¦
উঠতি সন্ত্রাসীদের হাতে-হাতে অস্ত্র

মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নু | প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০১৪

রাজধানীতে বিভিন্ন নামে এলাকাভিত্তিক নতুন নতুন সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে ওঠার প্রবণতা বেড়েই চলেছে। এর মধ্যে উঠতি বয়সী সন্ত্রাসী গ্র“পের তৎপরতা ভয়াবহ ও বেপরোয়া। পাড়া-মহল্লার ছিঁচকে সন্ত্রাসী থেকে শুরু করে এসব বাহিনীতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ছেন। যারা উঠতি সন্ত্রাসী নামে পরিচিত। অবাক হলেও সত্য যে এদের হাতে-হাতে এখন অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ছড়াছড়ি। আছে অত্যাধুনিক বিদেশী অস্ত্রও। প্রতিপক্ষকে শাসানো এবং চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপকর্মে অনেকটা প্রকাশ্যেই ব্যবহার হচ্ছে এসব অস্ত্র। এমনকি নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করতে তুচ্ছ ঘটনায় এরা যখন-তখন গোলাগুলি করে। আর মুহূর্তের মধ্যে মানুষ মেরে ফেলা এদের কাছে একেবারে মামুলি বিষয়। বৃহস্পতিবার মগবাজারের সোনালীবাগ ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায়ও এমন উঠতি সন্ত্রাসীদের সম্পৃক্ততার তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, পাড়া-মহল্লার বড় ভাই ছাড়াও এসব উঠতি সন্ত্রাসীদের প্রধান ক্রীড়ানকের ভূমিকা পালন করে জেলে কিংবা বিদেশে পালিয়ে থাকা শীর্ষ সন্ত্রসারী। যাদের নির্দেশনা অনুযায়ী এরা চাঁদাবাজি ছাড়াও নানা রকম সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহারিত হয়। আবার কোনো কানেকশন না থাকলেও সহজে চাঁদার টাকা পাওয়ার জন্য এদের কেউ কেউ বড় বড় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ব্যবহার করে চলে। ওদিকে যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তখন সেই সরকারি দলের বড় ভাইদের বিভিন্ন স্বার্থের কাজে হর-হামেশা ব্যবহারিত হয়। তাই এ চক্রের কোনো কোনো গ্র“প বড় ভাইদের ক্যাডার বাহিনী হিসেবেও পাড়া-মহল্লায় পরিচিতি লাভ করেছে। যে কারণে পুলিশের খাতায় নাম থাকলেও আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা এদের আটক করার সাহস পর্যন্ত দেখাতে চান না। ফলে চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে এরা হয় পার পেয়ে যায়, আর বেশি সমস্যা হলে খুব সহজে আত্মগোপনে চলে যেতে সক্ষম হয়।
সম্প্রতি গোয়েন্দা পুলিশ এ ধরনের ৪৬৬ উঠতি সন্ত্রাসীর তালিকা তৈরি করেছে। তবে ভয়ংকর তথ্য হচ্ছে- এ তালিকার মধ্যে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া কিশোরের সংখ্যাও শতাধিক। যাদের হাতে রয়েছে নামি-দামি অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র। পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, মূলত অভিভাবকদের উদাসীনতা ও দায়িত্বহীনতার কারণেই এসব শিক্ষার্থীদের সম্ভাব্য সোনালী জীবন এ রকম অন্ধকার জগতে ডুবে যেতে বসেছে।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলামও সম্প্রতি যুগান্তরের কাছে এসব উঠতি সন্ত্রাসীদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলা ও চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সিসি ক্যামেরায় ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজ দেখে এমন চিত্রই পাওয়া গেছে। তিনি জানান, এসব ভিডিও ফুটজে উঠতি কিংবা কিশোর বয়সের সন্ত্রাসীদের দেখা গেছে। এছাড়া অস্ত্রসহ গ্রেফতারকৃত কয়েকজন কিশোর সন্ত্রাসীর জবানবন্দিতেও উঠতি সন্ত্রাসীদের বিষয়ে ভয়াবহ তথ্য পাওয়া যায়।
ভিডিও ফুটেজের তথ্য বিশ্লেষণ করে গোয়েন্দা পুলিশ জানতে পারে, ২০ লাখ টাকা চাঁদা না দেয়ায় সম্প্রতি রাজধানীর মগবাজার এলাকায় উঠতি সন্ত্রাসীদের একটি গ্র“প সিএনজি স্টেশনের মালিক মোস্তাফিজুল হক মিলনকে গুলি করে। উত্তরার আশকোনায় অস্ত্রধারী চাঁদাবাজদের গুলিতে আহত হন নির্মাণাধীন বাড়ির মালিকসহ তিনজন। বাড্ডায় জয়নাল আবেদীন নামে এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে হত্যা করে চঁাঁদাবাজরা। মিরপুর ১ নম্বর সেকশনের কো-অপারেটিভ মার্কেটের এক কাপড় ব্যবসায়ীর কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে সন্ত্রাসীদের একটি গ্র“প। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ওই রাতেই মল্লিকা হাউজিং এলাকায় তার বাসায় মিষ্টির প্যাকেটে কাফনের কাপড় পাঠিয়ে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। এসব ঘটনায় পাড়া-মহল্লার উঠতি সন্ত্রাসী ছাড়াও কয়েকজন শিক্ষার্থীর সম্পৃক্ততা পায় গোয়েন্দা সংস্থা। তবে এ পর্যন্ত জড়িত কাউকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেনি।
এদিকে আরও কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের কয়েকটি সূত্র জানায়, জুলাই মাসের প্রথম দিকে শাহাদাত বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে এক ব্যবসায়ীর কাছে দশ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে স্থানীয় কিশোর সন্ত্রাসীরা। টাকা না দিলে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয়। এছাড়া দুই মাসে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় চিকিৎসক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন পেশার অন্তত ১৫ জন এই শ্রেণীর চাঁদাবাজদের হাতে গুরুতর জখম হন। এসব ঘটনা তদন্তে বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী শিক্ষার্থীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। অন্তত ৫টি চাঁদাবাজির ঘটনায় ১১ জন কলেজপড়ুয়া সন্ত্রাসীকে পুলিশ গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
র‌্যাব সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর কলেজছাত্রসহ ৬ উঠতি সন্ত্রাসীকে র‌্যাব গ্রেফতার করে। যাদের কাছ থেকে একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়। পরে পুলিশ জানতে পারে, গ্রেফতারকৃতরা মিরপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাত গ্র“পের সক্রিয় সদস্য। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে মেরাজুল ইসলাম (১৮) আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র। তার কাছ থেকে ১টি বিদেশী পিস্তল ছাড়াও গ্রেফতারকৃত অন্যদের কাছ থেকে আরও ২টি বিদেশী রিভলবার ও ৩২ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।
গত জুলাই মাসে বাড্ডা থানা পুলিশ সাড়ে ৪০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ গ্রেফতার করে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিবিএ’র ছাত্র শরিফুলকে। প্রায় একই সময়ে র‌্যাব-৩-এর একটি টিম মাদকের চালান ও অস্ত্রসহ গ্রেফতার করে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সায়েমকে। অপর অভিযানে র‌্যাব-৪-এর সদস্যরা অস্ত্রসহ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের তিন ছাত্রকে গ্রেফতার করে। পরে তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ৪টি আগ্নেয়াস্ত্র।
গোয়েন্দা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেন, সন্ত্রাসীরা এসব অস্ত্র সংগ্রহ করছে সীমান্ত এলাকার অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীদের ১৫টি গ্র“প বিভিন্ন কৌশলে সীমান্ত এলাকা থেকে এসব অস্ত্র রাজধানীর উঠতি সন্ত্রাসীদের হাতে পৌঁছে দিচ্ছে। আবার কারগারে আটক ও বিদেশে পালিয়ে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের মজুদের একটি অংশ এসব উঠতি সন্ত্রাসীদের হাতে চলে গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কাফরুল থানা পুলিশ শেওড়াপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে হুমায়ুন কবির বাবুকে ৫ রাউন্ড গুলিসহ গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃত বাবু গুলি বিক্রির জন্য শেওড়াপাড়ার রোকেয়া সরণি সড়কের গ্রিন ইউনিভার্সিটি এলাকায় অবস্থান করছিল। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ওই রাতেই তার দেয়া তথ্য মতে কল্যাণপুরের ৩ নম্বর রোডের ৬/২ নম্বর বাসায় অভিযান চালিয়ে লিখন ও হায়দারকে ২টি জার্মানির তৈরি রিভলবারসহ গ্রেফতার করে পুলিশ।
পরে তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই বাসার বিভিন্ন স্থান থেকে ১১৭ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা দায়েরের পর গ্রেফতারকৃতদের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। এসব অস্ত্র ব্যবসায়ীদের দেয়া স্বীকারোক্তিতে পুলিশ উঠতি ও কিশোর সন্ত্রাসীদের কাছে অস্ত্র বিক্রির ভয়াবহ তথ্য জানতে পারে, যা ছিল অনেকটা গা শিউরে ওঠার মতো বর্ণনা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদেশী অস্ত্রগুলো অত্যাধুনিক হওয়ায় দাম বেশি হলেও পেশাদার সন্ত্রাসীদের তা খুবই পছন্দের। ইতালির তৈরি পেট্রো বেরেটা, আমেরিকার ‘স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন’ কিংবা স্পেনের ‘এস্ট্রা আনকেটা, অস্ট্রিয়ার গ্লোক পিস্তল-১৭, ভোলকেনিক ভলিশনাল রিপিটার, ওয়ালদার পিপি, পিপিকে/এস পিস্তল, ফ্রান্সের ব্রাউনিং হাইপাওয়ারের মতো অনেক নামিদামি ব্র্যান্ডের পিস্তল-রিভলবার এসব উঠতি সন্ত্রাসীরা ব্যবহার করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পিট্রো বেরোটাসহ বিদেশী ওইসব অত্যাধুনিক অস্ত্রের দাম বৈধভাবে ৭০০ থেকে ১ হাজার ইউএস ডলার। অথচ এ অস্ত্রগুলোই বাংলাদেশে সন্ত্রাসীদের অন্ধকার জগতে অবৈধভাবে কেনাবেচা হচ্ছে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকায়। ভারতীয় পিস্তল কেনাবেচা হচ্ছে ৫০-৬০ হাজার টাকায়। দেশে তৈরি পিস্তল-রিভলবার বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকায়।
গোয়েন্দা পুলিশের সূত্রটি জানায়, গত মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ৪৬৬ উঠতি সন্ত্রাসী ও শিক্ষার্থীকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এদের অনেকের বিরুদ্ধে বড় ধরনের একাধিক অপরাধে সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী শিক্ষার্থীর সংখ্যাও শতাধিক। চিহ্নিত সন্ত্রাসী শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই ‘টিনএজ’ হওয়ায় তাদের গতিবিধি মনিটরিং করা হচ্ছে। এর বাইরে স্কুল কলেজ থেকে ঝরে পড়া কিছু বখাটে সন্ত্রাসীদের তালিকা পুলিশের হাতে রয়েছে, যা বর্তমানে হালনাগাদ করা হচ্ছে।
এদিকে এসব উঠতি সন্ত্রাসীদের অপরাধের পেছনে অন্যতম কী ধরনের কারণ কাজ করছে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, তাদের পর্যবেক্ষণে এখন পর্যন্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমত, চাঁদাবাজি। এর পরের ধাপে রয়েছে জমিজমা নিয়ে বিরোধ, মাদক ও ঝুট ব্যবসার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং বেশ কিছু ঘটনায় পরকীয়াসহ নারীঘটিত বিভিন্ন কারণও বেরিয়ে এসেছে।
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close