¦
সতেরো দিনে ১৩ জন গুম

আলাউদ্দিন আরিফ | প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০১৫

টানা অবরোধের মধ্যে রাজধানীসহ সারা দেশে আইনশৃংখলা বাহিনীর পরিচয়ে আটকের পর ১৩ জন ‘গুম’ হয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে তাদের স্বজন বা সংশ্লিষ্ট দলের পক্ষ থেকে। পরে তাদের মধ্যে একজনের ডিবি পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। নিখোঁজ থাকার দু’দিন পর লাশ উদ্ধার হয়েছে আরেকজনের। গুম হওয়ার পাঁচ দিন পর আদালতে হাজির করা হয়েছে পাঁচজনকে। অপর ৬ জন এখনও ‘নিখোঁজ’ রয়েছেন। এছাড়া বন্দুকযুদ্ধে ঢাকা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিহত হয়েছেন ২ ছাত্রদল নেতা। স্বজনদের অভিযোগ থেকে জানা যায়, মিরপুরের শাহআলীতে আটকের পর পুলিশের নির্যাতনে মারা গেছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের আরও এক নেতা।
এসব ঘটনাকে বিচারবহির্ভূত উল্লেখ করে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘নিখোঁজ, গুম বা বন্দুকযুদ্ধ যেভাবেই বলা হোক এগুলো বিচারবহির্ভূত ও বেআইনি হত্যাকাণ্ড। এসব ঘটনা যদি রাজনৈতিক আন্দোলন কিংবা অবরোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয় তাহলে এটা আরও গর্হিত অপরাধ। গায়ের জোরে হত্যা, গুম কিংবা গুলি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। রাজনৈতিক পক্ষগুলোর সমঝোতার মাধ্যমে এ থেকে নাগরিকদের রেহাই পাওয়া সম্ভব।’
একাধিক মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী ১৪ জানুয়ারি বেলা সাড়ে ৩টায় রংপুরের নিজ বাড়ি থেকে গুম হন দলিল লেখক ও বিএনপি কর্মী আল-আমীন কবির (৩৫), তার স্ত্রী বিউটি বেগম (৩০) ও বাসার পরিচারিকা মৌসুমী (৩০)। আল-আমিনের চাচাত ভাই তরিকুল ইসলাম বৃহস্পতিবার মোবাইল ফোনে যুগান্তরকে জানান, ঘটনার সময় আগ্নেয়াস্ত্র হাতে র‌্যাব ও ডিবির পোশাক পরা কয়েক ব্যক্তি রংপুরের চৈতালী দক্ষিণপাড়ার বাড়ি থেকে তাদের আটক করে। এখন পর্যন্ত ওই ৩ জনের কোনো খোঁজ মেলেনি। আল-আমীন কবিরের মা মাতুরা বেগম জানান, শতাধিক লোকের সামনে তার ছেলে, ছেলের বউ ও বাড়ির কাজের মহিলাকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু রংপুর জেলা কারাগার, কোতোয়ালি থানা, আশপাশের থানা, র‌্যাব কার্যালয়, হাসপাতালসহ সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ নিয়েও তাদের সন্ধান পাওয়া যায়নি। ১৭ জানুয়ারি সকাল ৯টার দিকে ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার বাটপাড়া গ্রাম থেকে আটক করা হয় কৃষক নাসির উদ্দিনকে। প্রায় ২০ বছর আগে তিনি পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি বিএনপি কর্মী বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। নাসির উদ্দিনের ছেলে আলমগীর ও চাচাত বোনের স্বামী রকিব উদ্দিন বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে জানান, নাসিরকে পুলিশ ও র‌্যাব আটক করে। আটক করতে আসা ব্যক্তিদের কাছে রাইফেল ছিল। কয়েকজন র‌্যাবের পোশাক পরা ছিলেন। ১৮ জানুয়ারি কোটচাঁদপুর থানা থেকে ফোন করে তাদেরকে বলা হয়, নাসির থানায় আছেন। আÍীয়রা থানায় গেলে পুলিশ জানায়, এ নামে কেউ থানায় নেই। যে নম্বর থেকে ফোন করা হয়েছে সেটি থানার নয়। রকিব উদ্দিন বলেন, আমরা স্থানীয় টিএন্ডটি (বিটিসিএল) অফিসে যোগাযোগ করি। তারা জানিয়েছে, ওই নম্বরটি থানার। কিন্তু পুলিশ নাসিরকে আটকের কথা অস্বীকার করেছে। পরে ১৯ জানুয়ারি গুলিবিদ্ধ অবস্থায় স্থানীয় মোহনপুর বিল এলাকায় রাস্তার পাশে একটি মাঠে নাসিরের লাশ পাওয়া যায়।
নড়াইলের জামায়াত নেতা ও পৌর কাউন্সিলর অ্যাডভোকেট ইমরুল কায়েস (৪০) আটকের দু’দিনের মাথায় মতিঝিলে ডিবি পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যান। নিহতের ছোট ভাই আবদুর রাজ্জাক যুগান্তরকে জানান, কায়েস একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি পাস করে বার কাউন্সিলে পরীক্ষা দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ১৬ জানুয়ারি রাতে ওয়ারী থানার ৬১, দক্ষিণ মৈশুন্ডিতে কায়েসের শ্যালক অ্যাডভোকেট সোহেলের বাসা থেকে ডিবি পরিচয়ে কয়েক ব্যক্তি তাকে আটক করে। পরদিন থানা, ডিবি ও র‌্যাব অফিসে যোগাযোগ করা হলে সবাই আটকের বিষয়টি অস্বীকার করে। এর এক দিন পর ১৯ জানুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে তার লাশ পাওয়া যায়। পুলিশের দাবি মতিঝিলের এজিবি কলোনি এলাকায় সন্ত্রাসীদের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছেন ইমরুল কায়েস। ১৯ জানুয়ারি জামায়াতের নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এক বিবৃতিতে দাবি করেন, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিকল্পিতভাবে ইমরুল কায়েসকে হত্যা করেছে। এ ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত করে জড়িতদের শাস্তি দাবি করেন তিনি।
১২ জানুয়ারি রাত আনুমানিক ১টার দিকে জামায়াতের কাফরুল থানার একটি ওয়ার্ডের সভাপতি একেএম তৌফিকুল হককে শেওড়াপাড়ার বাসা থেকে ডিবি পরিচয়ে আটক করা হয়। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত তৌফিকুলের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। জামায়াত এক বিবৃতিতে দাবি করে, চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে সরকারি নীলনকশার অংশ হিসেবে তৌফিকুলকে আটকের পর গুম করা হয়েছে।
৫ জানুয়ারি পুলিশ পরিচয়ে হাফিজুর রহমান (৪০) ও সাগর আলী (২৫) নামে দু’জনকে আটক করে কুষ্টিয়ার মিরপুর থানা পুলিশ। এরপর থেকে তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। সাগরের ফুফাতো ভাই রবিউল ইসলাম ৭ জানুয়ারি ওই থানায় একটি জিডি করেছেন। জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন, হাফিজ দৌলতপুর উপজেলার সেনপাড়া গ্রামের ইলা মণ্ডলের ছেলে এবং সাগর একই এলাকার সুখছাদের ছেলে। ৫ জানুয়ারি দুপুরে পুলিশ পরিচয়ে উপজেলার চিথলিয়া ইউনিয়নের পাহাড়পুর বাজার থেকে তাদেরকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
এছাড়া ১৫ জানুয়ারি র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে শ্যামপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সহ-সভাপতি মতিউর রহমান ও ২০ জানুয়ারি ঢাকায় ডিবি পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে, খিলগাঁও থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নূরুজ্জামান জনি নিহত হয়েছেন। ১৬ জানুয়ারি পুলিশের নির্যাতনে মারা গেছেন মিরপুরের স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মোহন বেপারী (৫৮)। তার শ্যালক আল-আমিন জানান, ১১ জানুয়ারি মোহন বেপারীকে চিড়িয়াখানা গেট এলাকা থেকে শাহ আলী থানা পুলিশ আটক করে। থানায় নিয়ে নির্যাতনের পর তাকে আদালতে পাঠানো হয়। ১৪ জানুয়ারি অসুস্থ মোহন বেপারীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৬ জানুয়ারি তিনি মারা যান। ৯ জানুয়ারি কবি নজরুল সরকারি কলেজের ছাত্রদল নেতা জসিম উদ্দিন, সুজন চন্দ্র দাস, রোমান আহমেদ, কেএম নজরুল হাসান ও ইরফান আহমেদ ওরফে ফাহিমকে ডিবি পরিচয়ে আটক করা হয়। কোনো সন্ধান না পাওয়ায় তাদেরকে গুম করার অভিযোগ তোলে ছাত্রদল ও বিএনপি। পরে ১৩ জানুয়ারি তাদের মিরপুর থানায় একটি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। তবে আদালতে হাজির করা হলেও তাদেরও ‘গুম’ করা হয়েছে উল্লেখ করে একজন মানবাধিকার কর্মী যুগান্তরকে বলেন, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদের অনুচ্ছেদ-২ এ বলা হয়েছে ‘গুম করা’ বলতে রাষ্ট্রীয় অনুমোদন, সাহায্য অথবা মৌন সম্মতির মাধ্যমে কার্যত রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি বা ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কর্তৃক সংঘটিত গ্রেফতার, বিনা বিচারে আটক, অপহরণ অথবা অন্য যে কোনো উপায়ে স্বাধীনতা হরণকে বোঝাবে; যা কিনা সংঘটিত হয় স্বাধীনতা হরণের ঘটনা অস্বীকার করা অথবা গুম করা ব্যক্তির নিয়তি এবং অবস্থানের তথ্য গোপন করে তাকে আইনি রক্ষাকবচের বাইরে রাখার ঘটনাগুলোর মাধ্যমে।’ এ সনদ অনুযায়ী ছাত্রদলের ৫ কর্মীও গুম হয়েছেন বলে জানান ওই মানবাধিকার কর্মী। আটকের ৫ দিন পরে তাদেরকে আদালতে হাজির করা হয়।
জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক ফয়জুল হাকিম লালা বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘সরকার রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের জন্য গুম ও গুলি করে বিরোধীদের হত্যার পথ বেছে নিয়েছে। শাসন ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ফ্যাসিবাদী পন্থা অবলম্বন করেছে।’
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close