¦
সন্দেহের তীর স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতার দিকে

যুগান্তর রিপোর্ট | প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০১৫

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা হামলার ঘটনায় বিএনপির অঙ্গসংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতার দিকে তদন্ত টিমের সন্দেহের তীর ঘুরপাক খাচ্ছে। যাকে বলা হচ্ছে মাঠ পর্যায়ের মূল পরিকল্পনাকারী ও অর্থ জোগানদাতা। প্রযুক্তিগত তদন্ত চালিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ স্বেচ্ছাসেবক দলের মধ্যম সারির জনৈক এই নেতার নাম জানতে পেরেছে। কিন্তু কৌশলগত কারণে ও মামলার তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে নাম প্রকাশ করতে চাননি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল পদস্থ গোয়েন্দা কর্মকর্তা। প্রসঙ্গত, শুক্রবার রাতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাঠের পুল এলাকায় গুলিস্তান-ভুলতা রুটের গ্লোরী পরিবহনের একটি বাসে দুর্বৃত্তরা পেট্রলবোমা হামলা চালায়। এতে ২৯ জন বাসযাত্রী আগুনে পুড়ে দগ্ধ হন। এদের মধ্যে ৯ জনের অবস্থা আশংকাজনক। এদিকে বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ঘটনায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামি করে যাত্রাবাড়ী থানায় পৃথক দুটি মামলা করেছে পুলিশ। শনিবার করা মামলাগুলোর একটি বিশেষ ক্ষমতা আইনে; অপরটি ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৯টি ধারা উল্লেখসহ বিস্ফোরক উপাদানাবলী আইনের ৪ ও ৫ ধারায় রেকর্ড করা হয়েছে। মামলার বাদী যাত্রাবাড়ী থানার এসআই কেএম নুরুজ্জামান যুগান্তরকে জানান, দুই মামলাতেই খালেদা জিয়াকে নির্দেশদাতা হিসেবে হুকুমের আসামি করা হয়েছে। মামলায় পরিকল্পনাকারী হিসেবে খালেদা জিয়া ও আরও ১৮ জন এবং বাস্তবায়নকারী হিসেবে ৫০ জন এজহারনামীয় আসামি করা হয়। এছাড়া মামলায় অজ্ঞাত হিসেবে বিএনপি-জামায়াতের আরও বেশ কিছু নেতাকর্মী জড়িত থাকার কথা বলা হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মাঠ পর্যায়ের স্বেচ্ছাসেবক দলের জনৈক নেতা এই হামলার পরিকল্পনা করেন এবং অর্থ জোগান দেন। তার বাসা যাত্রাবাড়ীর কাঠের পুল এলাকায়। এ ঘটনায় সরাসরি সম্পৃক্ত আরও কয়েক যুবকের নাম জানতে পেরেছে পুলিশ। এক্ষেত্রে প্রত্যক্ষদর্শীদের দেয়া তথ্যও কাজে লাগানো হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে পেট্রলবোমা হামলায় একটি মোটরসাইকেল ব্যবহৃত হয় বলে তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানতে পেরেছেন।
সূত্র জানায়, বাসে পেট্রলবোমা হামলার নেতৃত্বে থাকা স্বেচ্ছাসেবক দলের মধ্যম সারির কেন্দ্রীয় ওই নেতাকে তদন্ত দলের কব্জায় আনার জন্য নানামুখী প্রচেষ্টা চলছে। থানা পুলিশের পাশাপাশি ডিবি পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। এই ব্যক্তিকেই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও অর্থ জোগানদাতা হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে। দাবি করা হয়, তার সহযোগিতা ও বিএনপি নেতাদের নির্দেশে ৮ থেকে ১০ জন শুক্রবার রাতে ওই বাসটিতে পেট্রলবোমা হামলা চালায়। আনুমানিক ১৫-১৬ বছর বয়সী দুই কিশোরও এ হামলার ঘটনায় জড়িত ছিল।
মামলার আসামিদের গ্রেফতার করতে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির সমন্বয়ে যৌথ অভিযান চালানো হয়েছে। শনিবার ও রোববার রাতে যাত্রাবাড়ী, ডেমরা ও কদমতলী থানা এলাকায় যৌথ অভিযান চালানো হয়। দনিয়া এলাকার বাসিন্দা হাফিজুর রহমান জানান, এলাকার প্রত্যেকটি বাড়িতে অভিযান চালানো হয়েছে। বিশেষ করে বিএনপি নেতাকর্মীদের ঘরে ঘরে তল্লাশি চালানো হয়। পুলিশ সূত্র বলছে, এ অভিযানে এসব এলাকা থেকে ৩০ জনকে আটক করা হয়। ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার মাসুদুর রহমান জানান, যাত্রাবাড়ী, কদমতলী, শ্যামপুর ও ডেমরা এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়েছে। তিনি বলেন, এদের অনেকের বিরুদ্ধে আগে থেকেই নাশকতার অভিযোগ ছিল। ডিবি পুলিশের অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, স্বেচ্ছাসেবক দলের ওই নেতা বোমা তৈরির জন্য পেশাদার কয়েকজন বোমাবাজের কাছে অর্থ সরবরাহ করেন। তাকে গ্রেফতার করা গেলে এ ঘটনায় জড়িত পুরো নেটওয়ার্ককে সহজেই চিহ্নিত করা যাবে। ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ডিবি পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, এই নাশকতায় বিএনপি-জামায়াত জোটের কতিপয় নেতার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ রয়েছে। গোয়েন্দা অনুসন্ধানে অর্থ ও পরিকল্পনায় মাঠ পর্যায়ের একজনের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। তার বিষয়ে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
এদিকে এ ঘটনার কূলকিনারা করতে রোববার রাতে ওয়ারী জোনের পুলিশ কর্মকর্তারা জরুরি বৈঠকে বসেন। বৈঠকে প্রাপ্ত এসব তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত বৈঠক চলছিল।
যাত্রাবাড়ী থানার ওসি অবনী শংকর কর যুগান্তরকে জানান, মামলা দুটির তদন্তে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। আশা করছি শিগগিরই ঘটনার রহস্য উন্মোচন হবে। এজন্য অর্থদাতা ও নাশকতাকারীদের খোঁজা হচ্ছে। তিনি ইঙ্গিত করেন যে, এই ঘটনার সঙ্গে একাধিক রাজনৈতিক নেতার সম্পৃক্ততা রয়েছে। যাদের খোঁজা হচ্ছে।
শনিবার যাত্রাবাড়ী থানায় করা দুটি এজাহারে খালেদা জিয়া সম্পর্কে বলা হয়েছে, ৫ জানুয়ারি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির প্রধান খালেদা জিয়া দেশব্যাপী অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধের ডাক দেন এবং তাহাদের নেতাকর্মীদের অবরোধের মাধ্যমে সরকার পতন না হওয়া পর্যন্ত দেশের অচলাবস্থা নিশ্চিত করার জন্য বিএনপি ও জোটের কেন্দ্রীয় নেতৃবুন্দকে নির্দেশ প্রদান করেন। তারই নির্দেশে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া গংদের নির্দেশ ও পরিকল্পনায় এবং এজাহারে অন্তর্ভুক্ত ৫০ আসামিসহ অজ্ঞাতনামা আরও অনেক অনেক বিএনপি জামায়াতসহ জোটের নেতাকর্মীকে নিয়ে চরম নৈরাজ্য, ভীতি সৃষ্টি ও পুড়িয়ে মানুষ মারার জন্য পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে।
এ মামলা সম্পর্কে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ফৌজদারি আইনে যে হুকুম দান করেন, যে সহযোগিতা করেন, যে কর্মটি করেন সবাই সমান অপরাধী। কেউ যদি মামলা দিয়ে থাকেন সে মামলা অনুযায়ী আমাদের কার্যক্রম চলবে। এটাই আমাদের পরিষ্কার কথা।
যাত্রাবাড়ী থানার এসআই কেএম নূরুজ্জামানের দায়ের করা দুটি মামলাতেই ৩ ধাপে আসামি করা হয়েছে। দুটি এজাহারেই খালেদা জিয়ার স্বামী বা পিতার নাম, ঠিকানা ও আসামির ক্রমিক নম্বর দেয়া হয়নি। বলা হয়েছে তারই নির্দেশে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ব্যরিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহাবুব হোসেন (বার কাউন্সিল সভাপতি), শিমুল বিশ্বাস, এম কে আনোয়ার, শওকত মাহমুদ ওরফে নিজাম (সাংবাদিক), শিরিন সুলতানা, সাইরুল কবির, দিদার, মারুফ কামাল খান, সেলিমা রহমান, রিজভী আহম্মেদ, বরকত উল্লা বুলু, আমান উল্লাহ আমান, শরফুদ্দীন সফু, হাবিবুন নবী খান সোহেল, আজিজুল বারী হেলাল, কাইয়ুম কমিশনার ও লতিফ কমিশনারসহ জামাত-শিবির ও অন্যান্য শরিক দলের কেন্দ্রীয় নেতারা প্রকাশ্যে বিভিন্নভাবে সহযোগী সংসগঠন ও স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে পরিকল্পনা এবং এলাকা ভিত্তিক নাশকতা করার জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কঠোর নির্দেশ প্রদান করেন।
এজাহারে আরও বলা হয়, তাদের নির্দেশ ও পরিকল্পনায় মো. সালাহ উদ্দিন আহাম্মেদ (সমবায়বিষয়ক সম্পাদক ঢাকা মহানর বিএনপি) তানভীর আহমদ রবীন, আলহাজ নবী উল্লাহ নবী, মো. আতিক উল্লাহ, বাদল কমিশনার, জাহাঙ্গীর, মিজান ভাণ্ডারী, ছাত্র দলের আপ্যায়নবিষয়ক সম্পাদক শাহীন, জিকো, টুটুল, সোহেল আহাম্মেদ, তৈহিদুল হানাস (রিয়ন), জনি, নবী ওরফে মিলন, সোলজার, আলহাজ আবুল হোসেন, আনোয়ার হোসেন সর্দার ওরফে আনোয়ার, জাহিদুর রহমান লিপটন, শিবলু, সেলিম ভূঁইয়া (অধ্যক্ষ একে স্কুল অ্যান্ড কলেজ), সবুর ফকির (তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসার বাংলা শিক্ষক), সিরাজুল ইসলাম, ডা. আবদুল মাজেদ, মো. নিজাম উদ্দিন, মো. মাইনুদ্দীন মৃধা, মো, লোকমান হোসেন, নাসির উদ্দিন, আবদুল হাদী আল হেলালী, মোজাম্মেল হোসেন, আলিম, রিয়াজ উদ্দিন, মো. ইব্রাহিম, নাসির উদ্দিন, কাজী শাহ ইকবাল, হাবিবুল্লাহ, মাহামুদুল হাসান, ইমরান আহাম্মেদ, আইন উদ্দিন আহাম্মেদ, বোরহান উদ্দিন, মুসান্না জাহাঙ্গীর মুছা, বোরহান উদ্দিন, মো. অন্তর, আবদুল মান্নান, ফ্রিডম আইয়ুব, মাসুদ, তাজুদ্দীন, শাহাদাত হোসেন হেলাল, জুম্মন চেয়ারম্যান ও জামসেদুল হক শ্যামলসহ অজ্ঞাত আরও বিএনপি-জামায়াত জোটের কর্মীরা গাড়িতে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে অগ্নিসংযোগ করে। গাড়িতে থাকা ৩১ জন নিরীহ মানুষ অগ্নিদগ্ধ হয়ে বার্ন ইউনিটে ভর্তি হয়। আসামিরা গাড়িটি পুড়িয়ে ৫ লাখ টাকার ক্ষতিসাধন করেছে।
থানায় দায়ের করা ৫৮ নম্বর মামলায় পেনাল কোডের ১৪৩/৩২৬/৩০৭/৩৫৩/৪৩৫/৪২৭/১০৯/১১৪/৩৪ ধারাসহ বিস্ফোরক উপাদানাবলী আইনের ৪/৫ ধারায় রেকর্ড করা হয়। একই থানায় ৫৯ নম্বর মামলাটি ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ১৫/২৫(ঘ) ধরায় কেরর্ড করা হয়।
সেলিম ভূঁইয়া ১৪ দিনের রিমান্ডে : আগেই আটককৃত অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়াকে এ মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তিনটি মামলায় তার মোট ১৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। রোববার ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতে সেলিম ভূঁইয়া হাজির করে ৩টি মামলায় ১০ দিন করে মোট ৩০ দিনের রিমান্ডে নেয়ার আবেদন জানান যাত্রাবাড়ী থানার এসআই পরিমল চন্দ্র দাস। শুনানি শেষে ১৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মিজানুর রহমানের আদালত। বাসে বোমা হামলার দুটি মামলা ছাড়াও তাকেও আরও একটি মামলায় আটক দেখানো হয়েছে।
প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close