¦
দগ্ধদের আর্তনাদ স্বজনদের আহাজারি

শিপন হাবীব | প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০১৫

বিধ্বংসী পেট্রলবোমায় বেঁচে যাওয়া ৫০ জন বার্ন ইউনিটে মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। দগ্ধদের আর্তনাদ আর স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠছে বার্ন ইউনিটের পরিবেশ। এমন পরিবেশে চোখের পানি আটকে রাখা দায়। স্বজনদের কাঁদিয়ে ইতিমধ্যে ৫ জন চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে যারা বেঁচে রয়েছেন তাদের অনেকেই শংকামুক্ত নন। যেকোনো সময় নিভে যেতে পারে তাদের জীবনপ্রদীপ।
বর্তমানে ৮ জনের অবস্থা আশংকাজনক। রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন ডেকে এমনটাই জানিয়েছেন বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকরা। তারা জানিয়েছেন, যথাযথ চিকিৎসা প্রদানে ২শ’ ডাক্তার প্রয়োজন। পেট্রলবোমায় আহত রোগী ছাড়াও ইউনিটটিতে বর্তমানে প্রায় ৬শ’ রোগী ভর্তি রয়েছেন। ডাক্তারসহ নানা স্বল্পতায় চিকিৎসা প্রদান ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে শনিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আসা পরিচালক ডা. জুলফিকার আলী লেনিন ইউনিটে এসে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন রোববারের মধ্যে অতিরিক্ত আরও ২৫টি বেড ও ৪০ জন ডাক্তার ইউনিটে এসে চিকিৎসা প্রদান শুরু করবে। কিন্তু রোববার বিকাল পর্যন্ত ৪ জন ডাক্তার ও কয়েকটি বেড আনা হয়েছে। এ বিষয়ে রোববার বিকালে ডা. জুলফিকার আলী লেনিন যুগান্তরকে বলেন, বার্ন ইউনিটসংশ্লিষ্ট ডাক্তারদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ডাক্তারের তালিকা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত তালিকা পাওয়া যায়নি। তবে পেট্রলবোমায় আহত রোগীদের চিকিৎসা প্রদানে কোনো ত্র“টি হচ্ছে না বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
রোববার সকাল ১০টায় সরেজমিন বার্ন ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, আইসিইউর বারান্দায় কপাল ঠেকিয়ে কাঁদছেন শাপলা আক্তার। কিছুক্ষণ পর এইচডিইউ ইউনিটে ঢুকলেন শাপলা। ওই ইউনিটে ৫২ শতাংশ পোড়া শরীর নিয়ে তীব্র যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন স্বামী মাসুদ মিয়া। দিশেহারা শাপলা জানালেন, ২৩ জানুয়ারি বগুড়া সদরে ট্রাক নিয়ে বের হয়েছিলেন স্বামী মাসুদ ও ছোট ভাই জাহাঙ্গীর। দু’জনকেই দরজা বন্ধ করে পেট্রলবোমা মারা হয়। এখন আইসিইউতে ৫৭ শতাংশ পোড়া শরীর নিয়ে ভর্তি রয়েছেন ভাই জাহাঙ্গীর। আর এইচডিইউতে রয়েছেন স্বামী (মাসুদ)। বললেন, ‘আমি টাকা-পয়সা চাই না, চাই না বিচার, শুধু আমার স্বামী আর ভাইকে সুস্থ দেখতে চাই’।
খোকনের শরীর ৪৩ শতাংশ পুড়ে গেছে। পুরো শরীর ব্যান্ডেজে মোড়ানো। এবড়ো-থেবড়ো হয়ে পড়েছে মুখমণ্ডল। বেডে রেখেই ব্যান্ডেজ কাটা হচ্ছে। পাশে থাকা স্ত্রী রত্না আক্তারের চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় ঝরছে পানি। স্বামীর চিৎকারে ১ বছরের শিশু সন্তান উনাইষাকে কোলে নিয়ে আহাজারি করছিলেন রত্না।
রত্নার অভিযোগ সামনে কোনো ডাক্তার না থাকায় ওয়ার্ড বয়রা যেমনি ইচ্ছে তেমনিই কাটাকাটি করছে। স্বামীর কিছু হলে কি করবেন, কি করে বাঁচবেন এমন প্রশ্ন তার।
৭৫ বছরের বৃদ্ধা আবু বকর শুক্রবার থেকে একপ্রকার না খেয়েই আছেন। পেশায় একটি হাইস্কুলের সিনিয়র শিক্ষক। দুর্বল শরীর নিয়ে দৌড়ঝাঁপ, ২ তলা থেকে ৩ তলায় ছোটাছুটি করতে করতে ক্লান্ত তিনি। জানালেন, যাত্রাবাড়ী এলাকায় বাসে পেট্রলবোমায় গুরুতর আহত হয় ছেলে ফার্মাসিস্ট ইয়াছির আরাফাত ও বউ মা (ছেলের স্ত্রী) ফার্মাসিস্ট সাদিয়া ফাতেমা।
ঝলসে যাওয়া ছেলে মোশাররফ হোসেনের বেডের পাশে বসে তসবিহ পড়ছিলেন ৮৫ বছর বয়সী মা আনোয়ারা বেগম। ছেলের শরীর ২৭ শতাংশ পুড়ে গেছে। চোখ বন্ধ দুদিন ধরে। বৃদ্ধ মা ছেলের ঝলসে যাওয়া চেহারাটা আবছা আবছা দেখতে পেলেও হতভাগা ছেলে মাকে দেখতে পাচ্ছে না।
স্ত্রী লাভলী আক্তার জানান, মুখসহ চোখ ফুলে ফেঁপে উঠেছে। চোখ পুরোপরি বন্ধ হয়ে গেছে। বৃদ্ধ মা কাঁদছেন। দুটো কাচে অসংখ্য ঘষার দাগ ধরা যে বিবর্ণ চশমাটা চোখে রয়েছে, তাকে চশমার ফসিল বলাই ভালো। ভাঙা গলায় জানালেন, স্বাধীনতা দেখেছেন, দেখেছেন ধ্বংসলীলাও। কিন্তু এমন করে মানুষকে পুড়িয়ে মারার দৃশ্য দেখেননি তিনি।
রোববার পর্যন্ত আইসিইউতে ৪ জন রোগী রয়েছেন। আরও ৪৬ জন রোগী বার্ন ইউনিটের ২ ও ৩ তলার বিভিন্ন ইউনিটে ভর্তি রয়েছেন। যাদের অনেকের অবস্থা আশংকাজনক। কিন্তু পর্যাপ্ত ডাক্তার, নার্স ও ওয়ার্ড বয় না থাকায় বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে রোগী ও স্বজনদের।
এক রোগীর স্বজন অভিযোগ করেন, ‘আমরা দরিদ্র মানুষ, অগ্নিদগ্ধ স্বজনদের নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছি। কে ডাক্তার আর কে নার্স বুঝতে পারছি না। ডাক্তারদের নার্স ভেবে ওষুধ আর ইনজেকশন দেয়ার কথা বলতেই কিছু ডাক্তারের কাছ থেকে বকা শুনতে হচ্ছে।
এ প্রতিবেদকের সামনেই রোববার বেলা সাড়ে ১১টায় এইচডিইউ ইউনিটে এক রোগীর স্বজনকে উত্তেজিত হয়ে কথা বলছিলেন ডা. হোমায়রা। পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন বার্ন ইউনিটের সহকারী অধ্যাপক পাপন। এ বিষয়ে ডা. পাপন বলেন, পোড়া রোগীদের স্বজনরা অনেক দুঃখী, রোগীদের সঙ্গে তারাও নানা যন্ত্রণায় ভুগছেন। তাদের সঙ্গে সর্বোচ্চ ভালো ব্যবহার করা ডাক্তারদের নৈতিক দায়িত্ব।
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close