¦
বিধিনিষেধ মাথায় রেখে ফতোয়া দেয়া যাবে

কবির হোসেন | প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০১৫

এ রায়ে আরোপিত বিধিনিষেধ (রেসট্রিকশনস) মাথায় রেখে ধর্মীয় বিষয়ে ফতোয়া দেয়া যাবে। বিধিনিষেধ লংঘন করে ফতোয়া দান করলে তা আদালত অবমাননা হিসেবে গণ্য হবে এবং শাস্তির আওতায় আসবে। ফতোয়া নিয়ে আপিল বিভাগের দেয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতির চূড়ান্ত রায়ে এসব কথা বলা হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতির দেয়া রায়ের আদেশে বলা হয়েছে, যথাযথ শিক্ষিত ব্যক্তিরা ধর্মীয় বিষয়ে ফতোয়া দিতে পারবেন যেটা শুধু স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণযোগ্য হবে। কিন্তু ফতোয়া গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ভীতি বা অযাচিত প্রভাব নিষিদ্ধ। কেউ এমন কোনো বিষয়ে ফতোয়া দিতে পারবে না যা কোনো ব্যক্তির অধিকার, সম্মান ও সুনাম লংঘন ও ক্ষুণ্ন করে। ফতোয়া জারির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির ওপর শারীরিক শাস্তি ও মানসিক নির্যাতনসহ কোনো ধরনের শাস্তি আরোপ করা যাবে না।
ফতোয়া অবৈধ ঘোষণা করে ২০০১ সালে সুয়োমটো (স্বতঃস্ফূর্ত) রায় দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। ওই রায় বাতিল চেয়ে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে দুটি আপিল করা হয়। ২০১১ সালে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতির মতামতের ভিত্তিতে আপিল আংশিক মঞ্জুর করে সংক্ষিপ্ত রায় দেয়া হয়। আপিল দায়েরের ১৪ বছর পর রোববার আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ের অনুলিপি প্রকাশিত হয়েছে।
রায়টি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট তিনজন বিচারপতি রায়টি লিখেছেন। তারা হলেন- বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক, বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা ও বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। এদের মধ্যে মূল রায় লিখেছেন বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা ও বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা আপিল দুটি মঞ্জুর করে রায় দিয়েছেন। একই সঙ্গে হাইকোর্টের দেয়া রায় ও আদেশকে বাতিল ঘোষণা করেছেন।
আর বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন আপিল দুটির আংশিক মঞ্জুর করে রায় দিয়েছেন। এ ছাড়া নওগাঁর ঘটনায় দেয়া ফতোয়া অবৈধ ও কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছেন। এই বিচারপতির লেখা রায়ের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক, সাবেক প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন, বর্তমান প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা ও বিচারপতি মো. ইমান আলী। সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতি অর্থাৎ পাঁচজন বিচারপতি একপক্ষে রায় দেয়ায় সেটিই মূল রায় হিসেবে গণ্য হবে।
২০০০ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাবাজার পত্রিকায় নওগাঁর গ্রামে আজ ফতোয়াবাজদের সালিশে ভাগ্য নির্ধারণ হবে গৃহবধূ সাহিদার শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, নওগাঁ জেলার সদর উপজেলার কীর্তিপুর ইউনিয়নের আতিথা গ্রামের ওই গৃহবধূকে ফতোয়া দিয়ে হিল্লা বিয়ে দিতে বাধ্য করা হয়।
প্রতিবেদনটি আদালতের নজরে এলে হাইকোর্ট বিভাগের তৎকালীন বিচারপতি গোলাম রাব্বানী ও বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করেন। এতে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং নারী নেত্রী মালেকা বেগমসহ অন্যরা পক্ষভুক্ত হন। রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০০১ সালের ১ জানুয়ারি হাইকোর্ট ফতোয়াকে অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করে রায় দেন।
হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, বাংলাদেশের একমাত্র আদালতই মুসলিম বা অন্য কোনো আইন অনুযায়ী আইনসংক্রান্ত কোনো প্রশ্নে মতামত দিতে পারেন। কেউ ফতোয়া দিলে তা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯০ ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য হবে। এ ছাড়া সব মসজিদের ইমামকে জুমার নামাজের খুতবায় ও স্কুলে এবং মাদ্রাসায় মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা করারও সুপারিশ করা হয়। রায়ের বিরুদ্ধে মুফতি মো. তৈয়ব ও মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ওই বছরই আপিল করেন।
দীর্ঘদিন পর আপিল বিভাগে এই আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয় ২০১১ সালে। আদালত অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও ফতোয়া সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ আলেমদের মতামত শোনেন। এরপর ২০১১ সালের ১২ মে দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপিলের আংশিক মঞ্জুর করে সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করেন। রোববার আপিল বিভাগ চূড়ান্ত রায় প্রকাশ করে।
বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের মূল রায়ে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ-১৯৬১ তুলে ধরে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, আইনের ৭(১) ধারা অনুযায়ী তথাকথিত ওই তালাকের ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অথবা সাহিদাকে কোনো নোটিশ দেয়া হয়নি। তার স্বামী সাইফুল কর্তৃক ঘোষিত তালাক বৈধ ছিল না।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ইসলামিক নীতির ওপর ভিত্তি করে দেয়া মতামত ফতোয়াকে ইসলামিক আইনের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না এবং এটিকে শরিয়তের অংশ হিসেবেও বিবেচনা করা যাবে না। ফতোয়া হল বিচারিক সিদ্ধান্তের সংকলন।
ফতোয়া দেয়ার অধিকারের বিষয়ে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের আইনে কোনো ব্যক্তিকে ফতোয়া দেয়ার ব্যাপারে কর্তৃত্ব দেয়া হয়নি। তথাপি অনেক দেশে মুসলিম আইন সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে ফতোয়া দেয়ার জন্য মুফতিদের সমন্বয়ে রাষ্ট্র এডভাইসরি বোর্ডস (উপদেষ্টা পরিষদ) গঠন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগের এ ধরনের কোনো বডিকে ক্ষমতায়িত করা হয়নি। এখানে যেমন ফতোয়া দেয়ার জন্য কে মুফতি হতে পারবে তা খতিয়ে দেখতে কোনো কমিটি নেই, তেমনি কে ফতোয়া দিচ্ছে তা পরীক্ষার জন্য কোনো মনিটরিং বডিও নেই।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়েছে, আমরা ফতোয়া দেয়ার জন্য কোনো বিশেষ গোষ্ঠী তৈরি করতে চাই না। শরিয়তের বিষয়ে ব্যাপক জ্ঞানসম্পন্ন যেকোনো ব্যক্তিই ফতোয়া দিতে পারবেন। উপমহাদেশে স্মরণাতীত কাল থেকেই মুফতি শব্দটি পরিচিত হলেও বাংলাদেশে শিক্ষা কারিকুলামে মুফতিকে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। এ ছাড়া মুফতি নামক একটি শ্রেণী তৈরি করে গ্রাম এলাকায় ফতোয়া দেয়া বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়বে। এ রায়ে আরোপকৃত বিধিনিষেধ কঠোরভাবে মাথায় রেখে ফতোয়া দেয়া যাবে।
আপিলের শুনানিকালে একটি বড় প্রশ্ন উঠেছিল পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টের ভিত্তিতে হাইকোর্ট সুয়োমটো রুল জারি ও তার ওপর ভিত্তি করে রায় দিতে পারে কিনা- এ ব্যাপারে বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের রায়ে বলা হয়েছে, একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার বাধাগ্রস্ত হলে হাইকোর্ট সে ক্ষেত্রে সুয়োমটো রুল ইস্যু করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন, পোস্ট কার্ড এবং লিখিত উপাদান আবেদনপত্র হিসেবে বিবেচ্য হতে পারে। কিন্তু সুয়োমটো রুল ইস্যুর আগে হাইকোর্ট বিভাগকে অবশ্যই এ ধরনের ক্ষমতার প্রয়োগের সন্তোষজনক কারণ লিপিবদ্ধ করতে হবে।
বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞার দেয়া রায়ে বলা হয়েছে, এ ফতোয়ার বিষয়ে হাইকোর্টের সুয়োমটো রুল ইস্যুটি ছিল এখতিয়ারবহির্ভূত। ফতোয়া বৈধ না অবৈধ সে ব্যাপারে আমি কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করছি না। উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমি আপিল দুটি মঞ্জুর করছি এবং হাইকোর্টের রায় ও আদেশ বাতিল ঘোষণা করছি।
প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close