¦
আন্দোলনের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হচ্ছে

হাবিবুর রহমান খান | প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০১৫

নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ৩ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে দেশব্যাপী টানা অবরোধ চালিয়ে আসছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। আন্দোলনকে বেগবান করতে অবরোধের সঙ্গে মাঝে মাঝে যুক্ত করা হয় হরতালও। এছাড়া প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো জেলায় স্থানীয়ভাবে হরতাল পালিত হচ্ছে। বিশ্ব ইজতেমার মধ্যে অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার না করলেও অনেকে ধারণা করছিলেন আসন্ন এসএসসি পরীক্ষার কারণে কর্মসূচি কিছুটা হলেও শিথিল করা হতে পারে। কিন্তু অবরোধ প্রত্যাহার তো দূরের কথা, রোববার থেকে টানা ৭২ ঘণ্টার হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করা হয় শুক্রবার। তাই সোমবার থেকে শুরু হতে যাওয়া এসএসসি পরীক্ষার মধ্যেই এই আন্দোলন কর্মসূচিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ভিন্ন দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করতে চান। তারা বলছেন, এই কর্মসূচি ও পরিস্থিতি বিবেচনায় মনে হচ্ছে, এটি ২০ দলীয় জোটের চলমান আন্দোলন কর্মসূচির নতুন মাত্রা বা দ্বিতীয় ধাপ। অসহযোগ বা চূড়ান্ত আন্দোলনের আগে ওয়ারম্যাপ হিসেবে জোটের নীতিনির্ধারক মহল এই পথ বেছে নিয়েছে।
এদিকে বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের কয়েকটি সূত্র বলছে, এবারের হরতাল কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ২০ দলীয় জোটের আন্দোলনে ভিন্ন মাত্রা পাবে। কর্মসূচি সফল করতে তারা নেতাকর্মীদের আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। এছাড়া দাবি আদায়ে সরকারকে নানামুখী চাপে রাখার কৌশলও নেয়া হচ্ছে। এ উদ্দেশ্যে রাজধানীতে গণমিছিল বা গণসমাবেশ করা যায় কিনা সে ব্যাপারেও আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে সরকারের ওপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ জোরালো করার প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে।
আরও জানা যায়, প্রায় মাসব্যাপী চলমান এই আন্দোলনের সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে বিএনপি শিবিরে। বেশ কিছু বিষয়কে আন্দোলনের প্রাথমিক সফলতা হিসেবেও দেখছেন তারা। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘসহ বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের মোদি সরকারের নীতিনির্ধারক মহল সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির পররাষ্ট্র নীতির উল্লেখযোগ্য কিছু পরিবর্তনকেও বিএনপি ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। এছাড়া ২০ দলীয় জোটসহ সব স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে দ্রুত একটি জাতীয় সংলাপে বসার জন্য দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও ব্যবসায়ী সংগঠনের পক্ষ থেকে সরকারকে সংলাপে বসার আহ্বান জানানোকে বড় একটি অর্জন হিসেবে মনে করা হচ্ছে। সমন্বিত এই অর্জনের স্কোর মার্কগুলো আন্দোলনে থাকা নেতাকর্মীদের আরও উদ্যমী করছে। তাই এই সফলতাকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে বিরোধীদলীয় জোট আর পিছু হটতে চায় না। এজন্য এসএসসি পরীক্ষার চেয়েও তারা (তাদের ভাষায়) দেশের গণতন্ত্র সুরক্ষা ও একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দিতে চান।
সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, সংকট উত্তরণে বিএনপির পক্ষ থেকে বারবার সংলাপ বা আলোচনার আহ্বান জানানো হচ্ছে। কিন্তু সরকার তা আমলে নিচ্ছে না। তিনি মনে করেন, সরকারকে চাপে রাখতেই হয়তো বিএনপি আন্দোলনের কৌশল হিসেবে এসএসসি পরীক্ষার মধ্যে হরতাল কর্মসূচি দিয়ে নতুনমাত্রা যোগ করতে চায়। তবে সবার আশা ছিল, বিরোধীদলীয় জোট এসএসসি পরীক্ষা আন্দোলনের আওতামুক্ত রাখবে। কিন্তু পরিস্থিতি দেখে তেমন মনে হচ্ছে না। অপরদিকে সরকার শক্তি প্রয়োগ করে বিএনপির আন্দোলনকে দমন করার পথ বেছে নিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে দুই পক্ষই অনড়। যেন শক্তির পরীক্ষা চলছে। একদিকে সরকার কঠোর হচ্ছেন। অপরদিকে বিএনপিও কঠোর কর্মসূচি দেয়া থেকে পিছু হটছে না। আবার আইনশৃংখলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো রাজনৈতিক নেতাদের মতো কথা বলছেন। সবশেষ প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি রাষ্ট্রপতিও পুলিশকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপিও কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভেবেও তারা মানবিক পরিচয় দিতে পারেনি। এসএসসি পরীক্ষার মধ্যেই হরতালের ডাক দিয়েছে। বিএনপির আন্দোলনের কৌশল দেখে মনে হচ্ছে, তারা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যই সবকিছু করছে।
তিনি মনে করেন, দুই দলের নেতারা একবারও আয়নায় তাদের চেহারা দেখছেন না। তাদের এমন অনড় অবস্থানে সংকট আরও ঘনীভূত হবে। এ সংকট থেকে উত্তরণে দুই নেত্রীকে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ সমাধানের সবকিছুই তাদের দু’জনের কাছে। তারা সত্যিকারার্থে চাইলেই এ সংকট উত্তরণ সম্ভব। না হলে দেশ আরও অনিশ্চিত গন্তব্যে যাবে।
এসএসসি পরীক্ষার সময় আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণার হেতু কী- জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, চলমান আন্দোলনের বর্তমান অবস্থায় বিরতি দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। সরকার হার্ডলাইনে যাওয়ায় গ্রেফতার এড়িয়ে নেতাকর্মীদের সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে কাজ এগিয়ে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি মনে করেন, জনগণও আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছে।
আন্দোলনের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হল কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, আন্দোলনে এখন কোন ধাপ চলছে এটা মুখ্য বিষয় নয় বরং চলমান কর্মসূচিকে আরও সাফল্যের পর্যায়ে নিয়ে যেতে নানা কৌশল নেয়া হচ্ছে। তাই ধরে নিতে পারেন, কৌশলের অংশ হিসেবেই এসএসসি পরীক্ষার মধ্যে হরতাল ডাকা হয়েছে।
সাম্প্রতিক জাতিসংঘসহ প্রভাবশালী দেশগুলোর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিষয়ে মাহবুব বলেন, জাতিসংঘসহ বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলো চায়, বাংলাদেশে স্থিতিশীল পরিবেশ ও গণতন্ত্র অব্যাহত থাকুক। বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে তারা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সহযোগিতার মনোভাব দেখাচ্ছে। সংলাপের মাধ্যমে সংকট নিরসনের আহ্বান জানাচ্ছে। দেশের মানুষও তাই চায়।
বিএনপির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, কোকোর মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠে আন্দোলনে নজর দিতে শুরু করেছেন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ সিনিয়র নেতারা। বৃহস্পতিবার স্থায়ী কমিটির বেশ কয়েকজন নেতা তার সঙ্গে দেখা করেন। যদিও সেখানে রাজনৈতিক কোনো আলোচনা হয়নি। কিন্তু খালেদা জিয়া শোক কাটিয়ে উঠছেন এমন একটি ম্যাসেজ নেতাকর্মীদের দেয়া হচ্ছে। যাতে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা নতুন করে উজ্জীবিত হন।
প্রসঙ্গত, সরকারের মেয়াদ এক বছর শেষ হওয়ায় ৫ জানুয়ারির পর থেকে আন্দোলনের নতুন কৌশল নিয়ে কাজ শুরু করে ২০ দলীয় জোট। বিগত আন্দোলনের ব্যর্থতাগুলো চিহ্নিত করে কীভাবে ভবিষ্যতে আন্দোলনকে যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায় তার ছকও কষা হয়। এর আগে এ উদ্দেশ্যে নজর দেয় সংগঠনকে শক্তিশালী করার দিকে। ঢাকা মহানগর, ছাত্রদলসহ বেশ কয়েকটি জেলা কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করতে জেলা সফর করার সিদ্ধান্ত নেন খালেদা জিয়া। গত এক বছরে একাধিক জেলায় সমাবেশ করেন তিনি। এসব সমাবেশ থেকে নেতাকর্মীদের আন্দোলনের প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানানো হয়। একপর্যায়ে গাজীপুরে সমাবেশকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সরকারের বাধায় শেষ পর্যন্ত গাজীপুর থেকে পিছু হটে বিএনপি। এরপর ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের বর্ষপূর্তিকে গণতন্ত্র হত্যা দিবস আখ্যায়িত করে রাজধানীতে সমাবেশ করার ঘোষণা দেয়া হয়। সরকারও একই দিন ঢাকায় সমাবেশের ডাক দেয়। শুরু হয় উত্তেজনা। ৩ জানুয়ারি রাতে গুলশান কার্যালয়ে আসেন খালেদা জিয়া। ওই রাতে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে দেখতে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। এমন সময় কার্যালয়ের সামনে বাড়ানো হয় নিরাপত্তা। একপর্যায়ে জলকামানের সঙ্গে বালুর ট্রাক রাখা হয়। ওই রাত থেকে কার্যালয়ে অবরুদ্ধ হন খালেদা জিয়া। অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে ৫ জানুয়ারি বিকালে নয়াপল্টনের উদ্দেশে রওয়া হন। কিন্তু পুলিশি বাধায় তা সম্ভব হয়নি। কার্যালয়ের ভেতরে হ্যান্ডমাইকে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে ঘোষণা দেন দেশব্যাপী অনির্দিষ্টকালের অবরোধ। কার্যালয়ে অবরুদ্ধ থেকে সারা দেশের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে নানা দিকনির্দেশনা দেন তিনি।
১৮ জানুয়ারি গভীর রাতে হঠাৎ করে সরিয়ে নেয়া হয় সব ধরনের নিরাপত্তা। পরদিন সন্ধ্যায় স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে বৈঠক করে গণমাধ্যমের সামনে আসেন খালেদা জিয়া। সংকট নিরসনে আবারও সংলাপের আহ্বান জানিয়ে অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। এতে চলমান আন্দোলনে ভিন্ন মাত্রাও যুক্ত হয়। আন্দোলনে গতি বাড়ানোর নানা কৌশল নিয়ে এগোতে থাকে এই জোট। দুই দফায় চলা বিশ্ব ইজতেমার মধ্যেও কর্মসূচি স্থগিত না করে চালিয়ে যাওয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ গত শনিবার মারা যান খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো। শোকে মুহ্যমান খালেদা জিয়াসহ দলের নেতাকর্মীরা। আন্দোলন স্থগিত না করে তা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ছেলের অকাল মৃত্যুতে চলমান আন্দোলনে শোকের ছায়া পড়ে। কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে আন্দোলন। শোক কাটিয়ে আবারও নজর দেয়া হয় আন্দোলনে। এমন পরিস্থিতিতে সোমবার থেকে শুরু হওয়া এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে আলোচনায় আসে আন্দোলন। পরীক্ষার মধ্যেও কি আন্দোলন চলবে এমন নানা আশংকা দেখা দেয়। কিন্তু শুক্রবার নতুন করে ৭২ ঘণ্টার হরতালের মধ্য দিয়ে সব আশংকা স্পষ্ট করে দেয়া হয়। সূত্র বলছে, এ মুহূর্তে আন্দোলন ছাড়া কোনো কিছুই ভাবছে না তারা।
সূত্রগুলো জানায়, আন্দোলন যে পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে সেখান থেকে পিছু হটতে চাচ্ছে না মাঠের অবশিষ্ট সক্রিয় নেতাকর্মীরা। চলমান আন্দোলনে পিছু হটলে দলের অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে এমন আশংকাও রয়েছে। তাই সব ধরনের হুমকিকে উপেক্ষা করে আন্দোলন আরও বেগবান করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। চূড়ান্ত বিজয় না আসা পর্যন্ত আন্দোলন থেকে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া পিছু হটবেন না এমন বার্তাই দেয়া হয়েছে দল ও জোটের সবাইকে।
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close