jugantor
যুগান্তর যুগ যুগ জিও

  আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী  

০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, ০০:০০:০০  | 

দৈনিক যুগান্তর ১৬ বছরে পা দিল। আমাদের দেশে ১৬ বছর প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার বয়স বলে গণ্য হয়। যুগান্তর সে অর্থে এখন পুরোপুরি প্রাপ্তবয়স্ক। কিন্তু লক্ষণীয় ব্যাপার এই যে, যুগান্তর তার জন্মলগ্ন থেকেই সাংবাদিকতার যে উদাহরণ প্রতিষ্ঠা করেছে তা প্রাপ্তবয়স্ক সাংবাদিকতা, অপ্রাপ্তবয়স্ক সাংবাদিকতা নয়। দেশের একটি জটিল সন্ধিক্ষণে যুগান্তরের জন্ম। এই নামটি আমাকে চমকিত করেছে। কারণ আমার কৈশোরে দেখেছি অবিভক্ত বাংলায় কলকাতা থেকে যুগান্তর নামে দৈনিক পত্রিকা বের হতো। তার সম্পাদক ছিলেন সাংবাদিক বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়। তিনি ছিলেন একজন অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী। তখনকার দিনে তার ক্ষুরধার কলম থেকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে যে লেখা বের হতো তা আমাদের প্রেরণা ও উৎসাহ জোগাত। কলকাতার যুগান্তর বন্ধ হয়ে গেছে। তার দীর্ঘকাল পর স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে যখন আবার যুগান্তর নামে দৈনিক পত্রিকাটি প্রকাশের ঘোষণা দেয়া হয়- তখন প্রত্যাশায় বুক ভরে গেছে। দেশের তখন খুবই জটিল অবস্থা। সামরিক ও স্বৈরাচারী শাসনের দীর্ঘ ধারাবাহিকতা জনজীবনকে পিষ্ট করছে, স্বাধীনতার মূল মন্ত্রগুলো ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তির দ্বারা। এ সময় দেশের এমন একটি নির্ভীক এবং নিরপেক্ষ সংবাদপত্রের প্রয়োজন ছিল যা মানুষকে আবার আশা ও ভরসা জোগাবে।

যুগান্তর সে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে কিনা- তাই ছিল আমার মনের প্রশ্ন। আজ বলতে দ্বিধা নেই যুগান্তর নানা উত্থান-পতন, ভুল-ত্রুটির মধ্য দিয়েও সাংবাদিকতার আদর্শকে তুলে ধরতে পেরেছে। পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক গোলাম সারওয়ার থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে একে একে এবিএম মূসা, আবেদ খান, সালমা ইসলাম পত্রিকাটি সম্পাদনা করেছেন এবং এখন সাইফুল আলম সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করছেন। পত্রিকাটি তার জন্মকালীন সাংবাদিকতার নীতি থেকে কখনও বিচ্যুত হয়নি। সত্য প্রকাশের জন্য পত্রিকাটির মালিককে নির্যাতন বরণ করতে হয়েছে এবং নানা ঝড়-ঝাপটা গেছে পত্রিকাটির ওপর দিয়ে, কিন্তু যুগান্তর তার গণপাঠকের চাহিদা ও প্রত্যাশা পূরণ করে চলেছে।

দেশে এখন অনেক দৈনিক। জন্মকালে অনেক পত্রিকাই সৎ সাংবাদিকতা অনুসরণের ঘোষণা দেয়। কিন্তু পরে তারা নানা প্রলোভনে পথভ্রষ্ট হয়। দেশের অন্যান্য পেশার মতো সাংবাদিকতার পেশায়ও কালো টাকার প্রভাব পড়েছে। সংবাদপত্রের মৌলিক স্বাধীনতা রক্ষার জন্য এই কালো টাকার প্রভাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা সাংবাদিকদের একটা বড় কর্তব্য। যুগান্তরে আমার যেসব বন্ধু সাংবাদিক আছেন তারা কর্তব্যটি পালনে অনেকটাই নিবেদিত বলে আমার ধারণা। দেশে গণতন্ত্র এখন চারদিক থেকে বিপন্ন। হিংস মৌলবাদ মাথা তুলতে চাইছে, একটি সুবিধাভোগী সুশীল সমাজ নিজেদের কায়েমি স্বার্থ রক্ষার জন্য অনবরত জনগণকে বিভ্রান্ত করে চলেছেন। যে মানুষ পোড়ানো সন্ত্রাস আজ দেশে ছড়িয়ে পড়েছে, তাকে রোখার জন্য গণপ্রতিরোধ করার কাজে সংবাদপত্রের একটি ভূমিকা রয়েছে। দেশের সব সংবাদপত্রই সেই ভূমিকা পালন করতে পারছে বলে আমার মনে হয় না।

আমি যুগান্তরকে তাদের দলে ফেলি না। যুগান্তরের সাংবাদিকতায় ভুল থাকতে পারে, ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকতে পারে। কিন্তু তার নীতিগত অবস্থান সৎ ও নিরপেক্ষ। আমি এই পত্রিকাটির নিজেও একজন কলামিস্ট। পত্রিকার জন্মলগ্ন থেকে তার সঙ্গে জড়িত এবং তার জন্য গৌরব বোধ করি। এই পত্রিকা যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকুক এবং দেশে সৎ ও সাহসী সাংবাদিকতার উদাহরণ হয়ে থাকুক এটা কামনা করি।

৩১-০১-২০১৫, লন্ডন


 

সাবমিট

যুগান্তর যুগ যুগ জিও

 আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী 
০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, ১২:০০ এএম  | 

দৈনিক যুগান্তর ১৬ বছরে পা দিল। আমাদের দেশে ১৬ বছর প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার বয়স বলে গণ্য হয়। যুগান্তর সে অর্থে এখন পুরোপুরি প্রাপ্তবয়স্ক। কিন্তু লক্ষণীয় ব্যাপার এই যে, যুগান্তর তার জন্মলগ্ন থেকেই সাংবাদিকতার যে উদাহরণ প্রতিষ্ঠা করেছে তা প্রাপ্তবয়স্ক সাংবাদিকতা, অপ্রাপ্তবয়স্ক সাংবাদিকতা নয়। দেশের একটি জটিল সন্ধিক্ষণে যুগান্তরের জন্ম। এই নামটি আমাকে চমকিত করেছে। কারণ আমার কৈশোরে দেখেছি অবিভক্ত বাংলায় কলকাতা থেকে যুগান্তর নামে দৈনিক পত্রিকা বের হতো। তার সম্পাদক ছিলেন সাংবাদিক বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়। তিনি ছিলেন একজন অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী। তখনকার দিনে তার ক্ষুরধার কলম থেকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে যে লেখা বের হতো তা আমাদের প্রেরণা ও উৎসাহ জোগাত। কলকাতার যুগান্তর বন্ধ হয়ে গেছে। তার দীর্ঘকাল পর স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে যখন আবার যুগান্তর নামে দৈনিক পত্রিকাটি প্রকাশের ঘোষণা দেয়া হয়- তখন প্রত্যাশায় বুক ভরে গেছে। দেশের তখন খুবই জটিল অবস্থা। সামরিক ও স্বৈরাচারী শাসনের দীর্ঘ ধারাবাহিকতা জনজীবনকে পিষ্ট করছে, স্বাধীনতার মূল মন্ত্রগুলো ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তির দ্বারা। এ সময় দেশের এমন একটি নির্ভীক এবং নিরপেক্ষ সংবাদপত্রের প্রয়োজন ছিল যা মানুষকে আবার আশা ও ভরসা জোগাবে।

যুগান্তর সে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে কিনা- তাই ছিল আমার মনের প্রশ্ন। আজ বলতে দ্বিধা নেই যুগান্তর নানা উত্থান-পতন, ভুল-ত্রুটির মধ্য দিয়েও সাংবাদিকতার আদর্শকে তুলে ধরতে পেরেছে। পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক গোলাম সারওয়ার থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে একে একে এবিএম মূসা, আবেদ খান, সালমা ইসলাম পত্রিকাটি সম্পাদনা করেছেন এবং এখন সাইফুল আলম সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করছেন। পত্রিকাটি তার জন্মকালীন সাংবাদিকতার নীতি থেকে কখনও বিচ্যুত হয়নি। সত্য প্রকাশের জন্য পত্রিকাটির মালিককে নির্যাতন বরণ করতে হয়েছে এবং নানা ঝড়-ঝাপটা গেছে পত্রিকাটির ওপর দিয়ে, কিন্তু যুগান্তর তার গণপাঠকের চাহিদা ও প্রত্যাশা পূরণ করে চলেছে।

দেশে এখন অনেক দৈনিক। জন্মকালে অনেক পত্রিকাই সৎ সাংবাদিকতা অনুসরণের ঘোষণা দেয়। কিন্তু পরে তারা নানা প্রলোভনে পথভ্রষ্ট হয়। দেশের অন্যান্য পেশার মতো সাংবাদিকতার পেশায়ও কালো টাকার প্রভাব পড়েছে। সংবাদপত্রের মৌলিক স্বাধীনতা রক্ষার জন্য এই কালো টাকার প্রভাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা সাংবাদিকদের একটা বড় কর্তব্য। যুগান্তরে আমার যেসব বন্ধু সাংবাদিক আছেন তারা কর্তব্যটি পালনে অনেকটাই নিবেদিত বলে আমার ধারণা। দেশে গণতন্ত্র এখন চারদিক থেকে বিপন্ন। হিংস মৌলবাদ মাথা তুলতে চাইছে, একটি সুবিধাভোগী সুশীল সমাজ নিজেদের কায়েমি স্বার্থ রক্ষার জন্য অনবরত জনগণকে বিভ্রান্ত করে চলেছেন। যে মানুষ পোড়ানো সন্ত্রাস আজ দেশে ছড়িয়ে পড়েছে, তাকে রোখার জন্য গণপ্রতিরোধ করার কাজে সংবাদপত্রের একটি ভূমিকা রয়েছে। দেশের সব সংবাদপত্রই সেই ভূমিকা পালন করতে পারছে বলে আমার মনে হয় না।

আমি যুগান্তরকে তাদের দলে ফেলি না। যুগান্তরের সাংবাদিকতায় ভুল থাকতে পারে, ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকতে পারে। কিন্তু তার নীতিগত অবস্থান সৎ ও নিরপেক্ষ। আমি এই পত্রিকাটির নিজেও একজন কলামিস্ট। পত্রিকার জন্মলগ্ন থেকে তার সঙ্গে জড়িত এবং তার জন্য গৌরব বোধ করি। এই পত্রিকা যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকুক এবং দেশে সৎ ও সাহসী সাংবাদিকতার উদাহরণ হয়ে থাকুক এটা কামনা করি।

৩১-০১-২০১৫, লন্ডন


 

 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র