¦
সরকারও সমাধানের পথ খুঁজছে

শেখ মামুনূর রশীদ ও আবদুল্লাহ আল মামুন | প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

প্রকাশ্যে কঠোর মনোভাব প্রকাশ করলেও ভেতরে ভেতরে চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানের পথ খুঁজছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তাদের শরিক জেপি, ন্যাপ, বাসদ, কমিউনিস্ট কেন্দ্র এবং তরিকত ফেডারেশনের নেতারাও এ অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে বের করার পক্ষে মত দিয়েছে। আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়েও ইতিবাচক চিন্তা-ভাবনা চলছে বলে জানা গেছে। তবে কৌশলগত কারণে তারা আগ বাড়িয়ে বিএনপির সঙ্গে বসবে না। যদিও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন সংলাপে বসার জন্য সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে।
বিএনপি জোটকে নাশকতার পথ থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়ে সড়ক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, দেশের স্বার্থে সরকার অনড় অবস্থানে থাকবে তাও মনে করার কারণ নেই। বিএনপির উদ্দেশে তিনি বলেন- আপনারা শুভবুদ্ধির পরিচয় দিন। জনগণকে নিয়ে রাজনীতি করুন, আমরা স্বাগত জানাব। ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, রাজনীতির নামে নাশকতা করে, বোমা মেরে মানুষ হত্যা করা মানে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে হত্যা করা। তিনি বিএনপিকে সহিংসতার পথ থেকে সরে আসার আহ্বান জানান।
সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলে আসছেন, সংলাপে বসতে চাইলে বিএনপিকেই সবার আগে পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে তাদের জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ, হরতাল-অবরোধ প্রত্যাহার, গুপ্ত হামলা বন্ধ করতে হবে। এছাড়া জ্বালাও-পোড়াও বন্ধসহ আন্দোলনের নামে সব ধরনের সহিংস তৎপরতা বন্ধের প্রতিশ্র“তি দিতে হবে। অন্যথায় পরিস্থিতি মোকাবেলায় আরও কঠোর পথে হাঁটবে সরকার। এজন্য আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে সম্প্রতি সাত দফা নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। তবে প্রকাশ্যে যাই হোক, আওয়ামী লীগ ও সরকারের শীর্ষ মহল চলমান সহিংসতায় উদ্বিগ্ন। তারা যে কোনো সম্মানজনক উপায়ে সমঝোতার ব্যাপারে আগ্রহী। গণভবনে ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে আলোচনায় পেট্রলবোমায় নিহতদের সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী চলমান অচলাবস্থার দ্রুত নিষ্পত্তি কামনা করেছেন বলে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র যুগান্তরকে জানায়।
অবশ্য বাইরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজনে আরও কঠোর অবস্থান নেয়ার কথা বলেন। মানুষের জানমাল রক্ষায় যা যা করণীয় তিনি তা করবেন। শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগসহ তাদের শরিক দলগুলোর সংসদ সদস্য এবং নেতাকর্মীদের স্থানীয় জনসাধারণকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি-জামায়াতের সহিংস তৎপরতার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতেও নির্দেশ দিয়েছেন।
জানা গেছে, সমঝোতার পথ খোলা রাখতেই খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের চিন্তা থেকে ক্রমেই সরে আসছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। এই ইতিবাচক চিন্তার অংশ হিসেবেই গুলশান কার্যালয়ে বিদ্যুতের পুনঃসংযোগ দেয়া হয়। মুখোমুখি অবস্থান এড়ানোর জন্যই প্রথম দিনের এসএসসি পরীক্ষার সময় পরিবর্তন করা হয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ঢাকায় আনাও- এ উদ্যোগের অংশ বলে কেউ কেউ মনে করছেন। তবে রোববার রাতে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে বের হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হন তার উপদেষ্টা মোসাদ্দেক আলী ফালু। দৃশ্যত এর মাধ্যমে সরকারের কঠোর মনোভাব প্রকাশ পেলেও পর্দার অন্তরালে ভিন্ন কিছু হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
অবশ্য বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার কোনো সুযোগ নেই বলে দাবি করেছেন আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রধান শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি, বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। রোববার তিনি যুগান্তরকে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, ‘কিসের সমঝোতা? কার সঙ্গে সমঝোতা? যারা আন্দোলনের নামে স্বাধানীতাবিরোধী উগ্র সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী গোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারার রাজনীতি করছে তাদের সঙ্গে সরকার কেন সমঝোতা করতে যাবে?’ এ প্রসঙ্গে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য পানিসম্পদমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান রাজনৈতিকভাবেই হওয়া উচিত। কিন্তু বিএনপিতো জ্বালাও-পোড়াওর রাজনীতি করছে। তাদের সহিংসতার পথ পরিহার করতে হবে। আলোচনা চাইলে এজন্য বিএনপিকে পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
৬ জানুয়ারি থেকে টানা অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে বিএনপি-জামায়াতসহ বিশ দলীয় জোট। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনই এখন তাদের একমাত্র দাবি। এ ইস্যুতে সংলাপেও বসতে রাজি তারা। কিন্তু সরকার তা আমলে না নেয়ায় তারা আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে। টানা অবরোধের মধ্যেও বিএনপিসহ তাদের শরিকরা কয়েক দফা হরতালেরও ডাক দিয়েছে।
বিশ দলীয় জোটের টানা আন্দোলনকে ঘিরে চলছে সহিংস তৎপরতা। এখন পর্যন্ত সারা দেশে ৪২ জন নিহত হয়েছেন। পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রথম থেকেই সরকার সক্রিয় রয়েছে। রাজনৈতিকভাবে বিশ দলীয় জোটকে মোকাবেলার পাশাপাশি র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবিকে মাঠে নামানো হয়েছে। চলছে যৌথ অভিযান। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। জ্বালাও-পোড়াওসহ নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চলছেই। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের পক্ষ থেকে সম্প্রতি আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সাত দফা নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, আলোচনার দরজা খোলা রেখেই সরকার আন্দোলনের নামে বিএনপি-জামায়াতসহ তাদের শরিকদের সহিংস তৎপরতা বন্ধে আরও কঠোর অবস্থানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে খালেদা জিয়াকে দল ও জোটের শীর্ষ নেতাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার কৌশল নেয়া হয়েছে। তিনি যাতে কারও সঙ্গে আর যোগাযোগ রক্ষা করতে না পারেন, আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দিতে না পারেন- সেজন্য টেলিফোন, মোবাইল ও ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। তার গুলশান কার্যালয়ে নেতাদের আসা-যাওয়ার উপর অলিখিতভাবে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে শনিবার গুলশান কার্যালয়ের সামনে থেকে বিএনপির ৬ নারী নেত্রীকে আটক করে পুলিশ। রোববার সন্ধ্যায় চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মোসাদ্দেক আলী ফালুকে আটক করে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যায় পুলিশ।
এর সঙ্গে চলতে থাকা গ্রেফতার অভিযান আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যায়ের তৃণমূল নেতা- কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। দল ও জোটের নেতাকর্মীদের যাকে যেখানে যে অবস্থায় পাওয়া যাবে- সঙ্গে সঙ্গে তাকে গ্রেফতার করা হবে। আন্দোলনের পরিকল্পনাকারী ও নেতৃত্বদানকারীদের গতিবিধির ওপরও কঠোর নজরদারি আরোপ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে তাদের ফোনেও আড়িপাতা হচ্ছে। যেসব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে তাদের গ্রেফতারের জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়।
এছাড়াও ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বারে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো, কেরানীগঞ্জ, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, আশুলিয়াসহ ঢাকার আশাপাশের এলাকায় পুলিশের টহল কার্যক্রম বাড়ানো এবং ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের বাসায় বাসায় তল্লাশির নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। মাঠ পর্যায়েও একই ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশনা দেয়া হয়।
এদিকে হরতাল-অবরোধের নামে সন্ত্রাস, নাশকতা ও সহিংসতা বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ। রোববার জাতীয় সংসদে তিনি এ আহ্বান জানিয়ে বলেন, এভাবে একটা দেশ চলতে পারে না। নাশকতা বন্ধে যা যা পদক্ষেপ নেয়া দরকার তা নিতে হবে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে নাশকতা প্রতিহত করতে হবে। রওশন এরশাদ বিএনপির উদ্দেশে বলেন, প্রয়োজনে আলোচনায় বসুন। কিন্তু আলোচনায় না বসে হরতাল-অবরোধের নামে মানুষ পুড়িয়ে মারবেন না। মায়ের বুক খালি করবেন না। নাশকতার পথ পরিহার করার জন্য একই দিন জাতীয় সংসদে খালেদা জিয়ার ওপর বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close