¦
নতুন শিল্প-কারখানায় গ্যাস সংযোগের সিদ্ধান্ত আসছে

মুজিব মাসুদ ও মামুন আব্দুল্লাহ | প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

নতুন শিল্প-কারখানায় বন্ধ গ্যাস সংযোগের দরজা খুলছে। একই সঙ্গে পুরনো শিল্প প্রতিষ্ঠানের গ্যাসের লোড বৃদ্ধি, লোড স্থানান্তরের বিষয়েও সিদ্ধান্ত আসছে। ১৪ জানুয়ারি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির এক চিঠিতে সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীদের তালিকা চাওয়া হয়েছে। তালিকা পাঠানোর জন্য তিতাসের ঢাকা, ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহ জোনের জেনারেল ম্যানেজারদের কাছে চিঠি দেয়া হয়। চিঠিতে অবিলম্বে গ্যাস সংযোগের জন্য আবেদনকারী নতুন শিল্প-প্রতিষ্ঠান, লোড বৃদ্ধি ও লোড স্থানান্তরের জন্য আবেদনকারীদের অগ্রাধিকারভিত্তিতে তালিকা পাঠাতে বলা হয়।
তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী নওশাদুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, বর্তমান সরকার ১৭শ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস থেকে উৎপাদন বাড়িয়ে ২৭শ মিলিয়ন ঘনফুট করেছে। পাশাপাশি বিদেশ থেকে এলএনজি (তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানির জন্য অবকাঠামো নির্মাণের কাজও দ্রুত এগিয়ে নিয়ে গেছে। তার মতে, গ্যাসের জোগান বেড়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে সরকার শিল্পায়নকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সে কারণে গ্যাসের জন্য যেসব প্রতিষ্ঠান চালু করা যাচ্ছে না কিংবা লোড বাড়ানো ও গ্যাসলাইন স্থানান্তর করা যাচ্ছে না সেগুলোর তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছেন তারা। এ তালিকা থেকে পর্যায়ক্রমে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সংযোগ দেয়া হবে বলেও তিনি জানান। তবে কখন থেকে এই সংযোগ দেয়া শুরু হবে সেটা নিশ্চিত করেননি তিতাস এমডি।
জ্বালানি বিভাগের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, চলমান অবরোধ-হরতালের কর্মসূচি ও সহিংসতায় শিল্প-কারখানার মালিকরা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এছাড়া অনেক মালিক ঋণ নিয়ে শিল্প প্রতিষ্ঠান তৈরি করেও গ্যাসের অভাবে চালু করতে পারছেন না। এটি ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করবে। এ কারণে সরকার অবিলম্বে বন্ধ শিল্প-কারখানায় গ্যাস সংযোগ চালু করার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে বিতরণকারী কোম্পানি তিতাসের কাছ থেকে আবেদনকারীদের তালিকা চাওয়া হয়েছে। এই তালিকা অনুযায়ী নির্মিত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর আঙিনায় সরেজমিন পরিদর্শনপূর্বক গ্যাস সংযোগ দেয়া হবে।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের ২১ জুলাই থেকে শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের গ্যাস সংযোগ বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যেও প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি কিছু কিছু শিল্প-কারখানায় গ্যাস সংযোগ দিয়ে আসছিল। সরকার ইতিমধ্যে আবাসিক গ্যাস সংযোগ চালু করেছে। ২০১০ সালের ১৩ জুলাই থেকে আবাসিক খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ ছিল। তখন বলা হয়েছিল, গ্যাসের উৎপাদন দৈনিক ২২০ কোটি ঘনফুটে (২ হাজার ২০০ মিলিয়ন) উন্নীত না হওয়া পর্যন্ত নতুন সংযোগ দেয়া বন্ধ থাকবে। জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকারের নানা প্রচেষ্টায় নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের ফলে গ্যাস উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু গত বছরের ৭ মে আবাসিক গ্যাস সংযোগ দেয়া শুরু হলেও শিল্পে গ্যাস সংযোগ এখনও বন্ধ রয়ে গেছে।
তিতাসের জেনারেল ম্যানেজারদের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যাতে নতুন সংযোগ, লোড বৃদ্ধি ও লোড স্থানান্তরের আবেদনকারী গ্রাহকদের আঙিনায় জরুরিভিত্তিতে সরেজমিন পরিদর্শনপূর্বক প্রতিবেদন পাঠায়। সেই সঙ্গে চিঠিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্তও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বলা হয়। তিনটি ক্যাটাগরিতে তালিকা তৈরির জন্য বলা হয়েছে। এগুলো হল- যেসব বিনিয়োগকারী অর্থ ঋণ নিয়ে শিল্প-কারখানা নির্মাণ করেও গ্যাসের অভাবে চালু করতে পারেননি সেগুলোর একটি তালিকা। আন্তর্জাতিক ক্রেতা গোষ্ঠীর নির্দিষ্ট মান অনুসরণ করার বাধ্যবাধকতা ও অন্যান্য যৌক্তিক কারণে যেসব পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য কারখানা স্থানান্তরের যৌক্তিকতা দেখা দিয়েছে সেগুলোর আরেকটি তালিকা হবে। এছাড়া যেসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের লোড বৃদ্ধির আবেদন ইতিমধ্যে অনুমোদন হয়েছে কিন্তু সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে সংযোগ প্রদান করা যাচ্ছে না সেগুলোর আরেকটি তালিকা পাঠাতে বলা হয়েছে।
এদিকে বিদ্যমান ও নির্মাণাধীন বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সার ও শিল্প-কারখানায় নতুন সংযোগ প্রদান ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ করতে আরও ৬৬ কিলোমিটার গ্যাস পাইপলাইন বসাবে সরকার। ইতিমধ্যে সিলেটের বিবিয়ানা থেকে ধনুয়া পর্যন্ত পাইপলাইন বসানো হয়েছে। এখন ধনুয়া থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের আরেকটি পাইপলাইন বসানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এর মাধ্যমে দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিপরীতে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে নতুন নতুন শিল্প-কারখানায় সংযোগ দেয়া সহজ হবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এ প্রকল্পের প্রথম অংশে ধনুয়া থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত ৫২ কিলোমিটার এবং মনোহরদী-ধনুয়া-এলেঙ্গা-যমুনা সেতুর পূর্বপ্রান্ত পর্যন্ত ১০৩ কিলোমিটার গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। এজন্য আলাদা করে প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। কিন্তু ওই সময় দাতা সংস্থাদের কোনো সহায়তা না পাওয়ায় ধুনয়া থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত গ্যাসলাইন স্থাপন করা হয়নি। যে কারণে নতুন করে ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের ৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সর্বমোট ব্যয় হবে ৯৭৯ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) দিচ্ছে ৫০৭ কোটি টাকা, সরকারের নিজস্ব তহবিলে ৪৬৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা এবং গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) তহবিল থেকে সাত কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) আগামী সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন হতে পারে। এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের সদস্য এসএম গোলাম ফারুক বলেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব পাওয়ার পর প্রকল্পটির ওপর গত বছরের ২৯ অক্টোবর পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভার সিদ্ধান্ত প্রতিপালন করে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পুনর্গঠন করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধি ও বিভিন্ন কারখানায় গ্যাস সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের ৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন নির্মাণ করে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে প্রকল্পটি হাতে নেয়া হচ্ছে। অনুমোদন পেলে গাজীপুর জেলার শ্রীপুর, ময়মনসিংহের ভালুকা, টাঙ্গাইলের সখীপুর ও কালিহাতী এবং সিরাজগঞ্জের সায়দাবাদ, সিরাজগঞ্জ সদর, কামারখন্দ ও রায়গঞ্জ উপজেলায় ২০১৯ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রকল্পের আওতায় প্রধান কার্যক্রম হচ্ছে, ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের ৬৪ কিলোমিটার গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন এবং ছয়টি নদীর তলদেশে হরিজেন্টাল ডাইরেকশনাল ড্রিলিং (এইচডিডি) পদ্ধতিতে ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের আরও দুই কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন, তিনটি মিটারিং স্টেশন স্থাপন, সিপি সিস্টেম স্থাপন, স্কাডা সিস্টেম স্থাপন এবং ভূমি অধিগ্রহণ, ভূমি উন্নয়নসহ অন্যান্য পূর্ত কাজ। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বৈদেশিক সহায়তায় বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্পের তালিকায় এ প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে জাইকার সঙ্গে ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close