¦
এমন ঘটনা ঘটাব দেশ কেঁপে যাবে

মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নু ও আলাউদ্দিন আরিফ | প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা হামলার দায় স্বীকার করেছে দুই যুবক। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হামলার নির্দেশদাতা ও পরিকল্পনাকারী হিসেবে স্থানীয় বিএনপি নেতা হাবিব-উন-নবী খান সোহেলসহ ৫ জনের নাম জানিয়েছে। তবে জবানবন্দির কোথাও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কিংবা ২০ দলীয় জোটের কেন্দ্রীয় কোনো নেতার নাম নেই।
এ ঘটনায় আটককৃত যুবক শহীদুল্লাহ ও পারভেজকে শুক্রবার বিকালে কড়া নিরাপত্তায় মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এসএম মাসুদ জামানের আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় ম্যাজিস্ট্রেটের খাস কামরায় তারা স্বীকারোক্তিমূলক এই জবানবন্দি দেয়। আসামিরা জবানবন্দির মূল বক্তব্যে বলেন, তারা টাকার বিনিময়ে পেট্রলবোমা বানিয়ে বাসে নিক্ষেপ করে।
প্রসঙ্গত, ২৩ জানুয়ারি শুক্রবার রাতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে গ্লোরী পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা হামলার ঘটনায় ২৯ জন অগ্নিদগ্ধ হন। এর মধ্যে মারা যান ১ জন। গুরুতর দগ্ধ ৮ জনসহ বাকিরা এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ঘটনায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামি করে মামলা করা হয়। মামলায় বিএনপির ৫০ জন নির্দেশদাতা ও মাঠ পর্যায়ের ৫০ জনকে নির্দেশ পালনকারী হিসেবে আসামি করে অন্য মামলা করা হয়। বর্তমানে এ মামলায় শিক্ষক নেতা সেলিম ভূঁইয়াসহ ৮ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। মামলাটি মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্ত করছে।
যাদের নাম রয়েছে : ১৪ পৃষ্ঠার জবানবন্দিতে নির্দেশদাতা হিসেবে নাম রয়েছে মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আজিজুল বারী হেলাল, স্থানীয় বিএনপি নেতা সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর নবী উল্লাহ নবী, ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকার মিলন, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক মীর শরাফত আলী সফু, তার ভাই যুবদল নেতা নেওয়াজসহ কয়েকজনের নাম বলেছে। সেখানে নবী উল্লাহ নবীর বরাত দিয়ে আসামি শহীদুল্লা বলেছেন, ‘দলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নির্দেশ আছে। বড় কিছু ঘটাতে হবে। যাত্রাবাড়ী বিএনপি নেই। লোক নেই। ওপরে আমরা মুখ দেখাইতে পারি না।’ তরুণ জনি বলে, এমন ঘটনা ঘটাব দেশ কেঁপে যাবে। এরপর তারা বোমা হামলা চালায়।
স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে যা আছে : আসামি পারভেজ স্বীকারোক্তিতে বলেছে, ‘গত ২৩ জানুয়ারি মাতুয়াইল এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেয়া হয়। ওই ঘটনার দু’দিন আগে সোহাগ ও শহীদুল রাত সাড়ে ১০টার দিকে যাত্রাবাড়ী লেগুনা স্ট্যান্ডে মোবাইল ফোনে ডেকে নিয়ে যায়। তারা জানায়, গাড়িতে আগুন দিতে হবে। আরও বলেন, ওই কাজ করলে অনেক টাকা পাবে। তখন সোহাগ শহীদুলকে বলে, ‘ভাই আমার একটা ছেলে পরিচিত আছে। তার নাম বোমা রাসেল। আমি এ ব্যাপারে তার সঙ্গে কথা বলতে পারব।’
বোমা রাসেলের আগে থেকেই পরিচিত সোহাগ ও শহীদুল। এরপর তারা বোমা রাসেলের সঙ্গে কথা বলে। পরের দিন বোমা রাসেল যাত্রাবাড়ী যায়। সেখানে শহিদুল, সোহাগ, বোমা রাসেল, সাব্বির ও পারেভজ বোমা তৈরি করে বাসে নিক্ষেপ করার পরিকল্পনা করে। পরে ওরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। সোহাগের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলে জনি। সে শহীদুলকে সব ঠিকানা ও জায়গা দেখে রেকি করে আসতে বলে। ঘটনার দিন শহীদুল তার পরিচিত লোক দিয়ে দুই লিটার পেট্রল ও দুটি সেভেন আপের বোতল বোমা রাসেলকে দেয়। সঙ্গে ২ হাজার টাকাও দেয়। বোমা রাসেল ওই বোমা বানায়।
একটি পেট্রলবোমা সোহাগের হাতে এবং একটি পেট্রলবোমা রাসেলের হাতে রাখে। সাব্বিরের কাছে ছিল একটি ককটেল। পরিকল্পনা অনুযায়ী বোমা নিয়ে তারা কাঠেরপুল সংলগ্ন ঘটনাস্থলে যায়। রাত ৯টার দিকে পারভেজ একটু দূরে ওষুধের দোকানে দাঁড়িয়ে থাকে। সেখানে কিছুক্ষণ পর গ্লোরি পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস আসে। বাসটি রাস্তায় দিয়ে যাওয়ার সময় ঘটনাস্থলে পৌঁছলে তারা পেট্রলবোমা ছুড়ে মারে। মুহূর্তে বাসে আগুন লেগে যায়। পরে বাসে আগুন নিশ্চিত করে পারভেজ মাঠের কাছে সরে যায়। কিছুক্ষণ পর তার অপর সহযোগীরা মাঠে আসে। এরপর তারা মোবাইল ফোন বন্ধ করে যার যার মতো চলে যায়। পরের দিন ঘটনাস্থলে গেলে রাসেল তাকে ১০০ টাকা দিয়ে মোবাইল সিম পরিবর্তন করতে বলে।
আসামি শহীদুল্লাহ শহীদুল তার স্বীকারোক্তিতে বলেছে, ঘটনার দুদিন আগে জনি তাকে ফোন করে। ফোন দিয়ে জানায়, সে তার সঙ্গে দেখা করতে চায়। তাকে যাত্রাবাড়ী বাসস্ট্যান্ডে যেতে বলে। সেখানে বড় ভাই জনি মোটরসাইকেল নিয়ে আসে। তারপর তাকে মোটরসাইকেলযোগে বসুন্ধরা এলাকার একটি বাসায় যায়। সেখানে গিয়ে দেখে সোহাগও আছে। তখন সোহাগ তাকে জিজ্ঞাসা করে কি কাজ করতে হবে। আমি বলি, মনে হয় গাড়ি ভাংচুর করতে হবে। সোহাগ পারভেজকে ফোন দেয়। পারভেজ এসে বলে বোমা রাসেল ও সাব্বির এই কাজ ভালো করতে পারবে। পরে জনি ভাইকে ফোন করি। জনি তাকে বলে, তোদের পেট্রল ও টাকা দিচ্ছি। তোরা বোমা বানা। পরের দিন জনি ভাই বিকালে যাত্রাবাড়ীতে এসে বোমা রাসেল ও সাব্বিরকে সেভেন আপের দুটি বোতল, দুই লিটার পেট্রল ও ২ হাজার টাকা দেয়। তখন জনি বলে, কাঠেরপুলের কাউন্সিল এলাকায় বাসে বোমা মারলে পালাতে সহজ হবে। তখন আমরা ঘটনাস্থল পছন্দ করে সম্মতি জানাই। এরপর রাসেলকে বোমা তৈরি করে ওই জায়গায় আসতে বলি। ঘটনার দিন রাত ৮টা থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে রাসেল ও সোহাগ বোমা তৈরি করে নিয়ে তার সঙ্গে ঘটনাস্থলের কাছে দেখা করে। এরপর তারা কাঠেরপুলের কাছে অবস্থান নেয়।
সাব্বির, সোহাগ ও বোমা রাসেল কিছু দূরে অবস্থান নেয়। ওই সময় যাত্রাবাড়ী থেকে গ্লোরি পরিবহনের একটি বাস ডেমরার দিকে যাচ্ছিল। তখন বাসটি দেখে তারা তিনজন মিলে পরপর তিনটি বোমা গাড়িতে নিক্ষেপ করে। গাড়িতে আগুন লাগার পর তারা মাতুয়াইল পশ্চিমপাড়ায় নিরাপদ স্থানে চলে যায়। এরপর জনিকে মোবাইল ফোনে বলে, ‘জনি ভাই কাজ হয়ে গেছে।’ জনি তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ করে সাবধানে থাকতে বলে। পরের দিন বিকাল বেলায় তার সঙ্গে দেখা করার জন্য বলে। জনিসহ যাত্রাবাড়ী নবীউল্লাহ নবী ভাই, মিলন ভাইসহ বিএনপির আরও কয়েকজন সিনিয়র নেতার সঙ্গে দেখা করে। তাদের নাম ঠিকানা জিজ্ঞাসা করে। সে নিজেকে লেগুনা গাড়িচালক বলে জানায়। এরপর আরও অনেক কাজ করতে বলে। তারা পারবে বলে স্বীকারও করে। বিনিময়ে তাদের দেখে রাখতে অনুরোধ জানাই। এরপর বড় ভাইয়েরা আরও কোন কোন স্থানে বোমা হামলা চালাতে হবে তা নির্ধারণ করে দেয়।
যাত্রাবাড়ীতে বাসে আগুন দেয়ার এ ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি বিস্ফোরক আইনে। অন্যটি বিশেষ ক্ষমতা আইনে। দ্ুিট মামলার বাদী যাত্রাবাড়ী থানার এসআই কেএম নুরুজ্জামান। মামলা নম্বর ৫৮ ও ৫৯। শনিবার এ মামলা দায়ের করা হয়েছে। দুটি মামলায় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর আগে বিএনপির অধিকাংশ সিনিয়র নেতার নামে বিভিন্ন সময়ে নাশকতার মামলা হলেও দলের চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে এ দুটিই ছিল প্রথম মামলা।
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close