¦
দুই নেত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন এরশাদ

শেখ মামুনূর রশীদ | প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনের উপায় বের করতে দেশের দুই শীর্ষ নেত্রী শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বলবেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এমপি। তিনি দুই নেত্রীর সঙ্গে দেখা করবেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে সংকট সমাধানে একটি সম্মানজনক পথ বের করার উদ্যোগ নেবেন।
সাবেক রাষ্ট্রপতি বলেন, হত্যার রাজনীতি, রাজনীতিকেই হত্যা করে। তাই বিএনপিকে বলব, অবরোধের নামে জ্বালাও-পোড়াও, মানুষ হত্যাসহ সব ধরনের সংঘাত-সহিংসতা বন্ধ করুন। নাশকতার পথ ছাড়ুন। আওয়ামী লীগকে বলব, ভয়ভীতি দেখিয়ে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে ক্রসফায়ারের নামে মানুষ মারলেই সমস্যার সমাধান হবে না। দমনপীড়নের পথ পরিহার করে আলোচনায় বসুন। বর্তমানে রাজনৈতিক সংকট চলছে। তাই রাজনৈতিকভাবেই এ সংকট সমাধান করতে হবে। এ লক্ষ্যে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বয়োজ্যেষ্ঠ রাজনীতিক এইচএম এরশাদ দুই নেত্রীর সঙ্গে দেখা করে কথা বলার নতুন এ উদ্যোগ নিতে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।
রোববার যুগান্তরকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ তার এ উদ্যোগের কথা জানান। তিন দিনের ব্যক্তিগত সফর শেষে ভারত থেকে দেশে ফিরে শনিবার সন্ধ্যায় বিদেশী কূটনীতিক এবং দাতা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। সে সময় তিনি বলেন, ‘বিদেশীরা কি করবে? আমাদের সমস্যা আমাদেরই সমাধান করতে হবে’। কিভাবে এই সমস্যার সমাধান হবে- এমন প্রশ্ন নিয়ে যুগান্তর তার মুখোমুখি হলে সাবেক এই রাষ্ট্রপতি তার নিজের উদ্যোগ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানান।
যুগান্তর : দেশ কোন দিকে যাচ্ছে, এ অবস্থায় আপনি কি করবেন বলে ভাবছেন?
এরশাদ : ‘দেশ জ্বলছে। মানুষ পুড়ছে। মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। প্রতিদিনই কোনো না কোনো মায়ের বুক খালি হচ্ছে। পুরো দেশটাই বার্ন ইউনিটে পরিণত হয়েছে। সর্বত্র মানুষের আহাজারি। কান্না। শঙ্কা। সবাই উদ্বিগ্ন। একজন বয়োজ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ হিসেবে দেশের এ অবস্থায় চুপচাপ ঘরে বসে থাকতে পারি না। দেশ বাঁচাতে, দেশের মানুষকে বাঁচাতে প্রয়োজনে আমি নিজে দুই নেত্রীর কাছে যাব। তাদের সঙ্গে দেখা করে বলব, আসুন। একসঙ্গে বসুন। আলোচনায় বসে সমঝোতার পথ বের করি’।
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, সংবিধানে বলা আছে জনগণই সব ক্ষমতার উৎস। অথচ ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য সেই জনগণকে পেট্রলবোমা মেরে পুড়িয়ে মারছি। জনগণকে জিম্মি করে ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি করছি। এভাবে চলতে থাকলে পরিণতি কারও জন্যই ভালো হবে না। আগেও বলেছি, এখনও বলছি। হত্যার রাজনীতি রাজনীতিকেই হত্যা করে। তাই বিএনপিকে বলব, হরতাল-অবরোধের নামে জ্বালাও-পোড়াও মানুষ হত্যাসহ সব ধরনের সংঘাত-সহিংসতা বন্ধ করুন। নাশকতার পথ ছাড়–ন। এসব করে ক্ষমতায় যেতে পারবেন না।
যুগান্তর : শুধু কি বিএনপিকেই বলবেন? আওয়ামী লীগের উদ্দেশে কি কিছুই বলার নেই?
এরশাদ : কেন বলার থাকবে না? আওয়ামী লীগকে বলব, আপনারা সরকারে আছেন। যারা সরকারে থাকে তাদের দায়-দায়িত্ব বেশি। দয়া করে আরও নমনীয় হোন। সহনশীল হোন। দমনপীড়নের পথ পরিহার করে আলোচনার উদ্যোগ নিন। ভয়ভীতি দেখিয়ে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দিয়ে ক্রসফায়ারের নামে মানুষ মারলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সমস্যার সমাধান চাইলে আলোচনায় বসতে হবে। আলোচনার কোনো বিকল্প নেই। যেহেতু আজ হোক, কাল হোক আলোচনায় বসতেই হবে, তাই যত দ্রুত সম্ভব আলোচনার উদ্যোগ নিন।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক বছর পূর্তির দিন থেকেই সারা দেশে টানা হরতাল অবরোধের কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। বিপরীতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের নেতারা বিশ দলীয় জোটকে মোকাবেলায় মাঠে আছে। একদিকে দুই প্রধান দল ও জোটের এই মুখোমুখি অবস্থান। অন্যদিকে হরতাল-অবরোধের নামে দেশব্যাপী চলছে জ্বালাও-পোড়াও-সংঘাত-সহিংসতাসহ নানা ধরনের নাশকতামূলক তৎপরতা। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়ে মারা যাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
দেশের এ রকম সংকটময় পরিস্থিতিতে রাজনীতিবিদ, রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক-পেশাজীবী ও ব্যবসায়ী সংগঠন, শীর্ষ আইনজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সুশীল সমাজসহ কূটনীতিক ও দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা দুই প্রধান দলের মধ্যে সংলাপ অনুষ্ঠানের তাগিদ দিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ রাষ্ট্রের এক নম্বর ব্যক্তি হিসেবে রাষ্ট্রপতিকে এ উদ্যোগ গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছেন। কেউ আবার প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে সংলাপ আয়োজনের জন্য দুই দলের সম্মতি নিয়ে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠনেরও প্রস্তাব দিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ বলেন, ‘আমি, আমরা সবাই সংলাপ চাই। সংকট নিরসনে সংলাপ প্রয়োজন। এর কোনো বিকল্পও নেই। কিন্তু কবে সংলাপ হবে তা জানি না। তবে বিশ্বাস করি, সংলাপ হবে। হতেই হবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা খুবই সীমিত। এক্ষেত্রে তার কিছু করার আছে বলে আমি মনে করি না। আর সুশীল সমাজকে দিয়েও হবে না। তারা কাজের চেয়ে কথা বলেন বেশি। দুই প্রধান দলের কাছে গ্রহণযোগ্য এমন লোকজন খুঁজে পাওয়াটাও মুশকিল।
যুগান্তর : তাহলে কি সংকট অব্যাহত থাকবে? সমাধান কিভাবে হবে?
এরশাদ : কেন সংকট অব্যাহত থাকবে? কেন সংলাপ হবে না? সংলাপ হবে। সমস্যার সমাধানও হবে। সংকট নিরসনে দুই প্রধান দলের সদিচ্ছাই যথেষ্ট। তারা চাইলে কালই সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু হচ্ছে না। এর মূল কারণ দুই দলের মধ্যকার ‘ইগো প্রবলেম’। সন্দেহ-অবিশ্বাস। দূরত্ব।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আজ যদি ক্ষমতাসীন দল হিসেবে আওয়ামী লীগ সংলাপে বসতে রাজি হয় কিংবা আগ বাড়িয়ে সংলাপে বসার প্রস্তাব দেয়, বিএনপি এটাকে তাদের চলমান আন্দোলনের বিজয় হিসেবে দেখবে। মুহূর্তেই তাদের নেতাকর্মীরা রাস্তায় নেমে এসে আনন্দ উল্লাস করবে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর আক্রমণ হবে। তাদের ঘরবাড়িতে আগুন দেয়া হবে। জ্বালাও-পোড়াওসহ সংঘাত-সহিংসতা সারা দেশে আরও ব্যাপক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়বে। শাসক দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে এ বিষয়টি মাথায় রাখতে হচ্ছে। হয়তো ভেতরে ভেতরে তারাও চান সমঝোতা। সংলাপ। কিন্তু তাদের এই উদারতা ‘শাপেবর’ হতে পারে- এমন আশঙ্কায় শাসক দল আওয়ামী লীগ অনড় অবস্থান গ্রহণ করেছে।
যুগান্তর : তাহলে কি সামনে কোনো আশার আলো নেই?
এরশাদ : অবশ্যই আছে। আওয়ামী লীগকে শাসক দল হিসেবে যেমন ছাড় দিতে হবে। তেমনি ছাড় দিতে হবে বিএনপিকেও। সংলাপ বা সমঝোতা চাইলে বিএনপিরও ছাড় দেয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। সংলাপের আবহ তৈরি করার স্বার্থে তাদের হরতাল-অবরোধ, জ্বালাও-পোড়াওসহ সব ধরনের নাশকতা এবং সংঘাত-সহিংসতার পথ পরিহারের সুস্পষ্ট ঘোষণা দিতে হবে। শুধু তাই নয়, গত এক মাসে হরতাল-অবরোধের নামে যা যা ঘটেছে তার দায়-দায়িত্বও তাদের নিতে হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
যুগান্তর : তার মানে সমস্যার সমাধান নির্ভর করছে দুই দলের ওপর?
এরশাদ : অবশ্যই। আওয়ামী লীগ ছাড় দেবে। বিএনপি ছাড় দেবে না। তা হলে তো আর সমঝোতা হবে না। সংলাপও হবে না। দুই দলকেই ছাড় দিতে হবে। সহনশীল হতে হবে। আওয়ামী লীগকে বুঝতে হবে গায়ের জোরে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না। একইভাবে বিএনপিকেও বুঝতে হবে পেট্রলবোমা মেরে মানুষ পুড়িয়ে, জনমনে ভয়-ভীতি ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে ক্ষমতায় যাওয়া যাবে না। এই বার্তা পৌঁছে দিতেই আমি প্রয়োজনে দুই শীর্ষ নেত্রীর সঙ্গে দেখা করব। তাদের সঙ্গে কথা বলব। একটি সমাধানের পথ খুঁজে বের করার জন্য তাদের অনুরোধ জানাব।
যুগান্তর : জাতীয় সংলাপের আহবান জানিয়ে আপনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে চিঠি দিয়েছিলেন। কারা এতে সাড়া দিয়েছে?
এরশাদ : জাতীয় সংলাপে বসার আহবান জানিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৩৯টি রাজনৈতিক দলকে চিঠি দিয়েছি। অনেকেই এতে সাড়া দিয়েছেন। কিন্তু প্রধান দুই দল এখনও সাড়া দেয়নি। তারা সাড়া না দিলে আমার এ উদ্যোগের কাক্সিক্ষত কোনো ফল আসবে না। দুই নেত্রীর সঙ্গে দেখা করে এ বিষয়টিও বলব। তারা সায় দিলে আমি জাতীয় কনভেনশনের আয়োজন করব। সংকট নিরসনে সবার মতামত নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করব। একটি স্বাধীন দেশ দিন দিন এভাবে মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হতে পারে না।
যুগান্তর : কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বলেছেন, তারা আমাদের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। আমাদের সমস্যা আমাদেরই সমাধান করতে হবে। আপনি কি মনে করেন, আমাদের রাজনীতিবিদরা এই সমস্যার একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করতে পারবে?
এরশাদ : যে জাতি মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। সে জাতি পথ হারাবে না। এ জন্য প্রয়োজন সহনশীলতা। দলীয় সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে এসে দেশটাকে, দেশের মানুষকে ভালোবাসা। আমরা কেউ তা পারছি না। অথচ কথায় কথায় বলছি জনগণের জন্য আমরা নাকি রাজনীতি করছি। এই কি তার নমুনা? আমি সেদিন কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বলেছি, বিদেশীদের কাছে ধরনা দিয়ে লাভ হবে না। তারা আমাদের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। আমাদের সমস্যা আমাদেরই সমাধান করতে হবে। এখনও বলছি, আমাদের সমস্যা রাজনৈতিক। তাই এই রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান রাজনীতিকদেরই করতে হবে। তা না পারলে আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close