¦
পোড়া ক্ষতে বাড়ছে জ্বালা : চোখের জ্বলে ভাসছে স্বজনের বুক

শিপন হাবীব | প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

‘হে আল্লাহ তুমি আমার একমাত্র সন্তানের ওপর নিষ্ঠুর হইও না। মানুষ তাকে জ্বালিয়ে দিলেও তুমি আমার বুক থেকে তাকে কেড়ে নিও না।’ ছোট্ট মেয়ে মরিয়মের মাথার পাশে দু’হাত তুলে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করছিলেন মা নার্গিস আক্তার। পেট্রলবোমায় মরিয়মের ৪৫ শতাংশ শরীর পুড়ে গেছে। গত ৪ দিন ধরে ঢামেক বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে সে। তীব্র যন্ত্রণার মধ্যে আবার ১০৪ ডিগ্রি জ্বর। শরীর থরথর করে কাঁপছে। অসহায় মা নার্গিস আক্তার সৃষ্টিকর্তার কাছে টানা ফরিয়াদ করে যাচ্ছেন, মেয়ের সুস্থতার জন্য।
এদিকে বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন ৬৩ জনের প্রত্যেককে ১০ লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সোমবার বিকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক ডা. জুলফিকার আলী লেনিন জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী ৬৩ জন দগ্ধ রোগীর প্রত্যেককে ১০ লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র করে দিয়েছেন। যা সোমবার থেকে কার্যকর হচ্ছে।
সোমবার সকালে বার্ন ইউনিট সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, দগ্ধ রোগীদের যন্ত্রণায় হা-হুতাশ করছেন স্বজনরাও। কেউ কাউকে শান্ত্বনাও দিতে পারছিলেন না। আইসিইউর ভেতর থাকা ৮ জন দগ্ধ রোগীর স্বজনদের মাঝে আতংক বিরাজ করছে। শিশু মরিয়ম ও রাকিবের মায়ের গোঙানিতে ডাক্তার, নার্সরাও স্তব্ধ। মরিয়মের মা নার্গিস আক্তার জানান, তার মেয়েকে গত ২ দিনে ৩ ব্যাগ রক্ত দেয়া হয়েছে। দিন দিন সে আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছে। আজ (সোমবার) সকাল থেকে ১০৪ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে মেয়ে তার একেবারেই হলদে রঙের হয়ে যাচ্ছে।
নার্গিস আক্তার আরও জানান, মরিয়মের ব্যান্ডেজ বেয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। চোখ খুলে তাকাতে পারছে না। মেয়েকে বি-পজেটিভ রক্ত দিতে অনেক লোকজন আসছেন জানিয়ে বলেন, রক্তের অভাব হচ্ছে না, দেশের মানুষ যেন তার মেয়ের জন্য দোয়া করেন। অন্যদিকে শিশু রাকিবের অবস্থাও চরম সংকটাপন্ন। তার মুখমণ্ডল, মাথা ও গলা সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। ক্ষতগুলো ফুলে দু’চোখ একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে।
সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বার্ন ইউনিটে ১২৫ জন দগ্ধ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। তাদের মধ্যে ৫৭ জন এখনও ভর্তি রয়েছেন। বাকিরা চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। যারা ভর্তি আছেন তাদের মধ্যে ৩১ জনের ১০ শতাংশ থেকে ৬৪ শতাংশ শরীর পুড়ে গেছে। ৪৯ জন রোগী এইচডিইউ ইউনিট, ওয়ার্ড ও বারান্দায় ভর্তি রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট ডাক্তাররা বলছেন, দগ্ধ রোগীদের মধ্যে কারও কারও ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অনেকের হাড় ভাঙা রয়েছে। ক্ষত কিংবা পোড়া অংশ না শুকানোর কারণে হাড় ভাঙার যথাযথ চিকিৎসাও করা যাচ্ছে না। পেট্রলবোমায় দগ্ধ রোগীদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন জানিয়ে ডাক্তারা বলেন, দেড়শ’ রোগীর স্থলে বার্ন ইউনিটে বর্তমানে সাড়ে ৬শ’ রোগী রয়েছেন। শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও চিকিৎসা দিয়ে আসছেন তারা।
বার্ন ইউনিটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, বর্তমান উপদেষ্টা ডা. সামন্ত লাল সেন যুগান্তরকে জানান, পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়ে আসা রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। যাদের শরীর বেশি পোড়া এবং শ্বাসনালি পুড়ে গেছে তাদের বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ অনুসারে দগ্ধ রোগীদের যথাযথ ওষুধ ফ্রি দেয়াসহ সার্বিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
১০ লাখ টাকা করে পারিবারিক সঞ্চয়পত্র : প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক ডা. জুলফিকার আলী লেনিন সোমবার যুগান্তরকে জানান, ঢামেক বার্ন ইউনিটে দগ্ধ হয়ে ভর্তি রোগীদের তাৎক্ষণিক ১০ হাজার টাকা করে দেয়া হচ্ছে। রোগীদের সঙ্গে থাকা স্বজনদের হাতে ওই টাকা তুলে দেয়া হচ্ছে। যা প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত তহবিল থেকে দেয়া হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, ঢামেক বার্ন ইউনিটে ভর্তি ৬৩ জন দগ্ধের প্রত্যেকের নামে ১০ লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যার কার্যক্রম সোমবার থেকে শুরু হয়েছে। বার্ন ইউনিটে ভর্তি বাকিদের এবং ঢাকার বাইরে যেসব হাসপাতালে দগ্ধ রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন তাদের নাম ও তথ্যউপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। অচিরেই সবাইকে ১০ লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র করে দেয়া হবে। যা থেকে প্রতিমাসে ১০ হাজার টাকা করে পাওয়া যাবে। এ সঞ্চয়পত্রের টাকা দগ্ধ রোগী এবং পরে তাদের স্বজনরাও পাবেন।
ইতিমধ্যে যারা পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন তাদেরও নামের তালিকা করা হচ্ছে। তাদের স্বজনদেরও পারিবারিক সঞ্চয়পত্র দেয়া হবে। ডা. লেনিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তিনি বার্ন ইউনিটে উপস্থিত রয়েছেন। দগ্ধ রোগীদের নগদ টাকা প্রদানসহ তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসার খোঁজখবর রাখছেন।
এ পর্যন্ত ৪ জন দগ্ধ রোগীকে প্রধানমন্ত্রী উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠিয়েছেন। তারা হলেন- এসএসসি পরীক্ষার্থী মিনহাজুল ইসলাম অনিক, শাহরিয়ার হৃদয়, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল কাদের ও ট্রাক ড্রাইভার মো. লিটন মিয়া। প্রধানমন্ত্রী সরাসরি তাদের চিকিৎসার খোঁজখবর নিচ্ছেন। চেন্নাইয়ে তাদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
বার্ন ইউনিটে শুটিং বিষয়ে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : এ ধরনের তৎপরতা বন্ধে এখন থেকে সাংবাদিকদের (সোমবার থেকে) বার্ন ইউনিটে প্রবেশের পূর্বে দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীদের স্ব-স্ব পরিচয়পত্র দেখানোর অনুরোধ জানিয়েছে বার্ন ইউনিট কর্তৃপক্ষ। ইউনিটের পরিচালক ডা. আবুল কালাম জানান, সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে চিহ্নিত করে এ ধরনের কাজের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, সবাই সাংবাদিক পরিচয়ে বার্ন ইউনিটে ঢুকছে। কে সাংবাদিক কে সাংবাদিক নয়, তা চেনা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। তাই মিডিয়া কর্মীদের স্ব-স্ব পরিচয়পত্র যেন ঝুলিয়ে রাখা হয়, এমনটা অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে ঢামেক থেকে মিডিয়া কর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট একটি অস্থায়ী কার্ড প্রদানেরও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close