¦
ওসমানী হাসপাতালে শিশুসহ ৩২ জনের মৃত্যু

সিলেট ব্যুরো | প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টায় ১০ শিশুসহ ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১০ ঘণ্টার ব্যবধানে মারা যায় ১০ শিশু। ব্যাপকহারে মৃত্যুর ঘটনায় অভিভাবকদের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে। অনেকে নিজেদের শিশু নিয়ে হাসপাতাল ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
মৃত শিশুদের স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসক ও নার্সদের ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার কারণেই এতগুলো মৃত্যু। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মেডিসিন বিভাগের প্রধান ইসমাইল হোসেন পাটওয়ারীকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির অপর সদস্যরা হলেন- শিশু বিভাগের প্রধান ডা. মনজ্জির আলী এবং আবাসিক চিকিৎসক রঞ্জন কুমার রায়। সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বলা হয়েছে। মৃত শিশুরা হচ্ছে- সিলেটের গোয়াইনঘাটের সায়মা (দেড় বছর), জকিগঞ্জের দশগ্রামের আকাশ (৭ দিন), নগরীর শেখঘাটের নিলুমার নবজাতক মেয়ে, শাহপরাণের আসমা ও সন্ধ্যা রানীর নবজাতক মেয়ে, সুনামগঞ্জ সদরের তাজরিয়া (সাড়ে তিন বছর), মেহেদী (আড়াই মাস), ছাতকের শাফরাজ (৩ বছর), বিশ্বম্ভরপুরের নাদিনা (৬ মাস), হবিগঞ্জের ইয়াসমিন (৩ দিন)।
মৃত শিশুদের কয়েকজন স্বজন অভিযোগ করেন, রাত ১০টার পর শিশু ওয়ার্ডে কোনো চিকিৎসককে খুঁজে পাওয়া যায় না। শিশুদের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তারা নার্সদের ডাকলেও আসেনি। ফলে একের পর এক শিশু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
মৃত এক শিশুর খালা রেখা রানী জানান, রাত ১০টার পর তার বোনের মেয়ে ছটফট শুরু করলে তারা ওয়ার্ডে ডাক্তার খুঁজে পাননি। রাতে চিকিৎসক ও নার্স কোনো চিকিৎসা সেবা বা ওষুধ না দেয়ায় সকালে শিশুটি মারা যায়। হাসপাতালের তথ্যানুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ১০টা পর্যন্ত স্ট্রোকে ৪ জন, রোড ট্রাফিক অ্যাক্সিডেন্টে ৪ জন, মিওকার্ডিয়াল ইনফেকশনে ৩ জন, সেপটিসিমিয়ায় ৪ জন, পোস্ট নাটাল অ্যাটাক (পিএনএ) স্টেজে ৩ জন, নিউনাটাল সেপসিসে ১ জন, ব্রঙ্ক নিউমোনিয়ায় ২ জন, ইনটেসটিনাল অবস্ট্রাকশনে ১ জন, কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে একজন, অ্যানিমিয়ায় ২ জন, ক্যামেটাটেসিসে ১ জন, ব্রটে ১ জন, এনসেপিলাইটিসে ১ জন, আননোন পয়ঃজনিংয়ে ১ জন, অ্যাসল্টে ১ জন, কলপালমোনারি টিবিতে ১ জন এবং কিটন বডি ডায়াবেটিসে ১ জন রোগী মারা যায়।
সুনামগঞ্জের দিরাই থেকে আসা খায়ের মিয়া অভিযোগ করেন, রাতে নার্সদের ডেকে পাওয়া যায় না। রোগীর অসুবিধা হচ্ছে জানালে তারা চুপ করে বসে থাকতে বলেন। অন্যথায় হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়ার হুমকি দেয়।
নিহত শিশু আকাশের নানী মারজান বলেন, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত আমার নাতিকে সোমবার বিকালে হাসপাতালে ভর্তি করি। রাত ৩টার দিকে সে মারা যায়। মারা যাওয়ার আগে অবস্থা আশংকাজনক হওয়ায় নার্সদের কাছে গেলে তারা দুর্ব্যবহার করে ফিরিয়ে দেন। এরপর দুই ঘণ্টায় আরও ৯ শিশুর মৃত্যু হয়। রাত ৩টায় মারা যায় সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার মুতাহিদ আলীর তিন বছরের শিশুসন্তান শাফরাজ। শিশুটি মারা যাওয়ার পরও তার বাবাকে ওয়ার্ডে প্রবেশ করতে দেননি সিকিউরিটি গার্ড। একই অভিযোগ বিশ্বনাথের আনসার আলী, জকিগঞ্জের বেলাল আহমদ, সুনামগঞ্জের মনোরঞ্জন দাসের।
স্বজনদের অভিযোগ সম্পর্কে হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আবদুস সালাম বলেন, ‘রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে তারা এ ধরনের লিখিত কোনো অভিযোগ পাননি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ তিনি জানান, প্রতিদিন গড়ে ১২ থেকে ১৫ রোগীর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। কিন্তু ২৪ ঘণ্টার সংখ্যাটা তাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। তাই ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার আবদুস ছবুর মিঞা বলেন, সোমবার ৭৫ রোগী এসে শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছে। মারা যাওয়া শিশুদের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আশংকাজনক অবস্থায় এনে ভর্তি করা হয়েছিল। এরপরও বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক সিনিয়র চিকিৎসক বলেন, হাসপাতালে অতিরিক্ত রোগী ভর্তি করা হয়। সার্বিক অব্যবস্থাপনায় এ ধরনের বড় ঘটনা ঘটল। সরেজমিন গিয়েও অতিরিক্ত রোগী ভর্তির প্রমাণ পাওয়া যায়। মঙ্গলবার দুপুরে ২১ নং ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেছে, ৩৫ শয্যার ওয়ার্ডটিতে রোগী আছেন ৯৮ জন। ২২ নং ওয়ার্ডের ৫৬ শয্যা থাকলেও রোগী আছেন ১৬২ জন। যাদের অধিকাংশ রয়েছে হাসপাতাল ফ্লোরে।
প্রথম সন্তান হারিয়ে বাকরুদ্ধ ২ দম্পতি : ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্সদের অবহেলায় প্রথম সন্তান হারিয়ে বাকরুদ্ধ দুই দম্পতি। ঠিকমতো পৃথিবীর আলো দেখার আগেই চলে যাওয়া কিছুতেই মানতে পারছেন না তারা। এজন্য তারা দায়ী করছেন চিকিৎসক ও নার্সদের অবহেলাকে। এর মধ্যে ছেলে হয়েছিল আল-আমিন ও ফাতেমা আক্তার মৌ দম্পতির। ছেলেকে ৫ম তলায় ২২ নং ওয়ার্ড ও মাকে ২য় তলায় রাখা হয়। সোমবার সন্ধ্যায় জন্ম নেয়া শিশুটি মারা যায় মঙ্গলবার ভোরে। আল-আমিনের বাড়ি সিলেট নগরের ঘাসিটুলা এলাকায়। একই বেডে ছিল নগরের শেখঘাট কলাপাড়ার তারা মিয়া ও নিলুফা দম্পতির মেয়েশিশুটিও। জন্ম নেয়ার তিনদিনের মাথায় একই রাতে শিশুটির মৃত্যু হয়। তাদের অভিযোগ, বাচ্চার শারীরিক অবনতি দেখে নার্সদের ডাকলেও তারা ঘুমিয়ে রাত কাটান। ধমক দিয়ে বলেন, ডাক্তার আসলে দেখবেন।
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close