¦
আমরা একুশের চেতনা থেকে দূরে সরে গেছি

বুলবন ওসমান | প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

একুশের চেতনা হচ্ছে, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির প্রাণ-বীজ। একুশে ফেব্রুয়ারিতে বাংলা ভাষার দাবিতে প্রাণোৎসর্গের মধ্য দিয়ে ভাষাশহীদরা যে চেতনাটির জন্ম দিয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৫২-র সেই চেতনা থেকে বাঙালি জাতির স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ এক দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পদযাত্রার কাল। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা আর প্রাণের বলিদানে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা। একুশের চেতনাই আমাদের মূল চালিকাশক্তি, অন্তঃপ্রেরণা রূপে কাজ করেছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ পর্যন্ত বাঙালিত্বের সেই চেতনায় আমরা নতুন রাষ্ট্র গঠনের ব্রতী হয়েছিলাম কিন্তু ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার পর সেই যাত্রাকে সম্পূর্ণ উল্টো পথে পরিচালিত করা হল। রাতারাতি বাংলাদেশ বেতার হয়ে গেল রেডিও বাংলাদেশ। অর্থাৎ, এত রক্তে অর্জিত যে দেশ সেই দেশের গতিকে সম্পূর্ণ পেছনের দিকে ঘুরিয়ে দেয়া হল- এটা ঘটল সর্বক্ষেত্রে।
একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা অবশ্যই এক ধারায় পরিচালিত হয়ে থাকে। রাষ্ট্রের কাছে সব নাগরিক সমান। একুশের চেতনা-বীজে যে রাষ্ট্রের জন্ম সেই রাষ্ট্র বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থার রাষ্ট্র গড়ে তোলার অঙ্গীকারে আবদ্ধ। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থা বহু ধারায় বিভক্ত। শিক্ষা এখানে নির্মমভাবে শ্রেণী বিভক্তির উপকরণ রূপে কাজ করছে। বড় লোকের সন্তানরা ‘ও লেভেল’ ‘এ লেভেল’ ইংরেজি শিক্ষামাধ্যমে বিদেশী কারিকুলাম অনুসরণ করে শিক্ষা গ্রহণ করছে। গরিবের সন্তানরা মাদ্রাসা-মক্তবে পড়ছে, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সন্তান-সন্ততি বাংলা মাধ্যমে পাবলিক ও প্রাইভেট শিক্ষা নিয়ে পড়ছে। অর্থাৎ, আমরা আমাদের সন্তানদের স্পষ্টভাবে ভাগ করে ফেললাম। যা একুশের চেতনার সম্পূর্ণ বিরোধী। একুশের চেতনা ছিল আমাদের বাংলা জাতীয়তাবাদী চেতনা; তার সঙ্গে আন্তর্জাতিকতাবাদ- সেখান থেকে আমরা পিছিয়ে গেছি। এখন যেন আমরা বাংলাকে বিসর্জন দেয়ার কাজে ব্রতী হয়েছি। এখন আমাদের ভেতর মূর্তিমান হয়ে উঠেছে ভৃত্যের মনোবৃত্তি। আমাদের প্রতিদিনের জীবন থেকে আমরা বাংলাকে সরিয়ে দিচ্ছি। এক সময় এই ঢাকা শহরে বাংলায় দোকানপাটের নাম শোভা পেত, আজ সেগুলো আবার দখল করে নিচ্ছে ইংরেজি। বাড়িঘরের নাম পর্যন্ত ইংরেজিতে রাখা হচ্ছে। ছেলে-মেয়েদের নাম রাখা হচ্ছে আরবি-ফার্সি শব্দে। এটা যে নিখাঁদ ধর্মীয় অনুভূতিতে রাখা হচ্ছে তা নয়, বরং অনুকরণপ্রিয়তা, হীনমন্যতা বোধ থেকেই এরকম ঘটছে। এতে ধর্মীয় বোধও প্রতিফলিত হচ্ছে না। বাঙালির গর্ব কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলায় নামকরণের পথ দেখিয়ে গিয়েছিলেন; তিনি তার সন্তানদের নাম রেখেছিলেন কাজী অনিরুদ্ধ ইসলাম, সব্যসাচী ইসলাম, অনিন্দিতা ইসলাম- এসব সুন্দর সুন্দর নামের উদাহরণ থেকে আমরা প্রেরণা নিইনি অর্থাৎ, আমরা যে বাঙালি মুসলমান, সেই চিহ্নটুকু পর্যন্ত রাখছি না আমাদের সন্তানদের নামে। বাঙালি হিন্দুরা কিন্তু তাদের নামে বাংলাকে স্থান দিতে কার্পণ্য করেন না। দেখা যায়- বর্তমানে বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় এগুলোর নামের সিংহভাগেও বাংলা ভাষার স্থান নেই। এখনও দেশের আদালতে সম্পূর্ণরূপে বাংলা ভাষা চালু করা যায়নি- এসবই একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনার বিপরীত। অদ্ভুত একটা অবিমৃষ্যকারিতা! এ প্রবণতাকে কবি শামসুর রাহমান বর্ণনা করেছিলেন, ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’ বলে, এখন মনে হয়, উদ্ভট গাধার পিঠে সওয়ার হয়েছে দেশ! আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার নিয়েও চলছে উদ্ভটতা।
বাংলা একাডেমি বইমেলা করতে গিয়ে তার মূল কাজ থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। বইমেলা করা প্রকাশকদের কাজ, এটা স্মরণ রাখা দরকার। একুশের চেতনা কিন্তু বাণিজ্যের চেতনা নয়। একুশের যে চেতনা, আমরা সেই চেতনা থেকে ক্রমাগত দূরে সরে যাচ্ছি। আমাদের রাজনীতিতে একুশের চেতনা থাকলে রাজনীতিটাও শুদ্ধ হতো। একুশের চেতনা থেকে দূরে সরে গেছি বলেই আমরা পরিশুদ্ধ রাজনীতি পাচ্ছি না। গণতন্ত্র খুব কঠিন জিনিস। গণতন্ত্রের প্রথম শর্তই হল অপজিশনের কথা শুনতে হবে! সংখ্যাগরিষ্ঠের দাবি মানতে হবে- সেটা যদি ভুলও হয়- গণতন্ত্র আবেগ এবং যুক্তির পরিচর্যার মধ্য দিয়ে শুদ্ধ গন্তব্যে পৌঁছায়। এ জন্য চাই প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব। জনগণ নিজেদের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে কিন্তু আমাদের রাজনীতিকরা ভুল থেকে কোনো শিক্ষাই গ্রহণ করেন না। এখনও দেশের ৩০ ভাগ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। এটা একুশের চেতনার বিরোধী। জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে বাংলা ভাষাকে পরিপূর্ণ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একুশের চেতনায় প্রত্যাবর্তন সম্ভব।
এবারের বইমেলায় সময় থেকে বেরোচ্ছে বুলবন ওসমানের পিতৃতর্পণ, মিলানের ঘোড়া, বিশ্বসাহিত্য ভবন থেকে শিশু-কিশোর সমগ্র, শিশুকিশোর উপন্যাস সমগ্র ১ম খণ্ড, বাংলা প্রকাশ থেকে পঞ্চগড়ের পিসি প্রভৃতি। গ্রন্থনা : শুচি সৈয়দ
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close