¦
লণ্ডভণ্ড গ্রামীণ অর্থনীতি

দেলোয়ার হুসেন ও মামুন আব্দুল্লাহ | প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

গ্রামে টাকার জোগান কমে গেছে। শহর থেকে গ্রামে এবং গ্রাম থেকে শহরে মানুষের স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে বলে টাকার স্থানান্তরও হচ্ছে কম। গ্রামীণ প্রকল্প বাস্তবায়নে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। গ্রাম থেকে পণ্য যেমন ঢাকায় আসা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি ঢাকা থেকেও গ্রামে স্বাভাবিক গতিতে পণ্য যেতে পারছে না। পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় মানুষের চলাচলও কমে গেছে। টানা অবরোধ ও হরতালের কারণে এমনটি হয়েছে। সরকারি হিসাবেই দেখা গেছে, এসব কারণে গ্রামে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে। এদিকে পল্লী এলাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হওয়ায় কমে গেছে গ্রামের মানুষের আয়। অব্যাহত এই রাজনৈতিক ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছে গ্রামীণ অর্থনীতি।
মূল্যস্ফীতিতে অস্বাভাবিকতা : গত ৫ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে টানা অবরোধ ও হরতাল, যা এখনও চলছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য মতে, গত জানুয়ারি মাসে গ্রামে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। গত ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে গ্রামে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে দশমিক ০১ শতাংশ। খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দাম কমেছে। গত ডিসেম্বরে গ্রামে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ। জানুয়ারিতে তা বেড়ে হয়েছে ৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ। অর্থাৎ ডিসেম্বর মাসে যে পণ্য কিনতে খরচ হতো ২২১ টাকা ৪৭ পয়সা। একই পরিমাণ পণ্য কিনতে এখন খরচ হচ্ছে ২২৩ টাকা ৭৩ পয়সা। খাদ্য খাতের মধ্যে খাদ্য, পানীয় ও টোব্যাকো উপখাতে ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি হয়েছিল শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ, জানুয়ারিতে হয়েছে ১ দশমিক ০২ শতাংশ। খাদ্যবহির্ভূত খাতে ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল শূন্য দশমিক ৮০ শতাংশ, জানুয়ারিতে তা বেড়ে হয়েছে ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ফার্নিচার ও গৃহসামগ্রীর ক্ষেত্রে ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল শূন্য দশমিক ৮৫ শতাংশ, জানুয়ারিতে হয়েছে শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ।
গত ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে গ্রামে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়। ডিসেম্বরে এই উপখাতে মূল্যস্ফীতি হয়েছিল শূন্য দশমিক ৮৭ শতাংশ, জানুয়ারিতে তা বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ। যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় ওই সময়ে গ্রামে শিক্ষা, পরিবহন, কাপড় এসব উপখাতে চাহিদা কমায় দামও কমেছে।
এদিকে শহরে স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় গত ডিসেম্বরে বেড়েছিল শূন্য দশমিক ৯৫ শতাংশ, জানুয়ারিতে তা বেড়েছে ৩ দশমিক ৯১ শতাংশ।
বিবিএসের মতে, হরতাল-অবরোধসহ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ডিসেম্বও থেকে জানুয়ারিতে সাধারণ মূল্যস্ফীতি কমে এলেও খাদ্যপণ্যে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।
এ প্রসঙ্গে বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, শীতের সময়ে গ্রামে সবজির প্রচুর সরবরাহ থাকে। কম থাকে চালের দামও। এ কারণে এই সময়ে গ্রামে মূল্যস্ফীতির হার কম থাকে। আলোচ্য সময়েও সামান্য কমেছে। তবে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। যেটা অস্বাভাবিক। গ্রামে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের চাহিদা কম থাকে। এ কারণে এ খাতে মূল্যস্ফীতির হারও কম। আলোচ্য সময়েও এই হার সামান্য কমেছে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়েছে। বিশেষ করে চিকিৎসা খাতের ব্যয়।
এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবে মালামাল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বহন করা যাচ্ছে না। যে কারণে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতির হার বেড়েছে। তবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমার কারণে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতির হার কমেছে। কারণ আমরা অধিকাংশ সময় খাদ্যবহির্ভূত পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করে থাকি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অবরোধ-হরতালে জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। যে কারণে মূল্যস্ফীতির কোনো কোনো সূচকেও অস্বাভাবিকতা দেখা দিয়েছে। তবে এগুলো অচিরেই স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলে তিনি মনে করেন।
গ্রামীণ প্রকল্পে স্থবিরতা : পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ৬৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয় গ্রামে। বাকি ৩৫ শতাংশ খরচ হয় শহরে। এছাড়া দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি, পল্লী ঋণ কর্মসূচির আওতায় গ্রামে অর্থের প্রবাহ বাড়ানো হয়। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এডিপি বাস্তবায়ন ব্যাহত হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৩২ শতাংশ। এর মধ্যে বেশির ভাগ টাকা খরচ হয়েছে প্রক্রিয়াগত কারণে। যার বেশির ভাগই খরচ হয়েছে শহরকেন্দ্রিক।
প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী আহম মোস্তফা কামাল বলেন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক রাখতে সব ধরনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৩শ’ প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। যেসব প্রকল্পের অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হবে না সেগুলো সম্পর্কে মন্ত্রণালয়কে জানাতে বলা হয়েছে।
পল্লীঋণ বিতরণ ও আদায়ে ধস : অবরোধের কারণে কৃষক তার উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারছেন না। ফলে ওইসব পণ্য পচে নষ্ট হচ্ছে। অবরোধ অব্যাহত থাকায় কৃষক নতুন কৃষি ঋণ নেয়ার দিকেও ঝুঁকছে না। ফলে ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ কমে গেছে। গত ডিসেম্বরে পল্লী এলাকায় এসব ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৭৮৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। গত জানুয়ারিতে বিতরণ করা হয়েছে ১ হাজার ৪১৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এক মাসের ব্যবধানে গ্রামে ঋণ বিতরণ কমেছে ৩৭০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। গত বছরের জানুয়ারিতে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল ৩ হাজার ৩১৯ কোটি টাকা। গত বছরের জানুয়ারির তুলনায় এ বছরের জানুয়ারিতে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ কমেছে ১ হাজার ৯০৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
গ্রামে ঋণ বিতরণ যেমন কম হয়েছে, তেমনি পণ্য বিক্রি করতে না পেরে বা ভালো দাম না পাওয়ায় আর্থিক সংকটে পড়েছে কৃষক। ফলে আগের ঋণ শোধ করতে পারেনি। এতে গ্রাম থেকে কৃষি ঋণ আদায়ের পরিমাণও কমে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত ডিসেম্বরে গ্রাম থেকে কৃষি ঋণ আদায় হয়েছে ২ হাজার ৩১ কোটি ৯ লাখ টাকা। গত জানুয়ারিতে আদায় হয়েছে ১ হাজার ১৮১ কোটি ৩১ লাখ টাকা। ওই এক মাসের ব্যবধানে কৃষি ঋণ আদায় কমেছে ৮৪৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। গত বছরের জানুয়ারিতে কৃষি ঋণ আদায় হয়েছিল ৩ হাজার ৭৩২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। গত বছরের জানুয়ারির তুলনায় এ বছরের জানুয়ারিতে ঋণ আদায় কমেছে ২ হাজার ৫৫১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ও কৃষি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, কৃষি ঋণ বিতরণ ও আদায় কম হওয়ার আপাতত অন্য কোনো কারণ নেই। একমাত্র কারণ রাজনৈতিক সহিংসতা। জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া অস্থিরতায় কৃষি ঋণ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না তারা। এখন ধান বা পাট নয়, সবজি চাষের মৌসুম। ফলে সবজিতে এমনিতেই কৃষকরা লোকসানের মুখে। এজন্য নতুন করে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, হরতাল ও অবরোধের কারণে কৃষক উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারছে না। আবার যেগুলো বিক্রি করছে সেগুলোর প্রকৃত দাম পাচ্ছে না। এজন্য কৃষি ঋণও পরিশোধ করতে পারছে না। ফলে ঋণ প্রদান ও আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
আয় কমেছে গ্রামের মানুষের : রাজনৈতিক অস্থিরতায় গ্রামের মানুষের চলাচল ব্যাহত হওয়ায় তাদের আয় কমে গেছে। বিশেষ করে শহর থেকে পণ্য বোঝাই গাড়ি গ্রামে যাওয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যান্য কাজেও গ্রামে যাওয়ার প্রবণতা কমে গেছে। এছাড়া শহরে কাজ করেন এমন কর্মজীবীদের টাকা পাঠানোর পরিমাণও কমেছে। ফলে শহর থেকে গ্রামে টাকার প্রবাহ কমে গেছে। গ্রাম থেকে পণ্য শহরে আসছে কম। অনেক পণ্য ক্ষেতেই নষ্ট হচ্ছে। এতেও কমে গেছে টাকার প্রবাহ।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সিনিয়র গবেষণা পরিচালক ড. জায়েদ বখত যুগান্তরকে বলেন, অবরোধের প্রভাবে চাষীরা পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। কারণ তাদের পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে যেতে পারছে না। অন্যদিকে কারখানা এলাকা থেকে পণ্য গ্রামে আসতে পারছে না। ফলে পণ্যের প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে উৎপাদন এলাকায় পণ্যের দাম কম এবং বিপণন এলাকায় দাম বেশি। এতে উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিপণন এলাকায় পণ্যের জোগান না পেয়ে দাম বেড়ে যাচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভোক্তারা।
তিনি বলেন, এভাবে আরও কিছুদিন চলতে থাকলে শহর ও গ্রামে পণ্যমূল্যে বড় ধরনের ব্যবধান দেখা দেবে। তখন আরও বেড়ে যেতে পারে মূল্যস্ফীতির চাপ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঠাকুরগাঁও থেকে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ট্রাকভর্তি বাঁধাকপি নিয়ে এসে মোকছেদ মিয়া তা বিক্রি করতে না পেরে ট্রাক ভাড়া না দিয়েই পালিয়ে বেঁচেছেন। পরে ট্রাকচালক ওই বাঁধাকপি কিছুটা পানির দরে বিক্রি করে ভাড়ার টাকা আংশিক সংগ্রহ করেছেন। সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সরেজমিন অনুসন্ধান করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
হরতাল-অবরোধে পরিবহন ভাড়া বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। তারপরও কিছু লাভের আশায় ঢাকায় পণ্য নিয়ে এসেছিলেন। বিক্রি করতে না পেরে ট্রাকভর্তি বাঁধাকপি রেখেই কেটে পড়েন তিনি। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও কাউকে না পেয়ে ১২ হাজার টাকায় ওই পণ্য বিক্রি করে দেন ড্রাইভার সফিক। তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল- ঠাকুরগাঁও থেকে ২৬ হাজার টাকা ভাড়ার চুক্তিতে কারওয়ান বাজারে পণ্য নিয়ে আসেন সফিক। কিন্তু পণ্য বিক্রি করতে না পেরে ভাড়ার টাকা না দিয়েই সফিক পালিয়ে যান। গ্রামে টাকার প্রবাহ কমে যাওয়ায় অন্যান্য ব্যবসায়ও মন্দা দেখা দিয়েছে।
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close