¦
পদ্মায় আবারও লঞ্চডুবি

মতিউর রহমান ও শামীম শেখ,পাটুরিয়া থেকে | প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

পিনাক-৬ ডুবিতে হারিয়ে যাওয়া অনেকেরই খোঁজ মেলেনি এখনও। আর যাদের লাশ মিলেছিল- সেসব পরিবারে থামেনি কান্না। এরই মধ্যে রোববার আবার পদ্মায় ডুবল আরেকটি যাত্রীবাহী লঞ্চ। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মালবাহী কার্গো জাহাজের ধাক্কায় শতাধিক যাত্রী নিয়ে ডুবে যায় এমভি মোস্তফা-৩। লঞ্চটি পাটুরিয়া থেকে দৌলতদিয়া যাচ্ছিল। রাত ১২টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত শিশু ও নারীসহ ৪৩ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭টি শিশু, নারী রয়েছেন ১৭ জন। তখনও প্রায় অর্ধশত ব্যক্তি নিখোঁজ ছিলেন।
এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত নিহতদের মধ্যে ২৮ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন- রাজবাড়ীর জয়নাল (৬৫ বছর), নাসিমা আখতার (৩৬), অসীমা রানী (৪০), পাচুরিয়ার সন্তানসম্ভবা রাবেয়া (২২), গোয়ালন্দের সুফিয়া (২৮), ফারজানা আখতার স্মৃতি (৬ মাস), মাগুরার লাইলি বেগম (৬৫), দৌলতপুরের ইমরান হোসেন (৮), মো. সেলিম (২২), কুষ্টিয়ার নাসির উদ্দিন (৪০), মেহেদি হাসান (৩০), ইমামুল (১৮), সাবু (২৫), ইউসুফ (৪০), মধুসূদন সাহা (৬০), রেবেকা খাতুন (৩৩), বিথী খাতুন (১৫), ফরিদপুরের ইমামুল (১৪), নবীজান (৭০), নার্গিস (১১), রতন কুমার সরকার (৩৪), পাপন (৫), বাঁধন সরকার (৪০), অর্চনা মালো (৪৫), মানিকগঞ্জের লাবণী আখতার (১৫), শিমুলিয়ার লতা (২২), নড়াইলের হাফসা (৮) ও গোপালগঞ্জের জোনায়েদ শেখ (১)। রাতেই ২২ লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। নিখোঁজ ব্যক্তি ও লাশের সন্ধানে পদ্মা পাড়ে ভিড় জমান স্বজনরা। তাদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠে পদ্মা পাড়ের বাতাস।  
লঞ্চডুবির ঘটনায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর ও বিআইডব্লিউটিএ তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এসব কমিটিকে ১৫ ও ৭ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। আটক করা হয়েছে লঞ্চে ধাক্কা দেয়া কার্গো নার্গিস ১-এর তিন লস্করকে। তারা হলেন- শাহীনুর রহমান, শহীদুল ইসলাম ও জহিরুল ইসলাম। নার্গিস-১ মেসার্স দিলরুবা আশরাফ খানের মালিকানাধীন।
লঞ্চডুবির পর দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত ঘিওর ফায়ার সার্ভিসের কর্মী ও স্থানীয়রাই উদ্ধার অভিযান চালান। আড়াইটায় ঢাকা থেকে ডুবুরি দল গেলে পুরোদমে অভিযান শুরু হয়। রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত একটানা চলে তা। পরে ১০টায় আবারও তা শুরু হয়। রাত পৌনে ১২টায় বিআইডব্লিউটিএর উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তম ঘটনাস্থলে পৌঁছে এমভি মোস্তফা উদ্ধার অভিযানে নামে।  
নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান ড. সামসুজ্জোহা খন্দকার, পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি এসএম মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান, মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক রাশেদা ফেরদৌস, পুলিশ সুপার বিধান ত্রিপুরা, রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম খান ও পুলিশ সুপার তাপতুন নাসরীন উদ্ধার কাজ পর্যবেক্ষণ করেন।
মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক রাশেদা ফেরদৌস জানিয়েছেন, নিহতদের দাফনের জন্য ২০ হাজার টাকা করে দেয়া হচ্ছে। নিহত জনপ্রতি এক লাখ পাঁচ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। ম্যাজিস্ট্রেট সেতাবুল ইসলাম বলেন, পাটুরিয়া ও দৌলতদিয়া ঘাটে খোলা হয়েছে দুটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। আর পাটুরিয়া ঘাটে রাতে পুলিশ চালু করে তথ্য কেন্দ্র।
লঞ্চডুবিতে বহু মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
ডুবে যাওয়া লঞ্চের যাত্রী ব্র্যাক কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ জানান, পাটুরিয়া লঞ্চঘাট থেকে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শতাধিক যাত্রী নিয়ে এমভি মোস্তফা-৩ দৌলতদিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করে। লঞ্চটি মাঝ নদীতে এলে কার্গো জাহাজটি আমাদের লঞ্চের মাঝ বরাবর সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে মুহূর্তেই আমাদের জাহাজটি উল্টে যায়। মানিকগঞ্জের পুলিশ সুপার বিধান ত্রিপুরাও অনুরূপ তথ্য দেন। তিনি বলেন, সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী ঘাট থেকে নার্গিস-১ কাজিরহাট যাচ্ছিল।
পাটুরিয়া লঞ্চ ঘাটের সুপারভাইজার জুয়েল রানা জানান, লঞ্চে মাদারীপুরগামী কমফোর্ট লাইনের এক বাসের ৪৩ যাত্রী, একটি লোকাল বাসের ৬০ যাত্রী ও কয়েকজন সাধারণ যাত্রী ছিলেন। লঞ্চডুবির পর ৩৫-৪০ জন সাঁতরে ও কার্গো নার্গিসের সহযোগিতায় তীরে উঠতে সক্ষম হন।
ঘিওর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ম্যানেজার জিহাদ হোসেন জানান, তাদের একটি দল ঘটনাস্থলে এসে লঞ্চটি শনাক্ত করে। তবে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় তারা উদ্ধার অভিযানে যেতে পারেনি। এরপর ঢাকা থেকে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল বেলা আড়াইটার দিকে এসে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে। নদীতে প্রায় ১৮-২০ ফুট পানি রয়েছে। উদ্ধার জাহাজ আইটি ৩৮৯-এর সঙ্গে ডুবে যাওয়া লঞ্চটি বেঁধে রাখা হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ পাটুরিয়ার পোর্ট অফিসার এনামুল হক বিকালে জানান, আইটি ৩৮৯-এর পক্ষে লঞ্চটি তোলা সম্ভব না হওয়ায় এমভি রুস্তমকে খবর দেয়া হয়।
নিখোঁজ যাত্রী রমজান সরদারের শ্যালক সাইদুল ইসলাম জানান, তার ভগ্নিপতি ওই লঞ্চে ফেরি করে ফল বিক্রি করছিলেন। তিনি রাজবাড়ীর বরাট ইউনিয়নের অন্তরা মোড় এলাকার ইয়াদ আলী সরদারের ছেলে। লঞ্চডুবির পর থেকে তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া মডেল হাইস্কুলের শিক্ষক আবুল কাশেম জানান, তার শ্যালিকা রুমা খাতুন (২৮), সাত বছর বয়সী ছেলে উৎসব ও মাত্র দুই মাস বয়সী মেয়েকে নিয়ে দুর্ঘটনার শিকার লঞ্চটিতে রাজবাড়ীতে আসছিলেন। তার স্বামী লিটু মানিকগঞ্জের ডিবি পুলিশে কর্মরত আছেন। ঘটনার পর থেকে তাদের সন্ধান পাচ্ছি না।
ব্র্যাক কর্মকর্তা আবুল কালাম জানান, তিনি এবং দুই সহকর্মী রফিক মিয়া ও মোস্তফা মাহফুজ কুষ্টিয়ায় অডিট কাজে যাচ্ছিলেন। লঞ্চটি ডুবে যাওয়ার পর তিনি ও রফিক মিয়া সাঁতরে উঠতে পারলেও মোস্তফা মাহফুজ উঠতে পারেননি। মাত্র ৮-১০ সেকেন্ডের মধ্যে লঞ্চটি ডুবে যাওয়ায় এবং যাত্রীরা একে অপরকে আঁকড়ে ধরায় অনেকেই সুযোগ থাকা সত্ত্বেও উঠতে পারেননি।
তদন্ত কমিটি : এমভি মোস্তফা-৩ ডুবির ঘটনা তদন্তে সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের নটিক্যাল সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন মো. শাজাহানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে কমিটিকে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা হলেন- সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের স্পেশাল অফিসার মেরিন সেফটি গোলাম মাঈনউদ্দিন হাসান ও সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের মুখ্য পরিদর্শক মো. শফিকুর রহমান।
দুর্ঘটনা তদন্তে নৌ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব নূর উর রহমানের নেতৃত্বে ইতিপূর্বে গঠিত স্থায়ী তদন্ত কমিটি এ দুর্ঘটনার তদন্ত করবে। রোববার নৌমন্ত্রীর জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম খান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। চেয়ারম্যান ড. সামসুজ্জোহা খন্দকারকে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করে বিআইডব্লিউটিএ। এ কমিটিকে ৭ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
জানতে চাওয়া হলে নৌ সচিব শফিক আলম মেহেদী যুগান্তরকে বলেন, সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর ও বিআইডব্লিউটিএর নেতৃত্বেও আরও কমিটি গঠন করা হবে। তবে  রোববার ক’টি কমিটি গঠন করা হয়েছে সে সম্পর্কে তিনি জানাতে পারেননি। এ বিষয়ে যোগাযোগ করেও নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের কমিটির সদস্যরা রাতেই ঘটনাস্থলে যান। দিনে ঘটনাস্থলে ছিলেন ড. সামসুজ্জোহা। সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের মুখ্য পরিদর্শক মো. শফিকুর রহমান রাতে যুগান্তরকে জানান, ২৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছিল এমভি মোস্তফা ৩-এর মেয়াদ। আর কার্গো নার্গিস-১ এর মেয়াদ শেষ হবে ২০ জুন।
পিনাক-৬ ট্রাজেডি : এর আগে গত বছরের ৪ আগস্ট পদ্মায় আড়াই শতাধিক যাত্রী নিয়ে ডুবে যায় যাত্রীবাহী লঞ্চ পিনাক-৬। ওই ঘটনায় ৪৭ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এখন পর্যন্ত খোঁজ মেলেনি অর্ধশতাধিক মানুষের।
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close