¦
বিকল্প নেতৃত্ব প্রস্তুত

হাবিবুর রহমান খান | প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

গ্রেফতারি পরোয়ানা জারিকে আমলেই নিচ্ছেন না বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এজন্য তিনি মোটেই বিচলিত নন। উল্টো গুলশান কার্যালয়ে অবস্থানরত নেতাকর্মীদের সাহস জোগাচ্ছেন। তার গ্রেফতার নিয়ে অযথা টেনশন না করার জন্য তাদের পরামর্শ দিচ্ছেন। তার অনুপস্থিতিতে বিকল্প নেতৃত্ব প্রস্তুত বলেও তিনি নেতাকর্মীদের আশ্বস্ত করেন। বুধবার জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হলে আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হবে বলে মনে করেন দলের নেতাকর্মীরা।
গুলশান অফিস সূত্রে জানা গেছে, গ্রেফতার হলে চলমান আন্দোলন কিভাবে এগোবে, সে নির্দেশনাও ইতিমধ্যেই দেয়া হয়েছে। লন্ডনে অবস্থানরত দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও বিএনপির কয়েকজন নীতিনির্ধারককে এ ব্যাপারে বিশেষ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এদের পাশাপাশি খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত কয়েকজন কর্মকর্তাও পুরো আন্দোলন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। এছাড়া তৃণমূলের কিছু নেতাকেও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হলে এদের সমন্বয়েই বিকল্প নেতৃত্ব দলকে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে জানা গেছে।
আগেই তৃণমূলে এমন বার্তা পাঠানো হয়েছে। গতকাল নতুন করে সংশ্লিষ্টদের ওই বার্তা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সর্বশেষ তাকে গ্রেফতার করা হলে সাংবাদিকদের মাধ্যমে দলের পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে পারেন খালেদা জিয়া। তার অনুপস্থিতিতে কারা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবেন সেই ইঙ্গিতও দিতে পারেন তিনি।
সূত্র জানায়, বুধবার জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির দুটি মামলায় খালেদা জিয়াসহ আরও দুজনের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। আদালত যখন এই ঘোষণা দেন ওই সময়ে খালেদা জিয়ার ভাইয়ের স্ত্রী গুলশান কার্যালয়েই উপস্থিত ছিলেন। তার মাধ্যমেই খালেদা জিয়া এ ব্যাপারে অবগত হন। পরে তিনি নিজেই কার্যালয়ে অবস্থানরত দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান, উপদেষ্টা আবদুল কাইয়ুম, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা, বিশেষ সহকারী অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, প্রেস সচিব মারুফ কামাল খানকে ডেকে কথা বলেন। এ ব্যাপারে তাদের ভেঙে না পড়ার পরামর্শ দেন তিনি। উল্টো তাদের কাছে জানতে চান, ‘আমার গ্রেফতার নিয়ে তোমরা কি বিচলিত?’ একদম চিন্তা করবে না। তিনি বিষয়টি নিয়ে মোটেই চিন্তিত নন। তাদের আশ্বাস দিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, কারাগারে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তো তার রয়েছে। এটা তো নতুন নয়।
জানতে চাইলে গুলশান কার্যালয়ে অবস্থানরত মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা যুগান্তরকে বলেন, গ্রেফতার নিয়ে চেয়ারপারসন ততটা বিচলিত নন। তিনি তাদের বলেছেন, ‘প্রায় দুই মাস ধরে তিনি তো এক প্রকার বন্দিই আছেন।’
তিনি বলেন, গ্রেফতার হলে আন্দোলন কিভাবে চলবে সে ব্যাপারে চেয়ারপারসন একটা দিকনির্দেশনা দিয়ে যাবেন আশা করি।
সূত্র জানায়, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর থেকে গুলশান কার্যালয়ে অবস্থানরতদের মধ্যে এই বিষয়টিই ঘুরেফিরে আলোচনা হচ্ছে। বেশির ভাগই মনে করছেন, এবার চেয়ারপারসনকে গ্রেফতার করা হতে পারে। দলটির নেতাকর্মীদের মাঝেও এমন আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। তবে খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হলে আন্দোলনের গতি আরও বাড়বে বলে মনে করছেন তারা। কারণ হিসেবে দলটির নেতাকর্মীরা মনে করছেন, চলমান কর্মসূচি প্রত্যাহারে সরকার নানাভাবে তার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। কার্যালয়ের টেলিফোন, ডিশ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে তাকে মানসিক চাপে রাখা হয়। পাশাপাশি সারা দেশে নেতাকর্মীদের পাইকারি হারে গ্রেফতার চলছে। সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধ। কিন্তু কোনো চাপের কাছেই নতি স্বীকার করেননি খালেদা জিয়া। বিশ্ব ইজতেমা, এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে সরকার সামাজিক ও ধর্মীয় চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করলেও তা আমলে নেননি তিনি। উল্টো সংকট নিরসনে সরকারের ওপর দেশী-বিদেশী চাপ বাড়তে থাকে। খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হলে সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়বে বলে মনে করেন তারা।
সূত্র জানায়, গত তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে খালেদা জিয়ার সঙ্গে নেতাদের যোগাযোগ কার্যত বন্ধ। আন্দোলনের সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত কয়েকজন নেতা লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন কর্মসূচি চূড়ান্ত করছেন। পরে বিশেষ মাধ্যমে তা খালেদা জিয়াকে অবহিত করা হতো। খালেদা জিয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানার পরই ওইসব কর্মসূচি ঘোষণা করা হতো।
সূত্র জানায়, গতকাল আদালত খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর পরবর্তী আইনি করণীয় নিয়ে দলের সিনিয়র আইনজীবীরা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। বিকালে সাবেক বিচারপতি টিএইচ খানের বাসায় বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা বৈঠক করেন। বিষয়টি নিয়ে তারা দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গেও দেখা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যে কোনো মুহূর্তে গুলশান কার্যালয়ে যেতে পারেন তারা।
এ সম্পর্কে খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করতে সরকার অনেক আগে থেকেই চেষ্টা করছে। র‌্যাব-পুলিশ এমনকি আদালতকেও সরকার নিজের মতো করে ব্যবহার করছে। গতকাল আদালত যে রায় দিয়েছেন তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
তিনি বলেন, এই আদালতের ওপর তাদের কোনো আস্থা নেই। কারণ সরকার যেভাবে চাচ্ছেন, আদালত সেভাবেই রায় দিচ্ছেন। তাই ন্যায়বিচারের স্বার্থে হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করা হবে বলে জানান এই আইনজীবী।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান শুক্রবার টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। চলমান সংকটে এটা একটি নতুন মাত্রা। এর আগে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে তাকে গ্রেফতারের কথা বলা হচ্ছে। সরকারের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, খালেদা জিয়া গ্রেফতার হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আর গ্রেফতারের আগেই তো গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। আমরা যে আশঙ্কা করেছিলাম সরকার সেদিকেই হাঁটছে।
তিনি বলেন, এ মুহূর্তে গ্রেফতারের বিষয়টি চেয়ারপারসন আমলে নিচ্ছেন বলে মনে হয় না। তিনি গ্রেফতার হলে আন্দোলন বন্ধ হয়ে যাবে না। আন্দোলন যেভাবে চলছে সেভাবেই চলবে। বিএনপির মতো বড় একটি দলে অনেক নেতা রয়েছেন। তিনি গ্রেফতার হলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সিনিয়র নেতারা তা চালিয়ে নেবেন।
জানা গেছে, গত জানুয়ারির শেষদিকে খালেদা জিয়ার গ্রেফতারের বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় আসে। ওই সময় সংসদ এবং সংসদের বাইরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তাদের শরিকদের কেউ কেউ প্রকাশ্যে খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের আহ্বান জানান। কিন্তু সেই সময় বিষয়টি আর বেশিদূর এগোয়নি। সম্প্রতি আবারও তার গ্রেফতারের বিষয়টি সামনে আসে। যাত্রাবাড়ীতে বাসে ও মৎস্যভবনের সামনে পুলিশের গাড়িতে পেট্রলবোমা হামলা মামলা দুটিতে খালেদা জিয়াকে আসামি করে চার্জশিট দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। ওই মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ার উদ্যোগ নেয়ার মধ্যেই গতকাল তার বিরুদ্ধে অন্য দুটি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
জানতে চাইলে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগর নেতা মাহবুবুর রহমান শামীম যুগান্তরকে বলেন, আন্দোলন দমনে সরকার সব অস্ত্রই ব্যবহার করেছে। এখন সবশেষ অস্ত্র হিসেবে তারা খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করার চিন্তাভাবনা করছে। কিন্তু এতে আন্দোলন বন্ধ হবে না, তা আরও বেগবান হবে। তিনি বলেন, দলের চেয়ারপারসন সারা দেশের তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত আন্দোলনের কৌশল নিয়ে কথা বলছেন। তার সঙ্গেও কথা হয়েছে।
চট্টগ্রামের এই নেতা বলেন, খালেদা জিয়া গ্রেফতার হলেও আন্দোলন কিভাবে চলবে, কার নেতৃত্বে চলবে সে ব্যাপারে আরও আগেই তারা নির্দেশনা পেয়েছেন। তাই তাকে গ্রেফতার করা হলে আন্দোলন চালিয়ে যেতে কোনো সমস্যা হবে বলে মনে হয় না।
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close