¦
সিটি নির্বাচনের পথে বিএনপি

হাবিবুর রহমান খান | প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০১৫

একসঙ্গে আন্দোলন ও নির্বাচন করার কথা ভাবছে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে তারা আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, সমর্থন দিয়ে মেয়র ও কাউন্সিলরদের বিজয়ী করার চ্যালেঞ্জকে আন্দোলনের সাফল্য হিসেবে দেখানো যাবে। আর জয়লাভে ব্যর্থ হলে সরকারের বিরুদ্ধে কারচুপির অভিযোগে আন্দোলন জোরদার করা সহজ হবে। ইতিমধ্যেই সিটি নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে দলের তৃণমূল ও কেন্দ্রের বেশির ভাগ নেতা। এ অবস্থায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দলের নেতাকর্মীসহ পেশাজীবীদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করছেন। সব পর্যায়ে মত ও নেতাকর্মীদের মানসিকতার মূল্যায়ন করতে গিয়েই দলটি নির্বাচন নিয়ে ইতিবাচক চিন্তা করছে বলে জানা গেছে।
দলটির নীতিনির্ধারকদের মতে, দুই মাসের বেশি সময়ে চলমান আন্দোলন রাজধানীতে তেমন প্রভাব ফেলেনি। চলমান আন্দোলনের চেয়ে নির্বাচনে অংশ নিলে দল বেশি উপকৃত হবে। কারণ বর্তমানে বেশির ভাগ নেতাকর্মী আত্মগোপনে। আন্দোলন চাঙ্গা করতে হলে তাদের রাজপথে আনা দরকার। আর নির্বাচন হচ্ছে নেতাদের রাজপথে নামানোর বড় সুযোগ। নির্বাচনী প্রচারের নামে তারা প্রকাশ্যে আসার সুযোগ পাবেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ সুযোগ কাজে লাগাতে নির্বাচনে যাওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। নির্বাচন নিয়ে সরকারের অন্য কোনো মতলব আছে কিনা তাও স্পষ্ট হবে। নির্বাচনে হারজিত দুটো দিকই কাজে লাগানোর কথাও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
এদিকে ঢাকা ও চট্টগ্রাম তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সম্ভাব্য মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরাও হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত জানার অপেক্ষায় রয়েছেন। অনেকে দলের সমর্থন পেতে নানা মাধ্যমে লবিংও শুরু করেছেন। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন আগে থেকেই প্রার্থী চূড়ান্ত থাকলেও দক্ষিণে রয়েছে প্রার্থী সংকট। সেখানে আগের সম্ভাব্য প্রার্থীর সঙ্গে নতুন কয়েকজনের নাম শোনা যাচ্ছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বর্তমান মেয়র মনজুর আলমের প্রতি হাইকমান্ডের আস্থা আগের মতো নেই। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হতে পারে বলে কেউ কেউ মনে করছেন। বিএনপির নীতিনির্ধারণী সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে এখনও বিএনপি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। নির্বাচন নিয়ে কী করা উচিত- সে ব্যাপারে আলোচনা হচ্ছে। এ ব্যাপারে মতামত নেয়া হচ্ছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা কিংবা না করার বিষয়ে দলগতভাবে যেটা শক্তিশালী হবে দল তাই করবে। শিগগিরই এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে দল। মাহবুব বলেন, শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলে সেটা আন্দোলনের অংশ হবে। আন্দোলন বন্ধ করার কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচনে অংশ নিলে আন্দোলন আরও গতিশীল হবে। নেতাকর্মীরা চাঙ্গা হওয়ার সুযোগ পাবে। আবার নির্বাচনে জয়ী হলে আন্দোলনেও প্রভাব পড়বে।
সূত্র জানায়, সুষ্ঠু নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী জয়লাভ করলে ক্ষমতাসীনরা যে অভিযোগ করছে বিএনপির সঙ্গে জনগণ নেই তা মিথ্যা প্রমাণিত হবে। কারণ জনগণ কার সঙ্গে আছে তা প্রমাণের মাপকাঠি হচ্ছে নির্বাচন। অপরদিকে নির্বাচনে কারচুপি করলেও বিএনপির পক্ষে যাবে। ওই কারচুপির প্রতিবাদ জানিয়ে তাৎক্ষণিক সরকারবিরোধী আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা সম্ভব হবে।
সূত্র জানায়, সিটি কর্পোরেশন স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এখানে সরাসরি প্রার্থী দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। কাউকে সমর্থন দেয়া যেতে পারে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের আন্দোলন সব দলের অংশগ্রহণে একটি জাতীয় নির্বাচন। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেয়া মানে তাদের দাবি থেকে সরে আসা নয়। বরং আন্দোলনের কৌশল হিসেবেই তারা সিটি নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেবে। গত কয়েকটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে। তাই ঢাকা ও চট্টগ্রাম তিন সিটি নির্বাচনও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের জয়লাভের সম্ভাবনা বেশি থাকবে।
সূত্র জানায়, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলে চলমান আন্দোলন স্থগিত বা শিথিল করার ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত আসবে। সেক্ষেত্রেও নেতাদের মতামত নিচ্ছেন খালেদা জিয়া। এ ব্যাপারে নেতাদের ভিন্নমত রয়েছে। অনেকে চাচ্ছেন, নির্বাচনে অংশ নিয়ে শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটিতে কর্মসূচি শিথিল করা হোক। আবার কারও মতে, সারা দেশেই কর্মসূচি স্থগিত করা হোক।
লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, এটা স্থানীয় সরকার নির্বাচন। সরাসরি অংশ নেয়ার সুযোগ নেই। শেষ পর্যন্ত বিএনপি নির্বাচনে গেলে কাউকে সমর্থন জানাবে। নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হবেন বলে আশা করি। কারণ জনমত বিএনপির পক্ষে রয়েছে। বিগত কয়েকটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও তার প্রমাণ মিলেছে।
বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারকের মতে, চলমান আন্দোলনের কারণে সারা দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সরকার সংকট উত্তরণে কোনো উদ্যোগ না নিয়ে হঠাৎ করেই তিন সিটির নির্বাচনের আয়োজন শুরু করে। সে লক্ষ্যে ইতিমধ্যে তফসিলও ঘোষণা করা হয়েছে। সংকটময় পরিস্থিতিতে নির্বাচন করার পেছনে সরকারের কোনো মতলব থাকতে পারে। ক্ষমতাসীনরা মনে করছে, চলমান আন্দোলন স্থগিত বা শিথিল করে বিএনপি জোট নির্বাচনে অংশ নেবে না। তাই ফাঁকা মাঠে তারা গোল দিয়ে দেবেন। অথবা নির্বাচনে অংশ নিলে চলমান আন্দোলন থেকে সরে আসবে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনের পর আবারও আন্দোলন শুরু করা বিএনপির জন্য কঠিন হবে।
সরকারের এমন মনোভাব বিশ্লেষণ করছে বিএনপির হাইকমান্ড। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নেয়া না নেয়ার পক্ষে সুবিধা-অসুবিধাগুলো চিহ্নিত করে আলোচনা চলছে। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও এ ব্যাপারে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। অনেকের মতামতও নিচ্ছেন। দলের নীতিনির্ধারকদের বেশিরভাগই নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে। আন্দোলনের অংশ হিসেবে নির্বাচনে যাওয়া উচিত বলে তারা মনে করছেন। তাদের মতে, চলমান আন্দোলনে সারা দেশ থেকে ঢাকা বিচ্ছিন্ন। কিন্তু রাজধানীর চিত্র পুরো উল্টো। অবরোধ ও হরতালে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। দিন যত যাচ্ছে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। রাজধানীতে আন্দোলন জোরালো করতে নানা চেষ্টা করার পরও আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। অবরোধ-হরতালে নেতাকর্মীদের রাজপথে নামাতে বিক্ষোভ বা গণমিছিলের মতো কর্মসূচি দেয়া হয়। কিন্তু এরপরও নেতাকর্মীদের রাজপথে দেখা যায়নি। এ নিয়ে দলের হাইকমান্ডও ক্ষুব্ধ। সূত্র জানায়, এভাবে কর্মসূচি না চালিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়াই ভালো হবে। সে ক্ষেত্রে দলের নেতাকর্মীরাও রাজপথে নামার সুযোগ পাবে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে বড় ধরনের শোডাউনও করা যাবে। সব মিলিয়ে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে ভালো প্রার্থী দেয়া গেলে নির্বাচনে জয়লাভ করার সম্ভাবনাও বেশি।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে সম্ভাব্য প্রার্থী যারা : এর আগে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নেয়ার পর বিএনপি দুই সিটিতে সম্ভাব্য প্রার্থী চূড়ান্ত করে। ওই সময় উত্তরে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবদুল আউয়াল মিন্টুকে দলের পক্ষ থেকে নির্বাচন করার সবুজ সংকেত দেয়া হয়। এবারও নির্বাচনে অংশ নিলে উত্তর থেকে মিন্টুকে সমর্থন দেয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ ইতিমধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ একজন ব্যবসায়ীকে উত্তরের প্রার্থী হিসেবে সমর্থন দিয়েছে। মিন্টুও এফবিসিসিআইএ’র সাবেক সভাপতি ছিলেন। তাই আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সঙ্গে মিন্টুর বিকল্প নেই বলে অনেকে মনে করছেন। অনেক আগেই মিন্টু নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। মিন্টু ছাড়াও উত্তরে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এমএ কাইয়ুম।
ঢাকা দক্ষিণে প্রার্থী চূড়ান্ত না হলেও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন, অর্থবিষয়ক সম্পাদক আবদুস সালাম, যুবদলের সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের নাম আগে থেকেই শোনা যায়। তারা এ লক্ষ্যে আগে থেকেই কাজ শুরু করেন। তবে এবারের নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর দক্ষিণের প্রার্থী তালিকায় এদের সঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, যুগ্ম মহাসচিব বরকত উল্লা বুলু, মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেলের নামও শোনা যাচ্ছে।
সূত্র জানায়, মেয়র ছাড়াও ঢাকার দুই সিটিতে কাউন্সিলর পদে অনেকেই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে দল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেয়ায় তারা এখনও প্রকাশ্যে আসছেন না। অনেকে কারাগারে বসেও নির্বাচন করার কথা ভাবছেন।
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close