¦
মিন্টুর প্রার্থিতা বাতিলে গুঞ্জন

হাবিবুর রহমান খান | প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০১৫

আবদুল আউয়াল মিন্টু বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, দেশের একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। কোনো কাজে ব্যর্থ হওয়ার নজির খুবই কম। এক সময় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন অবিভক্ত ঢাকা সিটির মেয়র হওয়ার। সেই লক্ষ্যে শুরু করেন নানা প্রস্তুতিও। কিন্তু সাড়ে ৩ বছর আগে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে রূপান্তরিত হয়। তারপরও হাল ছাড়েননি তিনি। স্বপ্ন দেখতে থাকেন উত্তর সিটির মেয়রের। কিন্তু মিন্টুর সেই স্বপ্ন কি একটু সামান্য ভুলের কারণেই ভঙ্গ হতে চলেছে। নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো কারণ। এমন প্রশ্ন এখন ঢাকাবাসীর মুখে মুখে। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু মিন্টুর প্রার্থিতা বাতিলের বিষয়টি।
এমনকি তার দল বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যেও মিন্টুর প্রার্থিতা বাতিল নিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে নানা সন্দেহ। এর পেছনে সরকারের সঙ্গে কোনো আঁতাত রয়েছে কিনা- এমন প্রশ্নের উত্তরও খুঁজছেন কেউ কেউ। তবে মিন্টুর প্রার্থিতা বাতিলের ঘটনায় হতাশ ও বিব্রত দলটির হাইকমান্ড। সিটি নির্বাচনের মাঠে নামার আগে এটাকে বড় ধাক্কা বলেও মনে করছেন তারা। প্রার্থিতা বাতিলের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে যে আপিল করা হয়েছে, সেই রায় মিন্টুর পক্ষে আসবে বলে দৃঢ়ভাবে আশাবাদী তার পরিবার ও দলের নেতাকর্মীরা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, মিন্টুর প্রার্থিতা বাতিল নিয়ে সৃষ্ট নানা সন্দেহ দূর করার ক্ষেত্রে সরকার ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারত। যে ভুলের কারণে তার প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে- তা আইনি ক্ষেত্রে সঠিক। নির্বাচন কমিশন একটু আন্তরিক থাকলে এ ভুল শুধরিয়ে মিন্টুর প্রার্থিতা বৈধও ঘোষণা দিতে পারত। এতে বড় ধরনের অনিয়ম হতো না। তাদের মতে, দুই দলের মধ্যে সৃষ্ট দূরত্ব ঘোচাতে সিটি নির্বাচনকে নিয়ামক হিসেবে মনে করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে মিন্টুর প্রার্থিতা বৈধতা দেয়ার মধ্য দিয়ে তা আরও কাছাকাছি আসারও সুযোগ সৃষ্টি হতো।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে, মিন্টুর প্রার্থিতা বাতিল হওয়ার পর উত্তরে মেয়র পদে কাকে সমর্থন দেয়া হবে তা নিয়ে দলের নীতিনির্ধারকসহ নেতাকর্মীদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে মতভিন্নতা। কেউ কেউ আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে তাবিথ আউয়ালকে জোটের সমর্থন দেয়ার পক্ষে মত দিচ্ছেন। তবে বেশিরভাগই চাচ্ছেন শেষ মুহূর্তে মিন্টুর প্রার্থিতা বাতিল হলে এবং সেক্ষেত্রে তার ছেলেকে সমর্থন দেয়া হলে ভোটের মাঠে বিরূপ প্রভাব পড়বে। কারণ মিন্টুর ভুলের বিষয়টিকে কেউ অনিচ্ছাকৃত তা মেনে নেবে না। তার ছেলেকে সমর্থন দেয়া হলে প্রতিপক্ষ প্রার্থীর সঙ্গে ভোটের মাঠে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হবে না। সেক্ষেত্রে বিকল্পধারার যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি চৌধুরীকে সমর্থন দেয়ার পক্ষেই তারা আলোচনা করছেন। তবে বিষয়টি নিয়ে এখনও দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারও সঙ্গে আলোচনা করেননি। তিনি মিন্টুর প্রার্থিতা বাতিলে হতাশ। শনিবার আপিলের রায়ের পরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে বলে জানা গেছে।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, আবদুল আউয়াল মিন্টুর মতো সচেতন একজন ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে এমন ভুল করেছেন তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। এ ভুল নিয়ে যে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে তাও মানতে নারাজ তিনি। বলেন, নির্বাচন কমিশন ইচ্ছা করলে তার প্রার্থিতা বৈধতা দিতে পারত। এখনও সে সুযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক সহনশীলতা ও দুই দলের মধ্যে দূরত্ব কমানোর ক্ষেত্রে মিন্টুর প্রার্থিতা বৈধ করার মধ্য দিয়ে সরকার তাদের সদিচ্ছার প্রমাণ দেবে বলেও আশা করেন তিনি।
জানা গেছে, আবদুল আউয়াল মিন্টু খুবই সচেতন একজন লোক। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। কোনো ক্ষেত্রেই তার ব্যর্থতার নজির নেই। জীবনে যা করতে বা হতে চেয়েছেন সবই হতে পেরেছেন। এ সফলতার শেষ সিঁড়ি হিসেবে স্বপ্ন দেখেন ঢাকা সিটির মেয়র হওয়ার। অনেকের মতে, মেয়র হওয়ার লক্ষ্য নিয়েই তিনি আওয়ামী রাজনীতি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন। বিএনপিতে আসার পরই শুরু করেন মেয়র হওয়ার পরিকল্পনা। গোছাতে থাকেন সংশ্লিষ্ট নানা কর্মকাণ্ড। সুন্দর ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়ার স্বপ্ন নিয়ে আগাম পরিকল্পনা শুরু করেন। মেয়র হওয়ার পর কিভাবে কাজ করবেন তার একটি মাস্টার প্ল্যানও তৈরি করেন।
তার মতো একজন সচেতন ব্যক্তি এমন সামান্য ভুল করতে পারেন এটা কেউ বিশ্বাস করতে পারছেন না। ভুলের নেপথ্যে নানা কারণ খোঁজার চেষ্টা করছেন। অনেকের মতে, ছেলেকে রাজনীতির ময়দানে পরিচিত করতেই মিন্টু এমন ভুল করে থাকতে পারেন। মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার পর ভুলের বিষয়টি জানতে পেরে শেষ মুহূর্তে ছেলেকে দিয়ে মনোনয়নপত্র ক্রয় করান। যাতে তার প্রার্থিতা বাতিল হলে ছেলের জন্য দলের সমর্থন আদায় করা সম্ভব হয়।
অনেকে এর পক্ষে যুক্তি হিসেবে মনে করেন, মামলা বা অন্য কোনো কারণে মিন্টুর প্রার্থিতা বাতিল হলে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব বরকতউল্লা বুলু উত্তরে মেয়রপদে মনোনয়নপত্র কিনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নানা মাধ্যমে বুলুকে মনোনয়নপত্র কেনা থেকে বিরত রাখা হয়। মহানগর যুগ্ম আহ্বায়ক এমএ কাইয়ুমও উত্তরে প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মিন্টু প্রার্থী হওয়ায় দল তাকে নিশ্চিত সমর্থন দেবে জানতে পেরে তিনিও মনোনয়নপত্র কেনা থেকে বিরত থাকেন। অনেকের প্রশ্ন কেন দল থেকে বিকল্প প্রার্থীর মনোনয়নপত্র জমা দেয়া হয়নি। অনেকের আশংকা ছিল, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যে কোনো কারণ দেখিয়ে সরকার বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের প্রার্থিতা বাতিল করে দিতে পারে। এ কারণে দক্ষিণে একাধিক প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। দলের পক্ষ থেকে মির্জা আব্বাসকে সমর্থন দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। কোনো কারণে তার প্রার্থিতা বাতিল হলে অন্য কাউকে যাতে সমর্থন দেয়া যায় সে বিকল্পও রাখা হয়েছে। কিন্তু উত্তরে কেন দলের নেতাদের বিকল্প প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেয়া হয়নি সেই প্রশ্নও অনেকের মাঝে। এক্ষেত্রে অনেকে মিন্টুর প্রতি সন্দেহের তীর ছুড়লেও তাদের ধারনা, বিএনপির মতো একটি দল এমন গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে এমন হটকারী সিদ্ধান্ত নেবে এটা সমর্থন করা যায় না। দলের হাইকমান্ড এ ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বলেও মনে করেন তারা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, যে ভুলের কারণে মিন্টুর প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে তা অনিচ্ছাকৃত হলেও অনেকে তা মেনে নিতে পারছেন না। এ ভুলের পেছনে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে কোনো আঁতাত হয়েছে কিনা এমন সন্দেহ করছেন কেউ কেউ। তাদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী হলেন মিন্টুর বেয়াই। সরকার সমর্থক প্রার্থীকে নিশ্চিত বিজয়ী করতে সরকার কোনো কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে কিনা তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
জানা গেছে, মনোনয়নপত্র পূরণের ক্ষেত্রেও অবহেলার পরিচয় পাওয়া যায়। মিন্টু বর্তমানে আত্মগোপনে থাকায় তার ছেলে, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও আইনজীবীর মাধ্যমে তা পূরণ করা হয়। আবদুর রাজ্জাক নামে যে সমর্থকের কারণে মিন্টুর প্রার্থিতা বাতিল হয় তিনি তার (মিন্টুর) ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত এবং বিশ্বস্ত। এ কারণে তাকে সমর্থক করা হয়। কিন্তু তিনি উত্তরের ভোটার কিনা সে বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়নি। এমনকি মনোনয়নপত্রে তিনজন করে প্রস্তাবক ও সমর্থক দেয়ার সুযোগ থাকলেও কেন শুধু একজনকেই সমর্থক দেয়া হল সে প্রশ্নও ওঠেছে।
তবে মিন্টুর পারিবারিক সূত্র জানায়, তার প্রার্থিতা বাতিল নিয়ে যেসব অভিযোগ ও সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে তার বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই। যিনি সমর্থক তিনি তাদের খুবই বিশ্বস্ত। তিনি সিটি কর্পোরেশনের ভোটার এটা বলার পরই তাকে সমর্থক করা হয়েছে। এ নিয়ে যাচাই-বাছাইয়ের কোনো প্রয়োজন মনে হয়নি। প্রার্থিতা বাতিলের খবরে মিন্টু নিজেও ভেঙে পড়েছেন বলে তাদের দাবি। আপিলে মিন্টুর প্রার্থিতা বৈধ হবে বলে আশাবাদী তারা।
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close