¦
সিটি নির্বাচনই বিএনপির আন্দোলন

হাবিবুর রহমান খান | প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০১৫

তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকেই আন্দোলন হিসেবে নিয়েছে বিএনপি। এ লক্ষ্যে প্রার্থী চূড়ান্ত করা, তাদের পক্ষে প্রচারে নামাসহ সব বিষয় মনিটর করবেন দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। চলমান আন্দোলনের চেয়ে তিনি সিটি নির্বাচনকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এজন্য জোট সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চাইতে শিগগিরই ঢাকা ও চট্টগ্রামের মাঠে নামবেন তিনি। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে পথসভা করবেন। সরকারের আচরণ ও মনোভাব গভীর পর্যবেক্ষণে রাখবেন খালেদা জিয়া।
জনগণের সমর্থন নিয়ে তিন সিটিতে জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। এর অংশ হিসেবে প্রতি ওয়ার্ডে নির্বাচন পরিচালনা কমিটিসহ তৈরি করা হচ্ছে নানা কর্মপরিকল্পনা। ঢাকা ও চট্টগ্রামে মহাসমাবেশ আয়োজনের পরিকল্পনাও আছে। ইতিমধ্যেই হরতাল প্রত্যাহার করা হয়েছে। দুই সিটি থেকে অবরোধও তুলে নেয়ার সম্ভাবনা আছে। দলের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
৯২ দিন পর গুলশান কার্যালয় থেকে বেরিয়ে খালেদা জিয়া রোববার আদালতে যান। আদালত থেকে জামিন নিয়ে গুলশানের বাসভবনে ফিরে গেছেন। এসব আন্দোলনেরই অংশ। দলটির নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, সিটি নির্বাচন বিএনপি ইতিবাচকভাবে নিয়েছে। এ মুহূর্তে বিএনপি চেয়ারপারসনের সব পরিকল্পনা তিন সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের জয়লাভকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন তিনি। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার অংশ হিসেবেই কার্যালয় ছেড়ে বাসায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। রোববার খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে ‘শত নাগরিক’ কমিটির আহ্বায়ক প্রফেসর ড. এমাজউদ্দীন আহমদও জানান, ‘ম্যাডাম বলেছেন, নির্বাচনটাই হচ্ছে আন্দোলন।’
বিএনপির একাধিক নেতা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অবরুদ্ধ থাকায় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতে পারেননি খালেদা জিয়া। এ কারণে সিটি নির্বাচন ইস্যুতে কৌশলে এক ঢিলে দুই পাখি শিকার করতে চাচ্ছেন তিনি। প্রথম হচ্ছে, তিনি নির্বাচনী প্রচারে নামছেন। এতে একদিকে নির্বাচনী প্রচারে জোট সমর্থিত প্রার্থীর ভোট বাড়বে। অন্যদিকে রাজধানীর সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের কাছাকাছি যেতে পারবেন তিনি। বিশেষ করে নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থার অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের দাবিতে চলমান আন্দোলন আরও জোরদার করতে নেতাকর্মীদের উৎসাহিত করবেন তিনি। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে পথসভা করে প্রার্থীদের জনগণের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবেন। একই সঙ্গে তাদের জন্য ভোটও চাইবেন। সিটি নির্বাচনে পছন্দের প্রার্থীদের জন্য ভোট চাইতে খালেদা জিয়ার আইনি বাধা নেই। কারণ, তিনি এমপি-মন্ত্রী কিংবা জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা নন। বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা মনে করেন, দলের চেয়ারপারসন মাঠে নামলে দ্রুতই চাঙা হয়ে উঠবে নেতাকর্মীরা। নেতাদের মতে, বাংলাদেশের মানুষের কাছে দুই নেত্রীর জনপ্রিয়তা তুলনাহীন। তারা যেখানেই যাবেন সেখানেই গণজোয়ার সৃষ্টি হবে। সিটি নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারপারসন এ সুযোগটি কাজে লাগাতে পারবেন। যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে সম্ভব হবে না। তাই ভোটের প্রচারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চেয়ে খালেদা জিয়া একটু হলেও এগিয়ে থাকবেন। খালেদা জিয়া মাঠে থাকলে হিসাব-নিকাশ পাল্টে যেতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন। নিশ্চিত হতে পারে সিটি কর্পোরেশনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের বিজয়। নেতাদের মতে, তিন সিটিতে জয়লাভ করার মধ্য দিয়ে নেতাকর্মীরাও নতুনভাবে চাঙ্গা হওয়ার সুযোগ পাবেন। নির্বাচনে জয়লাভের মধ্যে দিয়ে অবরোধ-হরতালের সময়টুকু মানুষ ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে বলে নেতারা মনে করেন। তারা বলেন, আন্দোলনের সময় যারা পেট্রলবোমায় মানুষ মেরেছে বিএনপি তাদের বিচারের মুখোমুখি করবে। এগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। জনগণকে বোঝাতে হবে যে তারা বিএনপির সঙ্গে আছে বলেই তিন সিটিতে বিজয় এসেছে। তাদের বোঝানো যাবে যে আন্দোলনের প্রাথমিক লাভ হচ্ছে তিন সিটিতে বিজয়। এ আন্দোলন আরও বেগবান করা গেলে সরকার নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে। সেই নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয় নিশ্চিত হবে। কাজেই সিটি নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে আন্দোলন নতুনমাত্রা পাবে। সরকারও নানামুখী চাপে থাকবে। শেষ পর্যন্ত তারা মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য খালেদা জিয়া স্বয়ং নিজে মাঠে থেকে সিটি নির্বাচনের সব দিক তদারকি করবেন বলে নেতারা জানান।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন যুগান্তরকে বলেন, খালেদা জিয়া প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারে নামবেন। তিনি ঢাকার এক প্রান্তে প্রবেশ করে অন্যপ্রান্ত দিয়ে বের হবেন। চট্টগ্রামেও প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চাইবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনী প্রচার চালাতে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত সব পেশাজীবীদের সমন্বয় করে নির্বাচন পরিচালনার জন্য সমন্বয় কমিটি গঠন করা হচ্ছে। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর জন্য পেশাজীবীরা নির্বাচনী ইশতেহারের কাজও করছেন। এছাড়া দলের সিনিয়র নেতাদের নিয়ে নির্বাচন পরিচালনার জন্য একটি কেন্দ্রীয় কমিটি করা হচ্ছে। তাদের পক্ষ থেকেও সুন্দর ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়ার নানা প্রতিশ্র“তি দেয়া হবে ভোটারদের। নির্বাচনী প্রচার চালাতে তৃণমূল থেকে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। ইতিমধ্যে ঢাকা মহানগরীর প্রতিটি থানায় নির্বাচন পরিচালনার জন্য কমিটি করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের প্রায় ৪০টির মতো ওয়ার্ড কমিটি জমা দেয়া হয়েছে। এদের মধ্য থেকেই নির্বাচনের দিন পোলিং এজেন্ট চূড়ান্ত করা হবে।
সূত্র জানায়, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও চট্টগ্রামে বড় ধরনের দুটি সমাবেশেরও কথাবার্তা চলছে। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের অনুমতি পেলে সমাবেশ করা হবে। এদিকে আনুষ্ঠানিকভাবে না হলেও নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছে বিএনপি। দক্ষিণে মির্জা আব্বাসকে মেয়র পদে সমর্থন দেয়া হয়েছে। উত্তরে আবদুল আউয়াল মিন্টুর প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় উচ্চ আদালতে রিট করা হয়েছে। আজ রিটের ওপর রায় হতে পারে। মিন্টুর প্রার্থিতা বৈধ হলে তাকেই সমর্থন জানাবে বিএনপি। আর তার প্রার্থিতা বাতিল হলে বিকল্প হিসেবে বিকল্পধারার যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি চৌধুরীকে সমর্থন জানানোর বিষয়টি মোটামুটি নিশ্চিত।
তিন মাসের বেশি সময় চলমান আন্দোলনে চূড়ান্ত সফলতা না পেয়েই কেন কার্যালয় ছেড়ে বাসায় গেলেন খালেদা জিয়া এ নিয়েও কেউ কেউ আলোচনা করছেন। তারা মনে করছেন, চলমান আন্দোলনে পেট্রলবোমাসহ নানা নাশকতায় শতাধিক সাধারণ মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। তবে দলের কেউ কেউ মনে করেন, বাসায় চলে যাওয়া মানেই আন্দোলন বন্ধ হয়ে যাওয়া এমনটা নয়। আন্দোলনের কৌশল হিসেবেই চেয়ারপারসন বাসায় গেছেন। তাদের মতে, আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে হঠাৎ করে সিটি নির্বাচনের উদ্যোগ নেয় সরকার। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে না বলেই সরকারের ধারণা ছিল। নির্বাচনে অংশ না নিলে রাজনৈতিকভাবে বিএনপি অনেকটা পিছিয়ে পড়ার আশংকা ছিল। কারণ একদিকে ঢিলেঢালা আন্দোলন অপরদিকে নির্বাচন বর্জন করা- কোনোটাই সাধারণ মানুষ ভালোভাবে নিত না। তাই সরকারের এমন কৌশল মোকাবেলায় নির্বাচনে যাওয়ার পাল্টা কৌশল নেয়া হয়। শুধু অংশগ্রহণ নয়, সিটি নির্বাচনে জয় ছাড়া অন্যকিছু ভাবা হচ্ছে না। খালেদা জিয়া কার্যালয়ে থাকলে আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের রাজপথে নামানো কঠিন ছিল। নির্বাচনী প্রচারেও কোনো সমন্বয় না থাকার আশংকা থাকত। খালেদা জিয়া অবাধে চলাফেরা ও নির্বাচনী প্রচার চালাতে পারলে নেতাকর্মীরাও আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে আসার সাহস পাবেন। সাধারণ ভোটাররাও ইতিবাচক সাড়া দেবেন। তারা ভয়ভীতি উপেক্ষা করে ভোট কেন্দ্রে যাবেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, চলমান আন্দোলনে কি অর্জন তার হিসাব মেলানোর সময় এখনও আসেনি। চূড়ান্ত সফলতা না এলেও আন্দোলনে অনেক অজর্ন রয়েছে। চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবেই তারা সিটি নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নির্বাচনে যাওয়া মানে তো আন্দোলন থেকে সরে আসা নয়। এখন নির্বাচনই হল আন্দোলন। তাই নির্বাচনে জয়কেই আমরা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি।
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close