¦
প্রাণভিক্ষা চাইবেন কিনা সিদ্ধান্ত আজ

যুগান্তর রিপোর্ট | প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০১৫

রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন কিনা- সে বিষয়ে আজ সিদ্ধান্ত জানাবেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। বৃহস্পতিবার আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা শেষে কারা কর্তৃপক্ষকে তিনি সিদ্ধান্ত জানাবেন। বুধবার কামারুজ্জামানকে রিভিউ আবেদনের রায় পড়ে শোনানোর পর তিনি এ কথা বলেন। এর আগে চার বিচারপতির স্বাক্ষরের পর রায়ের কপি কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছায়। আজ বেলা ১১টায় আইনজীবীরা কারাগারে গিয়ে কামারুজ্জামানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন না জানালে কারা কর্তৃপক্ষ তার ফাঁসি কার্যকর করার উদ্যোগ নেবে। আর প্রাণভিক্ষা চেয়ে আবেদন করতে চাইলে তাকে সময় দেয়া হবে। আইনমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, এ সময় হবে দুই থেকে তিন ঘণ্টা। এদিকে আদালতের রায় কার্যকরের জন্য কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
জানা গেছে, রায় কার্যকরের জন্য সোমবার থেকেই ফাঁসির মঞ্চ পুরোপুরি প্রস্তুত। কারা প্রশাসন ইতিমধ্যে এক দফা মহড়া শেষ করেছে। ৮২ কেজি ওজনের ব্যক্তিকে ঝোলানো সম্ভব কিনা- তা প্রমাণের জন্য দুটি বালুর বস্তা দিয়ে সোমবার এক দফা পরীক্ষা করা হয়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মোট ১৬টি ফাঁসির রশি আছে, এর একটি নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। যে ছয়জন জল্লাদ এখন কারাগারে আছেন, তাদের প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। তাদের যে কোনো তিনজনকে নেয়া হবে। ফাঁসি কার্যকরের মাত্র এক ঘণ্টা আগে জল্লাদদের এসব তথ্য জানানো হবে। প্রস্তুতির ব্যাপারে জানতে চাইলে জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক ফরমান আলী সাংবাদিকদের জানান, আদেশ পাওয়ার দুই ঘণ্টার মধ্যে যাবতীয় প্রস্তুতি নেয়া সম্ভব। এদিকে রিভিউ খারিজ রায়ের কপি হাতে পাওয়ার পর কামারুজ্জামানের সাজা কার্যকরের জন্য বুধবার কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কারা মহাপরিদর্শক বরাবর পাঠানো নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ প্রদত্ত রায়টি অদ্যই (বুধবারই) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাওয়া যায়। ওই রায়ে আসামি মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে মহামান্য সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গত (এর আগের) রায়ে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। এমতাবস্থায় কারাবিধি এবং International Crimes Tribunal আইন ১৯৭৩ এর ২০(৩) উপধারা অনুযায়ী ওই মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করার ক্ষমতা সরকারকে দিয়েছে। সেহেতু ওই দণ্ডাদেশ কার্যকরকরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দিচ্ছে।’ এ চিঠি পাওয়ার বিষয়টি যুগান্তরকে নিশ্চিত করেছেন জেল সুপার ফরমান আলী।
রিভিউ খারিজের পর আইনমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করার জন্য দু-তিন ঘণ্টা সময় পাবেন কামারুজ্জামান। আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে যে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে এ সময়টুকু তাকে দেয়া হবে।’ এরপর রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকবে কারা কর্তৃপক্ষ। রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত তার ফাঁসি কার্যকর করা যাবে না। রাষ্ট্রপতি যে সাজা বহাল রাখেন কারা কর্তৃপক্ষ সে অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।
২০১৩ সালের ৯ মে ট্রাইব্যুনাল এই জামায়াত নেতাকে ফাঁসির দণ্ড দিয়ে রায় দেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করলে গত বছরের ৩ নভেম্বর সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতির মতামতের ভিত্তিতে তার ফাঁসি বহাল রাখা হয়। গত ১৮ ফেব্র“য়ারি আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি প্রকাশিত হয়। পরদিন ট্রাইব্যুনাল-২ তার মৃত্যু পরোয়ানায় সই করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠালে সেখানে কামারুজ্জামানকে তা পড়ে শোনানো হয়। রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে ৫ মার্চ আবেদন করেন কামারুজ্জামান। এরপর মৃত্যুপরোয়ানার কার্যকারিতা স্থগিত হয়ে যায়। ৫ এপ্রিল এই রিভিউ আবেদনের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। ৬ এপ্রিল রিভিউ খারিজ হয়ে যায়।
এরপর থেকে রিভিউ আবেদন খারিজের রায়ের কপি হাতে পাওয়ার অপেক্ষায় আছে কারা কর্তৃপক্ষ। বুধবার দুপুরের পরপরই প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চের সদস্যরা রিভিউ খারিজের রায়ে স্বাক্ষর করেন। এ বেঞ্চের বাকি তিন সদস্য হলেন- বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী। বিচারকদের সইয়ের পর বিকাল ৩টার দিকে রায় সুপ্রিমকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় পৌঁছায়। সেখান থেকে বিকাল পৌনে ৫টার দিকে রায়ের অনুলিপি যায় ট্রাইব্যুনালে। এদিকে রিভিউ খারিজের দিনেই কারা কর্তৃপক্ষের এক চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে কামারুজ্জামানের পরিবারের সদস্যরা তার সঙ্গে দেখা করেন।
সুপ্রিমকোর্টের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার (২) মো. সাব্বির ফয়েজ যুগান্তরকে জানান, ‘৩৬ পৃষ্ঠার রায়ের কপিটির ৬টি সেট তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি পাঠানো হয়েছে ট্রাইব্যুনালে। যার একটি কারাগারে, একটি ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে এবং অপরটি ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। এছাড়া বাকি তিনটি সেটের মধ্যে একটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে, একটি অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসে এবং অপরটি আসামিপক্ষের অ্যাডভোকেট অন রেকর্ডের কাছে পাঠানো হয়েছে।’
এদিকে রায়ের অনুলিপি হাতে পাওয়ার পরপরই ট্রাইব্যুনালের ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি রেজিস্ট্রার আফতাবুজ্জামান ওই নথি ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারকদের কাছে উপস্থাপন করেন। ট্রাইব্যুনালের নির্দেশনা পেয়ে সন্ধ্যা পৌনে ৬টায় তিনি তা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌঁছে দেন।
কারাগার সূত্র জানায়, সন্ধ্যা ৬টার দিকে কামারুজ্জামানকে রিভিউ আবেদন খারিজের রায়ের কপি পড়ে শুনানো হয়। রায় শোনানোর পর তিনি প্রাণভিক্ষা চাইবেন কিনা কারা কর্তৃপক্ষ তা জানতে চান। কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষের কথায় তিনি ভ্রুক্ষেপ করেননি। রায় পড়ে শোনানোর সময় একমনে কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন। ৪-৫ বার প্রাণভিক্ষার আবেদনের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। এরপর তাকে আবেদনের ফরম দেয়া হয়। তাকে বলা হয়, ‘এটা নিয়ম, আপনাকে স্পষ্ট জানাতে হবে। তখন একপর্যায়ে কামারুজ্জামান বলেন, আমি এখন কিছু বলব না, আইনজীবীর সঙ্গে কথা ও পরিবারের সঙ্গে দেখা করে সিদ্ধান্ত নেব।
এরপর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেল সুপার ফরমান আলী কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিনের সঙ্গে দেখা করতে তার কার্যালয়ে যান। সেখান থেকে ফিরে এসে ফরমান আলী যুগান্তরকে বলেন, ‘কামারুজ্জামান একদিন সময় চেয়েছেন। বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় আইনজীবীরা তার সঙ্গে দেখা করবেন। কারা কর্তৃপক্ষ তার আইনজীবী শিশির মুহাম্মদ মনিরকে সকাল ১১টায় কামারুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করতে বলেছেন। তার আইনজীবীদের সঙ্গে সাক্ষাতের পর প্রাণভিক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবেন।’
পরে সন্ধ্যায় আইনজীবী শিশির মনির যুগান্তরকে বলেছেন, বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে কারাগারে আমাদের সাক্ষাৎ করার জন্য সময় দেয়া হয়েছে। প্রাণভিক্ষা আবেদনের বিষয়ে কামারুজ্জামান সাহেব আমাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। এদিন শিশির মনির ছাড়াও ব্যারিস্টার এহসান আবদুল্লাহ সিদ্দিক, মতিউর রহমান আকন্দ, আসাদ উদ্দীন ও মুজিবুর রহমান তার সঙ্গে দেখা করবেন।
রিভিউ খারিজের রায়ে যা বলা হয়েছে : রায়ে বলা হয়েছে, আসামি পক্ষের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন ১১, ১২ এবং ১৩ নম্বর সাক্ষীর ব্যাপারে যেসব বিষয় উত্থাপন করেছেন, তা নতুন কিছু নয়। আপিলের সময়ই তা বিস্তারিত পরীক্ষা করা হয়েছে। বিষয়বস্তুর ভিত্তিতেই তা করা হয়েছে। আমরা এ আদালতের কোনো ভুল খুঁজে পাইনি। শোনা কথার সাক্ষ্য অন্য সাক্ষ্য দ্বারা সমর্থিত হতে হবে বলে খন্দকার মাহবুব হোসেন যে যুক্তি উত্থাপন করেছেন, আইনের ধারা তা সমর্থন করে না। আবদুল কাদের মোল্লার মামলায় আমরা এটা পরিষ্কার করেছি যে, আন্তর্জাতিক আইন এখানে প্রযোজ্য হবে না। নতুন এভিডেন্স দাবি করে ‘মহিলা মুক্তিযোদ্ধা’ নামের যে বই দাখিল করা হয়েছে, তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ রয়েছে। অসৎ উদ্দেশ্যে বইটি লেখা হয়েছে। রায় লিখেছেন বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী। অন্য তিন বিচারপতি তার সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন।
রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের দায়ের করা আবেদনের ওপর আপিল বিভাগে শুনানি হয় রোববার। কামারুজ্জামানের পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন। তিনি প্রধানত চারটি পয়েন্টে তার বক্তব্য উপস্থাপন করে আপিল বিভাগের কাছে রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন জানান। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, কামারুজ্জামান আলবদর কমান্ডার ছিলেন। আলবদর বাহিনী পাকিস্তানি সেনাদের চেয়েও জঘন্য অপরাধে জড়িত ছিল। কামারুজ্জামান কোনো ধরনের অনুকম্পা পেতে পারেন না।
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close