¦
৩ র‌্যাব কর্মকর্তার লোমহর্ষক সেই জবানবন্দি

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি | প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০১৫

জানালাবিহীন ৭ বাই ৮ ফুটের ছোট্ট কামরা, একটি চেয়ার আর একটিমাত্র কম্বল। ছিল না রুচিকর খাবার। বাথরুমে যেতে হলেও অপেক্ষা করতে হতো ২০-২৫ মিনিট। রাত ১১টা থেকে ভোর অবধি চলত বিভিন্ন সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদ। মানসিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে শেষপর্যন্ত নৃশংস ৭ খুনের ঘটনার জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন র‌্যাবের সাবেক ৩ কর্মকর্তা। তুলে ধরেন ঘটনার আদ্যোপান্ত। হাইকোর্টের নির্দেশে গত বছরের ১৬ মে রাতে ঢাকার সেনানিবাস থেকে মেজর (অব.) আরিফ হোসেন ও লে. কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ। তাদের আগেই অবসরে পাঠানো হয়। আর পরের দিন ১৭ মে গ্রেফতার করা হয় চাকরিচ্যুত লে. কমান্ডার এমএম রানাকে। একে একে ৩ জনই হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছিলেন। সেই জবানবন্দির চৌম্বক অংশগুলো তুলে ধরা হল।
তারেক বলেছিলেন সমস্যা নেই : ৩২ দিনের রিমান্ড শেষে ১৮ জুন নারায়ণগঞ্জের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম কেএম মহিউদ্দীনের আদালতে দীর্ঘ ৩ ঘণ্টা ধরে দেয়া জবানবন্দিতে লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ বলেছিলেন, আমি র‌্যাব-১১-এর কমান্ডিং অফিসার হিসেবে ২০১৩ সালের ২৪ অক্টোবর যোগদান করি। র‌্যাব-১১ কোম্পানি কমান্ডারদের সম্মেলনে আমি নজরুলকে (প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম) গ্রেফতারের নির্দেশ দিই। আমি লে. কমান্ডার রানাকে বলি, সে যেন মেজর আরিফকে এ বিষয়ে সাহায্য করে। ২৭ এপ্রিল বেলা অনুমান ১১টার দিকে মেজর আরিফ আমাকে ফোন করে বলে, স্যার নজরুল আজ কোর্টে আসবে। তাকে আজ গ্রেফতার করা যাবে। তখন আমি নজরুলকে গ্রেফতারের জন্য আরিফকে অনুমতি দিই।
ওইদিন আনুমানিক ২টার (দুপুর) সময় মেজর আরিফ আমাকে ফোন করে বলে, স্যার টার্গেট ধরা হয়েছে। সঙ্গে আরও ৪ জন আছে। সবাইকে নিয়ে নরসিংদী র‌্যাব ক্যাম্পে যাচ্ছি। বেলা অনুমান ৩টার সময় আরিফ আমাকে রিপোর্ট করে, সে নরসিংদী র‌্যাব ক্যাম্পে পৌঁছে গেছে।
তারেক সাঈদ আরও বলেন, রাত ৮টার সময় আমি নজরুলের স্ত্রী ও শ্বশুরের জন্য আমার অফিসে অপেক্ষা করছিলাম। ওই সময় মেজর আরিফ আমাকে ফোন করে বলে, স্যার আমার লোক বদলি করতে হবে। আপনি একটি গাড়ি দেন। তখন আমি আরিফকে নরসিংদী ক্যাম্পে বিশ্রাম নিয়ে একবারেই নারায়ণগঞ্জ ক্যাম্পে ফিরতে বলি। তখন আরিফ জানায়, সে নরসিংদী ক্যাম্পে নেই। নরসিংদী ক্যাম্প কমান্ডার সুরুজ তাকে ঠিকমতো (গ্রহণ) না করায় সে ক্যাম্প থেকে বের হয়ে গেছে। রাত ৮টার পর থেকে রাত ৯টার আগ পর্যন্ত আমি নজরুলের স্ত্রী, নজরুলের শ্বশুর ও নজরুলের আরও ১০-১২ জন লোকের সঙ্গে মিটিং করি। ওই সময় নজরুলের শ্বশুর ও স্ত্রী বলে, নূর হোসেন নজরুলকে অপহরণ করেছে। নূর হোসেনকে গ্রেফতার করলে নজরুলকে পাওয়া যাবে। তখন আমি বলি, তদন্ত সাপেক্ষে নূর হোসেনকে গ্রেফতার করা হবে। রাত আনুমানিক ৯টার দিকে আরিফ আমাকে ফোন করে বলে, স্যার রাস্তায় পুলিশের কড়া চেকিং চলছে। আমি বেসামরিক গাড়ি নিয়ে নারায়ণগঞ্জ এলে চেকিংয়ে পড়ব। তাই আমার ক্যাম্পে ফেরার জন্য নৌকা দরকার। তখন আমি আরিফকে বলি, লে. কমান্ডার রানার সঙ্গে কথা বলে তুমি নৌকা ঠিক করে নাও। র‌্যাব-১১-এর সব বোট লে. কমান্ডার রানা তত্ত্বাবধান করতেন। এরপর আমি বোটের বিষয়ে রানা এবং আরিফ দুজনের সঙ্গে কথা বলে তাদের সমন্বয় করে নিতে বলি। রাত ১০টা ৪৫ মিনিটের দিকে লে. কমান্ডার রানা আমার অফিসে আসে। আমি রানাকে জিজ্ঞাসা করি, আরিফ কোথায় নিতে বলেছে? রানা বলে, কাঁচপুর ব্রিজের নিচে নিতে বলেছে। রাত ১১টা ১৫ মিনিটের দিকে আরিফ আমাকে ফোন করে বলে, স্যার আমি কাঁচপুর পৌঁছে গেছি। তারপর আমি আমার ব্যাটালিয়ন অপারেশন কর্মকর্তা (সহকারী পুলিশ সুপার) শাহরিয়ারকে ফোন করে বলি, মেজর আরিফের গাড়ি ও ব্যাটালিয়ন থেকে একটি মাইক্রোবাস নৌকাঘাটে পাঠিয়ে দাও। রাত আনুমানিক ২টা ৩০ মিনিটের দিকে আমি নৌকাঘাটে পৌঁছি। আমি পৌঁছার ২০-২৫ মিনিট পর মেজর আরিফ নৌকাঘাটে পৌঁছায়। ওই সময় শাহরিয়ার মেজর আরিফের গাড়ি ও একটি মাইক্রোবাস নৌকাঘাটে পাঠিয়ে দেয়। তখন আরিফ বলে, স্যার আসামিদের মেরে ফেলেছি। আমি আরিফকে বলি, মেরে ফেলছ, মানে? কেন মেরেছ? আরিফ বলে, নজরুল আমাকে চিনে ফেলেছে। তাই নজরুলকে মেরে ফেলেছি। অন্যরাও দেখে ফেলেছে, তাই ভয়ে তাদেরও মেরে ফেলেছি। ওই সময় আরিফ বলে, মোট ৭ জনকে মেরেছি। আমি বলি, ৭ জন মানে? তুমি তো গ্রেফতার করেছ ৫ জনকে, অন্য ২ জন কোথায় পেলে। তখন আরিফ আমাকে বলে, স্যার আমার গাড়িতে ছিল ৫ জন। পেছনে আর একটি গাড়িতে রানা স্যার ২ জনকে পাঠিয়েছেন। এ ২ জনের বিষয়ে আপনাকে জানানো হয়নি। ভেবেছিলাম ক্যাম্পে এসে জানাব।
এ কথা শুনে আমি আরিফের টিমের সৈনিকদের নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ি। তারপর আমি সব সৈনিকের কাছ থেকে আরিফকে মোবাইল নিয়ে নিতে বলি এবং আরিফসহ তার লোকদের গাড়িতে উঠতে বলে র‌্যাব হেডকোয়ার্টারে যেতে বলি। মেসে যাওয়ার পথে রাস্তায় পুলিশ আমার মাইক্রোবাস চেক করে। পরে আমার পরিচয় জানার পর পুলিশ আমাকে ছেড়ে দেয়। ২৯ এপ্রিল বেলা আনুমানিক ১১টার দিকে আমি ও মেজর আরিফ অতিরিক্ত মহাপরিচালক অপারেশনের (এডিজি অপস) অফিসে যাই। তিনি মেজর আরিফ ও নূর হোসেনের মধ্যে কথোপকথনের সিডি ও লিখিত ভার্সন আমাদের দেখান। ওই সময় অতিরিক্ত মহাপরিচালক আরিফকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এছাড়া আরিফ ও নূর হোসেনের কথোপকথনের মধ্যে কিছু সাংকেতিক শব্দ থাকায় অতিরিক্ত মহাপরিচালক স্যার আরিফকে ওই বিষয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করেন। ঢাকার ফ্ল্যাটের বিষয়ে সে বলে, হ্যাঁ ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট আছে। নূর হোসেনের মাধ্যমে ফ্ল্যাটের টাকা জমা দিই। নজরুলের সঙ্গে নূর হোসেনের শত্র“তা থাকায় সোর্স হিসেবে নূর হোসেনকে ব্যবহার করি। র‌্যাব হেডকোয়ার্টার থেকে অতিরিক্ত মহাপরিচালকের সঙ্গে কথা বলে বের হয়ে আমি ও আরিফ বিকালে আনুমানিক ৪টার দিকে নারায়ণগঞ্জ র‌্যাব-১১ এর হেডকোয়ার্টারে চলে আসি। ওইদিন বিকাল ৫টায় আমি আরিফ ও রানা মাতৃবাহিনীতে ফেরত যাওয়ার আদেশ পাই। রাত ৮টার মধ্যে যার যার মাতৃবাহিনীতে যোগদান করি।
মেজর আরিফের লোমহর্ষক বর্ণনা : তদন্ত টিম ও আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে আরিফ হোসেন বলেছেন, তাদের সঙ্গে নূর হোসেনের ভালো সম্পর্ক ছিল। তাদের দিয়ে এর আগেও নজরুলকে অপহরণ ও গুমের পরিকল্পনার কথা বলেছিল নূর হোসেন। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ র‌্যাব রিস্ক নিতে রাজি হয়নি। তারেক সাঈদ বিষয়টির দায়িত্ব দেন আরিফের ওপর।
এর মধ্যে নূর হোসেন র‌্যাবকে জানায়, ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের একটি আদালতে নজরুলের জামিন শুনানি আছে। পরে আরিফ বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর নারায়ণগঞ্জ আদালতে চার-পাঁচজন সাদা পোশাকের র‌্যাব সদস্য পাঠায়। তারা নজরুলের পুরো গতিবিধি নজরে রাখে। ক্ষণে ক্ষণে মোবাইলে আরিফকে জানানো হয় সব কিছু।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জামিন নিয়ে আদালত থেকে একটি সাদা প্রাইভেটকারে নজরুল ইসলাম বের হওয়ার পরই তাদের গাড়ি লিংক রোড দিয়ে সাইনবোর্ড যাওয়ার পথেই ফতুল্লা স্টেডিয়ামের কাছে ময়লা ফেলার স্থানে পৌঁছার পর মেজর আরিফের নেতৃত্বে গাড়ির গতিরোধ করা হয়। নজরুলের গাড়ির পেছনে ছিল আইনজীবী চন্দন সরকারের গাড়ি। পরে দুটি গাড়ি থেকে সাতজনকে র‌্যাবের দুটি গাড়িতে তুলে নেয়া হয় অস্ত্র দেখিয়ে। গাড়িতে ওঠানোর পর তাদের প্রথমে অচেতন হওয়ার স্প্রে করা হয় যাতে তাৎক্ষণিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। সাতজনই জ্ঞান হারানোর পর তাদের বহন করা গাড়ি র‌্যাবের সাদা পোশাকের লোকজন নিয়ে যায় অন্য গন্তব্যে। এর মধ্যে সাতজনকে বহন করা গাড়ি নিয়ে যাওয়া হয় নরসিংদীতে।
পথের মধ্যে তাদের শরীরে আবারও অচেতন হওয়ার ইনজেকশন পুশ করা হয়। এরই মধ্যে নূর হোসেনের সঙ্গে কয়েক দফা কথা হয় আরিফের। তখন নূর হোসেন বারবার হত্যার বিষয়ে কথা বলে ও চাপ দিতে থাকে। রাত ১০টার পর কাঁচপুর ব্রিজের পশ্চিম পাড়ে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বালু-পাথর ব্যবসাস্থল জনমানুষ শূন্য করার জন্য নূর হোসেনকে ফোন দেন মেজর আরিফ হোসেন। তাদের বহন করা গাড়ি কাঁচপুর সেতুর নিচে আসার পথে অচেতন সাতজনের মাথা শক্ত পলিথিন দিয়ে পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। কাঁচপুর সেতুর নিচে লাশগুলো উঠানো হয় একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায়। পুলিশ যাতে কোনো সন্দেহ না করে সে জন্য ওই নৌকাতে ছিল কয়েকজন র‌্যাব সদস্য। নৌকায় করে লাশ শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরীর মোহনাতে নেয়ার পথে পেট ফুটো করে গ্যাস বের করে দেয় এবং সবার শরীর ইট দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়।
এমএম রানার স্বীকারোক্তি : গত বছরের ৬ জুন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কেএম মহিউদ্দিনের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন র‌্যাব-১১ এর স্পেশাল ক্রাইম প্রিভেনশন কোম্পানির চাকরিচ্যুত ক্যাম্প কমান্ডার অবসরে পাঠানো নৌ বাহিনীর লে. কমান্ডার এমএম রানা। তিনি বলেন, তার ওপর দায়িত্ব ছিল শুধু নজরুলকে অপহরণ করা। আর পুরো হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় ছিল তারেক সাঈদ ও আরিফ হোসেন। কিলিং মিশনে ছিলেন রানাসহ ২৩ র‌্যাব সদস্য। যাদের মধ্যে সামরিক বাহিনীতে কর্মরত ২০ জন ও পুলিশ থেকে আসা তিনজন। শুধু নজরুলকে অপহরণের পরিকল্পনা থাকলেও তার সঙ্গে আরও চারজন থাকায় তাদের এবং ঘটনা প্রত্যক্ষ করায় চন্দন সরকার ও তার গাড়ির চালককে হত্যা করা হয়েছে।
রানা বলেন, মূলত আমার দায়িত্ব ছিল নজরুলকে অপহরণ করা। আমি সেটাই করেছি। রানা জবানবন্দিতে হত্যার পর লাশ ইট দিয়ে বেঁধে ফেলা, নৌকায় তুলে তিন নদীর মোহনাতে ফেলে দেয়ার প্রত্যক্ষ বর্ণনা দেন।
প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close