¦
বদর কমান্ডারের ফাঁসি

যুগান্তর রিপোর্ট | প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০১৫

যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় শেরপুরের সোহাগপুর বিধবাপল্লীতে ১৪৪ জনকে হত্যা ও বহু নারীকে ধর্ষণের অভিযোগে তার ফাঁসি দেয়া হয়। শনিবার রাত ১০টা ৩০ মিনিটে রশিতে ঝুলিয়ে ফাঁসি কার্যকর করা হয় জামায়াতের এই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের। ৪ দিন সময় দেয়ার পরও প্রাণভিক্ষার আবেদন না করায় শনিবার একাত্তরে বদর বাহিনীর এ নেতার ফাঁসি কার্যকর করে সরকার। এর মধ্য দিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের দ্বিতীয় ফাঁসির রায় কার্যকর হল। ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষকে আনন্দ-উল্লাস করতে দেখা গেছে। স্বস্তি নেমে আসে বিধবাপল্লীতেও।
কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইফতেখার উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, ‘রাত ১০টা ৩০ মিনিটে কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে।’  
কারা সূত্র জানায়, প্রায় ২০ মিনিট তার লাশ ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে রাখা হয়। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর মরদেহ নামানো হয়। কেটে দেয়া হয় তার হাত-পায়ের রগ।  সিভিল সার্জন পরীক্ষা করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন। এরপর তার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়।  সব প্রক্রিয়া শেষে রাত ১১টা ২০ মিনিটে কামারুজ্জামানের মরদেহ তোলা হয় অ্যাম্বুলেন্সে। ১১টা ৩৮ মিনিটে অ্যাম্বুলেন্স দুটি কারাগার থেকে বের হয়ে আসে। এ সময় পেছনের অ্যাম্বুলেন্সের সামনে চালকের পাশের আসনে বসা ছিলেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার আখেরুজ্জামান।
নম্বরবিহীন (রওনক অ্যাম্বুলেন্স) ওই অ্যাম্বুলেন্সেই জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের মরদেহ ছিল। সামনের অ্যাম্বুলেন্সে ছিল তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র। নিরাপত্তার স্বার্থে কারা কর্তৃপক্ষ এ কৌশল নেয় বলে জানা গেছে। পরিবারের সদস্যদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর না করে সরকারিভাবেই আগে-পিছে র‌্যাব ও পুলিশের কড়া প্রহরায় তার মরদেহ শেরপুরে গ্রামের বাড়ি বাজিতখিলায় নিয়ে যাওয়া হয়। বাড়িতে পৌঁছার পর রাত শেষ হওয়ার আগেই তার জানাজা এবং দাফন সম্পন্ন হয়।
ফাঁসি কার্যকরের আগে কারা মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা মনির হোসেন রাত ৮টা ৫০ মিনিটে কারাগারে আসেন। তিনি কামারুজ্জামানকে গোসল করে নিতে বলেন। এরপর তিনি গোসল করে এশার নামাজ আদায় করেন। এ সময় দুই রাকাত নফল নামাজও পড়েন বলে প্রত্যক্ষদর্শী কারা কর্মকর্তা জানান। মাওলানা মনির হোসেনই কামারুজ্জামানকে তওবা পড়ান। কারা চিকিৎসক ডা. আহসান হাবিব তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। এরপর কনডেম সেল থেকে তাকে ফাঁসির মঞ্চে নেয়া হয়। স্বাভাবিকভাবে হেঁটে তিনি ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে যান। দোয়া পড়তে পড়তে তিনি সামনে হাঁটতে থাকেন। এ সময় তার পাশে ছিল জল্লাদ। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড় করানোর পর তাকে কালো জমটুপি পরিয়ে দেয়া হয়। দুই হাত পেছনে নিয়ে বেঁধে দেয়া হয়। এরপর নিয়ম অনুযায়ী জেল সুপার তার হাতে রাখা রুমাল মাটিতে ফেলে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রধান জল্লাদ রাজু ফাঁসির মঞ্চের লিভার (লোহার তৈরি বিশেষ হাতল) টেনে দেন। এতে করে পায়ের নিচের কাঠ সরে যায়। কার্যকর হয় ফাঁসির আদেশ। নিয়ম অনুসারে ফাঁসির রায় কার্যকরের সময় কারা প্রশাসনের মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইফতেখার উদ্দিন, সিনিয়র জেল সুপার ফরমান আলী, জেলার নেছার আহমেদ, ঢাকার জেলা প্রশাসক তোফাজ্জল হোসেন, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের প্রতিনিধি ডিবির উপপুলিশ কমিশনার শেখ নাজমুল আলম, পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার ফয়েজ আহমেদ এবং ঢাকা জেলা সিভিল সার্জন আবদুল মালেক মৃধা উপস্থিত ছিলেন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের পুরনো মঞ্চেই কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। যে মঞ্চে এর আগে আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছিল। ফাঁসি কার্যকর করার জন্য জল্লাদ রাজুর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি দল কাজ করেছে।
কারা সূত্র বলেছে, মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করতে আগেই পাঁচ সদস্যের জল্লাদ প্রস্তুত করা হয়। রাজু ছাড়া অন্য চারজন হচ্ছেন নেত্রকোনার জনি, ঢাকার পল্টু, সামছু ও সাত্তার।
কারা সূত্র জানায়, কারাগারের পূর্ব-পশ্চিম কোণে ফাঁসির মূল মঞ্চ। এর দৈর্ঘ্য আট ফুট এবং প্রস্থ সাড়ে চার ফুট। ভূমি  থেকে উঁচুতে এই মঞ্চে পাশাপাশি দু’জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ব্যবস্থা রয়েছে। মঞ্চের উপরে যে ফাঁসির কাষ্ঠ তার উচ্চতা আট ফুট। আর মঞ্চ থেকে নিচের দিকে বারো ফুট গভীর গর্ত আছে। সেই গর্ত কাঠের পাটাতন দিয়ে ঢাকা থাকে। ফাঁসি কার্যকরের সময় দক্ষিণে রাখা হয় একটি লম্বা টেবিল, যার পাশে ১০ জন বসতে পারেন। তার সামনে আরেকটি টেবিলে ফাঁসি কার্যকর করার পর মরদেহ রাখা হয়। পুরো ফাঁসির মঞ্চে লাল ও সবুজ রঙের শামিয়ানা টানিয়ে দেয়া হয়। এর ফলে বাইরে থেকে ফাঁসির মঞ্চ দেখার কোনো সুযোগ ছিল না।
দুপুর সোয়া ১টার দিকে কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকরের নির্বাহী আদেশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কারা কর্তৃপক্ষের হাতে পৌঁছানো হয়। এটি হাতে পেয়ে বিকাল ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে কামারুজ্জামানের পরিবারকে শেষ সাক্ষাতের জন্য ডেকে পাঠান কারা কর্তৃপক্ষ। সে অনুযায়ী বিকালে কামারুজ্জামানের পরিবারের ২০ সদস্য কারাগারে দেখা করেন। প্রায় ১ ঘণ্টা সাক্ষাৎ শেষে বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে কারাগার থেকে বের হন তারা।
এ সময় কামারুজ্জামানের ছেলে হাসান ইকবাল ওয়ামী সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাবা বিচলিত নন। তিনি সুস্থ আছেন। আমরা হাসিমুখে বিদায় দিয়ে গেলাম’। ওয়ামী বলেন, ‘প্রাণভিক্ষা চাওয়া প্রসঙ্গে বাবা বলেছেন, রাষ্ট্রপতি কে যে তার কাছে প্রাণভিক্ষা চাইব? প্রাণভিক্ষা দেয়ার মালিক আল্লাহ। আল্লাহর কাছেই প্রাণভিক্ষা চাইব।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার বাবার সঙ্গে শুক্রবার কোনো ম্যাজিস্ট্রেট দেখা করেননি। ম্যাজিস্ট্রেটদের দেখা করার কথা সম্পূর্ণ মিথ্যা। বাবা আমাদের এটি জানিয়েছেন। এছাড়া প্রাণভিক্ষার কথা বলে সরকার সময়ক্ষেপণের নাটক করেছে বলেও তার বাবা জানান। এ সময় কামারুজ্জামানের পরিবারের সদস্যদের কেউ কেউ উল্টো ভি চিহ্ন দেখান। আবার কারও চোখে পানিও দেখা যায়নি।
ফাঁসি কার্যকর উপলক্ষে কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকায় বিকাল থেকেই নিরাপত্তা বাড়তে থাকে। নিয়োগ করা হয় বিপুলসংখ্যক র‌্যাব, পুলিশ। লালবাগ জোনের উপপুলিশ কমিশনার ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ সন্ধ্যায় যুগান্তরকে জানান, ‘কেন্দ্রীয় কারাগারের আশপাশে ১৫ প্লাটুন পুলিশ সদস্য নিয়োগ করা হয়েছে।’ কোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সেখানে ১৮০ জনের মতো র‌্যাব সদস্য নিয়োজিত রয়েছে বলে জানায় র‌্যাব কর্তৃপক্ষ। রাত ৮টার দিকে র‌্যাবের একটি স্ক্যানার গাড়ি কারাগারের সামনে আসে। বোমা ও অস্ত্র চিহ্নিত করতে সক্ষম এ অত্যাধুনিক গাড়িটি কারাগারের চারপাশে ঘুরতে থাকে। কারাগারের পকেট গেটে বিকালে আর্চওয়ে বসানো হয়। এছাড়া সাদা পোশাকে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন ছিল। বাড়তে থাকে উৎসুক জনতার ভিড়।
কারাগারের প্রধান ফটকের সামনে লোহার বেরিকেড দিয়ে ঘিরে দেয়া হয়। এ বেরিকেড ঘিরে ছিল আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। রিভিউ খারিজের রায়ের কপি কারা কর্তৃপক্ষ হাতে পাওয়ার ৪ দিনের মাথায় কারা ফটকের সামনের চিত্রই বলে দিতে থাকে রাতেই তার ফাঁসি কার্যকর হবে। এরপর সন্ধ্যা ৬টা ৪৮ মিনিটের দিকে কারাগারের ভেতরে ঢোকেন আইজি প্রিজন ইফতেখার উদ্দিন। এরপরপরই এডিশনাল আইজি প্রিজন কবির হোসেন ও ডিআইজি (প্রিজন ঢাকা) গোলাম হায়দারও কারাগারে আসেন। জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক ফরমান আলী আগে থেকেই কারাগারের ভেতরে ছিলেন বলে জানা গেছে। রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে সশস্ত্র ১২ কারারক্ষী প্রবেশ করেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। নিয়ম অনুযায়ী রায় কার্যকরের সময় ওই ১২ কারারক্ষী ফাঁসির মঞ্চের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। মঞ্চের দুই পাশে পাঁচজন করে ১০ জন এবং সামনে দু’জন কারারক্ষী অস্ত্র তাক করে রাখেন।    
এর আগে সন্ধ্যার পর কারাগারের সামনের সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। কারাগারের চারদিকে তিন স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়। আশপাশের দোকানপাটও বন্ধ করে দেয়া হয়।  রাত ৯টার কিছুক্ষণ আগে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসেন ঢাকার জেলা প্রশাসক তোফাজ্জল হোসেন। অনেকটা সঙ্গে সঙ্গেই পৌঁছান ম্যাজিস্ট্রেট শহীদুল হক। এর আগেই রাত পৌনে ৯টার দিকে জয়েন্ট কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলাম, অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শেখ মারুফ হাসান, ডিসি-ডিবি (সাউথ) কৃষ্ণপদ রায় উপস্থিত হন। ডিবির বোমা ডিসপোজাল ইউনিটের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার সানোয়ার হোসেনও কারাগারে আসেন। কমিশনারের প্রতিনিধি হিসেবে ডিসি-ডিবি নর্থ শেখ নাজমুল আলম কারাগারে আসেন।
ফাঁসি কার্যকর করাকে কেন্দ্র করে কারাগার ও এর আশপাশের এলাকায় গণমাধ্যম কর্মীদের ভিড় লেগে যায়। জটলা বাঁধায় উৎসুক জনতাও।
কামারুজ্জামানকে শেরপুরের বাজিতখিলা গ্রামে তার প্রতিষ্ঠিত এতিমখানার পাশে দাফন করা হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে কামারুজ্জামানের স্ত্রী ও দুই ছেলেসহ পরিবারের কেউই যাননি। কামারুজ্জামানের বড় ছেলে হাসান ইকবাল ওয়ামী যুগান্তরকে এসব বলেছেন।
তিনি বলেছেন, বাজিতখিলা মুদিপাড়া এলাকায় এতিমখানার পশ্চিম পাশে তার আব্বাকে দাফন করা হয়।
শনিবার বিকালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কামারুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করার পর সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে বাসায় ফেরেন তার স্ত্রী ও মেয়ে। তার পরিবার মিরপুরের যে আবাসিক এলাকায় বসবাস করে, সে এলাকার নিরাপত্তাকর্মীরা বাসার সামনে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তবে সেখানে বাড়তি কোনো ভিড় দেখা যায়নি। চারপাশে শান্ত পরিবেশ বিরাজ করছিল। বাসাটি ভেতর থেকে তালা দেয়া ছিল।
৬ এপ্রিল কামারুজ্জামানের রিভিউ আবেদন খারিজের মধ্য দিয়ে বিচারের সমাপ্তি ঘটে। এরপর রিভিউ খারিজের রায়ের কপি ৮ এপ্রিল সন্ধ্যায় কারা কর্তৃপক্ষের হাতে পৌঁছায়। ওই দিনই রিভিউ খারিজ করে মৃত্যুদণ্ড বহালের রায় তাকে পড়ে শোনায় কারা কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি প্রাণভিক্ষার আবেদন করবেন কিনা জানতে চায়। কিন্তু কামারুজ্জামান পরদিন আইনজীবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সিদ্ধান্ত দেয়ার কথা জানান। ৯ এপ্রিল ৫ আইনজীবী তার সঙ্গে দেখা করেন। পরে আইনজীবীরা বের হয়ে কারা ফটকে গণমাধ্যমকে জানান, প্রাণভিক্ষার বিষয়ে কামারুজ্জামান ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেবেন।
এরপর চিন্তা করার জন্য সরকার তাকে প্রায় ৪ দিন সময় দিলেও অবশেষে প্রাণভিক্ষার আবেদন করেননি প্রায় ৬২ বছর বয়সী এ যুদ্ধাপরাধী।
এর আগে ২০১৩ সালের ৯ মে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনাল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে ফাঁসির আদেশ দিয়ে রায় দেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করেন তিনি। ২০১৪ সালের ৩ নভেম্বর বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে তার আপিল খারিজ করেন। তিন বিচারপতি শেরপুরের সোহাগপুর বিধবাপল্লীতে ১৪৪ জনকে হত্যা ও বহু নারীকে ধর্ষণের অভিযোগে তার মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। অপর একজন বিচারপতি এ অভিযোগে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেন।
১৮ ফেব্র“য়ারি আপিল বিভাগের রায়ের অনুলিপি প্রকাশিত হয়। রায়ের কপি হাতে পাওয়ার পর ৫ মার্চ রায়টি পুনর্বিবেচনার (রিভিউর) আবেদন জানান কামারুজ্জামান। এরপর ৫ এপ্রিল এই রিভিউ আবেদনে শুনানি গ্রহণ করে ৬ এপ্রিল তা খারিজ করে দেন সর্বোচ্চ আদালত।
মুক্তিযুদ্ধের প্রায় ৩৯ বছর পর ২০১০ সালের ফেব্র“য়ারিতে ট্রাইব্যুনাল গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু হয় মানবতাবিরোধী অপরাধের। নিজস্ব আইন ও দেশীয় ট্রাইব্যুনালে এরই মধ্যে ১৭টি মামলার বিচারে ১৮ জন আসামি বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডিত হয়েছেন। এসব আসামির মধ্যে দু’জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে পুরো জাতি।
এর আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলো যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জার্মান নাৎসি বাহিনীর বিচার করে নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে। ওই বিচারে অভিযুক্ত ২২ জনের মধ্যে ১২ জনের ফাঁসির দণ্ড ঘোষণা করা হয় ১৯৪৬ সালের ১ অক্টোবর। মাত্র ১৫ দিন পর ১০ যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর হয়। বাকি দু’জনের মধ্যে একজন ছিলেন পলাতক ও একজন ফাঁসি এড়াতে আত্মহত্যা করেন। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত কম্বোডিয়ায় ঘটে যাওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ১৯৯৭ সালে গঠিত হয় হাইব্রিড ট্রাইব্যুনাল। ওই ট্রাইব্যুনাল ২০১০ সালে রায় দেন, ২০১২ সালে সুপ্রিমকোর্ট তা চূড়ান্ত করেন।
আলবদর কমান্ডার থেকে শিবির সভাপতি : জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ১৯৫২ সালের ৪ জুলাই শেরপুর সদর উপজেলার বাজিতখিলায় জন্ম নেন। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের ময়মনসিংহ জেলার প্রধান। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর ২২ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা করতে জামালপুরের আশেক-মাহমুদ কলেজের ইসলামী ছাত্রসংঘের বাছাই করা নেতাকর্মীদের নিয়ে আলবদর বাহিনী গড়ে তোলেন তিনি। এ বাহিনী সে সময় ময়মনসিংহ, জামালপুর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর ও টাঙ্গাইলে ব্যাপক মাত্রায় যুদ্ধাপরাধ ঘটায়।
স্বাধীনতার পরের বছর ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন কামারুজ্জামান। ১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে মাস্টার্স পাস করার পর জিয়াউর রহমানের আমলে ১৯৭৮-৭৯ সালে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালের অক্টোবরে কামারুজ্জামান মূল দল জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন এবং ওই বছর ১৬ ডিসেম্বর রুকনের দায়িত্ব পান। ১৯৯২ সাল থেকে তিনি দলে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
আলবদর বাহিনীর সংগঠক : এ মামলায় ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুহাম্মদ কামারুজ্জামান বৃহত্তর ময়মনসিংহে আলবদর বাহিনীকে সংগঠিত করেন বলে যে তথ্যপ্রমাণ প্রসিকিউশন উপস্থাপন করেছে আসামির আইনজীবীরা তা খণ্ডাতে পারেনি। প্রসিকিউশন অভিযোগে বলেছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর পর পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা করতে বৃহত্তর ময়মনসিংহে যে আলবদর বাহিনী গড়ে তোলা হয়, কামারুজ্জামান ছিলেন তার ‘চিফ অর্গানাইজার’। এর পক্ষে প্রসিকিউটররা দৈনিক সংগ্রামের সে সময়ের একটি প্রতিবেদনও উপস্থাপন করেন, যে পত্রিকাটি জামায়াতের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত।
আর দল হিসেবে জামায়াতকেও যুদ্ধাপরাধে দায়ী করে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সে সময়ে দলটি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামীদের ‘সন্ত্রাসী ও গুপ্তচর’ আখ্যায়িত করে নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। আর এ কাজে তারা ব্যবহার করে নিজেদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্যদের নিয়ে গঠিত আলবদর এবং জামায়াতের কর্মীদের নিয়ে গঠিত রাজাকার বাহিনীকে। ‘দেখা যায়, জামায়াতে ইসলামী এসব মানবতাবিরোধী অপরাধের পরিকল্পনায় মূল ভূমিকা রাখে। আর আলবদর বাহিনী কাজ করে খুনে বাহিনী (ডেথ স্কোয়াড) হিসেবে।’
বিধবাপল্লীতে স্বস্তি : চার দশক পরে হলেও একাত্তরে খুন আর ধর্ষণের বিচারের রায় কার্যকর হওয়ায় স্বস্তি এসেছে শেরপুরের সোহাগপুর গ্রামে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কামারুজ্জামানের সেই পাশবিকতার শিকার হাফিজা বেওয়া (৬৫) তার স্বামী ইব্রাহিমকেও হারিয়েছেন সে সময়। তিনি  ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে এসে জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের যুদ্ধাপরাধের বিবরণ তুলে ধরেছিলেন। শনিবার রাতে কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর তিনি বলেন, ‘বেঁচে থাকতে বিচার দেখে গেলাম, সেজন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া।’ এছাড়াও শেরপুর সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার মোখলেছুর রহমান, ডেপুটি কমান্ডার আবুল কাশেম, মুক্তিযোদ্ধা প্রদীপ দে কৃষ্ণ, মুক্তিযোদ্ধা হযরত আলী, জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবু সালেহ নুরল ইসলাম হিরু, মুক্তিযোদ্ধা তালাপতুপ হোসেন মঞ্জু, মামলার সাক্ষী ও শহীদ স্বজন মোশাররফ হোসেন তালুকদার মানিক সন্তোষ প্রকাশ করে যুদ্ধাপরাধ মামলার বাকি রায়গুলো বাস্তবায়নের দাবি জানান।
এই যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির পর আইনশৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শেরপুর শহরে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। শহরের প্রতিটি প্রবেশমুখে নিরাপত্তা চৌকি বসানো হয়েছে। কামারুজ্জামানের বাড়ি বাজিতখিলা এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে বাড়তি পুলিশ। এছাড়া বিজিবি ও র‌্যাব সদস্যদেরও টহলে রাখা হয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান।
এর আগে ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর জামায়াতের অপর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হয়।  
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close