¦
বিএনপিকে আরও চাপে রাখার কৌশলে সরকার

হাবিবুর রহমান খান | প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৫

বিএনপিকে আরও চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে সরকার। দলটির নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, তিন মাসের টানা আন্দোলনে মামলা-হামলা গ্রেফতারসহ নানাভাবে তাদের চাপে রাখা হয়, যা এখনও অব্যাহত আছে। আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখন আবার ‘নতুন মোড়কে’ নানামুখী চাপ তৈরি করা হচ্ছে। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা যাতে নির্বাচনী প্রচারে মাঠে নামতে না পারেন ইতিমধ্যে সে কৌশলও নেয়া হয়েছে। ২০ দলীয় জোট সমর্থিত মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা জয়লাভ করলে সরকার বেকায়দায় পড়তে পারে, আওয়ামী লীগের জনসমর্থন নিয়েও প্রশ্ন দেখা দেবে- এরকম আশংকায় ক্ষমতাসীনরা বিরোধী জোটের ওপর এখন কৌশলগত চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতা যুগান্তরকে বলেন, তাদের বেশির ভাগ প্রার্থী এখনও প্রকাশ্যে ভালোভাবে প্রচার চালাতে পারছেন না। এ অবস্থায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নিজেই গণসংযোগে নামার কথা ভাবছেন। কিন্তু তিনিও যাতে গণসংযোগে নামতে না পারেন সেজন্য আগে থেকেই তার সম্পর্কে নানা কটূক্তি করা হচ্ছে। ওদিকে কাউকে অযথা হয়রানি বা গ্রেফতার করা হবে না- এই মর্মে নির্বাচন কমিশন, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে এমন আশ্বাস দেয়া হলেও বাস্তবে চিত্র উল্টো। তারা অভিযোগ করে বলেন, প্রার্থীদের আতঙ্কে রাখতে ব্যবহার করা হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। কোনো প্রার্থী এলাকায় প্রবেশ করলেই পুলিশ দিয়ে হয়রানি করানো হচ্ছে। মূলত প্রার্থী ও নেতাকর্মীদের মানসিকভাবে চাপে রাখার লক্ষ্যেই এসব পথ বেছে নেয়া হয়েছে। সবশেষ দলটির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে এই সময়ে ইন্টারপোলের রেড অ্যালার্ট জারির পেছনেও সরকারের হাত থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন তারা।
বিএনপির নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, তিন সিটিতে যে কোনোভাবে জয়ের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীনরা প্রমাণ করতে চান, জনগণ তাদের সঙ্গেই রয়েছে। এছাড়া গত তিন মাসের আন্দোলনে পেট্রলবোমা ও আগুনে পুড়িয়ে মারার দায় বিএনপি নেবে না বলে প্রথম থেকে জানিয়ে এলেও সরকার এ বিষয়টি এখন সামনে এনে বিএনপিকে কাবু করার চেষ্টা করছে। অবশ্য বিএনপি নেতারা দাবি করেন, হরতাল-অবরোধ চলাকালে যেসব ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে তার সঙ্গে বিএনপির কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বরং পর্দার আড়ালে থেকে কারা এমন ঘটনা ঘটিয়েছে তা সচেতন জনগণের অনেকে জানেন।
এদিকে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন মনিটরিং করার দায়িত্বে নিয়োজিত বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতা বুধবার যুগান্তরকে বলেন, সরকার যতই কৌশল আর অপপ্রচার করুক না কেন, শেষমেশ কোনো লাভ হবে না। জনগণ সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পারলে এবং তা যদি গণনা পর্যন্ত নিরাপদ থাকে, তবে তিন সিটির মেয়র পদে বিএনপি প্রার্থীরই জয় হবে। তাদের ধারণা, ভোটাররা ঠিকমতো ভোট দিতে পারলে রায় তাদের পক্ষেই আসবে। সরকারের নানা অন্যায়-অনিয়মের জবাব দিতে ভোটাররা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাই প্রকাশ্যে গণসংযোগ করতে না পারলেও নানা কারণে সৃষ্টি হওয়া সরকারবিরোধী বিপুলসংখ্যক ‘নীরব নেগেটিভ ভোট’ বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের ব্যালট পেপারে যুক্ত হবে। এমন প্রত্যাশা বাস্তবে প্রতিফলিত হলে আসন্ন তিন সিটি নির্বাচনে ‘নীরব’ ভোট বিপ্লবই সব চিত্র পাল্টে দেবে। মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও সরকারের বিরুদ্ধে জনগণ নীরব ভোট বিপ্লব ঘটাবে বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
তবে এসব অভিযোগ মানতে নারাজ আওয়ামী লীগ। জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম যুগান্তরকে বলেন, বিএনপির এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। তারা নানাভাবে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়। তিনি বলেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির নামে তারা নানা অমূলক অভিযোগ করছে। কিন্তু সবাই জানে বিএনপি প্রার্থীরা প্রচারণা চালাচ্ছেন। সরকারের দিক থেকে বিএনপির প্রার্থীদের কোনো চাপে রাখা হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন।
প্রচারণার কৌশল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা স্থানীয় নির্বাচন। প্রার্থী এবং স্থানভেদে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল হবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে সার্বিকভাবে বিএনপির সন্ত্রাস-দুর্নীতি, বোমাবাজি, জঙ্গিবাদ, খালেদা-তারেকের মামলা এবং বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে উন্নয়ন না হওয়াটাকে প্রার্থীরা তুলে ধরছেন- এটাই স্বাভাবিক।’
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ যুগান্তরকে বলেন, ‘বিএনপি ভোটের রাজনীতিতে বিশ্বাসী। এজন্যই আন্দোলনের অংশ হিসেবে তারা সিটি নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু বিএনপি নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্তের পর থেকেই সরকার নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। প্রার্থী হওয়ার পরও রাজনৈতিক মামলা দিয়ে হয়রানি ও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা প্রকাশ্যে গণসংযোগ করতে না পারায় ভোটের লড়াইয়ে অনেকটা পিছিয়ে পড়ছে। এ দায় অবশ্যই সরকারের ওপর বর্তাবে।’
তিনি বলেন, বিএনপি প্রার্থীরা কেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যেতে পারছেন না তা সবাই জানেন। ক্ষমতাসীনরা বিএনপি নেতাকর্মীদের নানামুখী চাপে রেখে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। কিন্তু জনগণ সুযোগ পেলে তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ হতে দেবে না। ২৮ তারিখের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নীরব ভোট বিপ্লব হতে পারে বলেও মনে করেন বিএনপির এই নীতিনির্ধারক।
এদিকে দলটির আরও কয়েকজন নীতিনির্ধারক মনে করেন, সরকার হয়তো ভেবেছিল আন্দোলনে থাকা বিএনপি সিটি নির্বাচনে অংশ নেবে না। এই সুযোগে ফাঁকা মাঠে গোল দেয়া যাবে। নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপির আন্দোলনও প্রশ্নের মধ্যে পড়বে। কিন্তু বিএনপি সিটি নির্বাচনে অংশ নেয়ার পরই সরকারের সেই কৌশলও ভেস্তে যায়। এরপর বিএনপিকে টেনে ধরতে শুরু করে ভিন্ন কৌশল। বিএনপি নেতাকর্মীদের মানসিকভাবে চাপে রাখতে নির্বাচনী প্রচারে নানাভাবে বাধা দেয়ার কৌশল প্রয়োগ অব্যাহত আছে। এসব কৌশল প্রয়োগে পুলিশ প্রশাসনের একটি অংশ প্রকাশ্যে সরকারদলীয় কর্মীর ভূমিকায় মাঠে অবতীর্ণ হয়েছে। সেই কৌশলের অংশ হিসেবে প্রার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে ভয়-ভীতি ও গ্রেফতার আতংক।
সূত্র জানায়, দল সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে গণসংযোগে নামতে পারেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনি প্রচারে নামলে জনগণের মধ্যে ব্যাপক সাড়াও পড়বে। অপরদিকে নির্বাচনী বিধি-বিধানের কারণে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা গণসংযোগ করতে পারবেন না। তাই নির্বাচনী প্রচারে বিএনপি যাতে বড় ধরনের এই সুযোগকে কাজে লাগাতে না পারে সেজন্য এখন অনেকটা মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছেন ক্ষমতাসীনরা। গণসংযোগে নামার আগেই তারা খালেদা জিয়াকে চাপে রাখতে চাইছেন। এ জন্য ইতিমধ্যে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী খালেদা জিয়াকে নিয়ে নানা কটূক্তিও করেছেন। খালেদা জিয়া গণসংযোগে নামলে এর পাল্টা জবাব দেয়ার কথাও ভাবছে তারা। এমনকি বিএনপি চেয়ারপারসনকে গণসংযোগে নামতে দেয়া হবে না- উসকানিমূলক এমন বক্তব্য জনগণের উদ্ধৃতি দিয়ে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। ভিন্ন কৌশলে বলা হয়েছে, চলমান আন্দোলনে পেট্রলবোমা ও আগুনে পুড়ে যেসব মানুষ হতাহত হয়েছেন তাদের স্বজনরা খালেদা জিয়াকে মাঠে নামতে দেবেন না।
দলটির নীতিনির্ধারকদের মতে, বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে যেসব রাজনৈতিক মামলা রয়েছে সেগুলো জামিন পাওয়ার যোগ্য। এসব মামলায় আগে অনেকেই জামিন পেয়েছেন। দক্ষিণে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মির্জা আব্বাস উচ্চ আদালতে জামিন পাবেন বলে নেতাকর্মীরা আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু বুধবার জামিন নিয়ে উচ্চ আদালত বিভক্ত রায় দেয়ার পর নেতাকর্মীরা মানসিকভাবে কিছুটা চাপ অনুভব করছেন। বিশেষ করে যেসব কাউন্সিলর প্রার্থী জামিন নেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তারা কিছুটা হলেও ধাক্কা খেয়েছেন। আবেদনের পর জামিন পাবেন এমনটা নিশ্চিত করে কেউ ধরে নিতে পারছেন না। শেষমেশ মির্জা আব্বাস জামিন না পেলে ভুক্তভোগী অনেকেই জামিন আবেদন করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে পারেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণের ৩৫ নং ওয়ার্ড বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী ইয়াকুব সরকার যুগান্তরকে বলেন, ‘সরকার নানাভাবে আমাদের চাপে রেখেছে। মামলার কারণে এলাকায় যেতে পারি না। নিজে প্রচার করতে না পেরে আত্মীয়-স্বজনকে দিয়ে প্রচারণা চালানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু তাদেরও ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রচার থেকে বিরত রাখা হচ্ছে। এভাবে চললে কিভাবে নির্বাচন করব?’
বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের অভিযোগ, সরকার তাদের চাপে রাখতে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করে এসব করাচ্ছে। অথচ নির্বাচন কমিশন এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বারবার বলে আসছেন প্রার্থীদের অযথা হয়রানি করা হবে না। তাদের এমন আশ্বাসে অনেকের ধারণা ছিল, মামলা থাকলেও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাদের গ্রেফতার বা হয়রানি করা হবে না। এমনটা আশা করে গত কয়েকদিনে রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকায় বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারে নামেন। কিন্তু বিধিবাম। সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের ধাওয়া করে। গ্রেফতার এড়াতে তাদেরকে এলাকা ছাড়তে হয়েছে। প্রার্থী ছাড়াও তাদের কর্মী ও সমর্থকদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।
এদিকে মঙ্গলবার বিকালে নয়াপল্টনে এক অনুষ্ঠান শেষে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া চলে যাওয়ার পর সেখান থেকেও বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন আচরণ নেতাকর্মীদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close