¦
মির্জা আব্বাসের আগাম জামিন প্রশ্নে বিভক্ত আদেশ

যুগান্তর রিপোর্ট | প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৫

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাসের দুটি মামলায় করা আগাম জামিন প্রশ্নে বিভক্ত আদেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ বুধবার এ আদেশ দেন।
আদালত বলেছেন, এখন নিয়ম অনুযায়ী আবেদন দুটি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হবে। তারপর প্রধান বিচারপতি আবেদন দুটি শুনানির জন্য তৃতীয় বেঞ্চ নির্ধারণ করে দেবেন। ওই তৃতীয় বেঞ্চ আবেদন দুটির ওপর শুনানি নিয়ে পরবর্তী আদেশ প্রদান করবেন। তৃতীয় বেঞ্চের আদেশই হবে চূড়ান্ত (ফাইনাল) আদেশ। ১৩ এপ্রিল হাইকোর্টে আত্মসমর্পণ করে তিনটি মামলায় আগাম জামিনের আবেদন করেন মির্জা আব্বাস। এর মধ্যে দুটি মামলা ছিল হরতাল-অবরোধে পল্টন ও মতিঝিল থানায় পুলিশ বাদী হয়ে দায়ের করা। অপরটি শাহবাগ থানার দুদক বাদী হয়ে করা। প্রথম দিনেই আদালত দুদকের মামলায় করা জামিন আবেদনটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দেন। দুদক সংক্রান্ত মামলার শুনানির এখতিয়ার সম্পন্ন বেঞ্চে ওই আবেদন নিয়ে যেতে বলেন। পরে বাকি দুটি আবেদনের ওপর শুনানি গ্রহণ শেষে বুধবার বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী তাকে তিন সপ্তাহের জামিন মঞ্জুর করেন। মেয়র প্রার্থী হিসেবে নির্বিঘেœ নির্বাচনী প্রচার চালানোর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তিনি এ জামিন দেন। তিন সপ্তাহ পরে তাকে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। অন্যদিকে বেঞ্চের কনিষ্ঠ
বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর তার আবেদন দুটি সরাসরি খারিজ করে দেন। তিনি বলেন, মামলা দুটি দায়েরের দীর্ঘ প্রায় চার মাস পর আত্মসমর্পণ করে আগাম জামিনের আবেদন করা হয়েছে। এছাড়া মামলা দায়েরের অনেক পরে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। তাই নির্বাচনী প্রচার চালানোর জন্যই এই জামিনের আবেদনের যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। এছাড়া একই ধরনের নাশকতার মামলায় এর আগে হাইকোর্ট আগাম জামিন দিলেও আপিল বিভাগ তা খারিজ করেছেন। তাই এ দুটি মামলায়ও আগাম জামিন আবেদন খারিজ করা হল।
এরপর বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর বলেন, ‘জাকারিয়া পিন্টুর মামলা অনুযায়ী কেউ আত্মসমর্পণ করলে তাকে হয় জামিন দিতে হয়, নইলে পুলিশ কাস্টডিতে পাঠাতে হয়। কিন্তু এটা করছি না। পরে এই বিচারপতি মির্জা আব্বাসকে পুলিশ কাস্টডিতে না পাঠিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে (অ্যাট ওয়ান্স) বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন।
বিভক্ত আদেশের পর মির্জা আব্বাসের পক্ষে আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আপনারা একজন জামিন দিলেন, অন্যজন আবেদন খারিজ করলেন। এখন নিয়ম অনুযায়ী আবেদন দুটি প্রধান বিচারপতির কাছে যাবে। তারপর তৃতীয় বেঞ্চ গঠন হবে। তৃতীয় বেঞ্চ আবেদন দুটির নিষ্পত্তি করবেন। এই যে প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার সময় পর্যন্ত পুলিশ যাতে তাকে গ্রেফতার না করে সেজন্য আদেশ চাচ্ছি।’ এ সময় একই আবেদন জানান মির্জা আব্বাসের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেনও।
এ সময় আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর বলেন, ‘১৩ এপ্রিল আত্মসমর্পণের পর থেকেই উনি আদালতের কাস্টডিতে রয়েছেন। এখন আপনাদের কাস্টডিতে রাখবেন। যেভাবে চলার উনি চলবেন। পরে আইনজীবীরা বলেন, ‘এ অবস্থায় আমরা তাকে আমাদের কাস্টডিতে নিতে পারি না।’ বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র এ সময় বলেন, ১৩ তারিখে যে আদেশ দিয়েছিলাম। তাকে বাসায় পাঠিয়েছিলাম, মানেই তাকে কাস্টডিতে পাঠিয়েছিলাম। কাস্টডিতে থাকলে আসামির যতটুকু সীমাবদ্ধতা তার ক্ষেত্রেও ততটুকু থাকবে।’ এ সময় মির্জা আব্বাসের পক্ষে তার আইনজীবী বলেন, ১৩ এপ্রিলের আদেশের প্রেক্ষাপট আর এখনকার প্রেক্ষাপট এক নয়। এরপর রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, সাধারণ নিয়ম হচ্ছে, এখন আবেদন দুটি প্রধান বিচারপতির কাছে যাবে। এর মধ্যে অন্য কোনো আদেশ দেয়ার প্রয়োজন নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মির্জা আব্বাসকে গ্রেফতার করার চেষ্টা করলে তারা আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালতে যেতে পারবেন।’ পরে আদালত আর কোনো আদেশ দেননি।
এদিকে দুদকের মামলায় করা আবেদনটিও প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানোর আবেদন জানান মির্জা আব্বাসের অপর আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। তিনি বলেন, যে কোর্টে নিয়ে যেতে বলেছেন ওই কোর্টের ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৮ ধারায় করা আবেদনের শুনানির এখতিয়ার নেই। এই কোর্টেরই এই আবেদনের শুনানির এখতিয়ার রয়েছে। দুদক সংক্রান্ত মামলায় করা জামিন আবেদন শুনতে পারবেন না, এটা কোথাও বলা হয়নি।’
এ সময় আদালত বলেন, ‘আজ (বুধবার) ভুল করে দুদকের মামলায় করা আবেদনটি লিস্টে চলে এসেছে। আমরা সেদিনেই ফাইল পাঠিয়ে দিয়েছি। এখন আর সম্ভব নয়।’
আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম তার কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘২০১৩ ও ১৪ সালে ঢাকা শহরে যেসব গড়ি পোড়ানো হয়েছে এবং লোকজন মারা গেছে- এসব ব্যাপারে চারটি মামলা হয়েছিল। সবগুলো মামলাতেই মির্জা আব্বাস আসামি ছিলেন। এসব মামলায় যখন হাইকোর্ট আগাম জামিন দিয়েছিল তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে যায়। আপিল বিভাগ চারটিতেই জামিন বাতিল করে দেন। এরপর যখন গত ডিসেম্বরে একটি মামলা হল এবং জানুয়ারিতে একটি মামলা হল- এ দুটি মামলায় ১৩ এপ্রিল আত্মসমর্পণ করে আগাম জামিন চেয়েছেন।’
রাষ্ট্রের প্রধান এই আইন কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘প্রথম দিন শুনানি শেষ না হওয়ায় দু’জন বিচারপতি একমত হয়ে একটি আদেশ দিয়েছিলেন, উনি উনার বাড়িতে থাকবেন। পুলিশও উনাকে গ্রেফতার করবে না। উনিও কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করবেন না। এই সিদ্ধান্তটা ছিল ঐকমত্যের সিদ্ধান্ত। আর আজকে দু’রকম আদেশ হওয়ায় আদালতে আত্মসমর্পণের আগে উনার যে রকম অবস্থান ছিল, আজকেও আবার সেই একই অবস্থানে চলে গেছেন। দু’জন বিচারপতি ঐকমত্য হয়ে যে আদেশ দিয়েছিলেন সে আদেশও এখন বলবৎ থাকবে বলে আমি মনে করি না।’
আত্মসমর্পণের আগের অবস্থা কি ছিল জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘তখন পলাতক ছিলেন।’ এখন মির্জা আব্বাস পলাতক কিনা এ ব্যাপারে আবারও প্রশ্ন করা হলে অ্যাটর্নি জেনারেল স্পষ্ট কোনো জবাব না দিয়ে বলেন,‘ দু’জন বিচারপতি দ্বিমত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আত্মসমর্পণের আগে যে অবস্থা উনার ছিল, সেই অবস্থায় চলে গেছেন।’ তাহলে এখন পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে পারবে কিনা প্রশ্ন করা হলে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘এই প্রশ্নের জবাব আমি সরাসরি দেব না।’ তিনি বলেন, ‘এটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিষয়। তারা গ্রেফতারের বিষয়ে যা বিবেচনা তাই করবেন।’
দুদকের মামলায় মির্জা আব্বাসকে গ্রেফতার করতে পারবে কিনা জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল জোরেশোরে বলেন, ‘দুদকের মামলায় অবশ্যই গ্রেফতার করতে পারবেন।’
এদিকে মির্জা আব্বাসের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘উনার বিরুদ্ধে বহু মামলা হয়েছে। সবই রাজনৈতিক মামলা। এসব মামলার হিসাব রাখার জন্য একজন লোক নিয়োগ দেয়া দরকার। এর আগে যেসব মামলা হয়েছে, যেগুলো জানতে পেরেছি, সবগুলোতে হাজির হয়েছেন এবং জামিন নিয়েছেন। কিন্তু এই তিনটি মামলা সম্পর্কে জানা ছিল না। উনার মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় যে মুহূর্তে উনি জানতে পারলেন, তখন জামিনের দরখাস্ত করলাম। একটি মাত্র বিষয় নির্বাচনের দুটি সপ্তাহ বাকি আছে, এ দুটি সপ্তাহ যাতে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারেন, ভোটারদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলতে পারেন। আমাদের এই সুযোগটুকু দেন। তারপর যা হওয়ার হবে।’
তিনি বলেন, ‘দুটি আবেদনের ওপর বিভক্তি আদেশ হল। আমার পেশাগত জীবনে এই প্রথম দেখলাম আগাম জামিনের ক্ষেত্রে বিভক্ত আদেশ হয়। এখন তৃতীয় বেঞ্চে সিদ্ধান্ত হবে। আরেকটি আবেদন ছিল দুদকের মামলায়। কিন্তু আদালত বললেন, এ সংক্রান্ত বেঞ্চ আছে সেখানে যান, আমরা শুনব না। শুনতে না পারলে লিখে দিতে বলা হলেও তাতেও রাজি হলেন না।
এ অবস্থায় আমরা প্রধান বিচারপতির কাছে গিয়েছিলাম। প্রধান বিচারপতিকে দেখালাম, ৪৯৮ শুনানির এখতিয়ার ওই বেঞ্চের আছে। ওই বেঞ্চেই এই আবেদনটিও শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতির কাছে লিখিত আবেদন দিয়েছি। প্রধান বিচারপতি বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন। এর অর্থ দুদকের মামলায় করা আবেদনটি এখনও মুলতবি রয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি যে নির্দেশ দেবেন, সে অনুযায়ী এটির শুনানি হবে।’
খন্দকার মাহবুব বলেন, ‘এ পর্যায়ে আইনের বিধান মোতাবেক ও প্রথা অনুযায়ী এই আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেন না। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, উনি নাকি পলাতক। কিন্তু অ্যাটর্নি জেনারেল মনে হয় পলাতক শব্দটা নতুন শুনেছেন। নতুবা পলাতক কারা-ওয়ারেন্ট হয়েছে। পুলিশ এসে রিপোর্ট দিল আসামিকে পাওয়া যাচ্ছে না। তখন নোটিশ দেয়া হবে, তারপরও হাজির না হলে আদালত অনুপস্থিত দেখিয়ে বিচার শুরু করবে, তখন হবে পলাতক। মির্জা আব্বাস সাহেব হাইকোর্টে এসে আত্মসমর্পণ করেছেন, উনি কিভাবে পলাতক হন। আমরা দুঃখিত যে, রাষ্ট্রের প্রধান কর্মকর্তা হয়ে ‘পলাতক’ শব্দটা আইনবহির্ভূত উনি ব্যবহার করেছেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সর্বোচ্চ আদালতে তার দরখাস্ত বিচারাধীন রয়েছে। এ অবস্থায় তাকে পুলিশ হয়রানি করলে তা আইনের চরম বরখেলাপ ও সর্বোচ্চ আদালতের প্রতি অসম্মান দেখানো হবে। আমরা বিশ্বাস করি সরকার বারবার বলেছে, নির্বাচনে সবাইকে সমান সুযোগ দেয়া হবে। তাকে গ্রেফতারের অর্থ হবে সরকারি দলকে সুযোগ করে দেয়া, যাতে উনি ভোটারদের কাছে না যেতে পারেন। তবে আমি জোরের সঙ্গে বলছি, মির্জা আব্বাস গ্রেফতার হলে তার বিজয় সুনিশ্চিত।
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close