¦
ব্যাংকের তহবিল পরিচালন ব্যয় আকাশচুম্বী

দেলোয়ার হুসেন ও মনির হোসেন | প্রকাশ : ০৯ মে ২০১৫

তহবিল পরিচালনায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করছে না। বিলাসী খরচ, অপচয়, দুর্নীতির কারণে বেড়ে যাচ্ছে পরিচালন ব্যয়। এসব কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তহবিল পরিচালন ব্যয় বা কস্ট অব ফান্ড বেড়ে আকাশচুম্বী হয়েছে। ফলে একদিকে কমানো যাচ্ছে না ঋণের সুদের হার, অন্যদিকে আমানতকারীরাও বাড়তি মুনাফা থেকে বঞ্ছিত হচ্ছে। পরিচালন ব্যয় বেশি হওয়ায় ঋণের বিপরীতে চড়া সুদ ও গ্রাহকদের কাছ থেকে মাত্রাতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ নিয়েও শেয়ারহোল্ডারদের আকর্ষণীয় মুনাফা দিতে পারছে না।
এদিকে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিবেশ তৈরির জন্য ঋণের সুদের হার কমানোর ক্ষেত্রে তহবিল পরিচালন ব্যয় কমানো একটি উল্লেযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করেন দেশের শীর্ষ স্থানীয় অর্থনীতিবিদরা। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এ বিষয়টি সরাসরি তদারকি করা হয় না। ফলে বাড়তি মুনাফার আশায় ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় লাগামহীনভাবে বেড়েই চলেছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ড. খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংকিং খাতে দুর্বৃত্তায়ন চলছে। ফলে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় হাজার হাজার কোটি টাকা আটকে যাচ্ছে। এর বিপরীতে প্রভিশর করতে গিয়ে ব্যাংকের খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এ দুর্বৃত্তরা সরকারের ওপর প্রচণ্ড প্রভাব বিস্তার করে আছে। ফলে এদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন। বিশেষ করে সরকারি ব্যাংকের পর্ষদে অসৎ লোকজনে ভরপুর। দু-একজন সৎ থাকলেও তাদের বের করে দেয়া হচ্ছে। যে কারণে হলমার্কের মতো ঘটনা ঘটছে, বিসমিল্লাহ গ্রুপ এবং বেসিক লুটের মতো ডাকাতি হচ্ছে ব্যাংকিং খাতে। এ ধরনের ঘটনার শাস্তি না হওয়ায় ডাকাতরা আরও উৎসাহিত হচ্ছে। ব্যাংকে ডাকাতি দূর করতে হলে সবার আগে সরকারের সদিচ্ছা থাকতে হবে। এছাড়া সরকারি ব্যাংকের ব্যাপারে বাংলাদেশকে আরও ক্ষমতা দিতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সৎ হতে হবে। তাহলে ব্যাংকে ডাকাতি বন্ধ হবে। আর এটি হলেই ব্যাংকিং খাতে শৃংখলা ফিরে আসবে।
সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ ও আমানতের সুদ হারের ব্যবধান বা স্প্রেড তদারকি করা হয়। এ ব্যবধান কোনোক্রমেই ৫ শতাংশের বেশি হবে না। এই ৫ শতাংশের মধ্য থেকেই ব্যাংকগুলোকে ব্যয় নির্বাহ ও মুনাফা করতে হবে। এ হিসাবে আমানতের সুদের গড় হারের সঙ্গে ১ থেকে দেড় শতাংশ যোগ করেই পাওয়া যায় তহবিল পরিচালন ব্যয়। গত ডিসেম্বরে ব্যাংকগুলোতে আমানতের গড় সুদের হার ছিল ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ। ১ বা দেড় শতাংশ প্রশাসনিক খাতে খরচ হলে তহবিল ব্যয় হতো ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ বা ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ। বাস্তবে ব্যাংকগুলোর তহবিল পরিচালন ব্যয় গড়ে ১০ শতাংশের ঘরে। এর কারণ হিসেবে অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, ব্যাংকগুলোর মাত্রাতিরিক্ত জাল-জালিয়াতি ও খেলাপি ঋণের কারণে তহবিল ব্যয় বাড়ছে।
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক ম. মাহফুজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ঋণ ও আমানতের সুদের হারের ব্যবধান কমানোর মাধ্যমেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ইতিমধ্যে সুদের হার কমতে শুরু করেছে। অপচয় বা খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকের কস্ট অব ফান্ড বাড়ার প্রবণতা বন্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তদন্ত করছে এবং ব্যবস্থা নিচ্ছে।
জানা গেছে, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে আমানতের গড় সুদের হার সাড়ে ৫ থেকে ৬ শতাংশে নেমে এসেছিল। ওই সময়ে ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যয়ও ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে ছিল। কিন্তু ২০১১-১২ থেকেই আমানতের সুদের হার বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বাড়তে থাকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। ফলে গত কয়েক বছরে তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয়ও বেড়েছে মাত্রাতিরিক্ত হারে।
বেসরকারি খাতের এনসিসি ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় ২০০৯ সালে ছিল ৯ দশমিক ৩১ শতাংশ, ২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১ দশমিক ৪৬ শতাংশ। ২০১২ সালে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ০৫ শতাংশে। ২০১৩ সালে তা ছিল ১১ দশমিক ৬১ শতাংশ। একই সময়ে অন্যান্য ব্যাংকেরও তহবিল ব্যয় বেড়েছে। তবে ২০১৩ সালের তুলনায় ২০১৪ সালে এসে তা কমতে শুরু করেছে।
জনতা ব্যাংকের আমানতের গড় সুদের হার ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ। তাদের ঋণ ও আমানতের সুদের হারের ব্যবধান বা স্প্রেড ৫ শতাংশের নিচে। তারপরও তাদের তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় ৯ দশমিক ২৩ শতাংশ।
গত বছর অগ্রণী ব্যাংকের কস্ট অব ফান্ড ছিল ১১ দশমিক ১ শতাংশ। এর আগের বছর ছিল ১১ দশমিক ৩৭ শতাংশ। বর্তমানে তা কিছুটা কমে ১০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।
ব্যাংকাররা জানান, আমানতের সুদের হার কমার কারণে এ ব্যয় কমছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, তহবিল ব্যবস্থাপনার বড় অংশই ব্যয় হয় আমানতের মুনাফার বিপরীতে। আমানতের গড় সুদের হারের সঙ্গে বাড়তি ১ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে বেতন-ভাতা খাতে। এর মধ্যে আমানত খাতে অর্ধেক এবং বাকি অর্ধেক ঋণের খাতে ব্যয় হচ্ছে। কেননা একজন কর্মকর্তা আমানতের সঙ্গে ঋণের বিষয়টি দেখাশোনা করেন বা কাজ ভাগাভাগি করেন।
কিন্তু ব্যাংকগুলো এ নিয়ম মানছে না। তারা আমানতের সুদের হারের চেয়ে আরও ২ থেকে ৩ শতাংশ বেশি খরচ করছে তহবিল ব্যবস্থাপনা খাতে। এ খাতে ব্যয় বেশি হওয়ায় কমছে না ঋণের সুদের হার।
এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের এমডি সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, কস্ট অব ফান্ড কমাতে হলে সবার আগে আমানতে সুদের হার কমাতে হবে। বতর্মানে আমরা আমানত নেয়া বন্ধ করেছি। ব্যাংকিংয়ে নেট প্রেজেন্ট ভ্যালু বলতে একটি টার্ম আছে। এর অর্থ হল আজকের ১০০ টাকা আর ১০ বছর পরের ১০০ টাকা এক নয়। মূল্যস্ফীতির কারণে এর মান উঠানামা করে। যে কারণে ইচ্ছে করলেও সুদের হার কমানো সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, সরকারি ব্যাংকগুলোর আমানতে ৬০ শতাংশই সরকারি খাতের। এর আগে আমরা কম খরচে সরকারি আমানত পেতাম। ২০০৮-০৯ সালের পর থেকে তা আর পাওয়া যাচ্ছে না।
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, কস্ট অব ফান্ড কমানোর কাজ চলছে। এটি চলমান প্রক্রিয়া। তবে বিষয়টি একদিনে সম্ভব নয়। কারণ এর সঙ্গে কস্ট অব ডিপোজিটসহ আরও অনেক বিষয় জড়িত। তবে আমাদের চেষ্টার কমতি নেই।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, ব্যাংকগুলোর মৌলিক সূচকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তদারকি করা হয়। এখন যদি ওইসব সূচকে বাস্তব অবস্থা পরিলক্ষিত না হয়, তবে অন্যান্য সূচকও তদারকির আওতায় আনা হবে। এর মধ্যে রয়েছে তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয়, আমানত সংগ্রহে ব্যয়, ঋণের গড় সুদের হার।
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কয়েকটি ব্যাংক ঋণের যে সুদের হার উল্লেখ করছে তা সঠিক হচ্ছে না। কিছু খাতে সুদের হার কম দেখাচ্ছে। ফলে তাদের ঋণের গড় সুদ কমে যাচ্ছে। কিন্তু ওইসব খাতে কোনো ঋণ বিতরণ করছে না।
একই সঙ্গে আমানতের যে গড় সুদের হার দেখানো হচ্ছে তাও যথাযথ নয়। কেননা চলতি হিসাবে ব্যাংকগুলো কোনো সুদ দিচ্ছে না। সঞ্চয়ী হিসাবেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সুদ দেয়া হচ্ছে না। তারপরও সুদের হার এত বেশি হওয়ার কথা নয়। এ ধরনের ফাঁকি বন্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পদক্ষেপ নিচ্ছে।
প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close