¦
স্বামীর খোঁজে দ্বারে দ্বারে হাসিনা আহমেদ

মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নু | প্রকাশ : ১০ মে ২০১৫

এখনও ঘুমের মধ্যে বাবাকে স্বপ্ন দেখে ডুকরে কেঁদে ওঠে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদের ছোট মেয়ে ফারিবা আহমেদ রাইবা। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে ভাবে, সকালে উঠেই হয়তো প্রাণপ্রিয় বাবাকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারবে। কিন্তু সে আশা পূরণ না হওয়ায় দিনভর মন খারাপ করে থাকে। গুলশানের একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল থেকে এ বছর ও-লেভেল পরীক্ষা দিচ্ছে রাইবা। আর ছোট ছেলে ইউসুফ আহমেদের দিন শুরু হয় বাবার পরিধেয় কাপড় আর ব্যবহার্য জিনিসপত্র নেড়েচেড়ে। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই ছোট্ট লাইব্রেরিতে গিয়ে বাবার চশমা, ঘড়ি আর বই নিয়ে মন খারাপ করে বসে থাকে নবম শ্রেণীর ছাত্র ইউসুফ। ছোট এ দুই সন্তানকে নিয়ে স্বামী সালাহ উদ্দিন আহমেদের জন্য অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হচ্ছে না হাসিনা আহমেদের। লেখাপড়ার জন্য বর্তমানে সালাহ উদ্দিন আহমেদ ও হাসিনা আহমেদ দম্পতির বড় ছেলে ইব্রাহিম আহমেদ কানাডা এবং মেয়ে ফার্মিচ আহমেদ মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদ নিখোঁজের দুই মাস পূর্ণ হচ্ছে আজ। এই দুই মাসের প্রতিটি মুহূর্ত স্বামী ফিরে আসার অপেক্ষায় থেকেছেন বিএনপিদলীয় সাবেক সংসদ সদস্য হাসিনা আহমেদ। গত দুই মাস প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন স্বামীর সন্ধানের জন্য। কিন্তু আশ্বাস ছাড়া তারা আর কিছুই দিতে পারেননি। স্বামীর সন্ধান দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি চেয়ে না পাওয়ায় হতাশ হয়ে এক প্রকার নিজ বাসায় বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন হাসিনা আহমেদ।
শুক্রবার দুপুরে গুলশান-২ নম্বর সার্কেলের ৭২ নম্বর রোডের ফ্ল্যাটে যুগান্তরের সঙ্গে কথা বলেন বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী সাবেক সংসদ সদস্য হাসিনা আহমেদ। আলাপচারিতায় তিনি বলেন, স্বামীর সন্ধান দাবিতে ঘুরতে ঘুরতে তিনি এখন ক্লান্ত। হাসিনা আহমেদ বলেন, ‘আগে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে গেলে তারা কথা বলতেন। তারা সালাহ উদ্দিন আহমেদকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন, এমন কথা বলতেন। কিন্তু এখন তারা আর এ ব্যাপারে কিছুই বলতে চান না।’ সবকিছু মিলিয়ে তিনি আল্লাহর ওপর ভরসা করা ছাড়া আর কোনো পথ দেখছেন না।
স্বামীর সন্ধানে নিজ দল বিএনপির ভূমিকায় সন্তুষ্ট কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে হাসিনা আহমেদ বলেন, যেখানে সালাহ উদ্দিন আহমেদের মতো একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে সরকার খুঁজে দিতে পারে না তখন একটি দলের পক্ষে কতটুকু করা সম্ভব? সালাহ উদ্দিন আহমেদ আইনশৃংখলা বাহিনীর হেফাজতেই আছে বলে আবারও দাবি করেন বিএনপির সাবেক এ সংসদ সদস্য।
শুক্রবার দুপুরে যুগান্তরের সঙ্গে আলাপচারিতায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে হাসিনা আহমেদ বলেন, স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর তার সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। চার সন্তানকে নিয়ে তিনি আর্থিক কষ্টে পড়েছেন। সংসদ সদস্য থাকাকালীন সময়ে সম্মানীর টাকাগুলো এতদিন ব্যাংকে গচ্ছিত ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ওই টাকা তুলে এখন সন্তানদের লেখাপড়া ও অন্যান্য খরচ মেটাচ্ছেন।
হাসিনা আহমেদ বলেন. আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে সালাহ উদ্দিন আহমেদকে তুলে নিয়ে যাওয়ার তিন দিন আগে তাদের দুই গাড়িচালক খোকন ও শফিক এবং ব্যক্তিগত সহকারী ওসমানকে আটক করে পুলিশ। পরে তাদের গুলশান ও বাড্ডা থানার দুটি বিস্ফোরক আইনের মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। ওই তিনটি পরিবারের ভরণ-পোষণও এখন তাকে বহন করতে হচ্ছে।
হাসিনা আহমেদ জানান, বাবাকে না পেয়ে ছেলে-মেয়েরা সারাক্ষণ মন খারাপ করে থাকে। ঠিকমতো স্কুলেও যেতে চায় না। বাবা নিখোঁজ হওয়ার পর প্রস্তুতি ভালো না হওয়ায় ছোট মেয়ে ফারিবা আহমেদ রাইদা এ বছর ও-লেভেল পরীক্ষা দিতে চাইছিল না। তাকে অনেক বুঝিয়ে রাজি করানো হয়েছে। বড় দুই সন্তান লেখাপড়ার জন্য দেশের বাইরে থাকলেও সব সময় ফোন করে কান্নাকাটি করে। আত্মীয়-স্বজনরাও যোগাযোগ রাখতে ভয় পায় বলে জানান হাসিনা আহমেদ।
১০ মার্চ গভীর রাতে উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরের ১৩/বি নম্বর সড়কে ৪৯/বি নম্বর বাড়ির ২/বি নম্বর ফ্ল্যাট থেকে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে তুলে নেয়া হয় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদকে। নিখোঁজ হওয়ার আগ পর্যন্ত দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থেকে দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করে আসছিলেন বিএনপির এ নেতা। ওই ফ্ল্যাটটির মালিক ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকের ডিএমডি হাবিব হাসনাত দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আমেরিকায় বসবাস করছেন। হাবিব হাসনাত বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিন আহমেদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়।
এদিকে ঘটনার রাতে ওই বাসা থেকে মামুন নামে আরও এক ব্যক্তি রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন বলে জানিয়েছেন বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ। মামুন ওই ফ্ল্যাটের কেয়ারটেকার ছিলেন। ঘটনার পর থেকে তারও কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। পুলিশি হয়রানির ভয়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন গৃহকর্মী ফাতেমা, কেয়ারটেকার আশরাফ ছাড়াও দু’জন নিরাপত্তাকর্মী।
অজ্ঞাত স্থান থেকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই বাড়ির একজন নিরাপত্তাকর্মী বৃহস্পতিবার বিকালে টেলিফোনে যুগান্তরকে জানান, সালাহ উদ্দিন আহমেদকে তুলে নেয়ার সময় আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে গেট খোলার নির্দেশ দেয়া হয়। গেট খুলতে দেরি হওয়ায় তাকে চড়থাপ্পড় মেরে নিচতলার ছোট একটি কক্ষে আটকে রাখে সাদা পোশাকে ৭-৮ জন অস্ত্রধারী ব্যক্তি। এরপর তারা দ্বিতীয় তলায় গিয়ে সালাহ উদ্দিনকে গামছা দিয়ে চোখ বেঁধে নিচে নিয়ে আসে। ওই সময় সালাহ উদ্দিন আহমেদ লুঙ্গি পরা অবস্থায় ছিলেন বলে জানান ওই নিরাপত্তাকর্মী। পরে তারা সাদা মাইক্রোবাসে করে ১১ নম্বর রোডের দিকে চলে যায়।
উত্তরার যে ফ্ল্যাট থেকে বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিন আহমেদকে তুলে নেয়া হয় ওই বাসার গৃহকর্মী ফাতেমা বেগম টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেছেন, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কয়েক দফায় তার কাছে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছে। পরিবারের সদস্যদের পরামর্শে পুলিশি হয়রানির ভয়ে তিনি এখন ঢাকা ছেড়ে দিয়েছেন। তবে তিনি ওই রাতের ঘটনা নিয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তিনি শুধু বলেন, ‘আপনাদের সঙ্গে কথা বললে আমার ক্ষতি হবে।’
উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টর কল্যাণ সমিতির নিরাপত্তারক্ষী মনসুর আহমেদ জানান, ১৩/বি নম্বর রোডের মাথায় তাদের প্রধান অফিস। এছাড়া প্রতিটি প্রবেশপথে তাদের চেকপোস্ট রয়েছে। রাতের বেলায় এসব চেকপোস্টে গেট দেয়া থাকে। তিনি জানান, আবাসিক এলাকা হওয়ায় রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় লোকজনের আনাগোনা কমে যায়। তিনি জানান, ঘটনার রাতে ১১ নম্বর রোডের মাথায় চেকপোস্টে একটি সাদা মাইক্রোবাস ও একটি কালো পিকআপ এসে থামে। মাইক্রোবাস থেকে ছয়-সাতজন ব্যক্তি নেমে নিজেদের আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দেয়। এরপর গেট খুলে দিলে তারা ১৩/বি নম্বর রোডের ৪৯ নম্বর বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। এর পর তারা ওই বাড়ির এক ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে চলে যায়।
এদিকে এ ঘটনার খবর পেয়ে পরদিন থানা, গোয়েন্দা পুলিশ ও র‌্যাবের কাছে ছুটে যান বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ। কিন্তু আইনশৃংখলা বাহিনীর কোনো সংস্থা সালাহ উদ্দিন আহমেদকে আটকের বিষয়টি স্বীকার করেনি। স্বামীর সন্ধান না পেয়ে তিনি তিনি প্রথমে উত্তরা ও পরে গুলশান থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে যান। কিন্তু পুলিশ তাকে ফিরিয়ে দেয়। এ অবস্থায় ১২ মার্চ সালাহ উদ্দিন আহমেদকে আদালতে হাজিরের নির্দেশনা চেয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯১ ধারায় হাইকোর্টে একটি আবেদন করেন তার স্ত্রী সাবেক সংসদ সদস্য হাসিনা আহমেদ। এ পরিপ্রেক্ষিতে ১৫ মার্চ সালাহ উদ্দিন আহমেদকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করার নির্দেশনা কেন দেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে একটি রুল জারি করা হয়। ওই রুলের পর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে একজন যুগ্ম কমিশনারের নেতৃত্বে ‘সার্চ কমিটি’ গঠন করা হয়। পরবর্তী ধার্য তারিখে ওই কমিটি আদালতে রিপোর্ট দাখিল করে জানায়, আইনশৃংখলা বাহিনীর কোনো সংস্থা বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিনকে আটক করেনি।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও বিশেষ শাখার প্রতিবেদনেও বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিন আহমেদকে আটকের বিষয়টি অস্বীকার করে বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী এবং বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের হাইকোর্ট বেঞ্চে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।
২০ এপ্রিল সালাহ উদ্দিন আহমেদকে হাজির করার নির্দেশনা চেয়ে স্ত্রী হাসিনা আহমেদের ফৌজদারি আবেদনের নিষ্পত্তি করেন বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের বেঞ্চ। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদকে খুঁজে বের করতে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অনুসন্ধান কার্যক্রম অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে আগামী ছয় মাস বা সালাহ উদ্দিন আহমেদ উদ্ধার হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতি মাসের এক তারিখে স্বরাষ্ট্র্র মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে এ অনুসন্ধানের অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়।
এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, যেহেতু উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশ কাজ করছে তাই এ বিষয়ে মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলা সমুচীন হবে না।
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close