¦
সাড়ে ৫ হাজার কোটি ডলার

মামুন আব্দুল্লাহ | প্রকাশ : ১০ ডিসেম্বর ২০১৫

দশ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে ৪ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা (৫ হাজার ৫৮৭ কোটি ডলার), যা দেশের বর্তমান মোট জাতীয় বাজেটের দেড়গুণ। প্রতি বছর গড়ে পাচার হয়েছে ৪৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। বছর বছর বাড়ছে পাচারের এই হার। এর মধ্যে শুধু ২০১৩ সালে পাচারের পরিমাণ ৭৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, যা তার আগের বছরের চেয়ে ৩৪ শতাংশ বেশি। অর্থ পাচারের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। বিশ্বের মধ্যে এ অবস্থান ২৬তম।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ১৪৯টি দেশের অর্থ পাচারের তথ্য রয়েছে। প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৩ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে। টাকার অংকে যা ৮৮ লাখ কোটি। আর ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে পাচার হয়েছে ৭ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশগুলোর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪ শতাংশ।
জিএফআই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রতি বছর গড়ে ৫৫৮ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ বাংলাদেশ থেকে পাচার হচ্ছে। ২০১০ সালে ৫৪০ কোটি ডলার পাচার হয়েছিল। তিন বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৬৬ কোটি ডলার। দশ বছরের মোট হিসাবে যার পরিমাণ ৫ হাজার ৫৮৭ কোটি ডলার।
জিএফআই এবার অর্থ পাচারের হিসাবে কিছুটা পরিবর্তন এনেছে, যার ফলে পাচারের পরিমাণ সব দেশের ক্ষেত্রেই বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাতে আরও বলা হয়েছে, পণ্য বা সেবা আমদানিতে ওভার ইনভয়েসিং এবং রফতানিতে আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে উল্লিখিত দেশগুলো থেকে অর্থ পাচার হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বুধবার যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি গভীর উদ্বেগজনক। এর আগে সংস্থাটি যে হিসাব দিয়েছে প্রকৃতপক্ষে তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে। এবার হিসাবের পদ্ধতিতে পরিবর্তনের সুবাদে সেটা স্পষ্ট হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের কারণ মূলত তিনটি। এর মধ্যে প্রধান হচ্ছে দুর্নীতি। দুর্নীতি বেড়েছে বলে অর্থপাচারও বেড়েছে। এছাড়া দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণেও অর্থ পাচার বাড়ছে। তার মতে, অর্থ পাচার রোধ করতে হলে দুর্নীতি কমিয়ে আনার বিকল্প নেই। পাশাপাশি বিনিয়োগের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। নাগরিক জীবনেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
জিএফআই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে ২০০৪ সালে ৩৩৪ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ পাচার হয়। ক্রমেই তার হার বেড়েছে। ২০০৫ সালে ৪২৬ কোটি, ২০০৬ সালে ৩৩৭ কোটি, পরের বছর ৪০৯ কোটি ডলার পাচার হয়। ২০০৮ সালে পাচারের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৬৪৪ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। ২০০৯ সালের পাচার হয় ৬১২ কোটি ডলার। এর পরের ২ বছর অর্থ পাচার কিছুটা কমে আসে। ২০১০ সালে ৫৪০ কোটি ও ২০১১ সালে ৫৯২ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ পাচার হয় দেশ থেকে। কিন্তু হঠাৎ বেড়ে গিয়ে ২০১২ সালে পাচার হয় ৭২২ কোটি ডলার। সর্বশেষ ২০১৩ সালে পাচার অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯৬৬ কোটি ডলার।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ওই ১০ বছরের গড় হিসাবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত থেকে ৫ হাজার ১০২ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। এছাড়া ওই সময়ে শ্রীলংকা থেকে ১৯৯ কোটি, নেপাল থেকে ৫৬ কোটি, পাকিস্তান থেকে ১৯ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। এ প্রসঙ্গে জাহিদ হোসেন বলেন, ভারতের জিডিপির যে আকার সে হিসাবে বাংলাদেশের চেয়ে ওই দেশ থেকে কম হারে অর্থ পাচার হয়।
অন্যান্য দেশ থেকে পাচার : জিএফআইর প্রতিবেদন অনুসারে, অর্থ পাচারের দিক থেকে বিশ্বের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে চীন। ১০ বছরে ওই দেশ থেকে গড়ে পাচার হয়েছে ১৩ হাজার ৯২২ কোটি ডলার। দ্বিতীয় স্থানে থাকা রাশিয়া থেকে ১০ হাজার ৪৯৭ কোটি ডলার, তৃতীয় স্থানে থাকা মেক্সিকো থেকে ৫ হাজার ২৮৪ কোটি ডলার, চতুর্থ স্থানে থাকা ভারত থেকে ৫ হাজার ১০২ কোটি ডলার পাচার হয়েছে।
জিএফআইর প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, দেশের মোট বিনিয়োগের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কমে গেলেও গত ২ বছর পর্যন্ত আমাদের আমদানি ব্যয় বেড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থাৎ যন্ত্রপাতির মূল্য বেশি দেখিয়ে বিদেশে টাকা পাচার করা হচ্ছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে বিষয়টি অবশ্যই খতিয়ে দেখতে হবে। কারণ একবার বিদেশে টাকা গেলে তা ফেরত আনা খুব কঠিন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য : এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক শুভংকর সাহা বুধবার যুগান্তরকে বলেন, জিএফআই বিশ্বের সব দেশের ওপর প্রতিবেদন করে। অন্যান্য দেশের মতো তাই প্রতিবেদনে বাংলাদেশেরও নাম এসেছে। এ ব্যাপারে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। তবে এতটুকু বলতে পারি, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে আমাদের সক্ষমতা বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা পাচার করা কিছু অর্থ ফেরতও এনেছি। তিনি আরও বলেন, জিএফআইর তথ্যের সূত্রের ব্যাপারে আমাদের জানা নেই। তবে সুনির্দিষ্টভাবে তথ্য পাওয়া গেলে আমরা পাচার করা টাকা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আমাদের সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) রয়েছে। ফলে টাকা ফিরিয়ে আনা সহজ হবে।
আমদানির নামে মুদ্রা পাচার : বিনিয়োগে মন্দার মধ্যেও শিল্পের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি বেড়েছে। আর এ আমদানির নামে অর্থ পাচার হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে শিল্পের যন্ত্রপাতি ভর্তি কনটেইনারে পাওয়া গেছে ছাই, ইট, বালি, পাথর ও সিমেন্টের ব্লক। শিল্পের কোনো যন্ত্রপাতি পাওয়া যায়নি। শুল্ক গোয়েন্দাদের তদন্তে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরে খালি কনটেইনার আমদানির ঘটনাও ধরা পড়েছে।
রফতানির নামে মুদ্রা পাচার : সাম্প্রতিক সময়ে ভুয়া এলসি (ঋণপত্র) এবং ক্রয়চুক্তির মাধ্যমে টাকা পাচার হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে এ ধরনের বেশ কিছু ঘটনা ধরা পড়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখা, বংশাল শাখা, বেসিক ব্যাংকের শান্তিনগর শাখা থেকে এ ধরনের পাচারের তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওইসব শাখার মাধ্যমে পণ্য রফতানি করা হলেও তার মূল্য দেশে আসেনি। অর্থাৎ ওইসব টাকা পাচার হয়ে গেছে। এর মধ্যে বেসিক ব্যাংকের মাধ্যমে ১৯৯ কোটি টাকা, কমার্স ব্যাংকের মাধ্যমে ১৫৭ কোটি টাকার রফতানি আয় দেশে না আসার তথ্য মিলেছে। রফতানি আয় দেশে না আসার ঘটনা অন্যান্য ব্যাংকের ক্ষেত্রেও রয়েছে।
মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোম : গত বছর মালয়েশিয়ান সরকারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, বিদেশীদের জন্য ওই দেশের সেকেন্ড হোম প্রকল্পে বাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী দেশ। নিয়ম অনুযায়ী, দেশ থেকে বিদেশে টাকা নিয়ে যেতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন প্রয়োজন। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোমে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে কাউকে কোনো প্রকার অনুমোদন দেয়া হয়নি। তারপরও বাংলাদেশ কিভাবে মালয়েশিয়ার ওই প্রকল্পে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী দেশ হল তা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ড. মইনুল হোসেন জানান, নিশ্চিতভাবে ওইসব অর্থ পাচার করা হয়েছে। যেহেতু মালয়েশিয়ায় টাকা নেয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো অনুমোদন না থাকার পরও টাকা গেছে, তাহলে বুঝতে অসুবিধা হয় না- ওই টাকা পাচার হয়েছে। কানাডায় বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী বসবাস করেন এমন একটি এলাকার নাম হয়েছে ‘বেগমপাড়া’। বিশেষ দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক নেতারা সেখানে টাকা পাচার করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। হংকংয়ে অনেক বাংলাদেশী ব্যবসায়ীর নিজস্ব অফিস রয়েছে। সেখানে তারা পুঁজি পাচার করে নিয়মিত ব্যবসা করছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
জিএফআই একটি অলাভজনক সংস্থা, যারা উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবৈধ আর্থিক প্রবাহ বা মুদ্রা পাচার নিয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণ করে থাকে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের সঙ্গে অর্থ পাচার রোধে বিভিন্ন রকম পরামর্শের মাধ্যমে নীতিগত সহায়তা দিয়ে থাকে। এরই অংশ হিসাবে প্রতি বছর তারা অর্থ পাচারের প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। ২০১৪ সালের অর্থ পাচারের তথ্য প্রতিবেদন আকারে প্রকাশিত হবে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে।
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close