jugantor
প্রথমবারের মতো গ্রেফতার ‘ছিনতাই প্রফেসর’

  তোহুর আহমদ  

১০ ডিসেম্বর ২০১৫, ০০:০০:০০  | 

শিক্ষকতার মহান পেশায় অন্তত ১৫ বছর কাটানোর পর একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর বা অধ্যাপক হওয়ার সুযোগ পান। মহান এ পেশায় নিয়োজিত সবারই আকাক্সক্ষা থাকে সম্মানের সেই জায়গাটির প্রতি। তবে অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, বছরের পর বছর ছিনতাই আর ডাকাতি করেও যারা পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে সক্ষম হন তারা এক পর্যায়ে ‘প্রফেসর’ উপাধি পান। তারা বনে যান অপরাধ জগতের ‘ছিনতাই প্রফেসর’।

সম্প্রতি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া একটি ছিনতাই চক্রের সদস্যদের কাছ থেকে জানা গেছে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য। তারা পুলিশকে

জানায়, শিক্ষকতায় নয়, ছিনতাই-ডাকাতি করে অন্তত অর্ধডজন প্রফেসর উপাধি পাওয়া অভিজ্ঞ ছিনতাইকারী রাজধানীতে

সক্রিয় আছে। যারা মূলত ছিনতাইকারীদের লিডার বা বস হিসেবে দায়িত্ব পালন করে।

পুলিশের সংশ্লিষ্টরা জানান, ২ নভেম্বর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় দায়ের হওয়া একটি ছিনতাই মামলায় সন্দেহভাজন ছিনতাইকারীদের ধরতে অভিযান শুরু করে পুলিশ। টানা কয়েকদিনের অভিযানের এক পর্যায়ে ৪ ডিসেম্বর পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয় ছিনতাই চক্রের সদস্য মিন্টু শেখ ও তার সহযোগী আসলাম। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ছিনতাই চক্রের গডফাদার মিন্টু শেখ জানায়, ছিনতাই জগতে তার বিচরণ ২০ বছর ধরে। ছিনতাই পেশায় সে প্রফেসর হিসেবে পরিচিত। এই ছিনতাইকারী আরও জানায়, রাজধানীতে ‘ছিনতাই প্রফেসর’কে সহায়তার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের নিজস্ব লোক কাজ করে। ছিনতাই জগতের ভাষায় এদের মাস্টার, ম্যান ও চাক্কা এই তিন শ্রেণীতে ভাগ করা আছে। ছিনতাই প্রফেসর মিন্টু আরও জানায়, রাজধানীতে তার মতো ছিনতাই প্রফেসরের সংখ্যা মাত্র ৮ থেকে ১০ জন। এদের মধ্যে মাইনুল হাসান ওরফে সাইদ নামের আরও এক ছিনতাই প্রফেসর কিছুদিন আগে শাহবাগ থানায় গ্রেফতার হয়েছে। মিন্টুর দেয়া তথ্য অনুযায়ী মাইনুল হাসানকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কারাগার থেকে পুলিশি রিমান্ডে আনা হয়।

যে ঘটনায় গ্রেফতার হলেন দুই ছিনতাই প্রফেসর : ২ নভেম্বর, সোমবার। রাত আটটা। রাজধানীর কারওয়ান বাজার থেকে বাসায় ফিরছিলেন বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা। তার গন্তব্য হাতিরঝিল সংলগ্ন বেগুনবাড়ী। প্রতিদিনের মতোই রিকশায় চেপে তিনি তেজগাঁও রেলগেট দিয়ে সাতরাস্তা পার হয়ে সেদিন বেগুনবাড়ীর গন্তব্যে যাচ্ছিলেন। তাকে বহনকারী রিকশাটি শিল্পাঞ্চল এলাকার চীনা ফ্যাক্টরি মোড়ে পৌঁছানোর পর ঘটে বিপত্তি। হঠাৎ আরেকটি রিকশা এসে ওই রিকশার গতিরোধ করে। অস্ত্রের মুখে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ওই কর্মকর্তাকে রিকশা থেকে নামিয়ে উঠানো হয় সন্ত্রাসীদের ভাড়া করা আরেকটি রিকশায়। ওই সময় আরেকজন সন্ত্রাসী মোটরসাইকেল দিয়ে রীতিমতো পাহারা দিয়ে রিকশাটিকে নিয়ে যেতে থাকে। এরপর অস্ত্র ঠেকিয়ে ছিনিয়ে নেয়া হয় তার মানিব্যাগ, মোবাইল ফোন, এমনকি চোখের চশমাও। তবে মানিব্যাগে হাজার দুয়েক টাকা দেখে ওই সন্ত্রাসীর মন ভরেনি। মানিব্যাগে থাকা এটিএম কার্ড দিয়ে টাকা তোলার জন্য অস্ত্রের মুখে তাকে নিয়ে ছিনতাইকারী কাছাকাছি কোনো এটিএম বুথের সন্ধানে নেমে পড়ে। রিকশায় ঘুরতে ঘুরতে তেজগাঁও লাভ রোডের সমকাল কার্যালয়ের সামনে দিয়ে এগিয়ে যায় রিকশাটি। এ সময় অস্ত্র ঠেকিয়ে রেখে এদিক-ওদিক না তাকানোর হুমকি দেয়া হয়। এ সময় সন্দেহজনকভাবে রিকশাচালকও নীরব ভূমিকা পালন করে। নীরবে সে রিকশা চালিয়ে এটিএম বুথ খুঁজতে সহায়তা করে। এ সময় রিকশায় থাকা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী বলতে থাকে- ‘আই অ্যাম এ গ্র্যাজুয়েট।’ আর পাশাপাশি চলতে থাকা মোটরসাইকেল আরোহী অপর সন্ত্রাসীকে একটি এটিএম বুথ রেডি করার নির্দেশ দেয়। এভাবে নিকেতন এলাকার একটি এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে নেয় ছিনতাইকারীরা। এ ঘটনায় মামলা হলে এটিএম বুথের ভিডিও ফুটেজ থেকে দুই ছিনতাইকারীকে শনাক্ত করে পুলিশ।

এটিএম বুথের ওই ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, রাত ৮টা ২৭ মিনিট ৪৩ সেকেন্ডে অস্ত্রধারী এক সন্ত্রাসী রিকশায় প্রবেশ করে নিকেতন আবাসিক এলাকায়। এরপর ৩ নম্বর সড়কের একটি এটিএম বুথে এসে থামে রিকশা। এরপর ৮টা ৩৩ মিনিট ৪৮ সেকেন্ডে বুথের মধ্যে প্রবেশ করে দুই ছিনতাইকারী। বুথের দায়িত্বে থাকা সিকিউরিটি গার্ড কোনো প্রশ্ন না করে অনুগত কর্মচারীর মতোই দরজা খুলে দিলেন। সিকিউরিটি গার্ডের সামনেই অস্ত্রের মুখে একজনকে জোর করে বুথে ঢোকানো হল। বুথে ঢোকার পর অস্ত্রধারীরা কার্ড দিয়ে ব্যালেন্স চেক করল। ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যায়, সঙ্গে থাকা অস্ত্রটি বের করে কয়েকবার নাড়াচাড়া করল ছিনতাইকারী। এরপর ৮টা ৩৪ মিনিট ১৪ সেকেন্ডে ওই বুথে প্রবেশ করে আরেক সন্ত্রাসী। ব্যালেন্স দেখার পর অস্ত্রধারী ওই ছিনতাইকারী ওই ব্যক্তিকে আঘাতও করল। এবার তারা জানতে চাইল একসঙ্গে কত টাকা তোলা যাবে? প্রাণভয়ে ওই ব্যক্তি অকপটে স্বীকার করেন ৫০ হাজার তোলা যাবে। এভাবে তিন দফায় ৫০ হাজার টাকা তুলে নিয়ে তারা সদর্পে এটিএম বুথ থেকে বেরিয়ে যায়।

কিন্তু ভিডিও ফুটেজে ধারণ করা এই ছিনতাই ঘটনার পর শিল্পাঞ্চল থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ বেঁকে বসে। পুলিশ ঘটনাটিকে চুরি মামলা হিসেবে রেকর্ড করতে বলে। ছিনতাইয়ের শিকার একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ, শিল্পাঞ্চল থানার ওসি মিজানুর রহমান কখনোই ছিনতাই মামলা নিতে চান না। এবারও তিনি বলেছিলেন, ছিনতাই মামলা রেকর্ড করা যাবে না। একপর্যায়ে তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনারের কার্যালয়ে গিয়ে ঘটনা খুলে বলেন ছিনতাইয়ের শিকার ওই ব্যক্তি। এরপর উপকমিশনার বিল্পব কুমার সরকার ছিনতাই মামলাটি রেকর্ড করার নির্দেশ দেন। এরপরও নানা টালবাহানার এক পর্যায়ে থানা পুলিশ মামলাটি রেকর্ড করতে বাধ্য হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার উপপরিদর্শক মারগুব তৌহিদ জানান, ভিডিও ফুটেজ থেকে দুই ছিনতাইকারীর ছবি পাওয়ার পর স্থানীয় সোর্সদের মাধ্যমে যোগাযোগ শুরু করেন তারা। এক পর্যায়ে প্রযুক্তির সাহায্যে ছিনতাই প্রফেসর মিন্টু শেখ ও তার সহযোগী আসলামকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, তাদের আরেক সহযোগী মাইনুল হাসান ওরফে সাইদ কিছুদিন আগে শাহবাগ থানায় গ্রেফতার হয়ে এখন কারাগারে রয়েছে। এরপর পুলিশ কারাগার থেকে সাইদকেও রিমান্ডে নিয়ে আসে।

পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া ছিনতাই প্রফেসর মাইনুল হাসান সাইদুল ওরফে সাইদ ওরফে নাছির এবং মিন্টু শেখ ওরফে জনি শেখ ওরফে জানেমান জনি ওরফে রাজৈর মিন্টু প্রায় পনেরো বছর ধরে ছিনতাই করলেও তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা বদলায়নি। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, ছিনতাইকৃত টাকার একটি বড় অংশ মাদকের নেশায় খরচ হয়ে যায়। এত দীর্ঘ সময় ধরে ছিনতাই কাজে যুক্ত থেকেও একবারও গ্রেফতার না হওয়ার কারণ হিসেবে পুলিশকে তারা জানায়, প্রতিটি মিশন সফল করার পর তারা নিজেদের চেহারায় পরিবর্তন আনে। চুল-দাড়ি ছেঁটে চেহারায় আমূল পরিবর্তন আনে তারা। পুলিশ জানায়, এই দুই প্রফেসরের সঙ্গে রাজধানীতে সহযোগী হিসেবে শতাধিক রিকশাচালক কাজ করে। এছাড়া ছিনতাই গডফাদার বা ছিনতাই প্রফেসর হিসেবে আরও ৪ ব্যক্তির নাম পাওয়া গেছে। এদের একজন রাজধানীর বসুন্ধরা ও উত্তরা এলাকায় কালো কাচের প্রাইভেট কারে ঘোরাফেরা করে। তার নাম তাজু ওরফে কিং তাজু ওরফে খোকন ওরফে কাপাসিয়া তাজু। এদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ আরও জানায়, এই দুই ছিনতাই প্রফেসর দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় ছিনতাই পেশায় নিয়োজিত। এই প্রথমবারের মতো পুলিশের হাতে তারা ধরা খেল।

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, প্রায় প্রতিদিনই সন্ধ্যার পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, বাড্ডা, গুলশান-তেজগাঁও লিংক রোড ও রামপুরা এলাকায় অফিস থেকে ঘরে ফেরা সাধারণ নাগরিকরা ছিনতাইকারীদের টার্গেটে পরিণত হচ্ছেন। অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তাদের কাছ থেকে সর্বস্ব হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে হাতিরঝিল এলাকায় গত দুই মাসে এ ধরনের অন্তত ৫ থেকে ৭টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটার পর এলাকাটি আতংকে পরিণত হয়েছে। ভয়ে এ এলাকা এড়িয়ে চলতে শুরু করেছেন অনেকেই।




 

সাবমিট

প্রথমবারের মতো গ্রেফতার ‘ছিনতাই প্রফেসর’

 তোহুর আহমদ 
১০ ডিসেম্বর ২০১৫, ১২:০০ এএম  | 

শিক্ষকতার মহান পেশায় অন্তত ১৫ বছর কাটানোর পর একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর বা অধ্যাপক হওয়ার সুযোগ পান। মহান এ পেশায় নিয়োজিত সবারই আকাক্সক্ষা থাকে সম্মানের সেই জায়গাটির প্রতি। তবে অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, বছরের পর বছর ছিনতাই আর ডাকাতি করেও যারা পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে সক্ষম হন তারা এক পর্যায়ে ‘প্রফেসর’ উপাধি পান। তারা বনে যান অপরাধ জগতের ‘ছিনতাই প্রফেসর’।

সম্প্রতি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া একটি ছিনতাই চক্রের সদস্যদের কাছ থেকে জানা গেছে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য। তারা পুলিশকে

জানায়, শিক্ষকতায় নয়, ছিনতাই-ডাকাতি করে অন্তত অর্ধডজন প্রফেসর উপাধি পাওয়া অভিজ্ঞ ছিনতাইকারী রাজধানীতে

সক্রিয় আছে। যারা মূলত ছিনতাইকারীদের লিডার বা বস হিসেবে দায়িত্ব পালন করে।

পুলিশের সংশ্লিষ্টরা জানান, ২ নভেম্বর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় দায়ের হওয়া একটি ছিনতাই মামলায় সন্দেহভাজন ছিনতাইকারীদের ধরতে অভিযান শুরু করে পুলিশ। টানা কয়েকদিনের অভিযানের এক পর্যায়ে ৪ ডিসেম্বর পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয় ছিনতাই চক্রের সদস্য মিন্টু শেখ ও তার সহযোগী আসলাম। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ছিনতাই চক্রের গডফাদার মিন্টু শেখ জানায়, ছিনতাই জগতে তার বিচরণ ২০ বছর ধরে। ছিনতাই পেশায় সে প্রফেসর হিসেবে পরিচিত। এই ছিনতাইকারী আরও জানায়, রাজধানীতে ‘ছিনতাই প্রফেসর’কে সহায়তার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের নিজস্ব লোক কাজ করে। ছিনতাই জগতের ভাষায় এদের মাস্টার, ম্যান ও চাক্কা এই তিন শ্রেণীতে ভাগ করা আছে। ছিনতাই প্রফেসর মিন্টু আরও জানায়, রাজধানীতে তার মতো ছিনতাই প্রফেসরের সংখ্যা মাত্র ৮ থেকে ১০ জন। এদের মধ্যে মাইনুল হাসান ওরফে সাইদ নামের আরও এক ছিনতাই প্রফেসর কিছুদিন আগে শাহবাগ থানায় গ্রেফতার হয়েছে। মিন্টুর দেয়া তথ্য অনুযায়ী মাইনুল হাসানকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কারাগার থেকে পুলিশি রিমান্ডে আনা হয়।

যে ঘটনায় গ্রেফতার হলেন দুই ছিনতাই প্রফেসর : ২ নভেম্বর, সোমবার। রাত আটটা। রাজধানীর কারওয়ান বাজার থেকে বাসায় ফিরছিলেন বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা। তার গন্তব্য হাতিরঝিল সংলগ্ন বেগুনবাড়ী। প্রতিদিনের মতোই রিকশায় চেপে তিনি তেজগাঁও রেলগেট দিয়ে সাতরাস্তা পার হয়ে সেদিন বেগুনবাড়ীর গন্তব্যে যাচ্ছিলেন। তাকে বহনকারী রিকশাটি শিল্পাঞ্চল এলাকার চীনা ফ্যাক্টরি মোড়ে পৌঁছানোর পর ঘটে বিপত্তি। হঠাৎ আরেকটি রিকশা এসে ওই রিকশার গতিরোধ করে। অস্ত্রের মুখে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ওই কর্মকর্তাকে রিকশা থেকে নামিয়ে উঠানো হয় সন্ত্রাসীদের ভাড়া করা আরেকটি রিকশায়। ওই সময় আরেকজন সন্ত্রাসী মোটরসাইকেল দিয়ে রীতিমতো পাহারা দিয়ে রিকশাটিকে নিয়ে যেতে থাকে। এরপর অস্ত্র ঠেকিয়ে ছিনিয়ে নেয়া হয় তার মানিব্যাগ, মোবাইল ফোন, এমনকি চোখের চশমাও। তবে মানিব্যাগে হাজার দুয়েক টাকা দেখে ওই সন্ত্রাসীর মন ভরেনি। মানিব্যাগে থাকা এটিএম কার্ড দিয়ে টাকা তোলার জন্য অস্ত্রের মুখে তাকে নিয়ে ছিনতাইকারী কাছাকাছি কোনো এটিএম বুথের সন্ধানে নেমে পড়ে। রিকশায় ঘুরতে ঘুরতে তেজগাঁও লাভ রোডের সমকাল কার্যালয়ের সামনে দিয়ে এগিয়ে যায় রিকশাটি। এ সময় অস্ত্র ঠেকিয়ে রেখে এদিক-ওদিক না তাকানোর হুমকি দেয়া হয়। এ সময় সন্দেহজনকভাবে রিকশাচালকও নীরব ভূমিকা পালন করে। নীরবে সে রিকশা চালিয়ে এটিএম বুথ খুঁজতে সহায়তা করে। এ সময় রিকশায় থাকা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী বলতে থাকে- ‘আই অ্যাম এ গ্র্যাজুয়েট।’ আর পাশাপাশি চলতে থাকা মোটরসাইকেল আরোহী অপর সন্ত্রাসীকে একটি এটিএম বুথ রেডি করার নির্দেশ দেয়। এভাবে নিকেতন এলাকার একটি এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে নেয় ছিনতাইকারীরা। এ ঘটনায় মামলা হলে এটিএম বুথের ভিডিও ফুটেজ থেকে দুই ছিনতাইকারীকে শনাক্ত করে পুলিশ।

এটিএম বুথের ওই ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, রাত ৮টা ২৭ মিনিট ৪৩ সেকেন্ডে অস্ত্রধারী এক সন্ত্রাসী রিকশায় প্রবেশ করে নিকেতন আবাসিক এলাকায়। এরপর ৩ নম্বর সড়কের একটি এটিএম বুথে এসে থামে রিকশা। এরপর ৮টা ৩৩ মিনিট ৪৮ সেকেন্ডে বুথের মধ্যে প্রবেশ করে দুই ছিনতাইকারী। বুথের দায়িত্বে থাকা সিকিউরিটি গার্ড কোনো প্রশ্ন না করে অনুগত কর্মচারীর মতোই দরজা খুলে দিলেন। সিকিউরিটি গার্ডের সামনেই অস্ত্রের মুখে একজনকে জোর করে বুথে ঢোকানো হল। বুথে ঢোকার পর অস্ত্রধারীরা কার্ড দিয়ে ব্যালেন্স চেক করল। ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যায়, সঙ্গে থাকা অস্ত্রটি বের করে কয়েকবার নাড়াচাড়া করল ছিনতাইকারী। এরপর ৮টা ৩৪ মিনিট ১৪ সেকেন্ডে ওই বুথে প্রবেশ করে আরেক সন্ত্রাসী। ব্যালেন্স দেখার পর অস্ত্রধারী ওই ছিনতাইকারী ওই ব্যক্তিকে আঘাতও করল। এবার তারা জানতে চাইল একসঙ্গে কত টাকা তোলা যাবে? প্রাণভয়ে ওই ব্যক্তি অকপটে স্বীকার করেন ৫০ হাজার তোলা যাবে। এভাবে তিন দফায় ৫০ হাজার টাকা তুলে নিয়ে তারা সদর্পে এটিএম বুথ থেকে বেরিয়ে যায়।

কিন্তু ভিডিও ফুটেজে ধারণ করা এই ছিনতাই ঘটনার পর শিল্পাঞ্চল থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ বেঁকে বসে। পুলিশ ঘটনাটিকে চুরি মামলা হিসেবে রেকর্ড করতে বলে। ছিনতাইয়ের শিকার একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ, শিল্পাঞ্চল থানার ওসি মিজানুর রহমান কখনোই ছিনতাই মামলা নিতে চান না। এবারও তিনি বলেছিলেন, ছিনতাই মামলা রেকর্ড করা যাবে না। একপর্যায়ে তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনারের কার্যালয়ে গিয়ে ঘটনা খুলে বলেন ছিনতাইয়ের শিকার ওই ব্যক্তি। এরপর উপকমিশনার বিল্পব কুমার সরকার ছিনতাই মামলাটি রেকর্ড করার নির্দেশ দেন। এরপরও নানা টালবাহানার এক পর্যায়ে থানা পুলিশ মামলাটি রেকর্ড করতে বাধ্য হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার উপপরিদর্শক মারগুব তৌহিদ জানান, ভিডিও ফুটেজ থেকে দুই ছিনতাইকারীর ছবি পাওয়ার পর স্থানীয় সোর্সদের মাধ্যমে যোগাযোগ শুরু করেন তারা। এক পর্যায়ে প্রযুক্তির সাহায্যে ছিনতাই প্রফেসর মিন্টু শেখ ও তার সহযোগী আসলামকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, তাদের আরেক সহযোগী মাইনুল হাসান ওরফে সাইদ কিছুদিন আগে শাহবাগ থানায় গ্রেফতার হয়ে এখন কারাগারে রয়েছে। এরপর পুলিশ কারাগার থেকে সাইদকেও রিমান্ডে নিয়ে আসে।

পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া ছিনতাই প্রফেসর মাইনুল হাসান সাইদুল ওরফে সাইদ ওরফে নাছির এবং মিন্টু শেখ ওরফে জনি শেখ ওরফে জানেমান জনি ওরফে রাজৈর মিন্টু প্রায় পনেরো বছর ধরে ছিনতাই করলেও তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা বদলায়নি। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, ছিনতাইকৃত টাকার একটি বড় অংশ মাদকের নেশায় খরচ হয়ে যায়। এত দীর্ঘ সময় ধরে ছিনতাই কাজে যুক্ত থেকেও একবারও গ্রেফতার না হওয়ার কারণ হিসেবে পুলিশকে তারা জানায়, প্রতিটি মিশন সফল করার পর তারা নিজেদের চেহারায় পরিবর্তন আনে। চুল-দাড়ি ছেঁটে চেহারায় আমূল পরিবর্তন আনে তারা। পুলিশ জানায়, এই দুই প্রফেসরের সঙ্গে রাজধানীতে সহযোগী হিসেবে শতাধিক রিকশাচালক কাজ করে। এছাড়া ছিনতাই গডফাদার বা ছিনতাই প্রফেসর হিসেবে আরও ৪ ব্যক্তির নাম পাওয়া গেছে। এদের একজন রাজধানীর বসুন্ধরা ও উত্তরা এলাকায় কালো কাচের প্রাইভেট কারে ঘোরাফেরা করে। তার নাম তাজু ওরফে কিং তাজু ওরফে খোকন ওরফে কাপাসিয়া তাজু। এদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ আরও জানায়, এই দুই ছিনতাই প্রফেসর দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় ছিনতাই পেশায় নিয়োজিত। এই প্রথমবারের মতো পুলিশের হাতে তারা ধরা খেল।

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, প্রায় প্রতিদিনই সন্ধ্যার পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, বাড্ডা, গুলশান-তেজগাঁও লিংক রোড ও রামপুরা এলাকায় অফিস থেকে ঘরে ফেরা সাধারণ নাগরিকরা ছিনতাইকারীদের টার্গেটে পরিণত হচ্ছেন। অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তাদের কাছ থেকে সর্বস্ব হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে হাতিরঝিল এলাকায় গত দুই মাসে এ ধরনের অন্তত ৫ থেকে ৭টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটার পর এলাকাটি আতংকে পরিণত হয়েছে। ভয়ে এ এলাকা এড়িয়ে চলতে শুরু করেছেন অনেকেই।




 

 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র