¦
অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে

মিজান চৌধুরী | প্রকাশ : ১২ ডিসেম্বর ২০১৫

আজ স্বপ্নের পদ্মা সেতুর মূল কাজের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে দেশে অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে। এটি বাস্তবে রূপ নিলে সম্প্রসারিত হবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। সেতু ঘিরে সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হবে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের। গতি ও মাত্রা বাড়বে অভ্যন্তরীণ ও আন্তঃদেশীয় যান চলাচলের। সবমিলিয়ে সেতুর উভয় পাশে বিকাশ ঘটবে সুষম অর্থনীতির। এতে আগামীতে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ১ দশমিক ২ শতাংশ বাড়বে বলে আশাবাদ অর্থনীতিবিদদের।
এদিকে সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পদ্মা সেতু ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জোরদার করতে এরই মধ্যে ৩১ দফা সুপারিশ করেছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবরা। ১৭ অক্টোবর তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভুইঞার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সচিব কমিটির বৈঠক থেকে এ সুপারিশ করা হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে।
সচিব কমিটির বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে, পদ্মা সেতু ঘিরে অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা দেখা দেয়ার কারণেই মূলত ৩১ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। সচিব কমিটির সুপারিশে বলা হয়, পদ্মা বহুমুখী প্রকল্প একটি গর্বের প্রকল্প। এ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নে স্ব স্ব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের করণীয় নির্ধারণ করে সেতুর সর্বোত্তম অর্থনৈতিক ব্যবহারের জন্য এখন থেকেই প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা। সেখানে আরও বলা হয়, এ সেতু চালুর পর অভ্যন্তরীণ ও আন্তঃদেশীয় যান চলাচলের মাত্রা ও গতি বৃদ্ধি পাবে। এ পরিস্থিতিতে সড়ক ও মহাসড়কে নির্বিঘ্নে যান চলাচলের সুবিধা সৃষ্টি এবং বড় বড় শহর এড়িয়ে বিকল্প পথে যান চলাচলের ব্যবস্থা করা।
অন্য সুপারিশগুলোর মধ্যে সেতু নির্মাণ কাজে বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। এক্ষেত্রে পায়রা ও রামপাল প্রকল্পের বিদ্যুৎ পদ্মা সেতুতে ব্যবহারের জন্য সেতু বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে সঞ্চালন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার সুপারিশ করা হয়। সেতুর উভয় পাশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড উৎসাহিত করতে নীতি-প্রণোদনা ঘোষণা, গ্যাস সংযোগের ব্যবস্থা, দক্ষিণে বিসিক শিল্পনগরীগুলো চালু ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল (বেজা) মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণে কার্যক্রম গ্রহণ করার কথা বলা হয়। পাশাপাশি সেতুর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শিল্প স্থাপনের সহায়ক নীতি গ্রহণ, মাশুল আদায়ে স্বয়ংক্রিয় ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রবাহে ফাইভার অপটিক ক্যাবল স্থাপনের কথা উল্লেখ করা হয় সচিব কমিটির সুপারিশে।
এছাড়া পদ্মা সেতু প্রকল্পের নির্মাণ সামগ্রী ও যন্ত্রপাতি কর অবকাশ সুবিধায় আমদানির সুপারিশ করেছে সচিব কমিটি। ভূমিকম্পনের ঝুঁকি মোকাবেলায় সেতুর গুরুত্বপূর্ণ ও বড় স্থাপনাগুলোকে বীমার আওতা নিয়ে আসা, প্রকল্পের শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং নিরাপত্তার জন্য পুলিশি তদন্ত ও থানা কেন্দ্র স্থাপনের কথাও বলা হয়েছে।
সুপারিশে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সেতু প্রকল্পের ডিপিপি সংশোধনের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া মাস্টার প্ল্যানের আওতায় সেতুর উভয় পাশে উন্নয়নের ব্যবস্থা, পৃথক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন, রেল সংযোগ স্থাপনে আগাম জমি অধিগ্রহণ, স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে লাভজনক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে উপযুক্ত কর্মসূচি গ্রহণের কথা বলা হয়। পাশাপাশি প্রকল্প এলাকায় ৪টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১টি জাদুঘর, পর্যটন আকর্ষণে নদীর উভয় পাশে ইকোপার্ক স্থাপনের কথা বলা হয়।
সেতু সমাপ্তির পর এর মানসম্মত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করে সচিবদের সুপারিশে বলা হয়েছে, নদীর গভীরতা ও নাব্যতা রক্ষায় দেশীয় বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত, ইলিশ প্রজনন রক্ষায় বিশেষ যত্নবান, নদীর ড্রেজিংয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও নদী ভাঙন রোধে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে আরও তৎপর এবং নদী শাসনের প্রতি লক্ষ্য রেখে কার্যক্রম গ্রহণ করতে বলা হয়।
পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিষয়ে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, পদ্মা সেতু জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে। এটি সমীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে। আমরা যদি যমুনা সেতুর প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখা যাবে, ব্রিজের পশ্চিমাঞ্চলে পাবনা ও সিরাগঞ্জসহ অন্য জেলাগুলোর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্রিজ নির্মাণের আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। এতে কৃষক সহজেই কাঁচামাল পান, উৎপাদিত পণ্যও বিক্রি করতে পারেন। এছাড়া শিল্প ও বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ার কারণে। একই অবস্থা পদ্মা সেতুু ঘিরে হবে। ফলে সবদিক থেকে পদ্মা সেতু ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
পদ্মা সেতুর ওপর একটি দাতা সংস্থার পরিচালিত সমীক্ষা থেকে জানা গেছে, সেতুটি চালু হলে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এতে দেশজ মোট উৎপাদন (জিডিপি) ১ দশমিক ২ শতাংশ বাড়বে বলে ওই সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়।
এদিকে সেতু বিভাগের তৈরি পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের সর্বশেষ অগ্রগতি প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, এ পর্যন্ত জাজিরা সংযোগ সড়ক নির্মাণ কাজ হয়েছে ৫১ দশমিক ১ শতাংশ, মাওয়া সংযোগ সড়ক নির্মাণ কাজের অগ্রগতি ৫৬ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং সার্ভিস এরিয়ার কাজের অগ্রগতি ৬১ শতাংশ।
এছাড়া মূল সেতুর ১৫ শতাংশ ভৌত অগ্রগতি হয়েছে। ইতিমধ্যে মূল সেতুর ১০টি টেস্ট পাইলের মধ্যে ৩টি টেস্ট পাইল ড্রাইভ, ভায়াডাক্টোর ১৬টি স্টেট পাইলের মধ্যে ৭টি পাইল ড্রাইড এবং ৬৪টি অ্যাংকর পাইলের মধ্যে ২৮টি পাইল ড্রাইড সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি নদী শাসন কাজের ভৌত অগ্রগতি ১১ শতাংশ শেষ হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন খাতে অক্টোবর পর্যন্ত ৫৪৬ কোটি ১০ লাখ টাকা সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে। পুনর্বাসন সাইটগুলোতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৫৯২টি প্লটের মধ্যে ১৩৬০টি প্লট ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে হস্তান্তর করা হয়।
অগ্রগতি প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর জেলার মোট প্রস্তাবিত প্রায় ১৬শ’ হেক্টর জমির মধ্যে অধিগ্রহণ করা হয় প্রায় ১২৩০ দশমিক ৯০ হেক্টর জমি। এরমধ্যে দখল বুঝে নেয়া হয় ১১১৫ দশমিক ৪৪ হেক্টর। প্রকল্পের পরিবেশ কার্যক্রমের আওতায় সেতুর উভয় প্রান্তে অক্টোবর পর্যন্ত গাছ লাগানো হয় ৬৭ হাজার ৫৫০টি।
সূত্র মতে, ২০১৮ সালের মধ্যে স্বপ্নের এ সেতু বাস্তবে রূপ নিবে। পদ্মা সেতু উভয় পাশে শিল্পায়নের জন্য দেশী ও বিদেশী উদ্যোক্তা কাজ শুরু করেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে উদ্যোক্তা এসব স্থানে শিল্পায়নের জন্য জমি ক্রয় করছেন।
এ ব্যাপারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, পদ্মা সেতু হলে অর্থনৈতিকভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সম্পৃক্ততা পরিপূর্ণ হবে। এর অনেক ইতিবাচক প্রভাব অর্থনীতিতে পড়বে। এর মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হবে। এতে সময় বেঁচে যাবে। এর উপকার আসবে অর্থনীতিতে। বাজারজাতকরণের দিক থেকে অর্থনীতির উপকার হবে। এছাড়া বিনিয়োগ সম্ভাবনা বাড়বে ওইসব অঞ্চলের। এর ইতিবাচক প্রতিফলন জিডিপিতে পড়বে। তিনি আরও বলেন, এর সঙ্গে অন্যান্য অবকাঠামো বিশেষ করে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সম্প্রসারণ করতে হবে ওইসব অঞ্চলে। তা করা হলে বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ অর্থনীতিবিদ মনে করেন পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থায়নে হচ্ছে। এ জন্য বেশি সাশ্রয় ও সুশাসন নিশ্চিত করে এর কাজ শেষ করতে হবে। বিনিয়োগ থেকে যে সুফল পাওয়া যায় সেটা যেন সর্বোচ্চ কাক্সিক্ষত হয়।
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close