¦
বাংলাদেশের প্রাণ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম | প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৫

এবারের বিজয়ের মাস আমাকে আবার ১৯৭১-এ ফিরিয়ে নিয়ে গেল। কারণটা খুব স্পষ্ট তা হচ্ছে, একাত্তরের ঘটনাকে, গণহত্যাকে আজ পাকিস্তান স্বীকার করছে না; তাদের অবস্থান আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে এবং আমাদের জাতিসত্তাকে অস্বীকার করা তাদের পুরনো একটি প্রবণতা- যেটি একাত্তরে খুব স্পষ্ট হয়ে যায়। অর্থাৎ এই দীর্ঘ ৪৪ বছরেও তাদের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি এবং তাতে এ কথাই প্রমাণিত হয় যে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সঠিক ছিল। আমরা সত্যের পথে ছিলাম।
১৯৭১-এর ১৪ ডিসেম্বরের পর যখন সংবাদ পেলাম, দেশের অসংখ্য গুণী মানুষকে চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে গিয়ে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে খুব ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছে। তখন ধারণা হয়েছিল, বাঙালি জাতিকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে দীন করার জন্য এবং নিশ্চিহ্ন করার জন্যই পাকিস্তানিরা এই পরিকল্পনা করেছে এবং বাংলাদেশের কিছু বাঙালিই তাদের এ কাজে সহযোগিতা করেছে। এবারের বিজয়ের মাসে ওই একাত্তরের বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে যারা জড়িত ছিল তারা যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন এবং আইন তার আপন গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের কার কী দণ্ড হল সেটা বড় নয়, বড় কথা হচ্ছে- এরা যে অপরাধ করেছে সে অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত তাদের দিতে হবে। এর মধ্য দিয়ে একাত্তরে যে কলংক তারা তৈরি করেছিল সেখান থেকে জাতি অনেকটাই বেরিয়ে আসতে পারল।
বিজয়ের মাস ডিসেম্বর এলে যে ভাবনা আমাকে তাড়িত করে- ‘সোনার বাংলা’র যে স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম তা কী আমরা আসলে বাস্তবায়ন করতে পেরেছি? এই বোধটি আমার ধারণা যে, প্রত্যেক বাঙালির মনেই এই মাসটি আÍজিজ্ঞাসা জাগিয়ে দেয়, বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের এবং যারা চিন্তাশীল মানুষ, যারা সমাজের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দেন তাদের এই ডিসেম্বরে এসে নিজেদের পরিষ্কারভাবে প্রশ্ন করতে হবে যে, আমি একজন বাঙালি হিসেবে আমার দেশের জন্য কতখানি দিতে পেরেছি? যদি বুকে হাত দিয়ে কেউ নিজেকে এই প্রশ্নটি করতে পারে যে, আমি দেশের কাছ থেকে কতটা নিয়েছি আর কতখানি দিয়েছি- আর এই হিসাবটা যদি দেখাতে পারে এবং হিসাবটা মিলিয়ে যদি নিজে লজ্জিত হয় অথবা আনন্দিত হয়। লজ্জিত হবে সে মানুষ- যে নিয়েছে প্রচুর, দেয়নি কিছুই আর আনন্দিত হবেন তিনি- যিনি দিয়েছেন প্রচুর নেননি কিছুই- এই হিসাবটা আমাদের করতে হবে। এই হিসাবটা আমরা করছি না বলেই একটা পার্বণিক বিষয় হিসেবে দেখছি এই বিজয়ের মাসটিকে।
গত ৪৪ বছরে বাংলাদেশের অনেক উন্নতি হয়েছে আমি জানি, এসব উন্নতির মূলে শুধু যে সরকারগুলো ছিল তা বলা যাবে না-এসব উন্নতির মূলে সাধারণ মানুষ। আমাদের কৃষক মাঠে ফসল ফলিয়েছেন, আমাদের জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার থেকেও বেশি হারে। তারা ফসল ফলিয়েছেন বলেই আমরা তিন বেলা খেতে পারছি। আমাদের প্রবাসী শ্রমিকরা, যারা গ্রাম থেকে বিদেশে যাচ্ছেন, তাদের অনেকেই দোতলা কোনো দালানে ওঠেননি অথচ তারাই চল্লিশ তলা ভবন তৈরি করছেন- এটা একটা অসাধারণ ব্যাপার। বিদেশে তারা কঠিন ও কঠোর পরিশ্রম করে দেশের জন্য মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন। আর দেশের ভেতরে যে গার্মেন্টের মেয়েরা একটা বিপ্লব করে গেল, তারা যে শুধু দেশকে স্বাবলম্বী করছে তা নয়, নিজেদেরও একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সামনে নিয়ে এলো- ঘরের চার দেয়ালের বাইরে নিজেদের নিয়ে এসে। খেয়াল করে দেখলে খুব পরিষ্কার এবং স্পষ্ট দেখতে পাই, আমরা যারা মধ্যবিত্ত, সমাজের সুশীল সমাজ হিসেবে দাবি করি এই পরিবর্তনে তাদের কোনো অবদান নেই।
বেশির ভাগ অবদান এই গ্রাম থেকে উঠে আসা শ্রমিক, কৃষক ও নারীদের। অর্থাৎ বাংলাদেশ বেঁচে আছে গ্রামের জন্য এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বেঁচে থাকবে গ্রামের অবদানে। আজ বিজয়ের মাসের যে গৌরব তার পেছনেও রয়েছে- গ্রাম। যখন দেশে মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভ হয় তখন ৯০ ভাগ মুক্তিযোদ্ধাই এসেছিল গ্রাম থেকে। গ্রামের সেই জনযোদ্ধাদের ভাগ্যে কোনো পদক জোটেনি। বীরশ্রেষ্ঠ, বীরউত্তম, বীরবিক্রম কোনো পদকই তাদের আমরা দেইনি। কিন্তু তাতে কিছু আসে যায়নি। তারা বন্দুক নিয়ে যুদ্ধ করেছে, বন্দুক ফেরত দিয়ে আবার কৃষি কাজে মনোযোগ দিয়েছে। তাদের আত্মত্যাগেই দেশ স্বাধীন হয়েছে, বিজয় অর্জিত হয়েছে। আমাদের মতো শহুরে মানুষের অবদানে দেশ স্বাধীন হয়নি। রাজাকার, পদকধারী মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের নামে সুবিধাভোগকারীরা সব কিন্তু শিক্ষিত সমাজ থেকেই এসেছে- সাধারণ মানুষ যারা যুদ্ধ করেছে তারা দেশের জন্য যুদ্ধ করেছে। ফলে এই বিজয়ের মাসে আমার একটি স্পষ্ট ও পরিষ্কার অনুধাবন যে, এই বাংলাদেশ বেঁচে থাকবে বাংলাদেশের গ্রামের মানুষের জন্য। গ্রামই বাংলাদেশের সম্পদ। ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের শহরগুলো সব সুবিধা ভোগ করছে কিন্তু এখনও দেশকে যারা কেবল দিচ্ছে সেই গ্রামের মানুষ তারা কিছু পাচ্ছে না। আমি তো মনে করি, এখন আমাদের গ্রামের দিকে সবকিছু ঘুরিয়ে দেয়া প্রয়োজন। আমরা যদি আমাদের ভবিষ্যৎ দেখি তবে সেটা গ্রাম থেকে আসবে। আমি একটা গ্রামের কথা বলি, নেত্রকোনার কালসিন্দুর। সেখান থেকে বাংলাদেশের নারী ফুটবল টিমের ৪০ ভাগ খেলোয়াড় আসছে। এটা শুধু একটা উদাহরণ। আমি তো মনে করি, ভবিষ্যতে নেতৃত্ব বলি, বুদ্ধিজীবী বলি- বাংলাদেশের সব নায়ক গ্রাম থেকেই আসবেন। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামগুলো সব মৃতপ্রায় কলকাতা সব গ্রামকে মেরে ফেলেছে কিন্তু ঢাকা তা পারেনি ফলে ঢাকাকে পাশ কাটিয়ে গ্রাম এগিয়ে যাচ্ছে।
এবারের বিজয়ের মাসে আমার এই উপলব্ধি হয়েছে যে, বাংলাদেশ একটা অসম্ভব সুন্দর দেশ হবে- কারণ বাংলাদেশের গ্রামের মানুষ এই দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে- এই দেশের মালিকানা তারা দাবি করছে। যেমন তারা ১৯৭১-এ দাবি করেছিল।
বঙ্গবন্ধু সব সময় বলতেন ‘সোনার বাংলা’র কথা। তার চিন্তায় কৃষক ছিল, শ্রমিক ছিল। তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতেন, ঢাকা খুব পছন্দ করবেন না। এখন বুঝতে পারে কেন করতেন না। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন- বাংলাদেশের সত্যিকার শক্তি কেন্দ্র হচ্ছে আমাদের গ্রাম। এ সত্যি ’৭১-এ অনুভব করেছিলাম, আজ ২০১৫-তেও আরও বেশি করে উপলব্ধি করছি। আমাদের গ্রাম আমাদের রক্ষা করার জন্য এগিয়ে আসছে। বাংলাদেশ বাঁচবে কারণ আমাদের গ্রামগুলো বাঁচার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অনুলিখন : শুচি সৈয়দ
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close