¦
স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তন হবে দুটি গ্রেড

মিজান চৌধুরী | প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৫

দুটি গ্রেড স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তন (উপরের ধাপে যাবে) হওয়ার বিধান রেখে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। চাকরির বয়স ১০ বছর হওয়ার পর একটি এবং ১৬ বছর পূর্ণ হওয়ার পর আরেকটি গ্রেড পরিবর্তন হবে। ৩৪ বছরের পুরনো টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিল করে এর বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে এ বিধান রাখা হয়েছে।
তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আগের নিয়মেই টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পাবেন। এক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আদেশ জারি করবে।
মঙ্গলবার সকালে নতুন বেতন কাঠামোর (অষ্টম বেতন স্কেল) প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এর আগে সোমবার রাতে এ সংক্রান্ত প্রস্তাবে চূড়ান্ত অনুমোদন দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
গতকাল বিকালে অর্থনৈতিক সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘নতুন বেতন স্কেলের প্রজ্ঞাপন আজই (মঙ্গলবার) জারি করা হবে। এটি সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য বিজয়ের উপহার।’
এ প্রসঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, চতুর্থ গ্রেড থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত দুটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পদোন্নতির বিধান রাখা হয়েছে। চাকরির বয়সে কর্মকর্তা ও কর্মচারী যারা প্রমোশন পাবেন না, তাদের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দু’বার বেতন গ্রেড ওপরে উঠবে। তিনি আরও বলেন, গত পহেলা জুলাই থেকে কার্যকর হবে নতুন বেতন স্কেল। জুলাই থেকে নভেম্বর এই পাঁচ মাসের বকেয়া বেতনের ৫০ শতাংশ ডিসেম্বর মাসের বেতনের সঙ্গে দেয়া হবে। বাকি ৫০ শতাংশ বকেয়া বেতন আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের বেতনের সঙ্গে উত্তোলন করতে পারবেন।
প্রজ্ঞাপনের উল্লেখযোগ্য বিষয় :
নবম গ্রেড নন-ক্যাডার, অষ্টম গ্রেডে ক্যাডার কর্মকর্তার প্রবেশ : অষ্টম বেতন স্কেলে একজন ক্যাডার কর্মকর্তা চাকরিতে প্রবেশ করবেন অষ্টম গ্রেডে এবং নন-ক্যাডার কর্মকর্তা প্রবেশ করবেন নবম গ্রেডে। সপ্তম বেতন স্কেলে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তা উভয়ই নবম গ্রেড থেকে চাকরি শুরু করতেন।
ব্যাংকের পৃথক বেতন কাঠামো নয় : রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য আলাদা কোনো বেতন কাঠামো প্রণয়ন করা হবে না। এসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একই বেতন স্কেল কার্যকর হবে।
বেতন বাড়বে শতাংশ হারে : নতুন বেতন কাঠামোতে সরকারি চাকরিজীবীদের ইনক্রিমেন্টের নির্ধারিত হার থাকছে না। এখন থেকে গ্রেড-২ ইনক্রিমেন্ট প্রতি বছর দেয়া হবে তিন দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে। গ্রেড-৩ এবং গ্রেড-৪ ইনক্রিমেন্ট হবে চার শতাংশ হারে, গ্রেড-৫ ইনক্রিমেন্ট হবে চার দশমিক পাঁচ শতাংশ হারে, গ্রেড-৬ থেকে ২০ পর্যন্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীর ইনক্রিমেন্ট হবে পাঁচ শতাংশ হারে।
বেতন গ্রেড থাকছে ২০টি : ৭ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হওয়া অষ্টম জাতীয় পে-স্কেলে ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হয়েছে। এই গ্রেডের বাইরে থাকছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব ও তিন বাহিনীর প্রধান। এক্ষেত্রে তাদের বেতন হবে ৮৬ হাজার টাকা (নির্ধারিত)। এছাড়া নির্ধারিত গ্রেডের বাইরে রয়েছেন সিনিয়র সচিব ও একই পদমর্যাদার সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা। এদের বেতন ৮২ হাজার টাকা (নির্ধারিত)। নতুন বেতন স্কেলে গ্রেড-১ সচিবের বেতন রাখা হয়েছে ৭৮ হাজার টাকা (নির্ধারিত), গ্রেড-২ ৬৬ হাজার টাকা, গ্রেড-৩ ৫৬ হাজার ৫০০ টাকা, গ্রেড-৪ ৫০ হাজার টাকা, গ্রেড-৫ ৪৩ হাজার টাকা, গ্রেড-৬ ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা, গ্রেড-৭ ২৯ হাজার টাকা, গ্রেড-৮ ২৩ হাজার টাকা, গ্রেড-৯ ২২ হাজার টাকা, গ্রেড-১০ ১৬ হাজার টাকা, গ্রেড-১১ ১২ হাজার ৫০০ টাকা, গ্রেড-১২ ১১ হাজার ৩০০ টাকা, গ্রেড-১৩ ১১ হাজার টাকা, গ্রেড-১৪ ১০ হাজার ২০০ টাকা, গ্রেড-১৫ ৯ হাজার ৭০০ টাকা, গ্রেড-১৬ ৯ হাজার ৩০০ টাকা, গ্রেড-১৭ ৯ হাজার টাকা, গ্রেড-১৮ ৮ হাজার ৮০০ টাকা, গ্রেড-১৯ ৮ হাজার ৫০০ এবং গ্রেড-২০ ৮ হাজার ২৫০ টাকা।
নববর্ষের ভাতা : নতুন বেতন স্কেলে বাংলা নববর্ষের ভাতা চালু করা হয়েছে। মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে নববর্ষের ভাতা পাবেন সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। অন্যান্য বিশেষ ভাতা হবে নির্ধারিত হারে। আগে ছিল শতাংশ হারে। তবে বাড়িভাড়া ভাতা হবে শতাংশ হারেই। নতুন পদ্ধতিতে সব ধরনের ভাতা আগের তুলনায় বেশি হবে। আর এই নতুন বোনাস ও ভাতা কার্যকর হবে আগামী বছরের পহেলা জুলাই থেকে।
কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের শ্রেণী বিলুপ্ত : ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী এই প্রথা বিলুপ্ত করা হয়েছে। এখন প্রশাসনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পরিচয় হবে গ্রেড দিয়ে। ক্লাস ওয়ান অফিসার শব্দ বলতে কিছু থাকবে না। একজন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর পরিচয় হবে ২০ গ্রেডের কর্মচারী হিসেবে। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী বলে মানসিক দুর্বলতা তৈরি হয় তা অবসান করতে শ্রেণী প্রথা বিলুপ্ত করা হয়েছে। তবে প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তার মাধ্যমে সরকারি কাগজপত্র সত্যায়িত করার ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন করা হবে।
পেনশনের হার বৃদ্ধি : নতুন বেতন কাঠামোতে অবসরে যাওয়ার সময় মূল বেতনের ৯০ শতাংশ হারে পেনশন নির্ধারণ করা হয়েছে। আগে এই হার ছিল মূল বেতনের ৮০ শতাংশ। নতুন পে-স্কেলে পেনশনের হার বাড়ানো হয়েছে ১০ শতাংশ।
জাতীয় অধ্যাপকদের জন্য সিনিয়র সচিব পর্যাদা : নতুন বেতন কাঠামোতে সিনিয়র সচিব পর্যাদার বেতন পাবেন জাতীয় অধ্যাপকরা। তবে এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বেতনের বিষয়টি এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে এমপিওভুক্ত কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা নতুন বেতন কাঠামো পাবেন তা সার্ভে করে অর্থ মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে বলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, বেতন স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি নিয়ে অর্থ ও আইন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলছে এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পাঠানো খসড়া প্রস্তাবের ৮টি বিষয়ে সায় দেয়নি আইন মন্ত্রণালয়। তাদের মতে, বিষয়গুলো সংবিধান ও রুলস অব বিজনেসের পরিপন্থী। এসব বিষয় সংশোধনসহ নিজেদের প্রস্তাব ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব পাশাপাশি রেখে একটি সারসংক্ষেপ তৈরি করে আইন মন্ত্রণালয়। এটি বৃহস্পতিবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মন্ত্রিসভায় পাস হওয়া প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ের প্রশ্ন তোলার যৌক্তিকতা নেই। তবে বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে প্রস্তাবটি সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছিল। এদিন রাতেই অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব অনুমোদন করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ফাইল অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রায় এক মাস ধরে অষ্টম পে-স্কেলের গেজেট জারি নিয়ে অর্থ ও আইন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে নথি চালাচালি চলছিল। পে-স্কেলের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে উভয় মন্ত্রণালয় ঐকমত্যে না পৌঁছানোয় গেজেট জারি করতে এতদিন বিলম্ব হয়েছে। সূত্র মতে, নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে পে-স্কেলের গেজেট জারি সংক্রান্ত সারসংক্ষেপ অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। প্রস্তাব পর্যালোচনা শেষে কিছু বিষয়ের আপত্তি জানিয়ে তা সংশোধন করতে নথি আবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠানো হয়। প্রয়োজনীয় সংশোধনী শেষে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে ভেটিংয়ের জন্য আবারও নথি পাঠানো হয় আইন মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু কাক্সিক্ষত সংশোধনী না হওয়ায় ভেটিং নিয়ে কালক্ষেপণ করতে থাকে আইন মন্ত্রণালয়। এ নিয়ে দফায় দফায় আইনমন্ত্রীর অফিস ও বাসায় বৈঠক করেছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এরপর সমঝোতা হয় উভয় মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব পাশাপাশি রেখে এ সংক্রান্ত সারসংক্ষেপ তৈরি করার বিষয়টি।
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close