¦
অহেতুক মূল্যস্ফীতি হতে পারে

মিজান চৌধুরী | প্রকাশ : ১৮ ডিসেম্বর ২০১৫

জানুয়ারিতে নতুন পে-স্কেলের বকেয়াসহ বেতন বাবদ মোটা অংকের অর্থ বাজারে প্রবেশ করাকে কেন্দ্র করে অহেতুক মূল্যস্ফীতি হতে পারে বলে আশংকা বিশেষজ্ঞদের। তাদের মতে, পে-স্কেলের সুবিধাভোগীরা অতিরিক্ত অর্থ হাতে পেয়ে সঞ্চয়ের পাশাপাশি ভোগ-বিলাসমুখী হতে পারেন। ফলে খাদ্যের বাইরে বাড়তে পারে অন্যান্য পণ্যের ওপর চাপ। পাশাপাশি আয় বৃদ্ধির কারণে কর্মস্থলের পাশেই পরিবার-পরিজনকে রাখার প্রবণতা বাড়বে চাকরিজীবীদের। এতে চাপ বাড়তে পারে বাড়িভাড়ার ওপরও। আর এসব কারণে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন ঘোষণাকে পুঁজি করে সুযোগ নিতে পারেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। ক্রেতাদের জিম্মি করে পণ্য বাজারের ওপর বিক্রেতারা অযৌক্তিকভাবে চাপ ফেলতে পারেন। যেমনটি হয়েছিল গত বছরের ডিসেম্বরে। তখন নতুন পে-স্কেলসংক্রান্ত পে-কমিশনের সুপারিশ ফলাও করে মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছিল। যার প্রভাব পড়েছিল মূল্যস্ফীতির ওপর। সম্ভাব্য পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নিত্যপণ্যের বাজারের ওপর কঠোর মনিটরিংয়ের পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বৃহস্পতিবার টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, পে-স্কেলের কারণে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। কারণ মানুষের আয় বাড়লে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের চাহিদা বেড়ে যায়। কিন্তু অর্থনীতির সূত্র দেশের ভেতর অনেক সময় কাজ করে না। বিক্রেতারা অনেক সময় ক্রেতাকে জিম্মি করে রাখে। এতে কিছুটা চাপ সৃষ্টি সাময়িক হলেও দীর্ঘ মেয়াদি করতে পারবে না। তবে বাড়ি ভাড়ায় চাপ বাড়তে পারে। কারণ আয় বৃদ্ধির ফলে অনেকে চাইবেন নিজের কাছে পরিবার-পরিজনকে রাখতে। আগে তা সম্ভব ছিল না। এজন্য বাড়িভাড়াও বাড়তে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ২১ ডিসেম্বর অষ্টম জাতীয় পে-কমিশনের সুপারিশ জমা দেয়া হয় অর্থমন্ত্রীর কাছে। এরপর এক মাসের মাথায় অর্থাৎ জানুয়ারিতেই মূল্যস্ফীতি হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে দেখা গেছে, ডিসেম্বরে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। পরে জানুয়ারিতে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৬ দশমিক ২০ শতাংশে দাঁড়ায়। ওই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ০৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬ দশমিক ১১ শতাংশে উঠে। পাশাপাশি খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ০১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬ দশমিক ২০ শতাংশে উঠেছিল। মূল্যস্ফীতির আশংকা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বকেয়াসহ নতুন বেতন দেয়া হলেও দুটি কারণে মূল্যস্ফীতি হবে না। প্রথমটি হচ্ছে, জানুয়ারিতে চাকরিজীবীদের হাতে যে অতিরিক্ত টাকা যাবে, তা বরাদ্দ রেখেই চলতি বাজেট তৈরি করা হয়েছে। বেতন দিতে নতুন নোট ছাপানো হবে না। ফলে চলতি বাজেটের ৫ শতাংশ ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, বর্তমান কৃষি ও শিল্প উৎপাদন এবং পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য ও জ্বালানি তেলের মূল্য কমছে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও ভালো। তার মতে চাকরিজীবীদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ গেলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়বে। সেটি মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জানুয়ারির শুরুতেই সরকারি চাকরিজীবীদের হাতে আসবে নতুন পে-স্কেলের বকেয়াসহ বেতন বাবদ ৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। চলতি বছর সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন খাতে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৯ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা। এর ভেতর নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ১৫ হাজার কোটি টাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কারণ অষ্টম বেতন স্কেল বাস্তবায়ন করতে সরকারকে আগের বেতনের চেয়ে অতিরিক্ত আরও ১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে।
জুলাই থেকে অষ্টম বেতন স্কেল কার্যকর করা হবে। ওই হিসাবে জুলাই থেকে নভেম্বর এই ৫ মাসে নতুন পে-স্কেলে মোট বকেয়া বেতনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ডিসেম্বরের বেতনের সঙ্গে বকেয়া পাওনার ৫০ শতাংশ দেয়ার কথা। ফলে বকেয়া বেতনের ৫০ ভাগের পরিমাণ হচ্ছে ৩ হাজার ১২৫ কোটি টাকা এবং ডিসেম্বরে নতুন স্কেলে বেতনের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। যা সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের হাতে আসবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ উন্নয়ণ গবেষণা সংস্থা (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক এমকে মুজেরী যুগান্তরকে বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা গ্রস (সর্বমোট) বৃদ্ধির চেয়ে নিট (প্রকৃত) বৃদ্ধি কম হবে। কারণ অনেক ভাতাসহ মহার্ঘ্য ভাতা বন্ধ হয়ে যাবে। এছাড়া এর আগে পে-স্কেল ঘোষণায় বাজারে কিছুটা প্রভাব পড়েছিল। এবার মূল্যস্ফীতি যে হবে না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কারণ বেতনের কিছু অংশ অবশ্যই কেনাকাটায় ব্যয় হবে। সবটুকু সঞ্চয় করা হবে না। তবে তিনি বলেন, এ মুহূর্তে মূল্যস্ফীতির খুব বেশি চাপ নেই। সবমিলিয়ে অর্থনীতি ও বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে মূল্যস্ফীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে না বলে আমি আশা করছি। তবে অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে সিন্ডিকেট করতে না পারে, সে জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্লোজ মনিটরিং করা জরুরি। অন্যথায় তারা সুযোগ নিতে পারেন।
নতুন পে-স্কেলকে কেন্দ্র করে মূল্যস্ফীতির আশংকা নিয়ে সাধারণ মানুষও উদ্বিগ্ন। কারণ নতুন বেতনের সুবিধা পাবেন সাড়ে ১২ লাখ কর্মকর্তা ও কর্মচারী। কিন্তু পে-স্কেলের কারণে মূল্যস্ফীতি হলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ পড়বে। নিু ও মধ্যবিত্তদের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের বাজেট মেলাতে হিমশিম খেতে হবে।
এ ব্যাপারে ভোক্তা অধিকার অধিদফতেরর মহাপরিচালক আবুল হোসেন মিয়া বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, শুধু পে-স্কেলের কারণেই নয়, যে কোনো পরিস্থিতিতেই অযৌক্তিকভাবে পণ্যমূল্য বাড়লে তা কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা হবে। এ ব্যাপারে ভোক্তা অধিকার অধিদফতর কঠোরভাবে বাজার মনিটর করছে।
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close