¦
সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সুজনের সংশয়

যুগান্তর রিপোর্ট | প্রকাশ : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৫

পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীদের অন্তত ২২৪ জন বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোতে পারেননি। এসব প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসির নিচে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ৪০ জন, বিএনপিরও ৪০ জন। তবে এর বিপরীত চিত্রও রয়েছে। ৩৪১ জন øাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এ নির্বাচনে মেয়র পদে লড়ছেন। এবারের পৌর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৯০৪ মেয়র প্রার্থীর হলফনামা পর্যালোচনা করে এসব তথ্য তুলে ধরেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। সেই সঙ্গে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছে বেসরকারি এ সংগঠনটি। নানা অনিয়মের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের।
সুজনের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে ৬৫২ জন ব্যবসায়ী, শতকরা হিসাবে ৭২ দশমিক ১২ ভাগ। ৮৯ জন প্রার্থী নিজেকে কৃষক উল্লেখ করেছেন। এছাড়া এই ৯০৪ মেয়র প্রার্থীর মধ্যে ২১৯ জনের বিরুদ্ধে হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা রয়েছে। অর্থাৎ প্রতি চারজনের মধ্যে একজন মামলার আসামি। অতীতে মামলা ছিল, কিন্তু বর্তমানে নেই এমন প্রার্থী রয়েছেন ৩২১ জন। অতীতে মামলা ছিল, এখনও আছে এমন প্রার্থী ১২১ জন। শুক্রবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে মেয়র প্রার্থীদের বিষয়ে এসব তথ্য তুলে ধরে সুজন। পৌর নির্বাচনে ৯২৩ জন মেয়র প্রার্থী হলেও সুজন ৯০৪ জনের তথ্য প্রকাশ করেছে। বাকিদের হলফনামা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে তারা।
সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন অনিয়ম তুলে ধরে নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করেন সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, পৌর নির্বাচন নিয়ে সংশয় ও শংকা রয়েছে। দশম জাতীয় সংসদ, উপজেলা ও তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ওই সব নির্বাচন রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেক সমস্যার সৃষ্টি করেছে। পৌর নির্বাচনে ওই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ সৃষ্টি হলেও কমিশনের ভূমিকা হতাশাজনক।
মামলার আসামিদের মনোনয়ন দেয়ায় হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, বিএনপির প্রার্থীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলা থাকতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। তারপরও মামলা রয়েছে এমন ৩৩ জনকে মনোনয়ন দিয়েছে আওয়ামী লীগ। প্রার্থী বাছাইয়ে দলগুলোর মধ্যে গুণগত পরিবর্তন আসেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ সময় তিনি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সরকার, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, আইনশৃংখলা বাহিনী, নির্বাচন কর্মকর্তা ও ভোটারদের ইতিবাচক ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, নির্বাহী সদস্য ড. হামিদা হোসেন, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং সুজন কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার প্রমুখ।
৬ কারণে সংশয় : সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার ৬ কারণে পৌর নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। এগুলো হল- প্রথমত, পর্যাপ্ত জনবল থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন থেকে ২৩৪টি পৌরসভার মধ্যে ১৭৫টিতে জনপ্রশাসন থেকে রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে। এই রিটার্নিং অফিসাররা নির্বাচন কমিশনের সব ধরনের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করবেন কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। দ্বিতীয়ত, সম্ভাব্য প্রার্থীদের ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে, তাদের মনোনয়নপত্র দাখিল করা থেকে বিরত রাখার এবং মনোনয়নপত্র ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন থেকে এসব বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। তৃতীয়ত, একটি পৌরসভায় এক দলের পক্ষ থেকে একাধিক মনোনয়নপত্র দাখিল হলে সব কটি মনোনয়নপত্র বাতিলের বিধান রয়েছে। কিন্তু তিনটি পৌরসভায় আওয়ামী লীগ থেকে একাধিক প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও সব মনোনয়নপত্র বাতিল না করে, একজন করে প্রার্থীকে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণরূপে নির্বাচনী আইনের পরিপন্থী। এ বিষয়ে কমিশন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। চতুর্থত, সমর্থকের স্বাক্ষরে মিল না থাকা বা সমর্থক হিসেবে যার নাম তালিকায় আছে এমন ব্যক্তির লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অনেক বিদ্রোহী প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের অভিযোগ, সমর্থকদের ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে এমনটি করা হয়েছে। পঞ্চমত, ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যকে আচরণবিধি লঙ্ঘন করতে দেখা গেছে। কিন্তু কমিশন এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়নি। ষষ্ঠত, কোনো কোনো পৌরসভা থেকে জোর খাটিয়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করানোর অভিযোগ উঠলেও বিষয়টি নির্বাচন কমিশন তদন্ত করে দেখেনি।
প্রার্থীদের ৭২ ভাগ ব্যবসায়ী : সুজন জানিয়েছে, মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে ৭২ দশমিক ১২ ভাগের পেশা ব্যবসা। ৯০৪ জন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে ৬৫২ জন ব্যবসায়ী। আওয়ামী লীগের ২২১ প্রার্থীর মধ্যে এই সংখ্যা ১৬৫। অন্যদিকে বিএনপির ২০৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৬২ জন ব্যবসায়ী। অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র ৪৭৭ জন প্রার্থীর মধ্যে ৩১৫ জন ব্যবসায়ী। আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপি প্রার্থীদের মধ্যে ব্যবসায়ীর হার প্রায় ৪ ভাগ বেশি। অন্যান্য প্রার্থীর মধ্যে ব্যবসায়ীর হার এই দুটি রাজনৈতিক দলের চেয়ে কম। এছাড়া আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের মধ্যে ২০ জনের পেশা কৃষি, ৮ জন চাকরিজীবী, ৬ জন আইনজীবী, ৩ জন গৃহিণী ও অন্যান্য পেশার ১০ জন। অপরদিকে বিএনপির ২০৬ প্রার্থীর মধ্যে ১৯ জনের পেশা কৃষি, ১১ জন চাকরিজীবী, ৫ জন আইনজীবী, ১ জন গৃহিণী ও অন্যান্য পেশার ৫ জন।
মামলা : ৯০৪ জন মেয়র প্রার্থীর হলফনামা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২১৯ জনের বিরুদ্ধে বর্তমানে, ৩২১ জনের বিরুদ্ধে অতীতে এবং ১২১ জনের বিরুদ্ধে উভয় সময়ে মামলা আছে বা ছিল। আওয়ামী লীগের ২২১ প্রার্থীর মধ্যে বর্তমানে মামলার আসামি ৩৩ জন। অতীতে মামলা ছিল ১০২ জন এবং অতীতে ও বর্তমানে মামলার আসামি এমন প্রার্থী ২০ জন। অপরদিকে বিএনপির ২০৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ৯৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। অতীতে মামলা ছিল ১০৯ জনের নামে। ৬১ জন প্রার্থীর আগে মামলা ছিল, এখনও রয়েছে। মোট ৯০৪ জন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে ৩৬ জনের বিরুদ্ধে ৩০২ ধারায় হত্যা মামলা রয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ৭ জন, বিএনপির ১৫ জন ও অন্যান্য ১৪ জন।
শিক্ষাগত যোগ্যতা : ৯০৪ জন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে ৩৪১ জনের শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক বা স্নাতকোত্তর বলে হলফনামায় উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ৯০ জন ও বিএনপির ৮৩ জন এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র ১৬৮ জন। এছাড়া ২২৪ জন বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোতে পারেননি।
আয় : সুজন মনে করে, প্রার্থীদের বেশির ভাগই হলফনামায় আয়-ব্যয় সম্পর্কে সঠিক তথ্য দেননি। তবে হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, ৯০৪ জন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে ৬৩৪ জন বছরে ৫ লাখ টাকা বা তার কম আয় করেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ১২৫ জন, বিএনপির ১৪৪ জন এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র ৬৩৪ জন প্রার্থী রয়েছেন। মেয়র প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৮ জন বছরে কোটি টাকার বেশি আয় করেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ৫ জন, বিএনপির ২ জন ও অন্যান্য ১ জন।
সম্পদ : হলফনামায় দেখা গেছে, মেয়র প্রার্থীর মধ্যে কোটিপতির সংখ্যা ৪৭ জন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ২০ জন, বিএনপির ১৩ জন এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ১৪ জন। বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোটিপতি প্রার্থীর সংখ্যা বিএনপির তুলনায় আওয়ামী লীগে বেশি।
দায়দেনা ও ঋণ : ৯০৪ জন মেয়র প্রার্থীর হলফনামায় দেখা গেছে, ঋণগ্রহীতা ১৪৬ জন। এদের মধ্যে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন ৪৮ জন ও বিএনপির ৪২ জন এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র ৫৫৬ জন। কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছেন ১৮ জন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ৫ জন, বিএনপির ৭ জন এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র ৬ জন।
সংবাদ সম্মেলনে ড. হামিদা হোসেন বলেন, ‘আমরা দেখছি যে, পৌর নির্বাচনে প্রার্থী, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য কর্তৃক উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে মহান বিজয় দিবসেও কয়েকটি এলাকায় কয়েকজন মন্ত্রী-এমপির বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। কমিশনের উচিত নিজ উদ্যোগে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা খতিয়ে দেখা, যাতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।’
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close