¦
বাড়ছে নির্বাচনী সংঘাত

হাবিবুর রহমান খান | প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর ২০১৫

পৌরসভা নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে নির্বাচনী সংঘাত। দিন দিন সহিংস হয়ে উঠছে পৌর নির্বাচনের পরিবেশ। প্রতিপক্ষের ওপর হামলা-পাল্টা হামলা, গুলি, গাড়ি ভাংচুর, প্রচারে বাধাসহ প্রতিদিনই ঘটছে সংঘর্ষের ঘটনা। এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত একজন নিহত এবং শতাধিক আহত হয়েছেন। হামলা থেকে রেহাই পাচ্ছেন না রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতাসহ সাংবাদিকরাও। অধিকাংশ ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনসহ নির্বাচন কমিশন (ইসি) একরকম নির্বিকার। কোনো কোনো স্থানে নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা কঠোর হলেও তাতে তোয়াক্কা করছেন না প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। এ অবস্থার পরিবর্তন না হলে নির্বাচনের দিন তারা ভোটকেন্দ্রে যাবেন কিনা তা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা সংশয়। নির্বাচনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা এবং নির্বিঘ্নে ভোটারদের ভোট দেয়া নিশ্চিত করতে আইনশৃংখলা বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনী মোতায়েন করা যেতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা। যদিও নির্বাচন কমিশন মঙ্গলবারও বলেছে, সেনা মোতায়েনের মতো পরিস্থিতি এখনও সৃষ্টি হয়নি।
নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে কিছুটা অনীহা কাজ করছে। শান্তিপূর্ণ ভোট হবে কিনা সেই ব্যাপারে আস্থাশীল হতে পারছেন না তারা। ভোটারদের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই সেনা মোতায়েন প্রয়োজন। সেনাবাহিনীর উপস্থিতিই জনগণ ও প্রার্থীদের আস্থা ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট বলে মনে করেন তারা। অনেকের মতে, শুধু সেনা নামালেই নির্বাচন সুষ্ঠু হবে এমনটা বলা যাবে না। সেনা নামিয়ে তাদের ব্যারাকে রেখে দিলে কোনো লাভ হবে না। তাই সেনা নামানোর আগে নির্বাচন কমিশনকে সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে সিরিয়াস হতে হবে। অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানে তাদের সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে হবে। ইসির সদিচ্ছা না থাকলে সেনা নামিয়েও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
সোমবার এক অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সেনা মোতায়েনের দাবি জানান। এছাড়া মঙ্গলবার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়েছেন বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনে কে সেনা চাইল বা কে চাইল না সেটা মুখ্য বিষয় নয়। নির্বাচন কমিশন মনে করে কিনা সেটাই বড়। মূলত দুটি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। প্রথমত, নির্বাচনের জন্য আইনশৃংখলা বাহিনী যথেষ্ট কিনা; দ্বিতীয়ত, ভোটারদের মনে অস্বস্তি বা ভয় আছে কিনা।
তিনি বলেন, সারা দেশের ২৩৪টি পৌরসভায় নির্বাচন হচ্ছে। আমাদের পুলিশ ফোর্স যথেষ্ট নেই। পুলিশ তো শুধু নির্বাচন নিয়েই থাকবে না, তাদের অন্যান্য কাজও সামাল দিতে হচ্ছে। পুলিশের পর রয়েছে বিজিবি। তাদের কাজ সীমান্ত রক্ষা। সেটা বাদ দিয়ে তো নির্বাচনের কাজে লাগানো যাবে না। সবশেষ হচ্ছে সেনাবাহিনী। সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, নির্বাচনের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখার দায়িত্বে যারা আছেন তাদের নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে। কিন্তু গত কয়েকদিনে যেসব ঘটনা ঘটেছে তার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি। রাস্তার পাশে আগুন জ্বললেও পুলিশের তৎপরতা নেই।
বর্তমান কমিশনের কার্যক্রমের সমালোচনা করে তিনি বলেন, যেসব এলাকায় সংঘর্ষ হচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে ওইসব এলাকার নির্বাচন বন্ধ করে দেয়া হোক। মেয়র প্রার্থীদের প্রার্থিতা বাতিল করা হলে বাকি এলাকায় এমনিতেই পরিবেশ ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং ভোটারদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য যা যা করা প্রয়োজন ইসিকে তাই করতে হবে। তারা যদি মনে করে, এজন্য সেনাবাহিনী প্রয়োজন তবে অবশ্যই তা করতে হবে। সাংবিধানিকভাবে তাদের সেই ক্ষমতা রয়েছে। তারা সরকারের কাছে সেনা চাইতে পারেন। সরকার না দিলে সেই দায়ভার সরকারের।
ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্সের (ফেমা) সভাপতি মুনিরা খান যুগান্তরকে বলেন, আসন্ন পৌর নির্বাচনের সময় সেনা মোতায়েন প্রয়োজন। নির্বাচনে শুধু সেনাবাহিনীর উপস্থিতিই জনগণ ও প্রার্থীদের আস্থা ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট। ইসি চাইলেই নির্বাচনের সময় সেনাবাহিনী ও বিজিবি মোতায়েন করার ক্ষমতা রাখে। পৌর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখন দেশের বিভিন্ন জায়গায় যে সংঘর্ষ হচ্ছে, তা আর বাড়তে দেয়া উচিত হবে না। আমরা চাই না নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একজনের প্রাণহানি হোক। নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য ইসির সব ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। পরিস্থিতি যদি সেনাবাহিনী মোতায়েনের মতো হয় তবে অবশ্যই ইসির তা করা উচিত। সেনাবাহিনীর উপস্থিতিই পরিবেশ সুশৃংখল করতে পারবে। একইসঙ্গে ভোটারদের মনে আস্থাও ফিরে আসবে।
নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম সম্পর্কে মুনিরা খান বলেন, ইসির প্রশাসনিক জনবল আরও বেশি পরিমাণে থাকা উচিত ছিল। একইসঙ্গে নির্বাচন যে সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হবে সে সম্পর্কে জনগণের মনে আস্থা তৈরির জন্য যেই অভিযোগই আসুক না কেন তার দ্রুত তদন্ত করতে হবে। আর যারা এই অভিযোগ করছেন তাদেরও জানিয়ে দিতে হবে যে ইসি তাদের করা অভিযোগ আমলে নিয়ে তার তদন্ত করেছে। আর তা না করলে কিন্তু জনগণের নির্বাচনের বিষয়ে আর আস্থা থাকবে না।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নির্বাচনের আগে সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোতে আইনশৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এবং আচরণবিধি লংঘনের ঘটনায় তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি ইসি। কৌশলে তাদের সব ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছেন মাঠ প্রশাসনের কাছে। জনপ্রশাসন থেকে আসা নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মাঠ প্রশাসন কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে সহিংসতার মাত্রা ততো বেড়ে চলেছে। বিশেষ করে ধীরে ধীরে বেপরোয়া হয়ে উঠছে ক্ষমতাসীন দলের মেয়র প্রার্থী ও সমর্থকরা। প্রথমদিকে প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি দেখালেও গত কয়েকদিন ধরে চলছে সরাসরি হামলা। শুধু প্রতিপক্ষ দলের প্রার্থী ও সমর্থকরাই নয়, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারাও হামলা থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। বিএনপির পাশাপাশি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের মধ্যেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। এছাড়া কোনো কোনো স্থানে বিএনপি ও তাদের বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যেও ঘটছে সংঘর্ষের ঘটনা। সম্প্রতি গফরগাঁওয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিত দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে এক প্রার্থীর মা নিহত হন। সোমবার সরিষাবাড়ীতে বিএনপির দুই গ্র“পে গোলাগুলি হয়। একই দিন কুমিল্লায় বিএনপির ঘরোয়া সভা চলাকালে মেয়র প্রার্থীর গাড়িতে বোমা বিস্ফোরণ এবং আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী ও বিদ্রোহীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এছাড়া ওইদিন সাভারে সংবাদ সম্মেলন চলাকালে বিএনপির মেয়র প্রার্থী বদিউজ্জামানের বাড়িতে হামলা চালায় ক্ষমতাসীনরা।
মঙ্গলবারও দেশের বিভিন্ন জায়গায় হামলা, ভাংচুর ও গুলির ঘটনা অব্যাহত ছিল। পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরীর গাড়িতে হামলা চালানো হয়। কুমিল্লার চান্দিনায় দলীয় মেয়র প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে অংশ নিতে গিয়ে হামলার শিকার হন বিএনপির প্রচার সম্পাদক ও সাবেক বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক। ভাংচুর করা হয় তার গাড়িও। পোস্টার লাগানোর সময় বগুড়ায় বিএনপির তিন কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থককে আটকে রেখে নির্যাতন করে ক্ষমতাসীনরা। সংঘর্ষের পাশাপাশি বিভিন্ন পৌরসভায় মেয়র প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের ভয়ভীতি এমনকি প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদেরও হাত-পা কেটে নেয়ার হুমকি দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জানতে চাইলে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার জন্য নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ ভূমিকা ও দৃঢ়তা অপরিহার্য। কিন্তু তারা তাদের সেই নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারেনি। বিগত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তাদের সক্ষমতার অভাব পুরোপুরি ফুটে ওঠে। এরই মধ্যে তাদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন যদি সিরিয়াস হয় এবং নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবে এমনটা মনে করলেই সেনাবাহিনী নামিয়ে ফল পাওয়া যাবে। অন্যথায় সেনাবাহিনী নামালেও ইতিবাচক কোনো ফলাফল বয়ে আনবে না। লোক দেখানোর জন্য সেনা নামিয়ে তাদের ব্যারাকে রেখে দিলে কী লাভ হবে। তাই সেনাবাহিনী নামানোর আগে নির্বাচন কমিশনকে সুষ্ঠু নির্বাচনের সদিচ্ছা দেখাতে হবে।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, সেনাবাহিনী নামানোর বিষয়টি সম্পূর্ণ নির্বাচন কমিশনের ওপর নির্ভর করছে। সারা দেশে নির্বাচনী পরিবেশ পর্যালোচনা করে দেখবে আদৌ সেনাবাহিনীর প্রয়োজন আছে কিনা। তবে আমার মতে এই মুহূর্তে সেনাবাহিনী নামালেই নির্বাচন সুষ্ঠু হবে এটা বলা যাবে না।
কারণ, সেনাবাহিনীর প্রস্তুতির ব্যাপার আছে। তাদের ডাকলেই নির্বাচন কমিশন পেয়ে যাবে এমনটা বলা যাবে না। অতীতে ডেকেও পায়নি। এছাড়া নির্বাচন পরিচালনার জন্য আইনশৃংখলা বাহিনীর অংশ থেকে সেনাবাহিনীকে বাদ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সেনাবাহিনী না নামিয়ে নির্বাচন কমিশন প্রয়োজন মনে করলে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য সংখ্যা বাড়াতে পারে।
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close