¦

এইমাত্র পাওয়া

  • রাজশাহীর বাগমারায় কাদিয়ানি মসজিদে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় অজ্ঞাতদের আসামি করে পুলিশের মামলা || রূপপুর বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণের জন্য রুশ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি সই || নাটোরের ভাষা সৈনিক দৌলতজ্জামান ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)
শ্বাসরুদ্ধকর ১৫ ঘণ্টা

যুগান্তর রিপোর্ট | প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর ২০১৫

মিরপুরে একটি ভবনে বৃহস্পতিবার জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের সময় আইনশৃংখলা বাহিনীর সতর্ক অবস্থান। উদ্ধার করা বিস্ফোরক (ইনসেটে) -যুগান্তর

বুধবার গভীর রাত। মিরপুর-১ নম্বর সেকশনের ‘এ’ ব্লকের ৯ নম্বর সড়কের ৩ নম্বর বাড়িটি ঘিরে ফেলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তারপর ছয়তলা ওই বাড়িটিতে রাত ১টা থেকে শুরু করে বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত চলে অভিযান। প্রায় ১৫ ঘণ্টার এ অভিযানে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরকসহ নিষিদ্ধ ঘোষিত জেএমবির (জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ) সাত সদস্যকে আটক করা হয়। উদ্ধারকৃত বিস্ফোরকের মধ্যে রয়েছে ১৬টি হাতে তৈরি গ্রেনেড, দুটি হাতবোমা, কয়েকটি সুইসাইডাল ভেস্ট (আত্মঘাতী হামলায় বোমা বহনে ব্যবহৃত বিশেষ ধরনের বেল্ট), ১৬ রাউন্ড গুলি, দুটি পাইপ বোমা ও দুই শতাধিক গ্রেনেড তৈরির উপকরণ। এ অভিযানে ডিবির সঙ্গে অংশ নেয় র‌্যাব ও সোয়াত টিমের সদস্যরা। উদ্ধারকৃত গ্রেনেড ও বোমা পাশের একটি মাঠে নিয়ে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। জঙ্গি আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত এ বাড়িটির জমির মালিক স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আবুল হোসেন ভূঁইয়া।
শ্বাসরুদ্ধকর এ অভিযানে নেতৃত্ব দেয়া ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, এটি ছিল একটি হাইপ্রোফাইল অভিযান। বুধবার জেএমবির এক সদস্যকে আটক করা হয়। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয় মিরপুরের এই বাড়িটিতে। সেখানে অভিযানে গেলে এক পর্যায়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুড়ে মারা হয়। তবে এতে কেউ হতাহত হননি। অভিযানের সময় বাড়িটি উড়িয়ে দেয়ারও হুমকি দেয় জঙ্গিরা। তবে শেষ পর্যন্ত বাড়ির বাসিন্দাদের নিরাপদে বের করে এনে আটক করা হয় সাত জঙ্গিকে। এদের মধ্যে ৩ জন জেএমবির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তারা কলেজছাত্র পরিচয় দিয়ে ওই বাড়ি ভাড়া নিয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের ডিবি কার্যালয়ে নেয়া হয়েছে। আটক ৭ জনের বয়স ২২ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে।
মনিরুল ইসলাম আরও জানান, এর আগে ঢাকার হোসনি দালানে হামলার পর ও কামরাঙ্গীরচরে জঙ্গিদের একটি আস্তানা থেকে উদ্ধার হওয়া বোমা এবং বিস্ফোরকের সঙ্গে এসব বিস্ফোরকের মিল রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, একই দলের লোকজন এগুলো তৈরি করেছে। সম্ভবত হোসনি দালানে হামলায় ব্যবহৃত বিস্ফোরকগুলো মিরপুরের এই বাড়িতেই বানানো হয়েছিল।
এদিকে অভিযানে অংশ নেয়া গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার মাশরুকুর রহমান খালেদ অভিযান শেষে যুগান্তরকে বলেন, সাম্প্রতিক সময় বাংলাদেশে যেসব জঙ্গিবিরোধী অভিযান চালানো হয়েছে তাতে এ ধরনের সুইসাইডাল ভেস্ট পাওয়ার নজির এটাই প্রথম।
যা ঘটেছে ১৫ ঘণ্টায় : অভিযানে অংশ নেয়া সূত্র জানায়, রাতে মিরপুরের ওই বাড়িটিতে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময়ই পুলিশের অস্তিত্ব টের পেয়ে জঙ্গিরা সব দরজা বন্ধ করে দেয়। জোর করে ভেতরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হাতে তৈরি গ্রেনেড ছুড়ে মারা হয় পুলিশকে লক্ষ্য করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ গুলি ছোড়ে। একপর্যায়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বাড়িটি উড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেয় জঙ্গিরা। কৌশল হিসেবে পুলিশ পিছিয়ে আসে। ভোরের দিকে বাড়ানো হয় পুলিশের সংখ্যা। অভিযানে যুক্ত হয় র‌্যাব, বোমা বিশেষজ্ঞ দল ও বিশেষ প্রশিক্ষিত টিম সোয়াতের সদস্যরা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আড়াইশ’র বেশি সদস্য যোগ দেয় অভিযানে। নির্দেশনা দিতে ছুটে যান ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেয়া হয় বাড়ির অন্য বাসিন্দাদের। আশপাশের ভবনের বাসিন্দাদেরও সরিয়ে নেয়া হয়। এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে আতংক। এরই মধ্যে চলতে থাকে জঙ্গি আটকের অভিযান। একপর্যায়ে জঙ্গি আস্তানায় ঢুকে পড়েন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা। দুই ইউনিটের বাড়ির ৬ তলার ওই মেসটিতে দেখা যায় বিস্ফোরকের ছড়াছড়ি। রান্নাঘর, টয়লেট, খাটের নিচে, বারান্দা, এমনকি সানশেডের ওপরও মজুদ রাখা নানা বিস্ফোরক। লোহার ট্রাঙ্কভর্তি তাজা গ্রেনেড খুঁজে পায় পুলিশ। বেশ কিছু বোমা ও বিস্ফোরক ছিল কাপড়ে পেঁচানো অবস্থায়। বোমা বিশেষজ্ঞ দলের সদস্যরা সতর্কতার সঙ্গে এসব বিস্ফোরক বের করে আনেন। তারপর পাশের একটি মাঠে নিয়ে গিয়ে নিষ্ক্রিয় করা হয় তাজা গ্রেনেড ও বোমাগুলো। উদ্ধারকৃত বিস্ফোরক দিয়ে শক্তিশালী ২০০টির বেশি বোমা ও গ্রেনেড তৈরি করা সম্ভব ছিল বলে জানান অভিযানে অংশ নেয়া পুলিশ কর্মকর্তারা।
এদিকে অভিযানে অংশ নেয়া এক পুলিশ সদস্য আশংকা প্রকাশ করেছেন, ৭ জনকে আটক করা হলেও বাড়ির অন্য ভাড়াটিয়াদের বের করে আনার সময় গোপনে জঙ্গিদেরও মধ্য থেকেও কেউ কেউ বের হয়ে যেতে পারে। আটক জঙ্গিদের বিরুদ্ধে বৃহস্পতিবার রাত ৯টা পর্যন্ত শাহ আলী থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছিল।
ডিবি পুলিশের বোম ডিসপোজাল ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার সানোয়ার হোসেন বলেন, আমরা বাড়ির মালিক আবুল হোসেন ভূঁইয়ার কাছ থেকে তালিকা নিয়ে কোন ভাড়াটিয়া কতদিন আগে উঠেছেন, তাদের পেশা কি এসব তথ্য নিয়েছি।
পুলিশকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড : বাড়ির তৃতীয় তলার বাসিন্দা ফাতেমা বেগম যুগান্তরকে জানান, রাত ১টার দিকে সাদা পোশাকে ডিবি পুলিশের একটি দল বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে। সোয়া ১টার দিকে তারা ৬ তলার পেছনের দিকের ফ্ল্যাটে যান। তখন বাড়ির অধিকাংশ বাসিন্দা ঘুমাচ্ছিলেন। দরজা বন্ধ পেয়ে পুলিশ দরজা ভাঙার চেষ্টা করে। ওই শব্দে তিনি জেগে ওঠেন। সে সময় তিনি বিস্ফোরণ ও গুলি ছোড়ার শব্দ শুনতে পান। ফজরের আজানের পরপর পুলিশ বাড়ির বাসিন্দাদের নামিয়ে দেয়। সকাল ৮টা থেকে আশপাশের ভবনের লোকজনকেও নিরাপদে সরে যেতে বলা হয়। তবে অভিযানের খবরে এলাকায় বিপুলসংখ্যক উৎসুক মানুষ ভিড় করেন। এ সময় আশপাশের সড়কে যানজট দেখা দেয়।
বাড়ির মালিক আওয়ামী লীগ নেতা : মিরপুর-১ নম্বর সেকশনের এই বাড়িটির জমির মালিক আবুল হোসেন ভূঁইয়া আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতা। তিনি একটি ডেভেলপার কোম্পানিকে দিয়ে ৬ তলা বাড়িটি নির্মাণ করান। দুই মাস আগে আবুল হোসেন ভূঁইয়া মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার দুই মাস আগে তিনি ৬ তলার পেছনের দিকের ফ্ল্যাট মেস হিসেবে ভাড়া দেন।
কলেজছাত্র পরিচয়ে মেস ভাড়া : বাড়ির মালিক আবুল হোসেন পুলিশকে জানান, মিরপুর বাঙলা কলেজ ও মিরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ছাত্র পরিচয়ে তিন যুবক মেস হিসেবে ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেয়। সেখানে বেশ কয়েকজন ব্যাচেলর থাকত। যাদের তিনি ‘ছাত্র’ হিসেবেই জানতেন। তারা ভাড়া দেয়ার সময় যেসব পরিচয়পত্র ও নাম ঠিকানা দিয়েছে, পুলিশ যাচাই করে সেসব পরিচয়পত্র ও নাম ঠিকানা ভুয়া বলে প্রমাণ পেয়েছে। ঘটনাস্থলে কারও কারও আইডি কার্ড পাওয়া গেছে। সেগুলোও ভুয়া বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এলাকায় আতংক : স্থানীয় বাসিন্দা হোসনে আরা বেগম যুগান্তরকে বলেন, এ বাড়িতে জঙ্গি আছে সেটা স্বপ্নেও ভাবিনি। এলাকার অপর বাসিন্দা তারেক জানায়, কম বয়সী কিছু ছেলেকে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে আসা-যাওয়া করতে দেখেছি। কিন্তু তারা যে জঙ্গি সেটা বুঝতেই পারিনি। একই এলাকার বাসিন্দা সিরাজ জানান, তিনি মতিঝিলে একটি বেরসকারি অফিসে চাকরি করেন। এ ঘটনার কারণে তিনি অফিসে যেতে পারেননি। পুলিশ সবাইকে বাসার ভেতরেই থাকতে বলেছে।
পাশের বাড়ির মালিক হাসিনা বেগম বলেন, মাঝরাতে হঠাৎ চিৎকার-চেঁচামেচি শুনি। এরপর শুনি পুলিশ এসেছে, কাউকে বের হতে দিচ্ছে না। সারারাত টেনশনে ছিলাম। সকাল হতেই পুলিশ-র‌্যাবের গাড়িতে এলাকা ভরে যেতে দেখি। বিকালে অভিযান শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত বাড়িটির বাইরে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ও র‌্যাব-পুলিশের বিপুলসংখ্যক সদস্যকে অবস্থান করতে দেখা যায়।
অভিযানে অংশ নেন যারা : চাঞ্চল্যকর এ অভিযানে প্রথমে অংশ নেয় মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। তাদের সহযোগিতা করার জন্য যায় শাহ আলী থানা পুলিশ। মিরপুর ও রাজারবাগ থেকেও অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য নেয়া হয়। সকালে আসে র‌্যাব-৪ এর অধিনায়কসহ বড় একটি দল। এছাড়া অভিযানে যোগ দেয় বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত দল সোয়াত। অভিযান তদারকি করেন ডিবি পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম। ডিবির উপপুলিশ কমিশনার মাশরুকুর রহমান খালেদ, বোম্ব ডিসপোজাল টিমের প্রধান এডিসি ছানোয়ার হোসেন, সোয়াত টিমের প্রধান এডিসি সাইফুল ইসলাম প্রমুখ।
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close