¦
কঠিন পরীক্ষার সামনে নির্বাচন কমিশন

আবদুল্লাহ আল মামুন | প্রকাশ : ২৯ ডিসেম্বর ২০১৫

প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে পৌর নির্বাচন নিয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি নির্বাচন কমিশন। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে ইসিকে এ ধাপ পার হতে হবে। এ লক্ষ্যে ভোট গ্রহণ ও ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। যে কোনোদিকে হেলে পড়লে প্রশ্নবিদ্ধ হবে সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা। এজন্য ইসিকে কঠোর হাতে আইন প্রয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। অন্যথায় কমিশনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবে বলে তারা আশংকা প্রকাশ করেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামীকাল বুধবারের নির্বাচন নিয়ে সরকার, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিও এক ধরনের পরীক্ষায় নেমেছে। সরকারকে প্রমাণ করতে হবে পৌর নির্বাচন উপলক্ষে তারা ইসির ওপর কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করেনি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিকে প্রমাণ করতে হবে তারা জনগণের প্রিয় রাজনৈতিক দল। জনগণ তাদের ওপর আস্থা রাখতে চায়। তারা জোর করে কেন্দ্র দখল বা ব্যালট ছিনতাই করে জয়লাভ করেনি। তারা জনগণের ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। একইভাবে ইসিকে প্রমাণ করতে হবে তারা সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করেছে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের পৌর নির্বাচনে আদর্শ অবস্থানে নেই কোনো পক্ষ। সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা প্রভাব খাটিয়ে আচরণবিধি লংঘন করেছেন। সরকারি দলের প্রার্থী ও সমর্থকরা প্রতিপক্ষের ওপর হামলা চালিয়েছে। বিএনপির প্রার্থীরা যেখানে শক্তিশালী সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বীকে ধাওয়া করেছেন। ইসিও বিধি ভঙ্গকারী মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেনি। সব ক্ষমতা থাকার পরও তা প্রয়োগ করেনি। তফসিল ঘোষণার পর থেকে ক্ষমতা প্রয়োগ না করায় ইসির কার্যক্রম ইতিমধ্যেই বিতর্কিত হয়ে পড়েছে। এখন বাকি শুধু ভোট গ্রহণ ও ফল প্রকাশ। এ দুটি ধাপে যদি নির্বাচন কমিশন কঠোর হাতে ক্ষমতা প্রয়োগ না করে তবে কঠিন পরীক্ষায় উৎরানো তাদের পক্ষে সহজ হবে না বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, এ পৌরসভা নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা। সিটি কর্পোরেশন ও উপজেলা নির্বাচনে ইসির ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এবার পৌরসভা নির্বাচনে আচরণবিধি প্রতিপালনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে নির্বিকার দেখা যায়। তবে আমরা আশা করছি, আগামী দু’দিন কমিশন কঠোর পদক্ষেপ নেবে যাতে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়।

নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের। তাদের মতে, ইসিকে সংবিধান, আইন ও বিধি-বিধানের মাধ্যমে অনেক ক্ষমতা দেয়া আছে। প্রয়োজন মতো ক্ষমতাগুলো প্রয়োগ করা হলে নির্বাচন কমিশন প্রকৃত অর্থেই গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে। কিন্তু দলীয় সরকারের অধীনে বেশির ভাগ নির্বাচনে ইসি তাদের ক্ষমতা যথাযথভাবে প্রয়োগ করে না। তাই একদিকে যেমন নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি সংকট তৈরি হয়েছে, তেমনি সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে সরকারের। বুধ্বারের পৌর নির্বাচনে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রসঙ্গে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং ভোটারদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য যা যা প্রয়োজন ইসিকে তাই করতে হবে। সাংবিধানিকভাবে তাদের সেই ক্ষমতা রয়েছে। যদিও সেই ক্ষমতার বাস্তবায়ন চোখে পড়ছে না। এদিকে স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসি শুধু খাতা-কলমে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান নয়। তাদের নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করার সক্ষমতা আছে। রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তারা সে প্রমাণ দিয়েছে। এবার দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠেয় পৌরসভা নির্বাচনে সে প্রমাণ দিতে পারলে সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানটির প্রতি জনগণের আস্থা ফিরে আসবে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বাধীন ইসির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আর এক বছর পরই। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিইসিসহ কমিশনাররা বিদায় নেবেন। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ এ সময়ে চার সিটি কর্পোরেশন (খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট) নির্বাচন ছাড়া তাদের আর কোনো অর্জন নেই। ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর উপজেলা এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নিজেদের ভাবমূর্তি চরমভাবে জলাঞ্জলি দেয় এ কমিশন। তাই নিজেদের মেয়াদের শেষ দিকে এসে দলীয় প্রতীকের এ পৌর নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে শেষ করা তাদের জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ, ঠিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের একটি বড় সুযোগও বলে মনে করেন তারা।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দলীয় প্রতীকে প্রথমবার পৌরসভার মেয়র নির্বাচন হওয়ায় সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশের মোকাবেলা করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। শুধু দলীয় প্রতীকের কারণেই জাতীয় নির্বাচনে আবহ তৈরি হয়েছে এ নির্বাচন ঘিরে। তাই আইনশৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, ভোটারদের ভয়ভীতি ছাড়াই নির্বিঘ্নে ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি, শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ, ভোট কারচুপি ও জালিয়াতি রোধ, সুষ্ঠুভাবে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন করে গণনা এবং ভয়ভীতি উপেক্ষা করে জনরায় প্রকাশের ব্যবস্থা করা নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জের বসুরহাট পৌরসভায় বিএনপির মেয়র প্রার্থীর পক্ষে গণসংযোগকালে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার আন্দোলনের অংশ হিসেবে এ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিয়েছে। সরকার ও নির্বাচন কমিশনের জন্য এ নির্বাচন একটি অগ্নিপরীক্ষা। তিনি বলেন, সারা দেশে পৌরসভা নির্বাচন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হলে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে। সরকার ও নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা যাতে করে সব পৌর এলাকার ভোটাররা নির্ভয়ে নির্বাচন কেন্দ্রে গিয়ে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপির নেতা মওদুদ আহমদের এ বক্তব্য গণতন্ত্রের জন্য খুবই ইতিবাচক। তাদের যুক্তি ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে টানা তিন মাস সারা দেশে অবরোধ চালানোর পর সিটি নির্বাচনে বিএনপির ফিরে আসাটাও গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক ঘটনা। কিন্তু ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়ে তারা চরমভাবে হোঁচট খায়। এবার তেমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে দলটি এ সরকারের অধীনে যে কোনো নির্বাচনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। তাই দেশের অন্যতম একটি প্রধান বিরোধী দলের আস্থা ফিরিয়ে আনতে আগামীকাল বুধবারের এই পৌরসভা নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ হওয়া জরুরি বলে মনে করেন তারা।

যদিও ইসির ভূমিকায় শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে দেশবাসী। তারা পৌর নির্বাচন শুরু থেকে কঠোর হতে পারেনি বা হয়নি। মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লংঘনের অভিযোগ উঠলেও যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রবল ক্ষমতাধরদের কারণ দর্শাও নোটিশ দিয়ে দায় সেরেছে নির্বাচন কমিশন। এ অবস্থায় ইসির কর্মকর্তারা মনে করছেন, পৌর নির্বাচনে নির্বাচনী কাজে যুক্ত কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করা কঠিন হবে। কারণ রিটার্নিং অফিসারদের বেশিরভাগই রয়েছেন সরকারি কর্মকর্তা। তারা ক্ষমতাসীনদের চাপ উপেক্ষা করে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করবেন না। ক্ষমতাসীনদের কথামতোই চলবেন তারা। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে নির্ভর করতে হবে তাদের অফিসারদের ওপর। তাই কর্মকর্তাদের সরকারের চাপ সামাল দিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনকেই ভূমিকা রাখতে হবে। এটা তাদের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না- এমন কোনো আশংকা নেই। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হবে না, এ অভিযোগও সত্য নয়। কারণ এখানে সরকারি দল বাড়তি সুবিধা দূরের কথা ন্যায্য সুবিধাই পাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন বিএনপির পক্ষে গেছে। তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। এ নির্বাচনে বিএনপির চেয়ারপারসন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া থেকে শুরু করে সাবেক উপরাষ্ট্রপতি ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদসহ সব শীর্ষ নেতা প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। কিন্তু আমরা অর্থাৎ সরকারি দলের ক্ষেত্রে কী হচ্ছে? আমাদের জেলা পর্যায়ের নেতারাই প্রচারণা চালাতে পারছেন না। কারণ তারা সংসদ সদস্য। আমরা এ বিষয়টি বিবেচনার জন্য নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেছিলাম। কিন্তু ইসি তা গ্রাহ্য করেনি।


 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close