¦
সরকারের সহায়তা ছাড়া ইসির পদক্ষেপ নিষ্ফল

শেখ মামুনূর রশীদ | প্রকাশ : ২৯ ডিসেম্বর ২০১৫

নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) যতই শক্তিশালী করা হোক না কেন, সরকারের কার্যকরী সহযোগিতা ছাড়া অবাধ, সুষ্ঠু ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা প্রায় অসম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলসহ নির্বাচনে অংশ নেয়া সব দলকেই ইসির প্রতি আস্থাশীল হওয়ার কথা বলেছেন তারা। অন্যথায় ইসির নেয়া সব পদক্ষেপই নিষ্ফল হবে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় দেশের ২৩৫টি পৌরসভার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু ঘটনায় ইসির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। আচরণবিধি লংঘনসহ বিভিন্ন স্থানে সহিংস ঘটনায় তেমন কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে পারেনি নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা। এ ব্যাপারে অসহায়ত্ব প্রকাশ করে এক পর্যায়ে ইসির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতাও চাওয়া হয়েছে। তবে ভোটের দিন ইসি কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়াও নির্বাচনী কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, পুলিশ, র‌্যাব, আনসার-ভিডিপি, বিজিবিসহ আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কতটুকু নির্মোহভাবে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তার ওপর নির্ভর করছে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন।
বিশ্লেষকরা আরও জানান, যত অনিয়মই হোক না কেন নির্বাচনের ফল ঘোষণা না করা পর্যন্ত সব রাজনৈতিক দলকে সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে। অপেক্ষা করতে হবে নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা পর্যন্ত। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মতো ভোট চলাকালীন নির্বাচনী মাঠ থেকে নিজেদের প্রত্যাহারে সংস্কৃতি বর্জন করতে হবে দলগুলোকে। নির্বাচন চলাকালীন কোনো অভিযোগ থাকলে, তা যথাযথ কর্তৃপক্ষে কাছে লিখিত অভিযোগ করতে হবে সংশ্লিষ্টদের।
তবে ভোট গ্রহণের দিন মিডিয়ার ওপর কড়াকড়ি আরোপ শিথিল করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। তারা জানিয়েছেন, নির্বাচন সষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য করতে মিডিয়া বড় ধরনের ভূমিকা রাখে। প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় নির্বাচনের অনিয়মের সংবাদ ও ছবি প্রকাশ অথবা প্রচার করা হলে সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে ইসির জন্য সহজ হবে।
যদিও সোমবার ভোট সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ হবে বলে আশ্বস্ত করেছে নির্বাচন কমিশন। তারা এক্ষেত্রে সব রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও ভোটারদের কাছে সহায়তা কামনা করেছে। মিডিয়ার কাছ থেকেও সব ধরনের সহায়তা প্রত্যাশা করেছে ইসি। উল্লেখ্য, ভোট গ্রহণ কক্ষে প্রবেশের ক্ষেত্রে মিডিয়ার পূর্বানুমতির বিধান করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার সোমবার যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচন আয়োজনের মূল কাজ নির্বাচন কমিশনের। কিন্তু নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করা নির্বাচন কমিশনের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্য সরকারকে সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা করতে হবে। কারণ সরকারের অনেক অর্গান ভোট সুষ্ঠু করার সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, পুলিশ, র‌্যাব, আনসার, ভিডিপি, বিজিবিসহ আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের অধীনেই থাকে। যদিও পৌরসভা নির্বাচনে সরকার সহায়তা করেনি- এমন কোনো অভিযোগ এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন করেনি। তবুও ভোট নির্বিঘ্ন করতে সরকারের দায়িত্ব অনেক। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী এবং মিডিয়ারও অনেক দায়িত্ব। তবে প্রার্থী ও ভোটারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জোরজবরদস্তি বন্ধ করা, কেউ যাতে আচরণবিধি লংঘন করতে না পারে, সবাই যাতে নির্বিঘেœ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে তা নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনেরই কাজ। তা না হলে ভোট অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য হবে না।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কে কি বলল বা করল তার চেয়ে বড় কথা নির্বাচন কমিশন কি চাইল কি করল। তাদের চাওয়া এবং করাটাই সুষ্ঠুভাবে ভোট আয়োজনের ক্ষেত্রে মুখ্য বিষয়। নির্বাচন কমিশন ভোট অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য করতে চায় কিনা সেটাই বড় কথা। তিনি বলেন, সারা দেশের ২৩৪টি পৌরসভায় নির্বাচন হচ্ছে। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এতদিন যা দেখেছি, তাতে নির্বাচন কমিশন তাদের যথাযথ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। সরকারও তাদের সেভাবে সহায়তা করেনি। এখন ভোটের দিন কি হয় তাই দেখার বিষয়। সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার আরও বলেন, নির্বাচনের দিন পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখার দায়িত্বে যারা আছেন তাদের নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে। ভোটার যাতে নির্ভয়ে ও নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, তার নিশ্চয়তা দিতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে সরকারের সহায়তা নিয়েই এই নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার জন্য নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং দৃঢ়তা অপরিহার্য। সরকারকেও এক্ষেত্রে সব ধরনের সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মাঠের চিত্র দেখে মনে হয়নি যে, ভোট সুষ্ঠু করতে নির্বাচন কমিশন সাহসী ভূমিকা পালন করতে পেরেছে অথবা সরকারও পর্যাপ্ত সহায়তা দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত দৃঢ়তা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই তারা হাত-পা গুটিয়ে বসে ছিল। ভোটের দিনও যদিও তারা হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকে তাহলে নির্বাচন কোনোভাবেই অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন যদি সিরিয়াস হয় এবং নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনে আন্তরিক হয়, সরকারও যদি নিরপেক্ষভাবে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় তাহলে ভোটের দিন পরিবেশ সুষ্ঠু থাকবে। মানুষ নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারবে। তা না হলে নির্বাচন কমিশন এবং সরকার উভয়ের ভূমিকাই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, ভোটার, মিডিয়া কর্মীদেরও অনেক দায়িত্ব রয়েছে। কেউ তার দায়িত্বের বাইরে গেলে ভোটের পরিবেশ নষ্ট হবে। তবে মিডিয়ার ভূমিকা এক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মিডিয়াকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। তাহলে মাঠের অনেক চিত্রই উঠে আসবে। যার আলোকে পরবর্তীকালে ভোটের বিষয়ে যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে নির্বাচন কমিশন।
ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ভোটের দিন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রার্থীদের মাঠে থাকতে হবে। যত অনিয়মই হোক না কেন নির্বাচনের ফল ঘোষণা না করা পর্যন্ত সব রাজনৈতিক দলকে সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে। অপেক্ষা করতে হবে নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা পর্যন্ত। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মতো ভোট চলাকালীন নির্বাচনী মাঠ থেকে নিজেদের প্রত্যাহারের সংস্কৃতি বর্জন করতে হবে দলগুলোকে। নির্বাচন চলাকালীন কোনো অভিযোগ থাকলে, তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করতে হবে সংশ্লিষ্টদের। এক্ষেত্রে সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে ইসিকে নিতে হবে কঠোর সিদ্ধান্ত। আর ইসির সিদ্ধান্ত আমলে নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্টদের তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও জানিপপের (জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদ) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কালিমুল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য করতে চাইলে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করতে হবে। সরকার, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, ভোটার, মিডিয়া, পর্যবেক্ষক সবারই এখানে দায়িত্ব রয়েছে। কারও দায়িত্ব বেশি, কারও কম- এসব বলে কেউ কাউকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সবুজ সংকেত পাওয়ার পরই ভোটের আয়োজন করেছে নির্বাচন কমিশন। এক্ষেত্রে ভোট অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য করতে নির্বাচন কমিশনকেই মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ মূল কাজটি তাদের। সাংবিধানিকভাবেই তাদের সেই ক্ষমতা দেয়া আছে। সরকার, প্রশাসন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ভোট নির্বিঘ্ন করতে তাদের সহায়তা করবে।
অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কালিমুল্লাহ বলেন, এখানেই শেষ কথা নয়। ভোট নির্বিঘ্ন করতে রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে প্রধান দুই দল, প্রার্থী, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী তাদেরও যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রার্থীকে মাথায় রাখতে হবে ভোটে তার প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে। চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য তাদের ভোটারদের ওপর আস্থা রাখতে হবে। যেহেতু এবারই প্রথম দলীয় মনোনয়ন এবং প্রতীকে পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোকেও ভোটারদের ওপর আস্থা রাখতে হবে। তিনি আরও বলেন, মিডিয়া এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের অনেক দায়িত্ব। বাড়াবাড়ি না করে তাদের নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। তবে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব ভোটারদের। কারণ সংখ্যায় তারাই বেশি। তারাই ভোটের মাঠে মূল শক্তি। তারা যা চাইবেন তাই হবে। সে কারণে ভোটারকে প্রজা থাকার মানসিকতা বদলাতে হবে। নগদ নারায়ণে খুশি হয়ে অযোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে নিজের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে ভোটারকে।
প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close