¦
নৌকা-ধানের শীষের লড়াই

কাজী জেবেল | প্রকাশ : ৩০ ডিসেম্বর ২০১৫

জমজমাট প্রচার শেষে দেশের ২৩৪ পৌরসভায় আজ ভোট। এ দিনটি কেন্দ্র করে দীর্ঘ ৭ বছর পর জমে উঠেছে নৌকা ও ধানের শীষের লড়াই। তৃণমূল পর্যায়ে জনপ্রিয়তা প্রমাণে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দলীয় প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করতে মরিয়া। ফলে উৎসব-আমেজের ভোটে উৎসাহ-উদ্দীপনার পাশাপাশি শংকাও বিরাজ করছে ভোটারদের মধ্যে।
এবারই প্রথম দলীয় প্রতীকে পৌরসভার মেয়র পদে নির্বাচন হচ্ছে। এ সুযোগে দীর্ঘ ৭ বছর পর নৌকা ও ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মাঠে নেমেছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থীরা। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই প্রতীকের সর্বশেষ লড়াই হয়েছিল। মেয়র পদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলেও কাউন্সিলররা নির্দলীয়ভাবেই নির্বাচন করছেন। ৯ ডিসেম্বর সকাল থেকে প্রচার শুরু হয়েছিল। শেষ হয় ২৮ ডিসেম্বর মধ্য রাতে।
আজ সকাল ৮টা থেকে শুরু হবে ভোট। চলবে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। ৩ হাজার ৫৫৫ কেন্দ্রে ভোট হবে। ৭০ লাখ ৯৯ হাজার ১৪৪ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এর মধ্যে নারী ভোটার ৩৫ লাখ ৪৬ হাজার ৮৬০। ভোট শেষে ফল পরিবেশনে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে ইসি। এ লক্ষ্যে একটি পরিপত্র জারি হয়েছে। এতে প্রতি ২ ঘন্টা পরপর ইসিতে ফলাফলের হাল নাগাদ তথ্য দিতে বলা হয়েছে।
ভোটগ্রহণের যাবতীয় প্রস্তুতি শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন। মঙ্গলবার সব কেন্দ্রে নির্বাচনী মালামাল পৌঁছে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইসিকে জানিয়েছেন। এদিকে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ বিবেচনায় লক্ষাধিক আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ভোট কেন্দ্রগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ ও সাধারণ দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে। উভয় ধরনের কেন্দ্রেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। নির্বাচনী এলাকায় মোবাইল টিম, স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাবসহ অন্যান্য বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সোমবার সকাল থেকেই টহল দিচ্ছেন মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্সের সদস্যরা। এছাড়া ১ হাজার ২০৪ জন নির্বাহী ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে আছেন। তারা আইন ও বিধি লংঘনকারীদের সংক্ষিপ্ত বিচারের মাধ্যমে সাজা দেবেন।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ ১৯টি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। কাউন্সিলর পদে নির্বাচন হচ্ছে নির্দলীয়ভাবে। ২৩৪টি মেয়র, ৭৩১টি সংরক্ষিত কাউন্সিলর ও ২ হাজার ১৯৩টি সাধারণ কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১২ হাজার ১৭১ প্রার্থী। এদের মধ্যে মেয়র পদে ৯৪৫, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ৮৭৪৬ ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর (নারী) পদে ২৪৮০ জন। ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী ৯৮ জন। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আছেন ৩৮ জন। ইতিমধ্যে মাদারগঞ্জ, পিরোজপুর, টুঙ্গীপাড়া, ফেনী, পরশুরাম, চাটখিল ও ছেংগারচর পৌরসভায় ৭ জন মেয়র বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ৯৪ জন সাধারণ কাউন্সিলর ও ৪০ জন সংরক্ষিত কাউন্সিলরসহ ১৪১ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন।
নির্বাচনের নিরাপত্তায় ১ লাখ ১৭ হাজার ৩০৪ জন সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। এর মধ্যে পুলিশ ৪৫ হাজার, বিজিবি ৯ হাজার ৪১৫, র‌্যাব ৮ হাজার ৪২৪, কোস্টগার্ড ২২৫, অঙ্গীভূত আনসার ৪৯ হাজার ৭২৮ এবং ব্যাটালিয়ন আনসার ৪ হাজার ৫১২ জন। ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিটি কেন্দ্রে ৮ অস্ত্রধারীসহ আইনশৃংখলা বাহিনীর ২০ জন সদস্য মোতায়েন থাকবে। আর সাধারণ কেন্দ্রে ৭ অস্ত্রধারীসহ ১৯ জন সদস্য থাকবেন। প্রতিটি পৌরসভায় সোমবার সকাল থেকে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির মোবাইল টিম টহল শুরু করেছে। নির্বাচনে দুই হাজারের বেশি সন্ত্রাসী সক্রিয় বলে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে সর্বশেষ ২০১১ সালে চার ধাপে পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তখন দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হলেও দলগুলো সরাসরি প্রার্থীদের সমর্থন দিয়েছিল। ওই বছর ১২ থেকে ১৯ জানুয়ারি চার ধাপে ২৪২ পৌরসভায় ভোট হয়। এর মধ্যে তাৎক্ষণিক ফলাফল ঘোষিত ২৩৬টি পৌরসভা। এতে বিদ্রোহীসহ ১০৯টি আওয়ামী লীগ ও ১০৩টিতে বিদ্রোহীসহ বিএনপি প্রার্থীরা জয় পান। এছাড়া জামায়াত ৫টি, জাতীয় পার্টির ২টি, এলডিপির একটি ও ১৬টিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী মেয়র নির্বাচিত হন।
ভোটার ও ভোটকেন্দ্র : ইসি জানায়, পৌর নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ৭০ লাখ ৯৯ হাজার ১৪৪ জন। এদের মধ্যে পুরুষ ৩৫ লাখ ৫২ হাজার ২৮৪ জন ও মহিলা ৩৫ লাখ ৪৬ হাজার ৮৬০ জন। ৩ হাজার ৫৫৫টি ভোট কেন্দ্রে একযোগে ভোট হবে। এসব ভোট কেন্দ্রে বুথের সংখ্যা ২১ হাজার ৭১টি। নির্বাচনে ৬৬ হাজার ৭৬৮ জন ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগ চূড়ান্ত করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। এদের মধ্যে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ৩ হাজার ৫৫৫ জন ও সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ২১ হাজার ৭১ জন, পোলিং কর্মকর্তা ৪২ হাজার ১৪২ জন।
প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৯ রাজনৈতিক দল : কমিশনের তথ্য মতে, নির্বাচনে ১৯টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ২৩৪ জন, বিএনপি ২২৩ জন, জাতীয় পার্টির ৭৪ জন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের ২১ জন, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির ১৭ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ৫৭ জন, ওয়ার্কার্স পার্টির ৮ জন, জাতীয় পার্টির (জেপি) ৬ জন, কমিউনিস্ট পার্টির ৪ জন, খেলাফত মজলিসের ৪ জন, ইসলামী ফ্রন্টের ৩ জন এবং লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল (পিডিপি), তরিকত ফেডারেশন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ, ইসলামী ঐক্যজোট, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ও খেলাফত মজলিসের একজন করে প্রার্থী রয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, নির্বাচনে ২৮৫ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। ইসিতে নিবন্ধন স্থগিত থাকায় জামায়াত নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। এছাড়া আওয়ামী লীগের ৯৮ জন ও বিএনপির ৩৮ জন বিদ্রোহী প্রার্থী সক্রিয় রয়েছেন। দলীয় প্রার্থী জয়ের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে বিদ্রোহী প্রার্থীদের। এরই মধ্যে বেশ কিছু পৌরসভায় আওয়ামী লীগ ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতাও হয়েছে।
ভোট পর্যবেক্ষণ করবেন চার কমিশনার : নির্বাচনে ভোট গ্রহণ পর্যবেক্ষণ করবেন চারজন কমিশনার। এজন্য চারজন নির্বাচন কমিশনারকে বিভাগওয়ারী দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক ঢাকা, মোহাম্মদ আবু হাফিজ রাজশাহী ও রংপুর, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. জাবেদ আলী খুলনা ও বরিশাল এবং মো. শাহ নেওয়াজ চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের ভোট পর্যবেক্ষণ করবেন।
ফলাফল পরিবেশনে বিশেষ নির্দেশনা : ইসি সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনের ফলাফল পরিবেশন নিয়ে সম্প্রতি বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে কমিশন। এ সংক্রান্ত একটি বিশেষ পরিপত্র জারি করে কমিশন বলেছে, মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রতি দুই ঘণ্টা পরপর ফলাফলের আপডেট দিতে হবে ইসিতে। এছাড়া পরিপূর্ণ ফলাফল কমিশনে পাঠানো পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের কার্যালয় ত্যাগ করতে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। কমিশন সূত্র জানায়, ফলাফল তদারকিতে ২৪ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে ৫ জন উপ-সচিব, ৫ জন সিনিয়র সহকারী সচিব ও ১৪ জন সহকারী সচিব রয়েছেন। তারা সার্বক্ষণিক ফলাফল সংগ্রহ করবেন। এর আগে গত সোমবার ভোট গ্রহণ ও গণনা শেষে দ্রুত ফলাফল পাঠাতে রিটার্নিং অফিসারদের বিশেষ নির্দেশনা পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
সক্রিয় ২০২৯ সন্ত্রাসী : গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে পৌর নির্বাচনে ২ হাজার ২৯ জন সন্ত্রাসী সক্রিয় রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব সন্ত্রাসীর গডফাদার রয়েছেন ৬৩৭ জন। ওই প্রতিবেদনে কোন জেলায় কারা অবস্থান করছেন তাও বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। নির্বাচনে এসব সন্ত্রাসী ও গডফাদাররা ভোট কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই ও নাশকতা চালাতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেছে গোয়েন্দা সংস্থাটি। প্রতিবেদনটি ধরেই সোমবার থেকে অভিযান শুরু করেছে আইনশৃংখলা বাহিনী। তবে বিএনপি অভিযোগ করেছে, সন্ত্রাসী গ্রেফতারের নামে বিএনপির নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও হয়রানি করা হচ্ছে। আতংকে অনেক নেতাকর্মী এলাকায় থাকতে পারছেন না।
পৌর নির্বাচন পর্যবেক্ষণে নেই বিদেশীরা : পৌরসভা নির্বাচন পর্যবেক্ষণে নেই কোনো বিদেশী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। ঢাকাস্থ কোনো দূতাবাস বা হাইকমিশন থেকেও নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য আবেদন করা হয়নি। এ পৌরসভা নির্বাচনের জন্য ২৯টি বেসরকারি সংস্থার ৪ হাজার ২০৭ জন পর্যবেক্ষক এ নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অনুমতি পেয়েছে বলে কমিশন সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে ৭টি সংস্থার ১১৮ জন পেয়েছেন কেন্দ্রীয়ভাবে অনুমোদন। বাকিরা স্থানীয় পর্যায় থেকে অনুমতি পেয়েছে।
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close