¦

এইমাত্র পাওয়া

  • হালনাগাদ ভোটার তালিকার খসড়া প্রকাশ; নতুন ভোটার ৪৩ লাখ ৬৮ হাজার ৪৭ জন
বিমানে কার্গো নিচ্ছে না অস্ট্রেলিয়া

মুজিব মাসুদ | প্রকাশ : ০২ জানুয়ারি ২০১৬

অপ্রতুল নিরাপত্তা ও বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশের অজুহাতে বিমানে কার্গো নেয়া বন্ধ করে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। ফলে কাতার, এমিরেটস, সিঙ্গাপুর, ক্যাথে প্যাসিফিক ও মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সসহ বেশ কয়েকটি বিদেশী এয়ারলাইন্স ও এয়ারফ্রেইট বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়াগামী কোনো পণ্য নিচ্ছে না। এতে ঝুঁকির মুখে পড়েছে তৈরি পোশাকসহ রফতানিমুখী বেশ কিছু পণ্য। প্রতি দিন অর্ধশত কোটি টাকার ব্যবসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু এসব নিয়ে বিমানের শীর্ষ কর্তাদের কোনো তৎপরতা নেই।
জানা গেছে, ১৯ ডিসেম্বরের পর বিমানের কার্গো ভিলেজ থেকে শুধু মরদেহ ও ২ গ্রাম ওজনের কূটনৈতিক ডকুমেন্ট ছাড়া অন্য কোনো পণ্য অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছে না। এ কারণে গত ১০ দিনে কার্গো রফতানি টার্মিনালে রফতানিযোগ্য পণ্যের স্তূপ জমে গেছে।
বিমানের পরিচালনা পর্যদ চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল জামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, এ জটিলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য বিমান চেষ্টা চালাচ্ছে। জনবল ঘাটতি পূরণ কোন পদ্ধতি ও কিভাবে করা হবে সে বিষয়ে প্রয়োজনে পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকেই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাইল হেউড বলেন, কার্গোর নিরাপত্তা জোরদারে প্রয়োজনে আরও নতুন জনবল নিয়োগ ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা যেতে পারে। এ নিয়ে গাফিলতি করা ঠিক হবে না। অর্গানোগ্রাম ও জনবলের কাঠামো চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। জরুরিভিত্তিতে জনবল নিয়োগ দিতে হবে বলে উল্লেখ করেন।
অস্ট্রেলিয়া জানিয়েছে, বিমানের কার্গো রফতানি টার্মিনালটি বহিরাগত জনবল দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এসব জনবল মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। সম্প্রতি দেয়া এক এক প্রতিবেদনে তারা জানিয়েছে রফতানি টার্মিনালে কর্মরত ৩০০ জনবলের মধ্যে মাত্র ৬০ জন বিমানের নিজস্ব। বাকিরা বিভিন্ন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও বহিরাগত। এদের মধ্যে চোরাচালানসহ একাধিক মামলার আসামি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ক্যাডার, স্থানীয় সন্ত্রাসী ও গোয়েন্দা নজরদারি তালিকাভুক্ত লোকজনও আছে। নাম মাত্র স্ক্যানের পর এরা টার্মিনালে প্রবেশ করছে। একইভাবে স্ক্যান ছাড়াই অবাধে পণ্যসামগ্রীও বিভিন্ন এয়ারলাইন্সে উঠানো হচ্ছে। এ অবস্থায় কার্গো পণ্যের সঙ্গে বোমা বা অন্য কোনো এক্সপ্লোসিভ বিমানের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়ার মতো আশংকার কথাও বলা হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার রিপোর্টে। এছাড়া নিরাপত্তা শিথিলতায় কার্গো ফ্রেইটগুলো যেসব দেশের বিমানবন্দরে যাচ্ছে সেখানে বড় ধরনের নাশকতার আশংকাও আছে। এসব কারণে তারা বিমানে কার্গো নেয়া বন্ধ রেখেছে।
কার্গো শাখা সূত্রে জানা গেছে, তারা ইউরোপে সরাসরি কার্গো রফতানি করতে প্রয়োজনীয় সনদ ‘এয়ার কার্গো সিকিউরিটি-৩ (এসিসি)’ ও ‘রেগুলেশন এজেন্ট-৩ (আরএ)’ সনদ নবায়ন করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন শর্ত সাপেক্ষে গত সপ্তাহে বিমানকে এ সনদ প্রদান করে। এখন কিছু নিরাপত্তা জোরদার ও জনবল সংকট কাটিয়ে উঠতে পারলেই অস্ট্রেলিয়ায় কার্গো রফতানি শুরু করা যাবে। এদিকে অস্ট্রেলিয়া মাল নেয়া বন্ধ করায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তৈরি পোশাক খাত। তৈরি পোশাক খাতের একটা বড় অংশ অস্ট্রেলিয়াতে রফতানি করা হয় জিরো ট্যারিফে। প্রতি বছর অস্ট্রেলিয়ায় কমপক্ষে ৩শ’ থেকে ৫শ’ কোটি টাকার পোশাক রফতানি করা হয়। এর সবটাই যায় আকাশপথে। বর্তমানে জরুরিভিত্তিতে গার্মেন্ট পণ্যের নমুনাও আকাশপথে অস্ট্রেলিয়া পাঠানোর সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।
বিজিএমইএ সহ-সভাপতি ফেরদৌস পারভেজ বিভন বলেন-অস্ট্রেলিয়া হঠাৎ বাংলাদেশ থেকে আকাশপথে কার্গো নেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এতে চরম বিপাকে পড়েছে তৈরি পোশাক খাত। আকাশপথে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস ও নমুনা পাঠানোর সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিকল্প পথে অন্য দেশের আশ্রয় নিতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে তেমনি আর্থিক ব্যয়ও বাড়ছে। এর ওপর যোগ হয়েছে হঠাৎ অতিরিক্ত নিরাপত্তার বাড়াবাড়ি। আগে আমদানি পণ্য একদিনেই খালাস করা সম্ভব হতো। এখন সেই মাল খালাস করতে সময় লাগছে ৬-৭ দিন। পণ্য খালাসের এ ধীরগতির কারণে কার্গো হাউসের সামনে পণ্যের স্তূপ জমেছে। খোলা আকাশের নিচে এ সব পণ্য দিনের পর দিন পড়ে থাকায় নতুন নতুন সংকট দেখা দিচ্ছে।
বিমানের একাধিক সূত্র জানায়, কাতার, এমিরেটস, সিঙ্গাপুর, ক্যাথে প্যাসিফিক ও মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সসহ বেশ কয়েকটি বিদেশী এয়ারলাইন্স ও এয়ারফ্রেইটের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া প্রতিদিনই ঢাকা থেকে পণ্য নিত। এর মধ্যে প্রধান পণ্য তৈরি পোশাক, পোশাকের নমুনা ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজ দলিলপত্র ও ডকুমেন্টস। এতে বিমান বড় ধরনের রয়ালেটি পেত। কিন্তু পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ ১৯ ডিসেম্বর অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশ থেকে পণ্য নেয়া বন্ধ করে দেয়। অস্ট্রেলিয়া এখন জরুরিভিত্তিতে বাংলাদেশ থেকে শুধু মরদেহ ও ২ গ্রাম ওজনের কূটনৈতিক চিঠিপত্র নিচ্ছে। বিমানের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অস্ট্রেলিয়া শুধু বাংলাদেশ থেকেই নয় ইয়েমেন, নাইজেরিয়াসহ ৭টি দেশ থেকে কার্গো আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে।
তবে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, শাহজালাল বিমানবন্দরে নিরাপত্তার অভাব আছে অস্ট্রেলিয়ার এমন ঢালাও অভিযোগ আদৌ সত্য নয়। কারণ গত ৩ মাস ধরেই ব্রিটিশ ট্রান্সপোর্ট ডিপার্টমেন্ট একাধিকবার হযরত শাহজালাল (রহ.) বিমানবন্দর ও বিমানের কার্গো শাখা দফায় দফায় পরিদর্শন করে। তারা নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আরও কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করে। সেটা বিবেচনায় রেখে ইতিমধ্যে বিমান ও সিভিল এভিয়েশন বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এখন বিমানবন্দর কার্গো শাখার নিরাপত্তা নিশ্চিদ্র বলা যায়। বিমানের ঢাকা লন্ডন সরাসরি ফ্লাইট নিয়েও সন্তুষ্ট যুক্তরাজ্য সরকার। এ ছাড়া ইউরোপের অনেক দেশেই এখনও বিমানের কার্গো ভিলেজ থেকে পণ্য রফতানি হচ্ছে। সেগুলোতে যদি নিরাপত্তার আশংকা না থাকে তাহলে শুধু অস্ট্রেলিয়া কেন সিদ্ধান্ত নিয়েছে? তারপরও অস্ট্রেলিয়ার সন্তুষ্টি অর্জন খুবই জরুরি বলে মনে করছেন তারা। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও সেবা নির্বিঘ্ন করতে হলে কিছু যন্ত্রপাতি ক্রয় ও প্রয়োজনীয় জনবল মোতায়েন করা গেলেই এ সংকট কাটানো সম্ভব বলে মনে করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে বিমানের রফতানি কার্গোতে তিন শিফটে মোট ৩শ’ কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন। এসব ইউনিটে নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে হলে কমপক্ষে আরও ২ শতাধিক লোডার প্রয়োজন। বারবার লোক নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হলেও বিমান পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রতিনিধিরা তা আমলে নিচ্ছে না। উল্টো লোডারের কাজ আনসার দিয়ে করানোর মতো তুঘলকি সিদ্ধান্ত নিয়েছে সম্প্রতি এক পর্ষদ সভায়। এ নিয়ে শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে ইতিমধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সিবিএ নেতারা হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, অর্গানোগ্রামে আনসার দেয়া হলে পুরো বিমান অচল করে দেবেন তারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিমানের একজন পরিচালক বলেন, পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা শুধু সিদ্ধান্ত দিয়েই দায়দায়িত্ব খালাস করেন। তারা জীবনে কোনো দিন কার্গো পরিদর্শন করেননি। কার্গোতে কাজের পরিবেশ ও ধরন কি, আর সেটা আনসারের মাধ্যমে আদৌ করা সম্ভব কিনা সেটা জানাও নেই পর্ষদ সদস্যদের। তার মতে, এভিয়েশনের নিরাপত্তা আর লোডারের কাজ সম্পূর্ণ আলাদা। সাধারণ কাজের চেয়ে এর জব ন্যাচার আলাদা।
উদাহরণ টেনে এক পরিচালক বলেন, কিছুদিন আগে বিমানের নিরাপত্তা শাখার জন্য লোক নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্তু যুক্তরাজ্য সরকারের শর্ত পূরণ করতে হঠাৎ সেসব নিরাপত্তাকর্মীদের কার্গোতে লোডার হিসেবে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এ নিয়ে কার্গো শাখায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কারণ হিসেবে জানা গেছে, নিরাপত্তা কর্মীদের সবাই কার্গো লোডার হিসেবে কাজ করতে আগ্রহী নয় বলে জানিয়ে দিয়েছে। এ অবস্থায় যে কোনো সময় কার্গোতে স্যাবোটাজসহ নিরাপত্তা বিঘ্নের ঘটনা ঘটতে পারে। একটি গোয়েন্দা সংস্থাও সম্প্রতি বিষয়টি বিমানকে জানিয়েছে। গোয়েন্দা রিপোর্টে বলা হয়েছে, নিয়োগকৃত নিরাপত্তাকর্মীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কার্গোতে লোডার হিসেবে বদলি করার কারণে তাদের মাঝে হতাশা নেমে এসেছে। জনবল নিয়োগের পাশাপাশি দ্রুত এ সমস্যার সমাধান করা উচিত বলেও তারা মনে করছেন।
প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close