¦
ঐশী কিতাব এসেছে নবী-রাসূলের ভাষায়

মাহমুদা আক্তা নীনা | প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

প্রত্যেক রাসূলকেই আমি স্বজাতির ভাষা দিয়ে প্রেরণ করেছি যেন তাদের (জাতিকে) পরিষ্কারভাবে বুঝাতে পারে। (সূরা ইবরাহীম ৪ আয়াত) এই আয়াতে অতি সংক্ষেপে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও সুন্দরভাবে আল্লাহ তার এক লাখ চব্বিশ হাজার (মতান্তরে দুই লাখ চব্বিশ হাজার) নবী-রাসূলের সময়ের অর্থাৎ গোটা নবী-রাসূলদের যুগের সেই ব্যাপক সময়ের ধর্মীয় ভাষানীতির ধারার ঐতিহ্যের ইতিহাস তুলে ধরেছেন, কিয়ামত পর্যন্ত সব যুগের সব জাতিকে মাতৃভাষা চেতনায় উজ্জীবিত করে তুলতে ও প্রেরণা যোগাতে। অর্থাৎ কিয়ামত পর্যন্ত সব জাতির ভাষার বিষয়ে শিক্ষা ও জ্ঞানদানের এবং দিক নির্দেশনাদানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়েই। আর নবী-রাসূলদের ভাষানীতির ধারাই যে ভাষানীতির মূলধারা, কল্যাণ ধারা ও প্রগতিশীল ধারা এতে বিন্দুমাত্রও সন্দেহের অবকাশ নেই। এই আয়াতই অকাট্যভাবে প্রমাণ করে দেয় নবী-রাসূলদের ভাষানীতির ধারা ছিল মাতৃভাষা নীতিরই ধারা। আল্লাহর কোনো নবী-রাসূলের ক্ষেত্রেই এই ধারার কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। কোনো নবী-রাসূলই এ ধারা থেকে বিচ্যুত হননি। ভাষার এই ইতিহাস পবিত্র কোরআনে স্বয়ং আল্লাহর বর্ণনাকৃত ভাষানীতির (মাতৃভাষানীতির) ধারার ঐতিহ্যের ইতিহাস। তা নয়ত কোনো কল্প কথার গল্প বা কল্পকাহিনী আর নয়ত কোনো রূপকথা বা রূপকাহিনী কিংবা নয়ত কোনো উদ্ভট বা বিকৃত ইতিহাস। আর ইতিহাস ও অতীতই হচ্ছে সর্বোচ্চ শিক্ষাক্ষেত্র। আর এই আয়াতে আল্লাহ স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন, জাতিসত্তার ভাষা বা মাতৃভাষা প্রেমের চেতনাই মানবের সহজাত ও স্বভাবজাত চেতনা অর্থাৎ মানবিক চেতনা। সুতরাং স্পষ্টই বুঝা যায় যে, নবী-রাসূলদের ভাষা চেতনা ও ভাষানীতির ধারার সঙ্গে একুশের চেতনা মিলেমিশে একাকার। নবী-রাসূলদের ভাষা চেতনা ও একুশের চেতনা এক এবং অভিন্ন। তা পবিত্র এ ঐশী চেতনা বা স্বর্গীয় চেতনা। আর আল্লাহ্ তার ঐশী কিতাবগুলোর সবই নাজিল করেছেন নাজিলকৃত নবী-রাসূলদের জাতিসত্তার ভাষা বা মাতৃভাষায়। তাইত কোরআর ছাড়া অন্য সব কিতাবই নাজিল করেছেন (ভিন্ন ভিন্ন) অনারবি ভাষাতে। তাওরাত, ইনজিল, যাবুর ও কোরআন- এই চার কিতাব চার ভাষায় (একেক কিতাব একেক ভাষায়) নাজিল করেই আল্লাহ্ পৃথিবীর বাস্তবতায় অকাট্যভাবেই প্রমাণ করে দিয়েছেন আল্লাহর কাছে সব জাতি ও সব ভাষার মূল্য বা মান ও মর্যাদা সমান, গুরুত্বও সমান। আর মাতৃভাষা বা জাতিসত্তার ভাষাই ভাষার সেরা এবং শিক্ষা ও জ্ঞানের সর্বোত্তম এবং সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম ও বাহন। তাই তো আল্লাহ তাঁর সব নবী-রাসূলের কণ্ঠে জাতিসত্তার ভাষা বা মাতৃভাষা দিয়ে এবং সবার প্রতি জাতিসত্তার ভাষা বা মাতৃভাষায় কিতাব দিয়ে দ্বীন ইসলামকে বান্দাদের মাতৃভাষা চেতনায় সমৃদ্ধ করে দিয়েছেন। আর সূরা ইবরাহীমের ৪ আয়াতে দ্বীন ইসলামও মাতৃভাষা চেতনাকে সমৃদ্ধ করেছে। সুতরাং নবী-রাসূলদের ভাষা চেতনা ও ভাষানীতির ধারার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এবং একুশের চেতনার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এক এবং অভিন্ন। সুতরাং বিশ্বের সব জাতিকে মাতৃভাষা চেতনা এবং ভাষা শহীদদের রক্ত ঝরানো একুশের চেতনায় উজ্জীবিত করে তুলতে হবে। বিশ্বের সব জাতিকে এনে দিতে হবে ভাষাগত মুক্তি, জ্ঞানগত ও শিক্ষাগত মুক্তি। ভাষার মুক্তি ছাড়া কোনো জাতিতেই শিক্ষা ও জ্ঞানের মুক্তি নেই। তাই সবার আগে ভাষাগত মুক্তি চাই। মাতৃভাষা এমনই এক মানবীয় চেতনা যার কোনো বিকল্প নেই। তার কোনো ক্ষয় নেই। তাই তো একুশের চেতনার কোনো ক্ষয় নেই। এই চেতনা পৃথিবীতে চির ভাস্বর হয়েই থাকবে ও পৃথিবীজুড়ে বাংলাভাষা ইতিহাস হয়েই থাকবে এবং কিয়ামত পর্যন্ত এই চেতনা আরও অনেক উজ্জ্বলতা ছড়াবে। পৃথিবীকে আরও আলোড়িত ও আলোকিত করবে। সূরা ইবরাহীমের ৪ আয়াতে আল্লাহ মাতৃভাষা অবলম্বনেরই দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। এর অমান্য করা যাবে না। এতে পূর্ণ ঈমান বা বিশ্বাস এনে আমলে পরিণত করতে হবে। সুতরাং মাতৃভাষাতে নামাজ ও কোরআন পড়তে হবে। আল্লাহর কথা বুঝতে হবে, জানতে হবে এবং মানতে হবে। তাই সব জাতিকে ভাষানীতির মূলধারায় ফিরে আসতেই হবে।
যে আলেম শ্রেণী এমনও বলেন, অনারবদের (সবাইকে) আরবি ভাষা বুঝার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। অনারবি ভাষায় নামাজ, কোরআন পাঠ বৈধ হবে না। তাদের কথার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, অনারবি ভাষা আল্লাহর ইবাদত ও কিতাব পাঠের অযোগ্য, তাই আরবি বোঝার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। তাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে চাই, আল্লাহ তাঁর একই কথা, একই আয়াত, একই সূরা তার চার কিতাবের একেকটিতে এককে ভাষায় নাজিল করেছেন। তাওরাত, ইনজিল ও যাবুর- এই তিন কিতাবেই অনারবি ভাষায় নাজিল করেছেন। অনারবি ভাষার কারণে আল্লাহর বাণীর মর্যাদা তো ক্ষুণ্ন হয়নি। আর পবিত্রতাও ক্ষয়ে যায়নি বা নষ্টও হয়নি। তাওরাত, যাবুর, ইনজিল তো কোরআনের মতোই আল্লাহর কিতাব, তা নাজিলের জন্য তো আরবির ভাষার প্রয়োজন হয়নি। অনারবি ভাষাগুলোই আরবির মতো যোগ্যতা পেয়েছে। এসব ক্ষেত্রে আল্লাহ কি বুঝিয়ে দেনি যে, তার ইবাদত ও কিতাবের শিক্ষার জন্যও বান্দাদের কণ্ঠের ভাষা বা মুখের ভাষা, জাতিসত্তার ভাষা ও মাতৃভাষাই যথেষ্ট। এর জন্য কোনো বাড়তি ভাষার প্রয়োজন নেই। তাইত আল্লাহ তাঁর কোনো অনারব নবী-রাসূলের ওপরেও আরবি ভাষা চাপিয়ে দেননি, কাউকে আরবি ভাষা বোঝার যোগ্যতা অর্জন করতে বলেননি। তিনি তাঁর নবী-রাসূলদের মাঝেই ভাষাগত ঐক্য সৃষ্টি করেননি এবং তাঁর কিতাবের মাঝেও ভাষাগত ঐক্য সৃষ্টি করেননি। সুতরাং মুসলিম উম্মাহর ভাষাগত ঐক্য আল্লাহর বিধানের পরিপন্থী। অর্থাৎ আল্লাহবিরোধী নীতি। এই উম্মাহর ভাষাগত ঐক্য দিয়ে অনারব মুসলমানদের আল্লাহ প্রদত্ত ভাষার, শিক্ষার ও জ্ঞানের অধিকারকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। (আপন ভাষায়) আল্লাহ-রাসূলের কোরআন-হাদীসের বাণী বা কথা বুঝতে জানার অধিকার ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। উম্মাহর ভাষাগত ঐক্য সম্পূর্ণই অন্যায়, অযৌক্তিক ও অবৈধ। এর কোনো প্রকৃত যুক্তি-ভিত্তি নেই। সব জাতির আলেম শ্রেণীর মাঝে ভাষাগত ঐক্যই হবে যথেষ্ট।
মাতৃভাষায় বুঝে-শুনে নামাজ-কিতাব পাঠই হবে উত্তম। এটাই আল্লাহর বিধান, সূরা ইবরাহীমের ৪ আয়াতের দিক নির্দেশনা। এতে বুঝিয়েই দেয়া হয়েছে, জাতিকে দেয়া হয়েছে জাতির ভাষা বা মাতৃভাষায় ব্যবহারের অধিকার, যেন তারা আল্লাহ-রাসূলদের কথাকে পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারে।
আল্লাহ মানুষের ভাষা বৈচিত্র্যতা ও জাতি বৈচিত্র্যতাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন বলেই তো তার একই সূরা একই কথা একেক কিতাবে একেক ভাষায় নাজিল করে বোঝার সমস্যার সুন্দর সমাধান করে দিয়েছেন। আর দাউদ, মুসা, ঈসা ও রাসূলুল্লাহ (সা.) তারা সবাই আপন আপন ভাষায় আল্লাহর ঘর বায়তুল মুকাদ্দাস বা মসজিদুল আকসায় নামাজ-কিতাব পড়েছেন। তাহলে আল্লাহর ঘর বায়তুল্লা বা মসজিদুল হারামে কিংবা আমাদের মসজিদগুলোতে কেন আমরা নিজ নিজ জাতিসত্তার ভাষা বা মাতৃভাষা দিয়ে নামাজ-কোরআন পড়তে পারব না? আমরা কি হেদায়েতের পথ ছেড়ে গোমরাহিতেই পড়ে থাকব।
উম্মাহর ভাষাগত ঐক্য মানেই অনারব জাতিকে আরবি ভাষার অনাগ্রাসন। তাদের প্রতি ভাষাগত শোষণ ও নিপীড়ন। অথচ আল্লাহর বিধানে কোনো ভাষাগত আগ্রাসন নেই। আল্লাহ তাঁর সব কিতাব বান্দাদের জাতিসত্তার ভাষা বা মাতৃভাষায় নাজিল করে এবং জাতিসত্তার ভাষা দিয়ে নবী-রাসূল পাঠিয়ে বিশ্ববাসীকে দিয়েছেন ভাষাগত মুক্তি। এই বোঝাটা বুঝি বলে এবং সূরা ইবরাহীমের ৪ আয়াতের ভাষানীতির ইতিহাসের পিছুডাক শুনতে পাই বলেই এই আয়াতের পিছুটানে এই ইতিহাস ও অতীতের পানেই ছুটে আসি। হৃদয় ভরে ভাষার মহাসত্যকে উপলব্ধি করি। তাইত আমার মন দরিয়ায় মাতৃভাষা চেতনার ভাবতরঙ্গের এতই খেলা। ভাব ও চেতনার উথাল-পাথাল ঢেউতরঙ্গের দোলায় দোলে আমার প্রাণ। নামাজ-কোরআন পাঠের ক্ষেত্রেও আমার প্রাণের আকুতি বারবার তাই চায়। একুশের চেতনায় রাঙিয়ে দিতে চাই বিশ্বকে।
যারা ভাবেন বেহেশতি ভাষায় কোরআন নাজিল হয়েছে। অন্য ভাষায় কোরআন নাজিল করা যেত না। তাদের বলছি, চেয়ে দেখুন সূরা দুখানের ৫৮ আয়াত ও সূরা মাইয়াসের ৯৭ আয়াতের দিকে, এখানে আল্লাহ বলেন, আপনার (রাসূলুল্লাহর) ভাষায় কোরআন সহজ করেছি। আর তাইত আরবি যেমন রাসূলুল্লাহর ভাষা ও কোরআনের ভাষা ঠিক তেমনি করেই রাসূলুল্লাহর জানের দুশমন ও নিকৃষ্ট কাফের আবু লাহাবের ভাষাও এই আরবিই। আর বেহেশতি ভাষা যদি দুনিয়া থেকেই শিখে যেতে হতো তবে তো আল্লাহ তাঁর অনারব নবী-রাসূলদের ওপরেই আরবিতে কিতাব দিবেন এবং তাদের আরবি ভাষা বোঝার যোগ্যতা অর্জনের নির্দেশ দিতেন। আল্লাহর বিধান, দুনিয়া চলবে দুনিয়ার ভাষাতেই। বিশ্বের সব জাতি জাগো মাতৃভাষা প্রেমের চেতনায়, জাগো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অভিষ্ঠ লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চল।
ই-মেইল : [email protected]
 

ইসলাম ও জীবন পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close