¦
লাইফ সাপোর্ট দেয়া না দেয়া

মুফতি মুতীউর রাহমান | প্রকাশ : ০৮ মে ২০১৫

লাইফ সাপোর্ট দেয়া শরিয়তে জায়েজ কিনা? ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে কোনো রোগীকে যদি লাইফ সাপোর্ট দেয়া না যায় আর তিনি মারা যান তাহলে সংশ্লিষ্ট লোক গোনাহগার হবেন কিনা? এ দুটি প্রশ্নই আমাকে করা হয়েছে। তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে এখানে অবশ্য আরও কিছু প্রশ্ন আসে। সবগুলো বিষয় নিয়েই আলোচনা করা জরুরি।
এসব প্রশ্নের সমাধানের জন্য প্রথমেই চিকিৎসার ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিটা আলোচনা করতে হয়। তাতে প্রশ্নগুলোর সমাধান সহজেই বেরিয়ে আসবে।
ইসলামে চিকিৎসাকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে- ‘যখন আমি রোগাক্রান্ত হই তখন তিনি আমাকে আরোগ্য দেন।’ (শুআরা : ৮০)। চিকিৎসার বহু উপকরণ এ পৃথিবীতে আল্লাহতায়ালা দিয়েছেন। এর কোনোটির কথা কোরআনেই পরিষ্কার বলে দিয়েছে। মধু সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে- তার (মৌমাছির) পেট থেকে বিভিন্ন রঙের পানীয় বের হয়। যাতে মানুষের জন্য রয়েছে রোগের প্রতিকার। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। (নাহল : ৬৯)। আল্লাহ যখন মানুষকে আরোগ্য দেন, আর মধুর মতো একটি ঔষধি দ্রব্যকে নেয়ামত উল্লেখ করেন তখন বুঝাই যায় চিকিৎসাটা ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ। একটুও হেলাফেলার বিষয় নয়। একটি আয়াতে কোরআনকে রোগের প্রতিকার বলা হয়েছে, আমি কোরআনে এমন বিষয় নাজিল করি যা রোগের সুচিকিৎসা এবং মুমিনদের জন্য রহমত। (ইসরা : ৮২)। স্বয়ং আল্লাহতায়ালাই যখন কোরআনে চিকিৎসার জন্য কিছু অবতীর্ণ করেন তখন তা যে গুরুত্ববহ সেটা সহজেই বোঝা যায়। হজরত মুহাম্মদ (সা.) তো পরিষ্কার ভাষাই চিকিৎসা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, হে আল্লাহর বান্দাগণ তোমরা চিকিৎসা করবে। কারণ আল্লাহতায়ালা এমন কোনো রোগই সৃষ্টি করেননি যার তিনি প্রতিষেধকও রাখেননি (বুখারি ২/৮৪৭), তিরমিজি ২/২৪১), (আবু দাউদ ২/৫৪১) হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেও চিকিৎসা নিয়েছেন। সাহাবিগণও চিকিৎসা নিয়েছেন। তিনি তার সমর্থন দিয়েছেন। তবে চিকিৎসা গ্রহণ, ওষুধ সেবন ইসলামের দৃষ্টিতে জরুরি (ফরজ বা ওয়াজিব) কোনো বিষয় নয়। বিভিন্ন হাদিস থেকে এরও সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেন, আমার উম্মতের মধ্য থেকে ৭০ হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারা হল যারা ঝাড়ফুঁক ও কুলক্ষণ নির্ধারণ করে না বরং তারা তাদের প্রতিপালকের ওপর ভরসা করে। (বুখারি ২/৯৫৮)। মুসলিম শরিফের ভাষ্যকার আল্লামা নব্বী বলেন, প্রতিটি রোগেরই ওষুধ আছে।... হাদিসে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, চিকিৎসা করা মুস্তাহাব। এটাই শাফী মাজহাব। জুমহুর ওলামা, পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ওলামাদেরও মাজহাব। কাজী ইয়াস বলেন, এসব হাদিস দিয়ে সামগ্রিকভাবে চিকিৎসা বৈধ হওয়া এবং হাদিসগুলোয় চিকিৎসা মুস্তাহাব প্রমাণিত হয়। (শরহে নব্বী ২/২২৫)।
এখানে অবশ্য আরেকটি বিষয় খোলাসা করা প্রয়োজন। কোনো সমস্যা দূর করার উপায় উপকরণ তিন ধরনের।
এক. এমন উপকরণ যা সমস্যা দূর হওয়া নিশ্চিত। যেমন পানি পান করায় পিপাসার কষ্ট দূর হওয়া। খাদ্য আহার করলে ক্ষুধার কষ্ট দূর হওয়া। নিশ্চিত বিষয়। যদি এমন পরিস্থিতি হয় যে, পানি পান না করলে অথবা আহার না করলে একজন লোক মারা যাওয়ার আশংকা আছে। তখন পানি পান না করা আহার না করা তার জন্য হারাম।
দুই. সন্দেহযুক্ত উপকরণ। যা ব্যবহার করলে সমস্যা দূর হওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। যেমন রোগীকে ঝাড়ফুঁক করা। এতে রোগীর সুস্থ হওয়ার বিষয়টি সন্দেহযুক্ত। এ ধরনের উপকরণ ব্যবহার না করাই উত্তম।
তিন. অনুমানভিত্তিক, সম্ভাব্য উপকরণ। সব চিকিৎসাব্যবস্থা বা ওষুধ এ অন্তর্ভুক্ত। বিভিন্ন বৈধ চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ, ওষুধ সেবন ইসলামের দৃষ্টিতে মুস্তাহাব। জরুরি নয়, সুতরাং সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসা গ্রহণ না করা, ওষুধ সেবন না করা আদৌ কোনো গোনাহ বা হারাম কাজ নয়। তবে অনুত্তম। (আলমগীরি ৫/৩৫৫)। এ পর্যায়ে একটি সন্দেহের অপনোদন অতি জরুরি। তা হল উপরোক্ত আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট হয়, চিকিৎসা গ্রহণ না করা ওষুধ সেবন না করা মোটেই কোনো গোনাহ নয়। একজন মানুষের পক্ষে পানি পান করা, আহার করা সম্ভব হওয়া সত্ত্বেও যদি সে পানাহার না করে মারা যান তাহলে অবশ্যই গোনাহগার হবেন। কিন্তু চিকিৎসা গ্রহণের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসা না নিয়ে মারা গেলে গোনাহগার হবেন না। বিভিন্ন ফিকাহের কিতাবে এ পার্থক্যটা পরিষ্কার করে উল্লেখ করা হয়েছে (আলমগীরি, ৫/৩৫৪, শামী ৯/৪৮৮-৮৯, মাজমাউল আনহুর ৪/১৮০)। কিন্তু কোনো কোনো লেখক এ দুটি বিষয়ের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন। ফলে তারা মারাত্মক ভুল করেছেন। এমন কয়েকটি বাংলা পুস্তক আমার নজরে পড়েছে। এ বিভ্রান্তির নিরসন জরুরি।
এবার মূল প্রসঙ্গে আসা যাক। লাইফ সাপোর্ট হচ্ছে একটি চিকিৎসা পদ্ধতি, যখন একজন মানুষ স্বাভাবিকভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করতে পারেন না তখন ইনটেনসিভ কেয়ারে লাইফ সাপোর্টের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে তার শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করা হয়। ফলে রোগীর ব্রেন, হার্ট, কিডনিসহ আরও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো তখন সচল থাকে। লাইফ সাপোর্ট না দিলে এসব অঙ্গগুলো কর্মক্ষম থাকবে না। মোট কথা এটা একজন আশংকাজনক রোগীকে সারিয়ে তোলার প্রাণান্ত প্রচেষ্টা। কিন্তু এ চেষ্টার শেষ পর্যন্ত সে সম্পূর্ণ সেরে উঠবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। অনেকে লাইফ সাপোর্টে থেকে মারাও যান। খুব কম লোকই সেরে ওঠেন। উপরন্তু এটা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। যে চিকিৎসায় সাধারণত মানুষ সুস্থ হয় তাও যদি কেউ গ্রহণ না করে মারা যায় তবুও সে গোনাহগার হয় না। তাহলে লাইফ সাপোর্টে যখন সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা কমই তখন তা না দিলে গোনাহ হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আর্থিক সঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও কোনো রোগীকে যদি লাইফ সাপোর্ট না দেয়া হয় তাহলে তাতে রোগী বা তার স্বজনরা মোটেই গোনাহগার হবেন না। তবে ডাক্তাররা যদি বলেন তাহলে সম্ভব হলে তা করাটাই ভালো।
প্রথমত ডাক্তাররা যখন লাইফ সাপোর্ট দেন তখন রোগী জীবিত বলেই তাকে সুস্থ করার চেষ্টা হিসেবে তা দেন। সুতরাং এক্ষেত্রে লাইফ সাপোর্টে থাকা স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক সম্পর্ক অবশ্যই বহাল থাকবে। তাতে সন্দেহ নেই। লোকমুখে একটা কথা বহুল প্রচলিত লাইফ সাপোর্ট মানেই আসলে লোকটা মারা গেছে। ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলে আমি জেনেছি কথাটা সঠিক নয়। তবে দীর্ঘদিন লাইফ সাপোর্টে থাকলে নাকি অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্রেন ডেমেজও হয়। তখন বাঁচার আশা থাকে না। এ ধরনের কোনো কোনো রোগীর মৃত্যু সঙ্গে সঙ্গে হয়তো ডাক্তাররা স্বজনকে জানান না। ২/১ দিন বিলম্বে জানান। এক্ষেত্রে দ্বীনদার অভিজ্ঞ ডাক্তারদের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা করতে হবে। এ বিষয়ে শরিয়তের আরও কিছু মাসআলা রয়েছে। এ ক্ষুদ্র পরিসরে তা আলোচনা করা সম্ভব হল না। ভবিষ্যতে লেখার ইচ্ছা থাকল। আল্লাহ তাওফিক দিন।
লেখক : শায়খেসানি ও প্রধান মুফতি চৌধুরীপাড়া মাদ্রাসা
 

ইসলাম ও জীবন পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close