¦
আমি কোরআনকে সহজ করে দিয়েছি

মাহমুদা আক্তার নীনা | প্রকাশ : ০৮ মে ২০১৫

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘রাসূলকে কবিতা শিখাইনি এবং তার জন্য তা লোভনীয় নয়, এটা (কোরআন) শুধু উপদেশ ও স্পষ্ট কোরআন, যাতে জাগ্রতচিত্তের অধিকারী ব্যক্তিদের সতর্ক করে এবং কাফেরদের বিরুদ্ধে শাস্তির বাক্য সত্য বলেই প্রমাণ হয়।’ (সূরা ইয়াসিন ৬৯ ও ৭০ আয়াত)। এ ছাড়াও সূরা কামারের ১৭, ২২, ৩২ ও ৪০নং আয়াতে কোরআন থেকে উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণের উদার আহ্বান জানিয়ে আল্লাহ বলেন, উপদেশ গ্রহণের জন্য আমি কোরআনকে সহজ করে দিয়েছি। অতএব আজ কি কেউ এর থেকে শিক্ষা গ্রহণের অর্থাৎ একই সূরায় একইভাবে চারবার শিক্ষা ও উপদেশ বলেই কোরআনকে দাবি করা হয়েছে। কোরআন থেকে উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। সর্বপ্রথম কোরআনের নাজিলকৃত আয়াতেও তাই শিক্ষা গ্রহণ ও জ্ঞান অর্জন বা অজানাকে জানার জন্য কোরআন পাঠের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সর্বপ্রথমে যেমন তা পাঠের নির্দেশ দেয়া হয়েছে তেমনি এতে শিক্ষার পরিষ্কার ও পরিপূর্ণ সংজ্ঞা জানিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রথমেই আল্লাহ বলেন, পাঠ করুন আপনার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন, যিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাটবাঁধা রক্তপিণ্ড থেকে, আর পাঠ করুন আপনার রব অত্যন্ত দয়ালু, তিনি শিক্ষা দিয়েছেন কলমের মাধ্যমে, তিনি শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না। (সূরা আলাক ১ থেকে ৫ আয়াত)। এখানে স্পষ্টই বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে অজানাকে জানার নামই হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষার এমন চমৎকার সংজ্ঞা আল্লাহ ছাড়া আর কে-ইবা দিতে পারে।
সুতরাং স্পষ্ট হয় যে, আল্লাহ রাসূলকে কোরআন পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন শিক্ষা গ্রহণের জন্য এবং অজানাকে জানার জন্য। অর্থাৎ ধর্মচর্চা ও ধর্মাচার হতে হবে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার মধ্য দিয়েই। না বুঝে ও না জেনে নয়। তাইতো আল্লাহ বলেছেন, রাসূলকে কবিতা শিখাননি বরং কোরআন হচ্ছে উপদেশ ও শিক্ষা। সুতরাং সবাইকে কোরআন পাঠ, কণ্ঠস্বর ও শ্রবণ করতে হবে তার উপদেশ, শিক্ষা ও জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে ও লক্ষ্যেই। এ লক্ষ্য থেকে বিন্দুমাত্র সরে যাওয়া চলবে না। শিক্ষা সভ্যতার বাহন, আর সভ্যতা প্রগতির বাহন। তাইতো আল্লাহ মানুষ জাতিকে সভ্য ও প্রগতিশীল করে তুলতে সৃষ্টির আদি থেকে যুগে যুগে জাতিতে জাতিতে নবী-রাসূল প্রেরণ করে ও কিতাব দিয়ে তাদের শিক্ষা ও জ্ঞানদান করেছেন। তিনি আদমকে সৃষ্টি করে সবার আগে তাকে শিক্ষা ও জ্ঞানদান করে অন্য জীব থেকে আলাদা করেছেন এবং শিক্ষা দিয়েই আদম জাতিকে তার সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। তাই শিক্ষা জ্ঞান আদম সন্তানদের জন্মগত অধিকার। আল্লাহ কিতাব (শিক্ষা ও জ্ঞান) আদম সন্তানদের সর্বজনীন দিকনির্দেশনা, হেদায়েতের আলোকবর্তিকা বা আলোকিত পথের দিশা। সৃষ্টির আদি থেকে ধর্ম ও আল্লাহর শিক্ষাই সমাজ সভ্যতাকে এগিয়ে এনেছে। আর শিক্ষা ও সভ্যতাই মানুষকে প্রগতির দিকে অগ্রসর করেছে। আল্লাহর কিতাবের শিক্ষা মূর্খ, বর্বর ও ঊচ্ছৃংখল থেকে সুশিক্ষিত, সভ্য ও সুশৃংখল করেছে। তাই শিক্ষাই মানুষের বিশেষ ও আলাদা বৈশিষ্ট্য যা তাদের দিয়েছে আল্লাহর সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্বের সম্মান, মর্যাদা ও গৌরব। তাই শিক্ষাই মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ, ঐশ্বর্য ও অলংকার। তবে শিক্ষার জন্য সর্বপ্রথমেই চাই বোধগম্য এ কার্যকর ভাষা, কেননা কোনোকিছুকে (কথাকে) বুঝা ও জানা ছাড়া তা কখনোই শিক্ষা, জ্ঞান কিংবা উপদেশে পরিণত হতে পারে না। তাই অবশ্যই শিক্ষার জন্য ভাষাটা বোধগম্য ও তা বোঝা চাই। বোঝা ছাড়া শিক্ষার কোনো উপায় নেই। আর মাতৃভাষা নিশ্চিত বোধের ভাষা তাই আল্লাহ বান্দাদের মাতৃভাষা বা জাতিসত্তার ভাষার (যা প্রাকৃতিক বোধগম্য ভাষা) বিকল্প কোনো পথই দেখাননি। রাসূলুল্লাহর (সা.) প্রতি যেমন তার জাতিসত্তার ভাষা আরবিতে কিতাব নাজিল করেছেন তেমনি অনারব রাসূলদের প্রতিও তাদের নিজ নিজ জাতিসত্তার ভাষা ও মাতৃভাষা বিভিন্ন অনারবি ভাষাতে কিতাব দিয়ে তার শিক্ষা ও জ্ঞানালোকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বিশ্বময়। আল্লাহর নবী-রাসূলগণই যুগে যুগে জাতিতে জাতিতে আল্লাহর শিক্ষা ও জ্ঞানের মাধ্যমে সভ্যতার মশাল জ্বালিয়েছেন সমাজকে সভ্য করে তুলতে। আল্লাহ তার শিক্ষা থেকে অনারব নবী-রাসূলদের জাতিসত্তার ভাষা মাতৃভাষাকে নির্বাসিত করেননি। আল্লাহর কিতাব নাজিলের ক্ষেত্রে এ নীতির ব্যত্যয় ঘটেনি। তথাপি নামাজ কোরআন পাঠের ক্ষেত্রে অনারবদের মাতৃভাষাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে যা ১৪৩৫ হিজরিতে সভ্যতার ঝলমলে রোদেলা দুপুরেও ফেরত আসেনি। এখনও ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তারের নামে বোধগম্যহীন ভাষা আওড়িয়ে চলছে অমানিশার অন্ধকারের মতো অজ্ঞতার অন্ধকারের বিস্তার। আল্লাহর কোরআনের উপদেশ, শিক্ষা ও জ্ঞানকে পরিণত করে রাখা হয়েছে অবোধ শিশুর আগডুম, বাগডুম ছড়ার মতো। যেখানে স্বয়ং আল্লাহই বলেছেন, তিনি রাসূলকে কবিতা শিখাননি বরং কোরআন হচ্ছে শিক্ষা ও উপদেশ। বোধগম্যহীন আরবি ভাষার মরণ ছোবলেই আমাদের অনারব মুসলিম সমাজ অজ্ঞতার অন্ধকারে ডুবন্ত জাহাজের মতোই নিমজ্জিত। যা টেনে তোলা দুরূহ কাজ, কঠিন ও সীমাহীন ধৈর্যের কাজ। শিক্ষা যেমন সভ্যতার আলো, তেমনি বোধগম্য ভাষা হচ্ছে শিক্ষার আলো। বোধগম্য ভাষা ছাড়া কখনোই শিক্ষার আলো জ্বলবে না বরং তা নিভন্ত প্রদীপের (জ্বালানিবিহীন) মতোই অন্ধকার হয়ে থাকবে। কোরআনকে বোধগম্যহীন ভাষায় কবিতা কিংবা ছড়ার মতো আওড়িয়ে কখনোই মানবজাতির ইহলৌকিক কিংবা পারলৌকিক শান্তি কিংবা মুক্তি মিলবে না। বরং বোধগম্য ভাষার কোরআন পাঠ ও তার শিক্ষা জ্ঞান ও উপদেশ গ্রহণের মাধ্যমে মিলবে মানুষের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক শান্তি ও মুক্তি। কেননা আল্লাহর কিতাবের মূল শিক্ষা মানবতার শিক্ষা। এছাড়া কোরআনে সব ধরনের জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমাহার ঘটেছে। তাই এ শিক্ষাই মানুষের বিবেকবোধকে জাগ্রত করবে, বিবেক-বুদ্ধিকে বাড়িয়ে দেবে ও জানিয়ে রাখবে, আর সমাজকে সভ্যতা ও প্রগতির দিকে এগিয়ে নেবে। জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, তথ্য-প্রযুক্তিতে তাদের সফলতা এনে দেবে। আর এ কোরআনভিত্তিক ধার্মিক সমাজই শক্ত হাতে মানবতার পতাকা ধরে রাখার দায়িত্ব পালন করবে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে। তাই শিক্ষার দুর্গম পথকে মাতৃভাষার মাধ্যমে সবার জন্য সুগম করতে হবে। এ কাজ যত দুরূহ হোক এতে ধৈর্যের ও সাহসের পরিচয় দিতে হবে। সবার জন্য শিক্ষাকে সহজ করে দিতে হবে। আল্লাহ যেমন রাসূলুল্লাহ (সা.) মতো অন্য নবী রাসূলদের আপনাপন ভাষায় তার কিতাব, শিক্ষা ও উপদেশকে অর্থাৎ ধর্মকে সহজ করে দিয়েছিলেন ঠিক তেমনিই।
সর্বপ্রথম নাজিলকৃত কোরআনের সূরা আলাকে প্রথম পাঁচটি আয়াতের চুলচেরা বিশ্লেষণ করুন। এখানে স্পষ্টই দেখা যায় রাসূলকে কোরআন পাঠ করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে শিক্ষা ও জ্ঞানার্জনের জন্য। অজানাকে জানার জন্য যা মানুষ জানত না। আর বারবার পাঠ করা হয় তা ভালোভাবে জানার জন্য যাতে করে ঈমান বা বিশ্বাসের দৃঢ়তা ও হৃদয়ের প্রশান্তি আসে। এছাড়া কোরআনে আল্লাহ বারবার বলেছেন এটা সুসংবাদ বার্তা ও সতর্কবার্তা। কিন্তু বোধগম্য ভাষা ছাড়া কোনো বার্তাই বার্তায় পরিণত হয় না। তা সুসংবাদ বার্তাই হোক আর সতর্কবার্তাই হোক। সতর্ক সংকেত বোঝা না গেলে সে সংকেত দিয়ে কোনো ফায়দা নেই। আর এ কারণেই আল্লাহতায়ালা তার শিক্ষা, জ্ঞান, উপদেশকে অর্থাৎ কিতাবকে নির্দিষ্ট কোনো ভাষার প্রাচীরে রুদ্ধ করেননি। [email protected]
 

ইসলাম ও জীবন পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close