jugantor
কম্পিউটার সায়েন্সে ক্যারিয়ার

  মোহাম্মদ আতাউর রহমান  

১০ ডিসেম্বর ২০১৫, ০০:০০:০০  | 

তথ্য প্রযুক্তি বিপ্লবের এই যুগে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জীবনের সর্বক্ষেত্রে কম্পিউটারের ব্যবহার বেড়েছে। যুগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শিক্ষার সব স্তরে কম্পিউটার শিক্ষা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। ব্যবসা বাণিজ্য, প্রশাসন, শিল্প ও যোগাযোগ প্রভৃতি এখন সম্পূর্ণরূপে কম্পিউটার ও তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে এ বিষয়ে শিক্ষিতদের ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে এবং হচ্ছে। কম্পিউটার সায়েন্স শিক্ষিতদের প্রধান কর্মক্ষেত্র হচ্ছে শিক্ষকতা, গবেষণা, প্রোগ্রামিং। বাংলাদেশী দক্ষ কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারদের দেশী-বিদেশী নামকরা প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ হচ্ছে। অনেকেই আইবিএম, মাইক্রোসফ্ট ও গুগলের মতো বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পাচ্ছে। আবার অনেক শিক্ষার্থী বিএসসি শেষ করেই মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে আইটি প্রফেশনাল হিসেবে ভালো বেতনে কাজ পেয়ে যাচ্ছে।

কম্পিউটার বিজ্ঞানের গ্রাজুয়েটরা এই সেক্টরের পাশাপাশি ভিন্ন সেক্টরেও নিজের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে ক্যারিয়ার গড়তে পারেন। যেমন ব্যাংক, কর্পোরেট হাউজ, মিডিয়াসহ সব জায়গায়ই আজ কম্পিউটার সায়েন্সের ছাত্রদের ব্যাপক চাহিদা। বর্তমানে প্রায় প্রতিটি কোম্পানিতে যেমন একটি অ্যাকাউন্টস বিভাগ লাগে তেমনি প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ভালোভাবে চালাতে দক্ষ জনবলসমৃদ্ধ কম্পিউটার সেকশন প্রয়োজন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলোতে বর্তমানে সফটওয়্যার ডেভেলপার, ওয়েব ডেভেলপার, আইটি ম্যানেজার, কম্পিউটার প্রোগ্রামার, গ্রাফিক্স ডিজাইনার, কম্পিউটার সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেটর, কম্পিউটার সিস্টেম অ্যানালিস্ট, ইনফরমেশন সিকিউরিটি অ্যানালিস্ট, ডাটাবেজ অ্যাডমিন,



এছাড়া প্রায় প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে এখন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সেল খোলা হয়েছে। সেখানেও কম্পিউটার সায়েন্স শিক্ষিতদের প্রাধান্য।

কম্পিউটার সায়েন্স শিক্ষিতদের কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে আরও বিশদভাবে জানতে একজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগের প্রফেসর ড. হাসানুজ্জামান। দুই-তিন বছর আগে তার সঙ্গে কথা হয়েছিল। তখনই বুঝতে পারি কম্পিউটার সায়েন্স শিক্ষা নিয়ে তার জ্ঞান ও ভাবনার গভীরতা সম্পর্কে। ড. হাসানুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ১ ডিসেম্বর দুপুর ২টায় সময় দেন। ক্যামেরা পারসন রেজাকে সঙ্গে নিয়ে যথাসময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগে হাজির হই। সেখানে গিয়ে দেখলাম ওই বিভাগের শিক্ষার্থীরা ল্যাবে মনের আনন্দে নিজ নিজ কাজ করছে। ড. হাসানুজ্জামান ল্যাবগুলো ঘুরে দেখান। জানালেন ঢাবির সিএসই শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রয়োগিক শিক্ষায়ও পিছিয়ে নেই। তার কথার প্রমাণ মেলে বিভাগের হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার ল্যাবে গিয়ে। অত্যাধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে সেখানে। রয়েছে পর্যাপ্ত কম্পিউটার। দ্রুত গতির ইন্টারনেট সুবিধা। গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি। সেখানে শিক্ষার্থীরা সহজেই প্রায়োগিক শিক্ষাটা নিতে পারছে। রয়েছে ডিজিটাল সেমিনার লাইব্রেরি। যেখানে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় পড়ার সামগ্রী পাওয়ার পাশাপাশি দুর্লভ সব আর্টিকেল ডাউনলোডের সুযোগ পাচ্ছে।

সাক্ষাৎকার

চাকরির খোঁজ : স্যার আপনার কাছে প্রথমেই জানতে চাইব কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার প্রতি দেশের শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কখন থেকে শুরু?

ড. হাসান : আমার যতদূর মনে পড়ে ১৯৮৭ সালে বুয়েটে এবং ১৯৯২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএসই বিভাগ খোলা হয়। তখন এ দুটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা কম্পিউটার সায়েন্স পড়া শুরু করে। একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে শিক্ষার্থীরা সিএসই পড়ার প্রতি ব্যাপকভাবে ঝুঁকে পড়ে। পরবর্তীতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ্য শিক্ষকের অভাব এবং উপযুক্ত ল্যাব তথা প্রায়োগিক শিক্ষা না পাওয়ায়

এ বিষয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে যায়। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় গত দুই বছর ধরে এ বিষয়ে পড়তে ছাত্ররা আগ্রহ দেখাচ্ছে। এ কারণে সম্প্রতি দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএসই শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে।

চাকরির খোঁজ : শিক্ষাবিদদের অনেকেই মনে করেন, সায়েন্সে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন কমছে। সেই ছোঁয়া সিএসইতেও পড়েছে বলে মনে করেন কিনা?

ড. হাসান : সিএসই শিক্ষার্থীদের চাকরি বাজার সংকুচিত হয়ে পড়ায় একসময় এ বিষয়ের প্রতি ছাত্রছাত্রীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় ও কর্মসংস্থান হওয়ায় ছাত্রছাত্রী ফের বাড়ছে।

চাকরির খোঁজ : একসময় বিবিএ, আইন পড়াটাকে শিক্ষার্থীরা লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিত। এখন সেই ঝোঁকটা নেই বললেই চলে। সিএসইও সেই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে বলে আপনি মনে করেন কি?

ড. হাসান : কম্পিউটার সায়েন্স শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের স্বপ্ন থাকে ভালো প্রোগ্রামার হওয়া। শিক্ষার্থীদের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে হলে আমাদের শিক্ষাটাও সেই মানের করতে হবে। হাতেগোনা দু’তিনটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অন্যত্র আমরা মানসম্মত শিক্ষাটা কি দিতে পারছি? সিএসই শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত ল্যাব নেই। সিএসই পড়া প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ১শ’ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১ জনও ভালো মানের প্রোগ্রামার হয়ে বেরিয়ে আসছে না। দু’একটি বিশ্ববিদ্যালয় বাদে সব প্রাইভেট বিশ্বদ্যিালয়ে ভালো স্কলার নেই এবং সেখানে সঠিক সিলেবাস প্রণয়ন হচ্ছে না। প্রাইভেটে সেমিস্টার পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের তাত্ত্বিক শিক্ষাটা দেয়া সম্ভব হলেও প্রাকটিক্যাল শিক্ষা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্রোগ্রামিং কনটেস্টেও ভালো পারফর্ম করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পারফরমেন্স ভালো। আমরা যদি মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারি তবে আমাদের শিক্ষার্থীরা প্রোগ্রামার হিসেবে কোনো ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাবে না। আর সিএসই পড়ে কর্মসংস্থান না হলে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের কেন এ বিষয়ে ভর্তি করবে? ভালো আইটি প্রফেশনাল সৃষ্টি করতে হলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদেরও উপযুক্ত শিক্ষাটা দিতে হবে। পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএসই শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোতে সিএসই শিক্ষার প্রসার ঘটলে দেশে আরও বেশি আইটি প্রফেশনাল তৈরি হবে।

চাকরির খোঁজ : সিএসই শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে জানতে চাই?

ড. হাসান : বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও দেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ বিষয়ের শিক্ষার্থীদের কাজের পরিধি বেড়েছে। এ বিভাগের শিক্ষার্থীরা মাস্টার্স ডিগ্রি করার আগেই ভালো ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রোগ্রামার ও নেটওয়ার্ক অ্যাডমিনিস্ট্রেটরদের চাহিদাও দিন দিন বেড়ে চলছে। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদেরও কাজের পরিধি বাড়ছে। তবে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব আইটি প্রোডাক্ট ব্যবহার করতে এখনও খুব একটা আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তারা বিদেশের তৈরি সফটওয়ার ব্যবহার করছে। এতে করে বেশি টাকা দিয়ে প্রোডাক্ট কিনতে হচ্ছে এবং মেনটেইনেন্স খরচও বাড়ছে। আমরা যদি নিজেদের আইটি প্রোডাক্ট ব্যবহারে আগ্রহী হই তবে সিএসই শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান আরও সৃষ্টি হবে। সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মিডিয়া হাউসসহ প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই সিএসই শিক্ষিত লোকবলের দরকার হচ্ছে। তাছাড়া আমাদের শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ শিক্ষকতারও সুযোগ পাচ্ছেন। আর সরকারি বহু প্রতিষ্ঠানে আইটি সেল খোলা হয়েছে। সেসব প্রতিষ্ঠানে এন্ট্রি লেভেলে সিএসই শিক্ষার্থীরা চাকরি পেলেও বড় পজিসনে চাকরি খুব একটা পাচ্ছে না। নীতিমালায় ত্র“টির কারণে সরকারি প্রতিষ্ঠানে বড় বড় পদে নন আইটি ব্যাকগ্রাউন্ডের লোকজন কর্তৃত্ব করছেন।

চাকরির খোঁজ : সিএসই শিক্ষার্থীদের বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ কতটা আছে?

ড. হাসান : আমাদের শিক্ষার্থীদের অনেকে মাইক্রোসফ্ট, আইবিএম, গুগল, স্যামসাংয়ের মতো বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে প্রোগ্রামার হিসেবে কাজের সুযোগ পেয়েছেন। এছাড়া ওয়েব ডিজাইনার, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার অথবা ডাটাবেজ প্রোগ্রামার হিসেবে দক্ষ প্রোগ্রামার হলে বিদেশের বড় প্রতিষ্ঠান কিংবা দেশে কাজ করছে এমন বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকরির সুযোগ রয়েছে। জাপানের জাইকা ও কোরিয়ার কোইকা বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে নেটওয়ার্কিং রিলেটেড কাজ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে। কোইকা বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স ফ্যাকাল্টি ও বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের সঙ্গে যৌথ আইটি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালু করেছে। স্যামসাং বাংলাদেশে রিসার্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফার্ম খোলেছে। সেখানে প্রচুর বাংলাদেশী তরুণের কর্মসংস্থান হয়েছে। সনি সফটওয়্যার হার্ডওয়্যার উন্নয়নে বাংলাদেশে রিসার্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফার্ম খুলতে আগ্রহী। সুতরাং দেখা যাচ্ছে সিএসই শিক্ষিতদের বিদেশী প্রতিষ্ঠানে কাজের ব্যবস্থা হচ্ছে।

চাকরির খোঁজ : আইটি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে একজন আবেদনকারীর কোন যোগ্যতাগুলো বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়?

ড. হাসান : সিএসই শিক্ষার্থীদের বড় প্রতিষ্ঠানে ভালো পজিশনে চাকরি পেতে হলে প্রোগ্রামিংয়ে ভালো দখল থাকতে হবে। মূলত C++, জাভা প্রোগ্রামিংয়ে দক্ষতা, ডাটা স্ট্রাকচার, আলগরিদম, ডাটাবেজ ও সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সে আবেদনকারীর ভালো দখল আছে কিনা বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তা যাচাই করে। এছাড়া বিদেশী প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে একজন আবেদনকারীর যোগাযোগ দক্ষতা বিশেষ করে ইংরেজিতে কতটা দখল আছে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়।

চাকরির খোঁজ : সিএসই শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা অবস্থায় চাইলে খণ্ডকালীন চাকরি করার সুযোগ কতটা পাচ্ছে?

ড. হাসান : সিএসই শিক্ষার্থীদের খণ্ডকালীন চাকরির বহু সুযোগ রয়েছে। সাধারণত কোনো একটা প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজ শেখার পরেই একজন ছাত্র এই সুযোগ পাচ্ছে। তাছাড়া আমাদের শিক্ষার্থীদের অনেকেই বিএসসি তৃতীয়-চতুর্থ বর্ষ থেকেই ভালো কাজের সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে।

চাকরির খোঁজ : বিদেশে উচ্চ শিক্ষা লাভের সুযোগ কতটা হচ্ছে?

ড. হাসান : ইউরোপ আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালগুলোতে পিএইচডি করতে হলে মাস্টার্স ডিগ্রি থাকা চাই। কিন্তু আমাদের সিএসই শিক্ষার্থীদের অনেকেই বিএসসি করেই চাকরিতে যোগ দেয়। মাস্টার্স করে না। তাই আমি বলব ইচ্ছা থাকলে আর ইংরেজিতে ভালো দখল থাকলে কম্পিউটার সায়েন্সের শিক্ষার্থীদের বিদেশে পড়ার পর্যাপ্ত সুযোগ রয়েছে। আইএলটিএস অথবা জিআরইতে একটু ভালো স্কোর করতে পারলে বিশ্বের যে কোনো ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভ করা সম্ভব। আমাদের শিক্ষার্থীদের অনেকে তা করছেও।

চাকরির খোঁজ : দেশের বহু সংখ্যক কর্মক্ষম লোকজনকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে সিএসই শিক্ষা কতটা ভূমিকা রাখতে পারে?

ড. হাসান : বর্তমান যুগ তথ্য প্রযুক্তির যুগ। আইটি জানা লোকদের ব্যাপক কর্মসংস্থান হচ্ছে। তাই আইটি ও কম্পিউটার শিক্ষা দিয়ে আমাদের ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে খুব সহজেই দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে পারি। এজন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে আইটি ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলতে হবে। শিল্প গড়ে না উঠলে কর্মসংস্থান হবে না। নতুন আইটি উদ্যোক্তাদের পর্যাপ্ত সহায়তা দিতে হবে। এছাড়া সিএসই গ্রাজুয়েটদের মানসম্মত কোম্পানিতে কাজ করার সুযোগ করে দিতে হবে। এছাড়া সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আইটি বিভাগে সিএসই ব্যাকগ্রাউন্ডের কর্মীদের প্রাধান্য দিতে হবে। এছাড়া বর্তমানে যেহেতু প্রোগ্রামারদের চাহিদা বেশি। তাই পদার্থ, গণিত, পরিসংখ্যানসহ সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ডের গ্রাজুয়েটদের ২ বছরমেয়াদি প্রোগ্রামিং শিক্ষা দেয়া যেতে পারে। এতে করে তারা দক্ষ প্রোগ্রামার হয়ে উঠবে।

চাকরির খোঁজ : আইটি বিজনেসে নতুন উদ্যোক্তরা কোন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে?

ড. হাসান : দেশী আইটি ফার্মগুলো বড় কোনো কাজ পাচ্ছে না। বড় কোম্পানি বা ব্যাংকগুলো দেশী সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোর ওপর আস্থা রাখছে না। তারা বিদেশীদের ওপর নির্ভর করছে। নতুন উদ্যোক্তারা সহজে কাজ না পাওয়ায় নিজেদের কর্মীদের ভালো বেতন দিতে পারছে না। ফলে মানসম্পন্ন প্রোগ্রামারও ধরে রাখতে পারছে না। এভাবে আইটি প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসায় টিকে থাকতে পারছে না। ফলে দেশে আইটি ইন্ডাস্ট্রিও গড়ে উঠছে না।

চাকরির খোঁজ : আমাদের সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

ড. হাসান : আপনাকেও ধন্যবাদ। যুগান্তরের প্রতি শুভ কামনা।

প্রফেসর ড. হাসানুজ্জামান

‘প্রফেসর ড. হাসানুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান। তিনি ঢাবির অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স বিভাগ থেকে অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছেন। কম্পিউটার সায়েন্সে মাস্টার্সেও ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছেন। পিইচডি ডিগ্রি করেছেন জাপানের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ইনফরমেটিক্স (এনআইআই) থেকে। একই প্রতিষ্ঠানের পোস্ট ডক্টরাল ফেলো তিনি। বেক্সিমকো গ্র“পে কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৯৮ সালে। ২০০০ সালে ঢাবির সিএসই বিভাগে লেকচারার পদে নিয়োগ পান। আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্স, হিউম্যান রোবট ইন্টারেকশন, হিউম্যান কম্পিউটার ইন্টারেকশন নিয়ে তিনি গবেষণা করছেন। দেশ-বিদেশের বহু জার্নাল ও বইয়ে তার লেখা ছাপা হয়েছে।’


 

সাবমিট

কম্পিউটার সায়েন্সে ক্যারিয়ার

 মোহাম্মদ আতাউর রহমান 
১০ ডিসেম্বর ২০১৫, ১২:০০ এএম  | 

তথ্য প্রযুক্তি বিপ্লবের এই যুগে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জীবনের সর্বক্ষেত্রে কম্পিউটারের ব্যবহার বেড়েছে। যুগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শিক্ষার সব স্তরে কম্পিউটার শিক্ষা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। ব্যবসা বাণিজ্য, প্রশাসন, শিল্প ও যোগাযোগ প্রভৃতি এখন সম্পূর্ণরূপে কম্পিউটার ও তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে এ বিষয়ে শিক্ষিতদের ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে এবং হচ্ছে। কম্পিউটার সায়েন্স শিক্ষিতদের প্রধান কর্মক্ষেত্র হচ্ছে শিক্ষকতা, গবেষণা, প্রোগ্রামিং। বাংলাদেশী দক্ষ কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারদের দেশী-বিদেশী নামকরা প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ হচ্ছে। অনেকেই আইবিএম, মাইক্রোসফ্ট ও গুগলের মতো বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পাচ্ছে। আবার অনেক শিক্ষার্থী বিএসসি শেষ করেই মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে আইটি প্রফেশনাল হিসেবে ভালো বেতনে কাজ পেয়ে যাচ্ছে।

কম্পিউটার বিজ্ঞানের গ্রাজুয়েটরা এই সেক্টরের পাশাপাশি ভিন্ন সেক্টরেও নিজের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে ক্যারিয়ার গড়তে পারেন। যেমন ব্যাংক, কর্পোরেট হাউজ, মিডিয়াসহ সব জায়গায়ই আজ কম্পিউটার সায়েন্সের ছাত্রদের ব্যাপক চাহিদা। বর্তমানে প্রায় প্রতিটি কোম্পানিতে যেমন একটি অ্যাকাউন্টস বিভাগ লাগে তেমনি প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ভালোভাবে চালাতে দক্ষ জনবলসমৃদ্ধ কম্পিউটার সেকশন প্রয়োজন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলোতে বর্তমানে সফটওয়্যার ডেভেলপার, ওয়েব ডেভেলপার, আইটি ম্যানেজার, কম্পিউটার প্রোগ্রামার, গ্রাফিক্স ডিজাইনার, কম্পিউটার সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেটর, কম্পিউটার সিস্টেম অ্যানালিস্ট, ইনফরমেশন সিকিউরিটি অ্যানালিস্ট, ডাটাবেজ অ্যাডমিন,



এছাড়া প্রায় প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে এখন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সেল খোলা হয়েছে। সেখানেও কম্পিউটার সায়েন্স শিক্ষিতদের প্রাধান্য।

কম্পিউটার সায়েন্স শিক্ষিতদের কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে আরও বিশদভাবে জানতে একজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগের প্রফেসর ড. হাসানুজ্জামান। দুই-তিন বছর আগে তার সঙ্গে কথা হয়েছিল। তখনই বুঝতে পারি কম্পিউটার সায়েন্স শিক্ষা নিয়ে তার জ্ঞান ও ভাবনার গভীরতা সম্পর্কে। ড. হাসানুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ১ ডিসেম্বর দুপুর ২টায় সময় দেন। ক্যামেরা পারসন রেজাকে সঙ্গে নিয়ে যথাসময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগে হাজির হই। সেখানে গিয়ে দেখলাম ওই বিভাগের শিক্ষার্থীরা ল্যাবে মনের আনন্দে নিজ নিজ কাজ করছে। ড. হাসানুজ্জামান ল্যাবগুলো ঘুরে দেখান। জানালেন ঢাবির সিএসই শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রয়োগিক শিক্ষায়ও পিছিয়ে নেই। তার কথার প্রমাণ মেলে বিভাগের হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার ল্যাবে গিয়ে। অত্যাধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে সেখানে। রয়েছে পর্যাপ্ত কম্পিউটার। দ্রুত গতির ইন্টারনেট সুবিধা। গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি। সেখানে শিক্ষার্থীরা সহজেই প্রায়োগিক শিক্ষাটা নিতে পারছে। রয়েছে ডিজিটাল সেমিনার লাইব্রেরি। যেখানে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় পড়ার সামগ্রী পাওয়ার পাশাপাশি দুর্লভ সব আর্টিকেল ডাউনলোডের সুযোগ পাচ্ছে।

সাক্ষাৎকার

চাকরির খোঁজ : স্যার আপনার কাছে প্রথমেই জানতে চাইব কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার প্রতি দেশের শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কখন থেকে শুরু?

ড. হাসান : আমার যতদূর মনে পড়ে ১৯৮৭ সালে বুয়েটে এবং ১৯৯২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএসই বিভাগ খোলা হয়। তখন এ দুটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা কম্পিউটার সায়েন্স পড়া শুরু করে। একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে শিক্ষার্থীরা সিএসই পড়ার প্রতি ব্যাপকভাবে ঝুঁকে পড়ে। পরবর্তীতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ্য শিক্ষকের অভাব এবং উপযুক্ত ল্যাব তথা প্রায়োগিক শিক্ষা না পাওয়ায়

এ বিষয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে যায়। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় গত দুই বছর ধরে এ বিষয়ে পড়তে ছাত্ররা আগ্রহ দেখাচ্ছে। এ কারণে সম্প্রতি দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএসই শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে।

চাকরির খোঁজ : শিক্ষাবিদদের অনেকেই মনে করেন, সায়েন্সে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন কমছে। সেই ছোঁয়া সিএসইতেও পড়েছে বলে মনে করেন কিনা?

ড. হাসান : সিএসই শিক্ষার্থীদের চাকরি বাজার সংকুচিত হয়ে পড়ায় একসময় এ বিষয়ের প্রতি ছাত্রছাত্রীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় ও কর্মসংস্থান হওয়ায় ছাত্রছাত্রী ফের বাড়ছে।

চাকরির খোঁজ : একসময় বিবিএ, আইন পড়াটাকে শিক্ষার্থীরা লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিত। এখন সেই ঝোঁকটা নেই বললেই চলে। সিএসইও সেই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে বলে আপনি মনে করেন কি?

ড. হাসান : কম্পিউটার সায়েন্স শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের স্বপ্ন থাকে ভালো প্রোগ্রামার হওয়া। শিক্ষার্থীদের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে হলে আমাদের শিক্ষাটাও সেই মানের করতে হবে। হাতেগোনা দু’তিনটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অন্যত্র আমরা মানসম্মত শিক্ষাটা কি দিতে পারছি? সিএসই শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত ল্যাব নেই। সিএসই পড়া প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ১শ’ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১ জনও ভালো মানের প্রোগ্রামার হয়ে বেরিয়ে আসছে না। দু’একটি বিশ্ববিদ্যালয় বাদে সব প্রাইভেট বিশ্বদ্যিালয়ে ভালো স্কলার নেই এবং সেখানে সঠিক সিলেবাস প্রণয়ন হচ্ছে না। প্রাইভেটে সেমিস্টার পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের তাত্ত্বিক শিক্ষাটা দেয়া সম্ভব হলেও প্রাকটিক্যাল শিক্ষা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্রোগ্রামিং কনটেস্টেও ভালো পারফর্ম করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পারফরমেন্স ভালো। আমরা যদি মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারি তবে আমাদের শিক্ষার্থীরা প্রোগ্রামার হিসেবে কোনো ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাবে না। আর সিএসই পড়ে কর্মসংস্থান না হলে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের কেন এ বিষয়ে ভর্তি করবে? ভালো আইটি প্রফেশনাল সৃষ্টি করতে হলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদেরও উপযুক্ত শিক্ষাটা দিতে হবে। পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএসই শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোতে সিএসই শিক্ষার প্রসার ঘটলে দেশে আরও বেশি আইটি প্রফেশনাল তৈরি হবে।

চাকরির খোঁজ : সিএসই শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে জানতে চাই?

ড. হাসান : বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও দেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ বিষয়ের শিক্ষার্থীদের কাজের পরিধি বেড়েছে। এ বিভাগের শিক্ষার্থীরা মাস্টার্স ডিগ্রি করার আগেই ভালো ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রোগ্রামার ও নেটওয়ার্ক অ্যাডমিনিস্ট্রেটরদের চাহিদাও দিন দিন বেড়ে চলছে। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদেরও কাজের পরিধি বাড়ছে। তবে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব আইটি প্রোডাক্ট ব্যবহার করতে এখনও খুব একটা আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তারা বিদেশের তৈরি সফটওয়ার ব্যবহার করছে। এতে করে বেশি টাকা দিয়ে প্রোডাক্ট কিনতে হচ্ছে এবং মেনটেইনেন্স খরচও বাড়ছে। আমরা যদি নিজেদের আইটি প্রোডাক্ট ব্যবহারে আগ্রহী হই তবে সিএসই শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান আরও সৃষ্টি হবে। সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মিডিয়া হাউসসহ প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই সিএসই শিক্ষিত লোকবলের দরকার হচ্ছে। তাছাড়া আমাদের শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ শিক্ষকতারও সুযোগ পাচ্ছেন। আর সরকারি বহু প্রতিষ্ঠানে আইটি সেল খোলা হয়েছে। সেসব প্রতিষ্ঠানে এন্ট্রি লেভেলে সিএসই শিক্ষার্থীরা চাকরি পেলেও বড় পজিসনে চাকরি খুব একটা পাচ্ছে না। নীতিমালায় ত্র“টির কারণে সরকারি প্রতিষ্ঠানে বড় বড় পদে নন আইটি ব্যাকগ্রাউন্ডের লোকজন কর্তৃত্ব করছেন।

চাকরির খোঁজ : সিএসই শিক্ষার্থীদের বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ কতটা আছে?

ড. হাসান : আমাদের শিক্ষার্থীদের অনেকে মাইক্রোসফ্ট, আইবিএম, গুগল, স্যামসাংয়ের মতো বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে প্রোগ্রামার হিসেবে কাজের সুযোগ পেয়েছেন। এছাড়া ওয়েব ডিজাইনার, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার অথবা ডাটাবেজ প্রোগ্রামার হিসেবে দক্ষ প্রোগ্রামার হলে বিদেশের বড় প্রতিষ্ঠান কিংবা দেশে কাজ করছে এমন বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকরির সুযোগ রয়েছে। জাপানের জাইকা ও কোরিয়ার কোইকা বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে নেটওয়ার্কিং রিলেটেড কাজ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে। কোইকা বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স ফ্যাকাল্টি ও বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের সঙ্গে যৌথ আইটি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালু করেছে। স্যামসাং বাংলাদেশে রিসার্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফার্ম খোলেছে। সেখানে প্রচুর বাংলাদেশী তরুণের কর্মসংস্থান হয়েছে। সনি সফটওয়্যার হার্ডওয়্যার উন্নয়নে বাংলাদেশে রিসার্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফার্ম খুলতে আগ্রহী। সুতরাং দেখা যাচ্ছে সিএসই শিক্ষিতদের বিদেশী প্রতিষ্ঠানে কাজের ব্যবস্থা হচ্ছে।

চাকরির খোঁজ : আইটি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে একজন আবেদনকারীর কোন যোগ্যতাগুলো বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়?

ড. হাসান : সিএসই শিক্ষার্থীদের বড় প্রতিষ্ঠানে ভালো পজিশনে চাকরি পেতে হলে প্রোগ্রামিংয়ে ভালো দখল থাকতে হবে। মূলত C++, জাভা প্রোগ্রামিংয়ে দক্ষতা, ডাটা স্ট্রাকচার, আলগরিদম, ডাটাবেজ ও সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সে আবেদনকারীর ভালো দখল আছে কিনা বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তা যাচাই করে। এছাড়া বিদেশী প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে একজন আবেদনকারীর যোগাযোগ দক্ষতা বিশেষ করে ইংরেজিতে কতটা দখল আছে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়।

চাকরির খোঁজ : সিএসই শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা অবস্থায় চাইলে খণ্ডকালীন চাকরি করার সুযোগ কতটা পাচ্ছে?

ড. হাসান : সিএসই শিক্ষার্থীদের খণ্ডকালীন চাকরির বহু সুযোগ রয়েছে। সাধারণত কোনো একটা প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজ শেখার পরেই একজন ছাত্র এই সুযোগ পাচ্ছে। তাছাড়া আমাদের শিক্ষার্থীদের অনেকেই বিএসসি তৃতীয়-চতুর্থ বর্ষ থেকেই ভালো কাজের সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে।

চাকরির খোঁজ : বিদেশে উচ্চ শিক্ষা লাভের সুযোগ কতটা হচ্ছে?

ড. হাসান : ইউরোপ আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালগুলোতে পিএইচডি করতে হলে মাস্টার্স ডিগ্রি থাকা চাই। কিন্তু আমাদের সিএসই শিক্ষার্থীদের অনেকেই বিএসসি করেই চাকরিতে যোগ দেয়। মাস্টার্স করে না। তাই আমি বলব ইচ্ছা থাকলে আর ইংরেজিতে ভালো দখল থাকলে কম্পিউটার সায়েন্সের শিক্ষার্থীদের বিদেশে পড়ার পর্যাপ্ত সুযোগ রয়েছে। আইএলটিএস অথবা জিআরইতে একটু ভালো স্কোর করতে পারলে বিশ্বের যে কোনো ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভ করা সম্ভব। আমাদের শিক্ষার্থীদের অনেকে তা করছেও।

চাকরির খোঁজ : দেশের বহু সংখ্যক কর্মক্ষম লোকজনকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে সিএসই শিক্ষা কতটা ভূমিকা রাখতে পারে?

ড. হাসান : বর্তমান যুগ তথ্য প্রযুক্তির যুগ। আইটি জানা লোকদের ব্যাপক কর্মসংস্থান হচ্ছে। তাই আইটি ও কম্পিউটার শিক্ষা দিয়ে আমাদের ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে খুব সহজেই দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে পারি। এজন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে আইটি ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলতে হবে। শিল্প গড়ে না উঠলে কর্মসংস্থান হবে না। নতুন আইটি উদ্যোক্তাদের পর্যাপ্ত সহায়তা দিতে হবে। এছাড়া সিএসই গ্রাজুয়েটদের মানসম্মত কোম্পানিতে কাজ করার সুযোগ করে দিতে হবে। এছাড়া সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আইটি বিভাগে সিএসই ব্যাকগ্রাউন্ডের কর্মীদের প্রাধান্য দিতে হবে। এছাড়া বর্তমানে যেহেতু প্রোগ্রামারদের চাহিদা বেশি। তাই পদার্থ, গণিত, পরিসংখ্যানসহ সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ডের গ্রাজুয়েটদের ২ বছরমেয়াদি প্রোগ্রামিং শিক্ষা দেয়া যেতে পারে। এতে করে তারা দক্ষ প্রোগ্রামার হয়ে উঠবে।

চাকরির খোঁজ : আইটি বিজনেসে নতুন উদ্যোক্তরা কোন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে?

ড. হাসান : দেশী আইটি ফার্মগুলো বড় কোনো কাজ পাচ্ছে না। বড় কোম্পানি বা ব্যাংকগুলো দেশী সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোর ওপর আস্থা রাখছে না। তারা বিদেশীদের ওপর নির্ভর করছে। নতুন উদ্যোক্তারা সহজে কাজ না পাওয়ায় নিজেদের কর্মীদের ভালো বেতন দিতে পারছে না। ফলে মানসম্পন্ন প্রোগ্রামারও ধরে রাখতে পারছে না। এভাবে আইটি প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসায় টিকে থাকতে পারছে না। ফলে দেশে আইটি ইন্ডাস্ট্রিও গড়ে উঠছে না।

চাকরির খোঁজ : আমাদের সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

ড. হাসান : আপনাকেও ধন্যবাদ। যুগান্তরের প্রতি শুভ কামনা।

প্রফেসর ড. হাসানুজ্জামান

‘প্রফেসর ড. হাসানুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান। তিনি ঢাবির অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স বিভাগ থেকে অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছেন। কম্পিউটার সায়েন্সে মাস্টার্সেও ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছেন। পিইচডি ডিগ্রি করেছেন জাপানের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ইনফরমেটিক্স (এনআইআই) থেকে। একই প্রতিষ্ঠানের পোস্ট ডক্টরাল ফেলো তিনি। বেক্সিমকো গ্র“পে কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৯৮ সালে। ২০০০ সালে ঢাবির সিএসই বিভাগে লেকচারার পদে নিয়োগ পান। আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্স, হিউম্যান রোবট ইন্টারেকশন, হিউম্যান কম্পিউটার ইন্টারেকশন নিয়ে তিনি গবেষণা করছেন। দেশ-বিদেশের বহু জার্নাল ও বইয়ে তার লেখা ছাপা হয়েছে।’


 

 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র