¦
ক্রিকেটে কৌলীন্য ও গরিমার বছর

পারভেজ আলম চৌধুরী | প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০১৬

মাশরাফি-মুস্তাফিজুরদের এই বাঁধনহারা উদযাপন ক্রিকেটে বাংলাদেশের পুষ্পিত ও পল্লবিত বছরের প্রতিচ্ছবি

ক্যালেন্ডারের পাতা ফুরিয়ে এলে স্মৃতিরা পাখি হয়ে ওড়ে। ভীষণ সাধ হয় পেছন ফিরে তাকাতে। নতুন সূর্যের অপেক্ষা, পুরনোকে বিদায় জানানোর ক্ষণে শিহরণ ও দীর্ঘশ্বাসের মিশ্র অনুভূতি আচ্ছন্ন করে তোলে মনটাকে। স্মৃতিমেদুরতায় আক্রান্ত মন হাহাকার করে ওঠে একটি বছর কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়ার বেদনায়। এই সময়টাই হিসাব মেলানোর।
২০১৫ কী দিল ক্রীড়াঙ্গনকে? বাংলাদেশের জন্য বছরটা পল্লবিত, পুষ্পিত হয়েছে ক্রিকেটের কল্যাণে। এমন ফুলে-ফলে ভরা ক্রিকেটীয় বছর বাংলাদেশ আগে কখনও পায়নি। ফুটবলে দেখা গেছে মুদ্রার অপর পিঠ। হকিতেও কেবলই হতাশা। খেলাহীনতা। অন্যান্য খেলায়ও আশার প্রজাপতি উড়েছে কমই। ফুটবলে বছরের শেষ ভাগে মেয়েদের এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় মার্জিয়াদের অভূতপূর্ব সাফল্য খরাজর্জর ফুটবল- বছরটাকে সিক্ত করেছে খানিকটা। কিন্তু ক্রিকেট বিদায়ী বছরে কৌলীন্যে, গরিমায় ছাপিয়ে গেছে সবকিছু। খানিকটা পেছন ফিরে দেখা যাক। ২০১৫ ছিল ক্রিকেট বিশ্বকাপের বছর। আরও স্পষ্ট করে বললে বাংলাদেশের বছর। স্বপ্নের বিশ্বকাপে হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো মাহমুদউল্লাহরা সমস্ত হতাশা ছুড়ে ফেলেছেন বিস্মৃতির নদীতে।
প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে খেলেছে বাংলাদেশ। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম সেঞ্চুরি করেছেন মাহমুদউল্লাহ। একটি নয়, দু’দুটি। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৩১৯ রান তাড়া করে জেতার রেকর্ড গড়েছেন মাশরাফিরা। এরপর এপ্রিলে ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে প্রথমবারের মতো হোয়াইটওয়াশ। নিজেদের আঙিনায় টানা পাঁচ ওয়ানডে সিরিজ জয়। ২০১৫ সালে ১৮ ম্যাচে ১৩ জয়ের সুখস্মৃতি অনেকদিন অনুপ্রেরণার মৌতাত ছড়াবে। জুনে ভারতের বিপক্ষে মুস্তাফিজুর রহমানের বিস্ময়কর উত্থান। বছরে সর্বোচ্চ তিনবার পাঁচ কিংবা তার বেশি উইকেট নেয়ার গৌরব অর্জনের পাশাপাশি ওয়ানডের বর্ষসেরা খেলোয়াড় হয়েছেন এই তরুণ পেসার। এ বছর সাকিব আল হাসান বাবা হয়েছেন। বাংলাদেশ ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ সাতটি সেঞ্চুরি করেছে। আগে ছিল চারটি। বছর শেষ হয়েছে ৯৭ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে, যা বাংলাদেশের সেরা অর্জন। ২০১৭ সালে চ্যাম্পিয়ন্স লীগে খেলাও নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ র‌্যাকিংয়ে সাতে অবস্থান করে। বছরটা শেষ হয়েছে বিপিএল দিয়ে।
পাকিস্তানের বিপক্ষে খুলনা টেস্টে তামিম ইকবাল ও ইমরুল কায়েস প্রথমবারের মতো ম্যাচের তৃতীয় ইনিংসে উদ্বোধনী জুটিতে ৩০০ রান করেন। জুটি ভাঙে ৩১২ রানে। তামিম টেস্টে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ২০৬ এবং ইমরুল ১৫০ রান করেন। দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশ ৬/৫৫৫ রান তুলে জয়তুল্য ড্র করে।
ক্রিকেটের জয়গানে গোটা বছর যখন অত্যুজ্জ্বল, ফুটবলে তখন হাহাকার। বছরের শেষে এসে সাফ ফুটবলে গ্রুপপর্ব থেকে বিদায় নেয়ার যন্ত্রণার সঙ্গে যোগ হয় জাতীয় দলে শৃংখলার ঘাটতি এবং খেলোয়াড়দের মধ্যে কোন্দলের বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ার অনভিপ্রেত সংবাদ।
ক্রিকেট ইতিহাসে ২০১৫ স্মরণীয় হয়ে থাকবে গোলাপি বিপ্লবের বছর হিসেবে। ১৩৮ বছরের টেস্ট ইতিহাসে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে এ বছর। গোলাপি বল আর ফ্লাডলাইটের কৃত্রিম আলোয় ভেসে যাওয়া মাঠে ইতিহাসের প্রথম ডে-নাইট টেস্টে মুখোমুখি হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড। গত নভেম্বরে অ্যাডিলেড ওভালে সেই ঐতিহাসিক ম্যাচে শেষ হাসি হাসে অস্ট্রেলিয়া। পাতলা সিমের গোলাপি বলে রীতিমতো আগুন ঝরিয়েছেন বোলাররা।
ঘটনাবহুল বছরটা শুরু হয়েছিল বিশ্বকাপ দিয়ে। মেলবোর্নে ফাইনালে সহ-আয়োজক নিউজিল্যান্ডকে সাত উইকেটে হারিয়ে রেকর্ড পঞ্চমবারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি ঘরে তোলে অস্ট্রেলিয়া।
ফিক্সিং-কাণ্ডে পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফিরেছেন পাকিস্তানি পেসার মোহাম্মদ আমির।
বিশ্বকাপ জিতলেও অস্ট্রেলিয়ার জন্য বছরটা ছিল অম্লমধুর। ইংল্যান্ডের মাটিতে মর্যাদার অ্যাশেজ খোয়াতে হয়েছে তাদের। সেই বিপর্যয়ের ধাক্কায় অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্কসহ দলের প্রায় অর্ধেক খেলোয়াড়ই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানিয়ে দিয়েছেন। ক্লার্কদের মতো এ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েছেন শ্রীলংকার দুই ব্যাটিং মহীরুহ কুমার সাঙ্গাকারা ও মাহেলা জয়াবর্ধনে।
বছরজুড়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে আইসিসির বর্ষসেরা ক্রিকেটার হয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার নতুন অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথ। ওয়ানডের বর্ষসেরা দক্ষিণ আফ্রিকার এবি ডি ভিলিয়ার্স। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে ইতিহাসের দ্রুততম ফিফটি ও সেঞ্চুরি গড়েছেন এবি।
মাঠের বাইরে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা আইসিসি চেয়ারম্যানের পদ থেকে এন শ্রীনিবাসনের বিতাড়িত হওয়া। বহুল বিতর্কিত এই ক্রিকেট প্রশাসককে ক্ষমতাচ্যুত করেছে তার দেশ ভারতই। নতুন আইসিসি চেয়ারম্যান হয়েছেন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের বর্তমান সভাপতি শশাংক মনোহর।
ক্রীড়ায় বাংলাদেশের মেয়েদের হাত ধরে ২০১৫ হয়ে ওঠে সাফল্যের স্বর্ণালী বছর। ক্রিকেটে যেমন, ফুটবলেও তেমনি বিদায়ী বছর মুগ্ধতা ছড়িয়েছে কিশোরী-তরুণীদের কল্যাণে। বছরের শেষে জাহানারা-ফারজানারা ২০১৬ টি ২০ বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে আনন্দে ভাসিয়েছেন ক্রিকেটপ্রেমীদের।
ছেলেদের ফুটবলে ব্যর্থতা ও হতাশা পাশাপাশি হাঁটলেও, মেয়েদের ফুটবলে বয়ে গেছে সুবাতাস। বিজয়ের মাসে লাল-সবুজের দুরন্ত কন্যারা হিমালয় জয় করে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। মেয়েদের অনূর্ধ্ব-১৪ ফুটবল দল নেপালকে ফাইনালে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ দলের মেয়েদের সিংহভাগ ছিল ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার কলসিন্দুর গ্রামের। ১৮ জনের দলে ১০ জনই ভারত সীমান্তঘেঁষা ওই অজপাড়া গাঁয়ের। রাজশাহী, রাঙ্গামাটি, সাতক্ষীরা ও টাঙ্গাইলের মেয়েরাও কৈশোরের চপলতায় স্বর্ণাভ হলুদ হয়ে ওঠা দলটিকে ঋদ্ধ করেছে।
বাংলাদেশের খেলাধুলার ইতিহাসে ২০১৫ লাল হরফে লেখা একটি বছর হয়ে থাকবে। একথা আগেই বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে সাতক্ষীরা নামটি বিশেষভাবে জায়গা করে নেবে লাল-সবুজের সাফল্যে মোড়ানো এই বছরটিতে। ২০১৫তে সাতক্ষীরা বাংলাদেশের ক্রিকেটকে উপহার দিয়েছে এক মহাবিস্ময়। যার নাম মুস্তাফিজুর রহমান। যার সম্পর্কে আগেই বলা হয়েছে। এখানে তার বিশদ বর্ণনার অবকাশ নেই। সাতক্ষীরার গোলকন্যা সাবিনা খাতুনের কথা বলাটাই বরং যুক্তিযুক্ত। এ বছরই সাবিনা বিদেশে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে নিজের ফুটবল জাদু দেখিয়েছেন। মালদ্বীপ ফুটবল লীগে ছয় ম্যাচে ২৭ গোল করেছেন তিনি পুলিশ ক্লাবের হয়ে। টানা পাঁচ ম্যাচে সেরা খেলোয়াড় হওয়ার অনন্য গৌরব অর্জন করেছেন বাংলাদেশের ফুটবলের এই স্বর্ণকন্যা।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে ২০১৫ আক্ষরিক অর্থেই সুখ-দুঃখের, আনন্দ-বেদনার এক বিশাল ক্যানভাস। বছরের শুরুতে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো টানা দ্বিতীয়বার ব্যালন ডি’অর পুরস্কার জেতার আনন্দে উদ্ভাসিত হয়েছিলেন। সেই আনন্দ কর্পুরের মতো উবে যায় বছর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে। রোনাল্ডোর রিয়াল মাদ্রিদ ডিসেম্বরে এসে যেন পথ হারানো পথিক। তার ওপর কোপা ডেল রে থেকে বহিষ্কার হওয়ার যন্ত্রণা তো রয়েছেই।
রিয়াল-রোনাল্ডো পর্ব যদি দুয়োরানী হয়, তাহলে মেসি-বার্সেলোনা অধ্যায় সুয়োরানী। লাতিন তারকাত্রয়ী মেসি, নেইমার, সুয়ারেজে সাফল্যের শিখরে আরোহণ করা বার্সা বছরটা শুরু করে কোপা ডেল রে জিতে। এরপর স্প্যানিশ লীগ, চ্যাম্পিয়ন্স লীগ এবং বছরের শেষে জাপানে ক্লাব বিশ্বকাপ ট্রাফি- সবই শোভা পেয়েছে কাতালানদের শোকেসে।
এ তো গেল সুখের শ্রাবণ। আনন্দের উপাখ্যান। এর পিঠে দুঃখগাথাও রয়েছে। আছে কলংকের কালিমা। বিদায়ী বছরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে সবচেয়ে কলংকজনক অধ্যায় হচ্ছে ব্লাটার-প্লাতিনির নির্বাসন। ফিফা কেলেংকারির মহাঝড়ে লণ্ডভণ্ড ফুটবলবিশ্বের দুই মহারথি সেপ ব্লাটার ও মিশেল প্লাতিনি দুর্নীতির দায়ে নিষিদ্ধ হয়েছেন আট বছরের জন্য। ডিসেম্বরে আঘাত হানা যে ঝড়ের সূচনা হয়েছিল গত মে মাসে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফিফার সাতজন কর্মকর্তার গ্রেফতার হওয়ার মধ্যদিয়ে। ফুটবলবিশ্ব তোলপাড় করা ওই ঘটনার দিনকয়েকের মধ্যে ফের সভাপতি পদে নির্বাচিত হওয়া ব্লাটার বাধ্য হন পদত্যাগের ঘোষণা দিতে। এরপর পানি গড়িয়েছে অনেকদূর। ব্লাটার ডুবেছেন প্লাতিনিকে সঙ্গে নিয়ে।
এদিকে ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগে আগের মৌসুমে চেলসিকে শিরোপা এনে দেয়া হোসে মরিনহো বিতাড়িত হয়েছেন ব্যর্থতার বোঝা কাঁধে নিয়ে। বছরান্তে ভ্যান গলেরও বিদায়ের ঘণ্টা শোনা যাচ্ছে। ম্যানইউতে তার দিনও বুঝি শেষ হয়ে এলো। ওয়েন রুনি ইংল্যান্ডের হয়ে ৫০তম গোল করে টপকে যান কিংবদন্তি স্যার ববি চার্লটনের রেকর্ড।
 

কালনিরবধি ২০১৬ পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close