¦
নতুন বছরের প্রত্যাশা

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী | প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০১৬

আগামী বছরে বাংলাদেশে অনেক সমস্যার ধারাবাহিকতা থাকবে। তবে একটি সমস্যা হয়তো বিশেষভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। সেটি হল জঙ্গিবাদের বিস্তার ও মাত্রাবৃদ্ধি।
এ সমস্যাটির মোকাবেলা খুবই জরুরি হয়ে পড়বে, কেননা এর সঙ্গে আমাদের ভবিষ্যৎ জড়িত। জঙ্গির লালনভূমি দেশের ভেতরেই রয়েছে, বাইরে থেকে উসকানি ও সহায়তা আসছে। এ দুটোই একটা বাস্তবতা, লালনভূমিটাই প্রধান সমস্যা। দেশে উন্নতি হচ্ছে কিন্তু বৈষম্য বাড়ছে। বৈষম্য বৃদ্ধির ফলে মানুষের মনে বিক্ষোভ ও হতাশা দুটোই বেড়ে চলেছে। এ বিদ্যমান ব্যবস্থা মানুষকে সন্তুষ্ট রাখতে পাড়ছে না; কিন্তু এর বিরুদ্ধে যে অসন্তোষ সেটা প্রকাশের গণতান্ত্রিক পথ অবরুদ্ধ হয়ে আসছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। শাসকশ্রেণীর মধ্যে দ্বন্দ্ব-হিংস্র রূপ নিচ্ছে এবং ক্ষমতাসীনরা বিরোধী দলকে নিশ্চুপ করে দিতে চাচ্ছে।
মানুষের জীবনে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নেই। খুন-ধর্ষণ-বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এসব বেড়েই চলেছে। সব কিছু মিলিয়ে পরিবেশটা অন্ধকারাচ্ছন্ন। বিদ্যমান রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার ত্র“টি হচ্ছে এই যে, এরা মানুষকে চরিতার্থতা দিচ্ছে না; বঞ্চনা ও শোষণ অবাধে চলছে। মৌলিক-মানবিক অধিকারগুলো পদদলিত হচ্ছে। এ অন্ধকার থেকে মুক্তির কোনো গণতান্ত্রিক ও প্রকাশ্য পথ মানুষ খুঁজে পাচ্ছে না।
পথ অবরুদ্ধ হচ্ছে। লোকে ভ্রান্ত পথে চলে যায়। জঙ্গিবাদ ওই পথ ভ্রান্তিরই নিদর্শন।
আরেকটি উপমা হতে পারে বদ্ধ জলাশয়ের। জলাশয় অবদ্ধ হয়ে পড়লে তার পানি দূূষিত হয়ে পাড়ে, পোকা-মাকড় দেখা দেয় রোগ-বালাই বাড়তে থাকে। আমাদের সমাজ এখন এই বদ্ধ জলাশয়ের মতো। এখানে সৃষ্টিশীলতার স্বাভাবিক প্রভাব নেই। ফলে নানা প্রকার বিকার দেখা দিচ্ছে। সহিংসতা ও মাদকাসক্তি এ বিকারের অন্তর্ভুক্ত, জঙ্গি তৎপরতাও এ বিকারেরই অংশ।
দেশের মানুষ দীর্ঘকাল মুক্তির স্বপ্ন দেখেছে, মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছে, সংগ্রামটা ছিল সমষ্টিগত। সেই স্বপ্নটা এখন আর নেই। এখন স্বপ্নগুলো ব্যক্তিগত হয়ে গেছে। ব্যক্তিগত স্বপ্নের আঘাতে সমষ্টিগত স্বপ্ন ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।
মানুষ সমাজে কোনো আশা দেখছে না, স্বপ্নভঙের বেদনা ও হতাশা জঙ্গিবাদের লালনভূমি পুষ্ট করে তুলছে।
উন্নতি হচ্ছে। অনেকে মনে করেন যে উন্নতি হলেই জঙ্গি তৎপরতা কমে যাবে; এ ধারণা সত্য নয়। বরং দেখা হচ্ছে, উন্নতি যতই বৃদ্ধি পাচ্ছে মানুষের অসন্তোষও সেই পরিমাণেই প্রবল হচ্ছে। এর কারণ হল উন্নতি বৈষম্য সৃষ্টি করছে। উন্নতি হওয়া উচিত ছিল নদীর মতো প্রবহমান ও সর্বত্রগামী। সেই উদাহরণের উন্নতি উর্বরতা বৃদ্ধি করে তাতে সৃষ্টিশীলতা উৎসাহিত হয়, পরিবেশের বিপর্য ঘটে না এবং সব মানুষই উন্নয়ন থেকে উপকার লাভ করে। কিন্তু আমাদের দেশে যে উন্নতি ঘটছে সেটা অনেকটা পাহাড়ের মতো, এ পাহাড় গড়ে উঠছে অন্যদের বঞ্চিত ও শোষণ করে। যারা ধনী তারা সম্পদ বিদেশে পাচার করছে। উদ্বৃত্ত ও সঞ্চয় পুঁজিতে পরিণত হচ্ছে না। ফলে অর্থনৈতিক বিকাশ বিঘ্নিত হচ্ছে, বিনিয়োগের অভাবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাচ্ছে না। বেকারত্ব ক্রমশ মারাত্মক আকার ধারণ করছে।
বেকার মানুষ সহজেই জঙ্গি হয়। কারণ তার জীবনের কোনো দাম থাকে না, সে ভবিষ্যৎ দেখতে পায় না। ন্যায়বিচার আশা করে না। তাই সে মনে করে যে, ধর্মীয় জঙ্গি তৎপরতা তার জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তুলবে। সে বাঁচলে গাজী হবে। প্রাণ হারালে বেহেশতে চলে যাবে। শিক্ষা তাকে মহৎ করছে না, মাদ্রাসা শিক্ষা তো নয়ই। তথাকথিত আধুনিক শিক্ষাও তাকে কোনো আশা দেয় না। মুক্তির ইহজাগতিক ও সুস্থ পথের কথা বলে না। বেকারদের যে অসন্তোষ সেটা তারা সমাজবদলের কাজে নিয়োগ করার উপায় খুঁজে পায় না। দেশে সমাজবদলের প্রবল কোনো আন্দোলন নেই। সমষ্টিগত মুক্তির স্বপ্নও নেই। এতদিন যারা স্বপ্ন দেখত সমাজটাকে বদলাবার, তারা সে স্বপ্ন এখন আর দেখে না।
বামপন্থী আন্দোলন স্থগিত। বেকার তরুণদের অসন্তোষ ও ক্ষোভ তাই দক্ষিণপন্থী হয়ে পড়েছে। জঙ্গিবাদ হচ্ছে দক্ষিণ পন্থার চরম রূপ। সেই রূপটাই এখন দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। জঙ্গিবাদের বিকাশে বাইরের উসকানি আছে। আর্থিক সহযোগিতাও আসছে। পুঁজিবাদী বিশ্ব জঙ্গিবাদকে দুইভাবে উৎসাহিত করে-
উন্নতির অন্তরালে তারা বৈষম্য ও অসন্তোষ সৃষ্টি করে। সে অসন্তোষ গণতান্ত্রিক উপায়ে কার্যকরভাবে প্রকাশের পথ পায় না।
দ্বিতীয়ত পুঁজিবাদী বিশ্ব চায় জঙ্গিবাদের অজুহাত সৃষ্টি করে উন্নয়নশীল বিশ্বে তাদের আধিপত্য বিস্তার করবে। সেই আধিপত্য বিস্তারের অজুহাত হিসেবে তারা জঙ্গিবাদকে ব্যবহার করতে চাইছে।
গত শতাব্দীর শেষ দিক পর্যন্ত তাদের ভাবটা ছিল কমিউনিজম বিস্তারের। পুঁজিবাদীরা তখন ধর্মীয় মৌলবাদকে উৎসাহিত করত কমিউনিজম রাখবার জন্য। কমিউনিজমের ভয় এখন আর আগের মতো নেই; কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য বিস্তারের লোভটা আছে। জঙ্গিবাদের অজুহাত তুলে পুঁজিবাদী বিশ্ব মধ্যপ্রাচ্যকে তছনছ করে ফেলেছে, আফগানিস্তানে দখলদারিত্ব কায়েম করেছে, পাকিস্তানে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে; তারা চাইছে বাংলাদেশেও তৎপর হতে।
জঙ্গিবাদকে উসকানি দেয়া ও সাহায্য করা তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যেই পড়ে।
ভেতরের লালনভূমিতে বাইরের উৎসাহ ও সহায়তার দৃষ্টিপাত হচ্ছে, ফলে জঙ্গিবাদ তরতাজা হয়ে উঠছে।
ঐ লালনভূমি নষ্ট না করতে পারলে জঙ্গিবাদকে মোকাবেলা করা যাবে না।
অন্ধকার এবং আবদ্ধ দশায় যে লালনভূমি প্রসারিত হচ্ছে সেটিকে নষ্ট না করতে পারলে জঙ্গিবাদকে রোখা যাবে না। জঙ্গিবাদ এখন যে অবস্থায় আছে তা সুসংগঠিত নয়, বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজ নিজ পথে কাজ করে যাচ্ছে।
লেখক ও প্রকাশকরা আক্রান্ত ও নিহত হয়েছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ চলছে, এমনকি ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেও শিয়া-সুন্নি বিভাজন তৈরির চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। এর তাৎপর্য হচ্ছে এ রকম- এ গোষ্ঠীগুলো তাদের উপস্থিতি প্রকাশ করতে চাচ্ছে এবং নিজেদের দৃশ্যমান করে তোলার চেষ্টাই করছে। তাদের লক্ষ্য মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচার লাভ করা; কিন্তু এরা যদি সংগঠিত হয়ে পড়ে তাহলে বিপদ ঘটবে। যে স্বৈরাচারী ব্যবস্থার মধ্যে আমরা বসবাস করছি তাতে এদের বিকাশ এবং সংগঠিত হওয়া খুবই স্বাভাবিক।
দেশের শাসকশ্রেণী জঙ্গিবাদের বিস্তারকে হয়তো তেমন গুরুত্ব দেবে না। তাদের জন্য মূল বিপদটা হচ্ছে বঞ্চিতশ্রেণীর মানুষের অসন্তোষ। সেই মানুষদের যদি ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার মাধ্যমে বিভক্ত করা যায় তাহলে শ্রেণী-চেতনা ও শ্রেণী-সংগ্রাম বিকাশের যে অংশটা থাকে সেটা কমে আসবে বলে তারা ধারণা করে। অতীতেও আমরা দেখেছি সাম্প্রদায়িকতার আচ্ছাদনে শ্রেণী-চেতনাকে ঢেকে রাখার চেষ্টা। সম্ভব হলেই দুর্বল করে তুলবার চেষ্টা চলছে। এ সাম্প্রদায়িকতার কারণে ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হয়েছে; কিন্তু তাতে শ্রেণী সমস্যার কোনো মীমাংসা হয়নি। বাংলাদেশে এখন শ্রেণী সমস্যাই মূল সমস্যা। জরিপ বলছে যে এখন দেশের শতকরা ২০ ভাগ লোক উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত; বাকি ৮০ ভাগ সুবিধাবঞ্চিত। এ বিক্ষুব্ধ ৮০ ভাগকে বিভক্ত করার কাজে জঙ্গিবাদকে ব্যবহার করা সম্ভব।
শাসকশ্রেণী তাই জঙ্গিবাদের বিকাশ দেখে তেমন ভয় পায় না। এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে। সেই ধর্মনিরপেক্ষতা এখন আর সংবিধানের মূল নীতিতে নেই। শাসকশ্রেণীর এক অংশ অপর অংশের সঙ্গে জীবনপণ সংগ্রামে লিপ্ত। কিন্তু কোনো অংশই ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়ে উৎসাহিত নয়। অথচ ধর্মনিপেক্ষতাই হচ্ছে গণতান্ত্রিক অগ্রগতির পথে প্রথম পদক্ষেপ। যে ভিত্তির ওপর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জঙ্গিবাদ তাকেই আঘাত করেছে; কিন্তু শাসকশ্রেণী এ আঘাতে বিপন্নবোধ করে না।
জঙ্গিবাদের সঙ্গে আপস করতে তাদের কোনো অসুবিধা নেই। প্রয়োজনে বিপদ দেখলে তারা দেশ ছেড়ে চলে যাবে। বিপদ ঘটবে দেশের ওই শতকরা ৮০ ভাগ মানুষের। তারা এগোতে পারবে না, পিছিয়ে পড়বে, পরিবেশটা কেমন দাঁড়াবে তা আমরা মধ্যপ্রাচ্যে আফগানিস্তান-পাকিস্তানের দিকে তাকালেই বুঝতে পারব।
এ সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যারা দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক সেই মানুষদেরই এগিয়ে আসতে হবে। মুখের কথায় কাজ হবে না। সমষ্টিগত মুক্তির স্বপ্নটিকে আবার সামনে নিয়ে আসা চাই।
বৈষম্য সৃষ্টিকারী উন্নত পুঁজিবাদী ধরন প্রত্যাখ্যান করে উন্নতি যাতে সার্বজনীন হয় তার জন্য রাজনৈতিক আন্দোলনকে বেগবান করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। এ আন্দোলন সমাজ পরিবর্তনের। মুক্তির যে স্বপ্ন নিয়ে এদেশের মানুষ দীর্ঘকাল সংগ্রাম করেছে সেই স্বপ্নকে আবার সামনে রাখা চাই। এ ক্ষেত্রে দেশের বুদ্ধিজীবীরা কোন ভূমিকা পালন করবেন সেটা একটা বড় বিষয়।
বুদ্ধিজীবীদের বর্তমান ভূমিকা বিদ্যমান ব্যবস্থাটাকে সমর্থন করার, তারা এই ব্যবস্থার সুবিধা লোভীতে পরিণত হয়েছে। বিদ্যমান ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখে মুক্তি অসম্ভব। মুক্তির অসমাপ্ত সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। এই সংগ্রাম না এগোলে আমরা এমন একটা অন্ধকারের কবলে পড়ে যাব যেখান থেকে বেরিয়ে আসা দুঃসাধ্য হবে। জঙ্গিবাদের বিকাশ সেই বিপদের কথাই জানিয়ে দিচ্ছে।
নতুন বছরে আমাদের অনেক প্রত্যাশা থাকবে; কিন্তু মূল প্রত্যাশা হওয়া দরকার বৈষম্য কমিয়ে উন্নতিকে সার্বজনীন করা এবং অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার সংগ্রামকে গতিশীল করে তোলা।
শ্রুতি লিখন মেহেদী হাসান
 

কালনিরবধি ২০১৬ পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close