¦
তিন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর

কবির হোসেন | প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০১৬

বছর জুড়েই আলোচনায় ছিল দেশের আদালত অঙ্গন। জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির রায় চূড়ান্ত করার ঘটনা ছিল ২০১৫ সালে আদালত-অঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা। এছাড়া বছরের শুরুতে বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির বিষয়টিও ছিল বেশ আলোচনায়। দীর্ঘ সাত বছর পর সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে নাইকো, গ্যাটকো ও কয়লা খনি মামলা সচলের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। মাত্র তিন-চার মাসের মাথায় খুলনার রাকিব ও সিলেটের রাজন হত্যা মামলার রায় ঘোষণা ছিল বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি মাইলফলক।
এছাড়াও বাবা-মাকে হত্যার দায়ে ঐশীর ফাঁসির রায় ঘোষণা, তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারে মিডিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ, নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলায় চার্জশিট দাখিল ও হাইকোর্টে বিডিআর হত্যা মামলা আপিলের শুনানি শুরুর বিষয়টি নিয়েও যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে। এসবের বাইরে ছাত্রী ধর্ষণের দায়ে ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের শিক্ষক পরিমল জয়ধরের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার দুর্নীতির মামলায় সাজা বাতিলের রায় বাতিল করে পুনঃশুনানির নির্দেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগ। মন্ত্রীর পদে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে রিট দায়ের, ব্রাজিল থেকে পচা গম আমদানি নিয়ে রিট এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মামলায় লতিফ সিদ্দিকীর জামিন লাভের ঘটনাও বিদায়ী বছরে আদালত অঙ্গনে আলোচনায় ছিল।
ফাঁসি কার্যকর : ২০১৫ সালে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান এবং বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। এদের মধ্যে গত ১১ এপ্রিল রাতে মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের এবং ২১ নভেম্বর রাতে একই সঙ্গে ফাঁসি কার্যকর করা হয় আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সাকা চৌধুরীর। এই তিন ফাঁসির রায় চূড়ান্ত করার ঘটনা ছিল ২০১৫ সালে বিচার বিভাগের আলোচিত ঘটনা।
খালেদা জিয়ার গ্রেফতারি পরোয়ানা : জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আদালতে হাজির না হওয়ায় ২০১৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি জামিন বাতিল করে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। একই সঙ্গে মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদের জামিন বাতিল করে তাদের বিরুদ্ধেও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। রাজধানী ঢাকার আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত ৩ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক আবু আহমেদ জমাদার এই পরোয়ানা জারি করেন। কিন্তু ওই গ্রেফতারি পরোয়ানা দীর্ঘদিনেও থানায় পৌঁছায়নি বলে দাবি করে পুলিশ। আর পরোয়ানা না পৌঁছানোয় খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারও করা হয়নি। অবশেষে খালেদা জিয়া নিজেই আদালতে হাজির হয়ে আবারও জামিন নেন। বর্তমানে মামলা দুটি সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে আছে।
তিন মামলায় আদালতে খালেদার ৭ দিন : দুদকের দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ও নাইকো মামলায় ২০১৫ সালে সাত দিন আদালতে হাজিরা দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির দুই মামলায় ২৮ নির্ধারিত দিনে ঢাকার বকশীবাজারের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতে ৬ দিন ও নাইকোর দুর্নীতি মামলায় ঢাকার বিশেষ জজ-৯ আদালতে একদিন হাজিরা দেন তিনি। ২৫ ফেব্রুয়ারি আদালতে হাজির না হওয়ায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করা হয়। পরে ৫ এপ্রিল আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করলে আদালত তাকে জামিন দেন। বর্তমানে তিনি সব মামলাতেই জামিনে আছেন। এ দুটি মামলায় চলতি বছর ৫ এপ্রিল, ২৫ মে, ১৮ জুন, ২৩ জুলাই, ৩ আগস্ট ও ১০ সেপ্টেম্বর এবং নাইকোর দুর্নীতি মামলায় ৩০ নভেম্বর আদালতে হাজিরা দেন। এছাড়া দুর্নীতির অভিযোগে ওয়ান-ইলেভেনের সময় দুদকের করা তিনটি মামলা দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকার পর ২০১৫ সালে সচল করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
প্রধান বিচারপতি নিয়োগ : বিচার বিভাগের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো অমুসলিমকে দেশের প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। আইন মন্ত্রণালয় ২০১৫ সালের ১২ জানুয়ারি বিচারপতি এস কে সিনহাকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করে। ১৭ জানুয়ারি তিনি দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে বিচারপতি এস কে সিনহা মামলার জট কমানো ও বিচার প্রার্থীদের হয়রানি লাঘবে নিয়েছেন নানামুখী উদ্যোগ।
রাজন-রাকিব হত্যার বিচার : মাত্র তিন-চার মাসের মাথায় সিলেটের রাজন ও খুলনার রাকিব হত্যার বিচার শেষ হয়েছে। দ্রুত মামলা দুটির বিচার শেষ হওয়ার ঘটনা বিচার বিভাগের ইতিহাসে নজিরবিহীন। ঘটনা দুটিকে বিচার বিভাগের জন্য উৎসাহজনক এবং মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।
জানা যায়, গত ৮ জুলাই ভোরে সিলেটের কুমারগাঁওয়ে শিশু রাজনকে একটি ভ্যানগাড়ি চুরির অপবাদে সড়কের পাশে একটি দোকানের পাকা খুঁটির সঙ্গে বেঁধে বর্বরোচিত নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। আবার নির্যাতনকারীরাই শিশুটিকে পেটানোর দৃশ্য ভিডিও ধারণ করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে গত ৩ আগস্ট বিকালে নগরীর টুটপাড়ায় মোটরসাইকেল গ্যারেজ শরীফ মোটর্সের মালিক ওমর শরীফ, তার কথিত চাচা মিন্টু খান চাকরি ছেড়ে দেয়ার অপরাধে শিশু রাকিবকে ধরে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালায়। মোটরসাইকেলের চাকায় পাম্প দেয়ার পাইপ তার পায়ুপথে ঢুকিয়ে হাওয়া দেয়। এতে নাড়িভুঁড়ি ছিঁড়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সে মারা যায়।
আসামিদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলা দুটি ‘ডেথ রেফারেন্স’ হিসেবে হাইকোর্ট এসেছে। এখন হাইকোর্টে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা : আইনের দৃষ্টিতে ‘পলাতক’ থাকায় বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য যে কোনো ধরনের (প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম) মিডিয়ায় প্রচার ও প্রকাশ বন্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি করে বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমানের বেঞ্চ ২০১৫ সালের ৭ জানুয়ারি এই নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেন। তথ্য সচিব ও স্বরাষ্ট্র সচিবকে এই অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়। রুলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে বলে জানান সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের রাষ্ট্রপক্ষের আইন কর্মকর্তা ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিৎ রায়। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা জারির পাশাপাশি তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচার ও প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কেন নির্দেশ দেয়া হবে না- তা জানতে চেয়ে একটি রুলও জারি করেন। একইসঙ্গে তারেক রহমানের বর্তমান অবস্থা ও তার পাসপোর্ট নবায়ন করা হয়েছে কি-না, এক মাসের মধ্যে তা জানাতে পররাষ্ট্র সচিবকে নির্দেশ দেন আদালত। তারেক রহমানের বক্তব্য বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা চেয়ে রিট আবেদনটি দায়ের করেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী নাসরিন সিদ্দিকা লিনা।
ঐশীর ফাঁসি : বাবা-মাকে হত্যার দায়ে মেয়ে ঐশী রহমানকে ফাঁসির রায়টিও ছিল বছরের আলোচিত ঘটনার অন্যতম। স্ত্রী, দুই সন্তান এবং শিশু গৃহকর্মীকে নিয়ে মালিবাগের চামেলীবাগের এক ফ্ল্যাটে থাকতেন পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (রাজনৈতিক শাখা) পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান। ২০১৩ সালের ১৬ আগস্ট ওই বাসা থেকেই তাদের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, আগের রাতে কোনো এক সময়ে কফির সঙ্গে ঘুমের বড়ি খাইয়ে বাবা-মাকে কুপিয়ে হত্যা করে ঐশী। পরদিন সকালে সাত বছর বয়সী ছোট ভাইকে নিয়ে বাড়ি থেকে সে বেরিয়ে যায়। পরে ভাইকে এক প্রতিবেশীর বাসায় পাঠিয়ে একদিন পর গৃহকর্মী সুমিকে নিয়ে রমনা থানায় আত্মসমর্পণ করে এই কিশোরী। পরে তার বক্তব্যের সূত্র ধরেই বন্ধু রনি ও জনিকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ সবাইকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করে। মামলা তদন্তসহ সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে গত ১২ নভেম্বর ঢাকার তিন নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক সাঈদ আহমেদ চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার রায়ে ঐশীকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন।
বিডিআর হত্যা মামলার আপিলের শুনানি শুরু : ২০১৫ সালের ফেব্র“য়ারিতে আলোচিত বিডিআর হত্যা মামলায় দায়ের করা সব ডেথ রেফারেন্স ও ফৌজদারি আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয়। বর্তমানে শুনানি অব্যাহত রয়েছে। বিচারপতি মো. শওকত হোসেনের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিশেষ বেঞ্চে এই শুনানি গ্রহণ করছেন। বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হিসেবে রয়েছেন-বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বিডিআর’র সদর দফতর ‘পিলখানা ট্রাজেডি’তে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন।
সাত খুন মামলার চার্জশিট : ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংকরোডের ফতুল্লার শিবু মার্কেট এলাকা থেকে নারায়ণগঞ্জের কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ ৭ জনকে অপহরণ করা হয়। ওই ঘটনার তিন দিন পর তাদের লাশ উদ্ধার করা হয় শীতলক্ষ্যা নদী থেকে। নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি বাদী হয়ে একটি ও আইনজীবী চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় আরেকটি মামলা দায়ের করেন।
প্রায় এক বছর তদন্ত শেষে ২০১৫ সালের ৯ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৭ খুনের ঘটনায় নূর হোসেন, র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) আরিফ হোসেন ও লে. কমান্ডার (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) এম এম রানাসহ ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মামুনুর রশিদ মণ্ডল। বর্তমানে মামলাটির বিচার চলমান রয়েছে।
আলোচিত ঘটনা
* খালেদা জিয়ার গ্রেফতারি পরোয়ানা
* তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা
* সাত খুন মামলার চার্জশিট
* ঐশীর ফাঁসির আদেশ
* বিডিআর হত্যা মামলার আপিলের শুনানি শুরু
 

কালনিরবধি ২০১৬ পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close