¦
আলোচনায় শিশু হত্যা রাজনৈতিক সহিংসতা আর টার্গেট কিলিং

মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নু ও সৈয়দ আতিক | প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০১৬

রাজনৈতিক সহিংসতা, পৈশাচিক কায়দায় শিশু হত্যা আর টার্গেট কিলিং ছাড়াও ২০১৫ সালজুড়ে ছিল নানা অঘটন। বছরের শুরুতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের ডাকা ৯৩ দিনের লাগাতার অবরোধে স্থবির হয়ে পড়ে ঢাকাসহ সারা দেশ। সহিংসতার আগুনে প্রাণ যায় দেড় শতাধিক নিরীহ মানুষের। এর মধ্যে পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়ে মারা যান ৬৯ জন। আহত হয় তিন সহস্রাধিক মানুষ। বছরের মাঝামাঝি আইনশৃংখলা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও শুরু হয় টার্গেট কিলিং। মুক্তমনা লেখক, ব্লগার ছাড়াও টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হন বিদেশী নাগরিকও। হামলা থেকে বাদ যায়নি মসজিদ-উপাসনালয়ও।
এসব টার্গেট কিলিং ও হামলার পর আইএস, আল কায়দাসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের দায় স্বীকার করে দেয়া বিবৃতি অপরাধে নতুন মাত্রা যোগ করে। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের অস্তিত্ব নিয়ে শুরু হয় তর্ক-বিতর্ক। পশ্চিমা কয়েকটি দেশ বাংলাদেশে আইএসের কার্যক্রম রয়েছে বলে দাবি তুললেও সরকারের পক্ষ থেকে তা নাকচ করা হয়। কয়েকটি দেশ বাংলাদেশে তাদের নাগরিকদের ভ্রমণ সতর্কতাও জারি করে। পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ সালে সারা দেশে ৩ হাজার ২১৫টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিদিন গড়ে ৯ জন খুন হয়েছে। ব্লগার, মুক্তমনা লেখক ও বিশিষ্ট নাগরিকদের হত্যার হুমকি ছিল বছরজুড়ে। কখনও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, কখনও ই-মেইলে আবার কখনোবা চিঠি দিয়ে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের পক্ষ থেকে এসব হুমকি দেয়া হয়। এসব হুমকি থেকে বাদ যাননি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, মেয়র, শিক্ষক, লেখক, আইনজীবী, বিচারপতি, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, পেশাজীবী ও কবি-সাহিত্যিকসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ।
এর বাইরে বিদায়ী বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল শিশু হত্যা। সিলেট, খুলনা ও ঢাকায় পৃথক ঘটনায় চার শিশুকে নির্দয়ভাবে হত্যার পর ফেসবুকে সে দৃশ্য আপলোড করার পর শুরু হয় তোলপাড়। এছাড়া মাগুরায় ছাত্রলীগ নেতার গুলিতে মাতৃগর্ভে শিশু গুলিবিদ্ধের ঘটনাটি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিভিন্ন বিদেশী গণমাধ্যমেও গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ পায়। এছাড়া চলন্ত বাস ও মাইক্রোবাসে নারী ধর্ষণের ঘটনাও ঘটে।
বছরের প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও খুনের ঘটনা ঘটছে। ১৩ এপ্রিল রাজধানীর ইস্কাটন রোডে ক্ষমতাসীন দলের সংরক্ষিত আসনে নারী সংসদ সদস্য ও মহিলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক পিনু খানের মদ্যপ ছেলে বখতিয়ার আলম রনির এলোপাতাড়ি গুলিতে খুন হন নিরীহ রিকশাচালক হাকিম ও দৈনিক জনকণ্ঠের সিএনজি অটোরিকশা চালক ইয়াকুব।
বছরজুড়ে সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হন দেড় শতাধিক নেতাকর্মী। এর বাইরে আইনশৃংখলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ ও গুমের ঘটনা দেশের মানুষকে আতংকিত করে তোলে। অপহরণের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে ৬২, ফেব্র“য়ারিতে ৫৫, মার্চে ৭৯, এপ্রিলে ৯৩, মে মাসে ১২২, জুনে ৮০, জুলাইয়ে ৬৫, আগস্টে ৭৯, সেপ্টেম্বরে ৮১, অক্টোবরে ৬৮ এবং নভেম্বরে ৮০টি। এসব অপহরণের বড় একটি অংশ আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও আইনশৃংখলা বাহিনীর পক্ষ থেকে এ অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করা হচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে সারা দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৪ হাজারের বেশি নারী ও শিশু। এছাড়া গত বছর সারা দেশে বিভিন্ন অপরাধে ১ লাখ ৩৫ হাজার মামলা রেকর্ড হয়েছে। গড়ে প্রতি মাসে ১১ হাজার ২৫০টি মামলা হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত অপরাধের ঘটনা আরও কয়েকগুণ বেশি।
বছরের উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা : ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনে লেখক ও মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। গুরুতর আহত হন তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা। ৩০ মার্চ রাজধানীর তেজগাঁওয়ের বেগুনবাড়িতে নিজ বাসার সামনেই খুন হন আরেক ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান। প্রায় একই কায়দায় ১২ মে সিলেটে খুন হন ব্লগার অনন্ত বিজয় দাস। ৭ আগস্ট রাজধানীর খিলগাঁওয়ের দক্ষিণ গোড়ানে ভাড়া বাসায় দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে খুন হন ব্লগার ও গণজাগরণ মঞ্চের সক্রিয় কর্মী নীলাদ্রী চট্টোপাধ্যায়।
৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থানার বাংলাবাজার এলাকায় মাজারে প্রবেশ করে ল্যাংটা ফকির ও আবদুল কাদের নামে দু’জনকে গলা কেটে খুন করে দুর্বৃত্তরা। ২৩ অক্টোবর পুরনো ঢাকার হোসেনি দালানে আশুরার তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতির মধ্যে বোমা হামলায় দু’জন নিহত ও শতাধিক মানুষ আহত হন। ২৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় দুর্বৃত্তরা বগুড়ার শিবগঞ্জে শিয়া সম্প্রদায়ের একটি মসজিদে ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এতে মসজিদের মুয়াজ্জিন নিহত এবং তিনজন আহত হন। ১০ ডিসেম্বর রাতে ঢাকার দারুসসালাম এলাকায় কথিত বন্দুকযুদ্ধে ‘জেএমবির সামরিক শাখার প্রধান’ বাণী ওরফে মাহফুজ ওরফে হোজ্জা ভাই নিহত হয়। ১৮ ডিসেম্বর জুমার নামাজ আদায়রত অবস্থায় চট্টগ্রামে নৌঘাঁটির ঈসা খাঁ মসজিদে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ২৬ ডিসেম্বর রাজশাহীর বাগমারায় আহমদিয়া সম্প্রদায়ের একটি মসজিদে জুমার নামাজের সময় আত্মঘাতী বোমা হামলায় একজন নিহত হন। ওই ঘটনায় আহত হন শিশুসহ অন্তত ১২ জন।
বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল তিন বিদেশী খুন। ২৮ সেপ্টেম্বর গুলশানে ৯০ নম্বর সড়কে ইতালীয় নাগরিক সিজারি তাভেল্লাকে গুলি করে খুন করে দুর্বৃত্তরা। পরে এ ঘটনায় দায় স্বীকার করে ইসলামিক স্টেট (আইএস)। জঙ্গি হুমকি পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ‘সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্র“প’ ওই দাবি করে। তাভেল্লা সিজারি হত্যার রেশ কাটতে না কাটতেই ৩ অক্টোবর রংপুরের কাউনিয়ায় মাহিগঞ্জ আলুটারি এলাকায় বন্দুকধারীদের গুলিতে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি নিহত হন। এর কয়েক দিন পর উত্তরায় জাপানি নাগরিক হিরোয়ি মিয়েতাকে হত্যা করে লাশ গুমের ঘটনা জানাজানি হয়। তাকে মুসলমান পরিচয়ে হালিমা খাতুন নাম দিয়ে উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টর খালপাড়া কবরস্থানে দাফন করা হয়েছিল। ৩১ অক্টোবর বিকালে রাজধানীর আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলার জাগৃতি প্রকাশনীর কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী ফয়সাল আরেফিন দীপনকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। একই দিন দুপুরে লালমাটিয়ায় আরেক প্রকাশনা সংস্থা শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে ঢুকে এর কর্ণধার আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুলসহ তিনজনকে কুপিয়ে আহত করে দুর্বৃত্তরা।
২২ অক্টোবর গাবতলীর দারুসসালাম পর্বতা সিনেমা হলের সামনে চেকপোস্টে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন এএসআই ইব্রাহিম মোল্লা। এর কয়েক দিনের মাথায় ৪ নভেম্বর সকালে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে আশুলিয়ার বাড়ৈপাড়া এলাকায় দুর্বৃত্তরা চেকপোস্টে হামলা চালালে কনস্টেবল মুকুল হোসেন নিহত ও নূরে আলম নামে আরেক পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন।
৫ অক্টোবর রাজধানী মধ্য বাড্ডায় নিজ বাড়িতে খুন হন পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান খিজির খান। ১৩ মে রাজধানীর পল্লবীতে নিজ ফ্ল্যাটে খুন হন ডেসকোর ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার স্ত্রী ও তার মামা। ২৫ জুন কলাবাগানে ৫৭ সার্কুলার রোডে নিজ বাসার অদূরে স্ত্রীর প্রেমিকের গুলিতে খুন হন ওবায়দুল হাসান। একই দিনে অপহৃত ব্যবসায়ী মোমিন বক্সের লাশ উদ্ধার হয়। ১৩ আগস্ট আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মধ্য বাড্ডা আদর্শনগর আল সামি হাসপাতালের পাশে নিজ দলের অস্ত্রধারীদের গুলিতে খুন হন স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মাহবুবুর রহমান গামাসহ ৪ জন।
আলোচনায় শিশু হত্যা : বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল পৈশাচিক কায়দায় একাধিক শিশু হত্যা। ৮ জুলাই চুরির অপবাদ দিয়ে সিলেটের কুমারগাঁওয়ে শিশু রাজনকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের ২৮ মিনিটের ভিডিও ফেসবুকে আপলোড করে দেয় হত্যাকারীরা। ১৩ এপ্রিল রাজধানীর খিলক্ষেতের মস্তুল এলাকায় কবুতর চুরির অপবাদ দিয়ে ১৬ বছরের কিশোর নাজিমকে নির্যাতন করে রশি দিয়ে হাত-পা বেঁধে ফেলে দেয়া হয় বালু নদীতে। এ নির্যাতনের ভিডিওটিও ফেসবুকে আপলোড করা হয়। ৩ আগস্ট খুলনার টুটপাড়ার রাকিব (১৩) নামের এক শিশুকে কমপ্রেসার মেশিন দিয়ে মলদ্বারে বাতাস ঢুকিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। একই দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কম্পাউন্ডে লাগেজের ভিতর আনুমানিক ৯ বছর বয়সের এক শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়। তার শরীরে ইস্ত্রির ছ্যাঁকাসহ ৫৭টি আঘাতের চিহ্ন ছিল। ২৩ জুলাই মাগুরায় ছাত্র লীগ নেতার গুলিতে মাতৃগর্ভেই গুলিবিদ্ধ হয় এক শিশু। ১৭ আগস্ট হাজারীবাগে এক কিশোরকে মোবাইল চুরির অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করেন থানা ছাত্রলীগ সভাপতি রাজা মিয়া। পরে র‌্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হন তিনি।
 

কালনিরবধি ২০১৬ পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close