¦
সাংবাদিক বেবী মওদুদের জীবনাবসান

যুগান্তর রিপোর্ট | প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০১৪

সাংবাদিক ও সাবেক সংসদ সদস্য এএন মাহফুজা খাতুন বেবী মওদুদ আর নেই। দীর্ঘদিন ক্যান্সারে ভুগে শুক্রবার রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর। তিনি দুই ছেলে রেখে গেছেন।
তার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন শোক প্রকাশ করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিল যুগান্তরকে জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাংবাদিক ও সাবেক সংসদ সদস্য বেবী মওদুদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ঘনিষ্ঠ এই বন্ধুকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে বিকালে হাসপাতালে যান। সেখানে তিনি বেশ কিছুক্ষণ অবস্থান করেন। এ সময় তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। প্রধানমন্ত্রী হাসপাতালে থাকা বেবী মওদুদের স্বজনদের সান্ত্বনা দেন। বেবী মওদুদের সন্তানদের সান্ত্বনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘তিনি একটি ভালো দিনে (জুমাতুল বিদা) মারা গেছেন। আমি তোমাদের পাশে আছি।’ এ সময় তার বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিল তার সঙ্গে ছিলেন।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী ১২ জুলাই অসুস্থ বেবী মওদুদকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন।
বেবী মওদুদের মৃত্যুর খবরে সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শুক্রবার বাদ এশা ধানমন্ডির ঈদগাহ মাঠে তার প্রথম জানাজা শেষে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় জাতীয় প্রেস ক্লাবে। সেখানে সর্বস্তরের মানুষ তাকে শ্রদ্ধা জানান। পরে রাতেই তাকে বনানী কবরস্থানে স্বামীর কবরের ওপর দাফন করা হয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বেবী মওদুদ অনলাইন সংবাদপত্র বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সোস্যাল অ্যাফেয়ার্স এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। বেবী মওদুদের সাংবাদিকতার সূচনা ১৯৬৭ সালে; তিনি দৈনিক সংবাদ, বিবিসি, দৈনিক ইত্তেফাক, বাসস ও সাপ্তাহিক বিচিত্রায় দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেন। সর্বশেষ যোগ দেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে।
তার জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৩ জুন, কলকাতায়। তার বাবা মরহুম আবদুল মওদুদ পাকিস্তান আমলে হাইকোর্টের বিচারপতি ছিলেন। তার মায়ের নাম হেদায়েতুন নেসা। ছয় ভাই, তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। তার স্বামী মরহুম অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ হাসান আলী ছিলেন স্বনামখ্যাত প্রগতিশীল রাজনীতিক।
মুক্তিযুদ্ধের আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকার দিনগুলোতেই পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য হিসেবে ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হন বেবী মওদুদ। ১৯৬৭-৬৮ সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল ছাত্রী সংসদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭১ সালে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন এই কৃতী সাংবাদিক। নব্বইয়ের দশকে যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তির দাবিতে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আন্দোলনেও সোচ্চার ছিলেন বেবী মওদুদ। নবম জাতীয় সংসদে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংরক্ষিত নারী আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এবং লাইব্রেরি কমিটির সদস্য হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
আনুষ্ঠানিক নাম এএন মাহফুজা খাতুন হলেও সবাই তাকে তার ঘরোয়া নাম ‘বেবী মওদুদ’ হিসেবেই চিনতেন। বিদূষী, বিনয়ী, ন্যায়পরায়ণ ও সাদামাটা পোশাকের জনদরদী এই নারী সহকর্মীদের ছিলেন প্রিয় ‘বেবী আপা’।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের জন্য লিখেও সুনাম অর্জন করেন বেবী মওদুদ। তার গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে- মনে মনে (ছোট গল্প), শেখ মুজিবের ছেলেবেলা, পবিত্র রোকেয়া পাঠ, শান্তুর আনন্দ, পাকিস্তানে বাংলাদেশের নারীর পাচার, আমার রোকেয়া, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও তার পরিবার, টুনুর হারিয়ে যাওয়া, কিশোর সাহিত্য সমগ্র উল্লেখযোগ্য।
রাষ্ট্রপতির শোক : সাংবাদিক ও সাবেক সংসদ সদস্য এএন মাহফুজা খাতুন বেবী মওদুদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ। এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, ‘বেবী মওদুদ ছিলেন এক সৎ ও সাহসী সাংবাদিক। তার মৃত্যুতে জাতি একজন নির্ভীক সংবাদকর্মীকে হারাল।’
তিনি বেবী মওদুদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বেবী মওদুদের মৃত্যুতে যে ক্ষতি হল তা অপূরণীয়।’
প্রধানমন্ত্রীর শোক : দীর্ঘদিনের বন্ধু বেবী মওদুদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার মৃত্যুতে জাতি এক নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিক এবং লেখককে হারাল। মরহুম বেবী মওদুদকে তার অকৃত্রিম সুহৃদ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তার মৃত্যুতে আমি আমার দীর্ঘদিনের একজন প্রিয় বন্ধুকে হারিয়েছি।’ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রচিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থটি সম্পাদনার ক্ষেত্রে বেবী মওদুদের ভূমিকা তিনি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন। প্রধানমন্ত্রী মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোক সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন।
বেবী মওদুদের মৃত্যুতে আরও শোক প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সাধারণ সম্পাদক শরীফ নুরুল আম্বিয়া, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি কামাল উদ্দিন সবুজ, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য, সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহ তারেক, মাওলানা মতীন স্মৃতি সংসদের চেয়ারম্যান জাকির হোসেন সরকার, মহাসচিব দেলোয়ার হোসেন সাইদ।
 

শেষ পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম