jugantor
‘অপারেশন মোনায়েম খান’ প্রসঙ্গে মোজাম্মেল হক বীর প্রতীক
এক গুলিতেই সফল

  আলাউদ্দিন আরিফ  

১৭ ডিসেম্বর ২০১৪, ০০:০০:০০  | 

‘একাত্তরের ১৪ অক্টোবর ভোরে বাড়ির বাংলোঘরে শুয়ে আছি। মালেক চাচা (ভাটারার আবদুল মালেক মাস্টার) জোরে জোরে দরজা ধাক্কাচ্ছেন। দরজা খুলতেই বললেন, ‘রাইতে আকাম কইরা শুইয়া আছ। মোনায়েম খান মারা গেছে। মিলিটারি বাড়িত আইল, তাড়াতাড়ি বাড়িত থেইকা বাইর-হ।’ তখনই নিশ্চিত হলাম আমার গুলিতেই মারা গেছেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান।’

কথাগুলো বলছিলেন, মোজাম্মেল হক বীর প্রতীক। একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি গত বুধবার যুগান্তরের কাছে আরও বলেন, ‘১৯৭১ সালে আমি শাহীনবাগের স্টাফ ওয়েল ফেয়ার হাই স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র ছিলাম। শিশুকাল থেকেই পাকিস্তানিদের অত্যাচার-নির্যাতনের অনেক ঘটনা শুনেছি। ওই সময় গুলশানের নাম ছিল ‘পাড়ামনা’। পাড়ামনা গ্রামে আমার দাদার ৩২ বিঘা জমি ছিল। সাবেক ডিআইটির (রাজউক) তৎকালীন প্রধান ছিলেন জিএ মাদানী। তিনি আমাদের জমিগুলো অধিগ্রহণ করেন। আমরা একর প্রতি মাত্র ১৫০ টাকা ক্ষতিপূরণ পাই। তাও তিন কিস্তিতে। যদিও এর ফাইনাল বিল এখন পর্যন্ত পাইনি। এসব নিয়ে শিশুকাল থেকে পারিবারিকভাবেই পাকিস্তানিদের প্রতি ক্ষোভ তৈরি হয়।’

মোজাম্মেল হক জানান, মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর চাচাতো ভাই বকুল, গিয়াস ও সাঈদের সঙ্গে পরামর্শ করে যুদ্ধে যাই। প্রথবার খাবারের কষ্ট ও চোখ ওঠা রোগের ভয়ে ফিরে আসি। গ্রামের রহিমু উদ্দিন মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে গ্রামে আসেন। রহিমকে আবার যুদ্ধে যাওয়ার কথা বলি। কিন্তু তিনি আমার সাহসের পরীক্ষা চান। জুন কি জুলাই মাসে রহিম উদ্দিনের সহযোগিতায় একটি বিদেশী পতাকাওয়ালা বাড়িতে গ্রেনেড ছুড়ে মারি। পরদিন পত্রিকায় দেখি, ‘দুষ্কৃতকারীরা বিদেশী দূতাবাসে গ্রেনেড হামলা করেছে! রহিম উদ্দিনের পরীক্ষায় পাস করে মায়ের কাছ থেকে ২৪৬ টাকা নিয়ে ত্রিপুরার মেলাঘর ট্রেনিং সেন্টারে যাই। সেখানে ২ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর এটিএম হায়দারের সম্মতিতে গেরিলা ট্রেনিং নেই। ২১ দিনের ট্রেনিং শেষে ১৫ জন নিয়ে আমাদের ‘ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গেরিলা গ্র“প’ তৈরি হয়। এর গ্র“প কমান্ডার ছিলেন এমএন লতিফ।

তিনি বলেন, মেজর হায়দার আমাকে মোনায়েম খান কিলিং অপারেশনের দায়িত্ব দেন। ওই সময় মেজর হায়দারকে বলি, ‘অপারেশন সাকসেস হলে অপারেশন শেষে আমি আপনার কোমরের রিভলবারটা চাই!’ ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গেরিলা গ্র“প এলাকায় আসি। আমার মাথায় তখন একটাই চিন্তা ‘অপারেশন মোনায়েম খান।’ আমি মোনায়েম খানের গোয়ালা জব্বার চাচার সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি রাখাল শাজাহানের সঙ্গে সম্পর্ক করার পরামর্শ দেন। আমি শাজাহানের সঙ্গে খাতির জমাই। এ সময় শাজাহান বলেন, ‘মোনায়েম খান একটা জানোয়ার! আমাকে বেতন তো দেয়ই না, উল্টো নানা নির্যাতন করে। পাঁচবার বাসা থেকে পালিয়েছি। প্রতিবার পুলিশ দিয়ে আমাকে ধরে এনেছে। মুক্তিরা এত মানুষ মারে, এই ব্যাটাকে মারতে পারে না!’ আরেকটু খাতির জমিয়ে ‘অপারেশন মোনায়েম খান’ সম্পর্কে জানাই। তিনি সহায়তা করার প্রতিশ্র“তি দেন।

‘অপারেশন মোনায়েম খান’ কিভাবে সফল হল এর একটি বিশদ বর্ণনা দিলেন মোজাম্মেল হক বীর প্রতীক। তার এই বর্ণনা নিচে তুলে ধরা হল-

‘একদিন বিকালে চটের ব্যাগে স্টেনগান, দুটি ম্যাগাজিন, একটি হ্যান্ড গ্রেনেড আর একটি ফসফরাস বোমা নিয়ে রাখাল শাজাহানের কাছে হাজির হই। মোনায়েম খানের বাসায় গিয়ে পরপর ২ দিন ব্যর্থ হই। প্রথমবার সন্ধ্যায় মোনায়েম খানের বাসায় ঢুকে গেটের পাশের কলা গাছের ঝোপে বসে ছিলাম। একটু পরে শাজাহান এসে জানায়, মোনায়েম খানের শরীর খারাপ। তিনি দোতলায় উঠে গেছেন। ওইদিন অপারেশন স্থগিত রেখে বনানীর খ্রিস্টান পাড়ায় ইটের স্তূপে অস্ত্রের ব্যাগটি লুকিয়ে রাখি। আরেকদিন সন্ধ্যায় অস্ত্রের ব্যাগ নিয়ে শাজাহানের সঙ্গে আবার মোনায়েম খানের বাসায় যাই। একটি উজ্জ্বল বৈদ্যুতিক বাল্বের আলোয় চারপাশের সব কিছু পরিষ্কার দেখাচ্ছিল। অপারেশনের সুবিধার্থে সেই বাতিটি ইট দিয়ে ভেঙে ফেলি। ভাঙা বাল্ব দেখে বাসার লোকজন চোর চোর বলে চিৎকার শুরু করে। বাসায় পাহারারত অবাঙালি পুলিশ সদস্যরা হুইসেল বাজিয়ে টর্চ দিয়ে চোর খুঁজতে থাকে। আমি বিপদ দেখে সরে যাই।’ ’৭১ সালের ১৩ অক্টোবর আবার অভিযান শুরু করি। এবার সহযোগী হিসেবে সঙ্গে নেই আমার চাচাতো ভাই আনোয়ারকে। সন্ধ্যার পর মোনায়েম খানের বাসার ভেতরে কলা গাছের ঝোপে দুজন বসে থাকি। একটু পরে শাজাহান এসে জানায়, ‘আজ অপারেশন সম্ভব। মোনায়েম খান, তার মেয়ের জামাই (জাহাঙ্গীর মো. আদিল) আর শিক্ষামন্ত্রী (আমজাদ হোসেন) বাসার নিচ তলার ড্রইংরুমে বসা। একটি সোফায় তিনজন বসা। মাঝে মোনায়েম খান। আমি গোয়ালা জব্বার চাচা আর রাখাল শাজাহান ভাইকে জামা-কাপড় নিয়ে বাসা থেকে পালিয়ে যেতে বলি। অস্ত্র তাক করে আমরা দুজন ড্রইংরুমের দিকে এগিয়ে যাই। আমার প্ল্যান ছিল স্টেনগানের একটি ম্যাগাজিন পুরো খরচ করব মোনায়েম খানের ওপর। বাকি দুজনকে আরেকটি ম্যাগাজিন দিয়ে ব্রাশফায়ার করব। ব্যাকআপ আর্মস হিসেবে হ্যান্ড গ্রেনেড আর ফসফরাস বোমা তো আছেই।

ড্রইংরুমের দরজাটি খোলা ছিল। দরজার দিকে মুখ করে তিনজন একটি সোফায় বসা। আমি স্টেনগান দিয়ে ব্রাশফায়ার করি। কিন্তু সিঙ্গেল ফায়ার হয়, গুলিটি মোনায়েম খানের পেটে লাগে। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। বাকি দুজন ভয়ে বাঁচাও, বাঁচাও’ চিৎকার শুরু করেন। আমার স্টেনগান জ্যাম হয়ে যায়। আর ফায়ার হয় না। আমি ম্যাগাজিন বদলে ফায়ার করার চেষ্টা করি, তাতেও কাজ হয় না। আনোয়ার ভাই সেফটি পিন খুলে গ্রেনেড ছুড়ে মারেন। এবারও ভাগ্য খারাপ। গ্রেনেডটি বিস্ফোরিত না হয়ে বরং সেটি দেয়ালে লেগে আমাদের কাছেই ফিরে আসে। এরই মধ্যে বাড়িতে থাকা অবাঙালি পুলিশ সদস্যরা মাথা নিচু করে ওপরের দিকে ক্রমাগত ব্ল্যাংক ফায়ার করতে থাকে। আমরা দেয়াল টপকে সেখান থেকে পালাই।

দৌড়ে গুলশান লেকের কাছে পৌঁছে দেখি জব্বার চাচা আর শাজাহান ভাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। তারা তিনজন সাঁতরে লেক পাড়ি দেন। কিন্তু আমার পক্ষে স্টেনগান নিয়ে সাঁতরে লেক পার হওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। একটি কোষা নৌকায় আস্তে আস্তে গুলশান ২ নম্বর ব্রিজের কাছাকাছি পৌঁছি। এদিকে গোলাগুলির শব্দে ক্যান্টনমেন্টের দিক থেকে একের পর এক পাক আর্মির গাড়ি মোনায়েম খানের বাসার দিকে যেতে থাকে। গুলশান ২ নম্বর ব্রিজটির ওপর আর্মির চেক পোস্ট ছিল। আমি ধরা পড়ার ঝুঁকি নিয়েই ব্রিজের নিচ দিয়ে একটু একটু করে ক্রলিং করে ভাটারায় পৌঁছি।

ভাটারা বাজারে একটি চায়ের দোকানে আনোয়ার, জব্বার ও শাজাহান আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। পথে ইস্রাফিল খন্দকারের সঙ্গে দেখা। তাকেই প্রথম মোনায়েম খান গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর দেই। স্টেনগান কাঁধে করে ওই দিনই প্রথম গ্রামের মানুষ আমাকে দেখেন। আমি শীতে কাঁপতে থাকি। আনোয়ার ভাইকে স্টেনগান দিয়ে বলি, আমার খুব শরীর খারাপ লাগছে! এরপর আমি জ্ঞান হারাই। জ্ঞান ফিরে রাতে। দেখি, বাড়ির লোকজন আমাকে ঘিরে আছেন। বাড়িতে থাকা নিরাপদ নয় ভেবে আনোয়ার ভাইসহ অন্যরা রূপগঞ্জে চলে গেলেন। আমি বাড়ির বাংলোঘরে (কাচারি) ঘুমাই।

আমার এক চাচা মালেক মাস্টার রেডিও পাকিস্তানে সকাল ৭টার খবর শুনছেন। খবরে প্রচার হয় ‘রাতে আততায়ীর গুলিতে আহত হয়ে মোনায়েম খান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছেন।’ সকালে আমি বাড়ির কাচারি ঘরে ঘুমিয়ে আছি। মালেক চাচা এসে খুব জোরে বারবার দরজা ধাক্কাচ্ছিলেন। আমি ঘুম চোখে দরজা খুলতে জানতে চাই কি হইছে? তিনি বললেন, ‘কি অইছে জান না, রাইতে আকাম কইরা শুইয়া আছ! মোনায়েম খান মইরা গেছে। মিলিটারি বাড়িত আইল, তাড়াতাড়ি বাড়ি থেকে বাইরহ।’ তখন আমি নিশ্চিত হলাম যে, আমার গুলিতে মারা গেছেন পাক গভর্নর মোনায়েম খান।

ভাটারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন মোজাম্মেল হক। এই ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের শেষ মাথায় ফাজিলারটেক শাওড়াতলায় সাড়ে ৫৯ ফুট উঁচু একটি ভাস্কর্য ‘বীরের প্রত্যাবর্তন’ তারই প্রচেষ্টায় তৈরি করা।


 

সাবমিট
‘অপারেশন মোনায়েম খান’ প্রসঙ্গে মোজাম্মেল হক বীর প্রতীক

এক গুলিতেই সফল

 আলাউদ্দিন আরিফ 
১৭ ডিসেম্বর ২০১৪, ১২:০০ এএম  | 

‘একাত্তরের ১৪ অক্টোবর ভোরে বাড়ির বাংলোঘরে শুয়ে আছি। মালেক চাচা (ভাটারার আবদুল মালেক মাস্টার) জোরে জোরে দরজা ধাক্কাচ্ছেন। দরজা খুলতেই বললেন, ‘রাইতে আকাম কইরা শুইয়া আছ। মোনায়েম খান মারা গেছে। মিলিটারি বাড়িত আইল, তাড়াতাড়ি বাড়িত থেইকা বাইর-হ।’ তখনই নিশ্চিত হলাম আমার গুলিতেই মারা গেছেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান।’

কথাগুলো বলছিলেন, মোজাম্মেল হক বীর প্রতীক। একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি গত বুধবার যুগান্তরের কাছে আরও বলেন, ‘১৯৭১ সালে আমি শাহীনবাগের স্টাফ ওয়েল ফেয়ার হাই স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র ছিলাম। শিশুকাল থেকেই পাকিস্তানিদের অত্যাচার-নির্যাতনের অনেক ঘটনা শুনেছি। ওই সময় গুলশানের নাম ছিল ‘পাড়ামনা’। পাড়ামনা গ্রামে আমার দাদার ৩২ বিঘা জমি ছিল। সাবেক ডিআইটির (রাজউক) তৎকালীন প্রধান ছিলেন জিএ মাদানী। তিনি আমাদের জমিগুলো অধিগ্রহণ করেন। আমরা একর প্রতি মাত্র ১৫০ টাকা ক্ষতিপূরণ পাই। তাও তিন কিস্তিতে। যদিও এর ফাইনাল বিল এখন পর্যন্ত পাইনি। এসব নিয়ে শিশুকাল থেকে পারিবারিকভাবেই পাকিস্তানিদের প্রতি ক্ষোভ তৈরি হয়।’

মোজাম্মেল হক জানান, মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর চাচাতো ভাই বকুল, গিয়াস ও সাঈদের সঙ্গে পরামর্শ করে যুদ্ধে যাই। প্রথবার খাবারের কষ্ট ও চোখ ওঠা রোগের ভয়ে ফিরে আসি। গ্রামের রহিমু উদ্দিন মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে গ্রামে আসেন। রহিমকে আবার যুদ্ধে যাওয়ার কথা বলি। কিন্তু তিনি আমার সাহসের পরীক্ষা চান। জুন কি জুলাই মাসে রহিম উদ্দিনের সহযোগিতায় একটি বিদেশী পতাকাওয়ালা বাড়িতে গ্রেনেড ছুড়ে মারি। পরদিন পত্রিকায় দেখি, ‘দুষ্কৃতকারীরা বিদেশী দূতাবাসে গ্রেনেড হামলা করেছে! রহিম উদ্দিনের পরীক্ষায় পাস করে মায়ের কাছ থেকে ২৪৬ টাকা নিয়ে ত্রিপুরার মেলাঘর ট্রেনিং সেন্টারে যাই। সেখানে ২ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর এটিএম হায়দারের সম্মতিতে গেরিলা ট্রেনিং নেই। ২১ দিনের ট্রেনিং শেষে ১৫ জন নিয়ে আমাদের ‘ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গেরিলা গ্র“প’ তৈরি হয়। এর গ্র“প কমান্ডার ছিলেন এমএন লতিফ।

তিনি বলেন, মেজর হায়দার আমাকে মোনায়েম খান কিলিং অপারেশনের দায়িত্ব দেন। ওই সময় মেজর হায়দারকে বলি, ‘অপারেশন সাকসেস হলে অপারেশন শেষে আমি আপনার কোমরের রিভলবারটা চাই!’ ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গেরিলা গ্র“প এলাকায় আসি। আমার মাথায় তখন একটাই চিন্তা ‘অপারেশন মোনায়েম খান।’ আমি মোনায়েম খানের গোয়ালা জব্বার চাচার সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি রাখাল শাজাহানের সঙ্গে সম্পর্ক করার পরামর্শ দেন। আমি শাজাহানের সঙ্গে খাতির জমাই। এ সময় শাজাহান বলেন, ‘মোনায়েম খান একটা জানোয়ার! আমাকে বেতন তো দেয়ই না, উল্টো নানা নির্যাতন করে। পাঁচবার বাসা থেকে পালিয়েছি। প্রতিবার পুলিশ দিয়ে আমাকে ধরে এনেছে। মুক্তিরা এত মানুষ মারে, এই ব্যাটাকে মারতে পারে না!’ আরেকটু খাতির জমিয়ে ‘অপারেশন মোনায়েম খান’ সম্পর্কে জানাই। তিনি সহায়তা করার প্রতিশ্র“তি দেন।

‘অপারেশন মোনায়েম খান’ কিভাবে সফল হল এর একটি বিশদ বর্ণনা দিলেন মোজাম্মেল হক বীর প্রতীক। তার এই বর্ণনা নিচে তুলে ধরা হল-

‘একদিন বিকালে চটের ব্যাগে স্টেনগান, দুটি ম্যাগাজিন, একটি হ্যান্ড গ্রেনেড আর একটি ফসফরাস বোমা নিয়ে রাখাল শাজাহানের কাছে হাজির হই। মোনায়েম খানের বাসায় গিয়ে পরপর ২ দিন ব্যর্থ হই। প্রথমবার সন্ধ্যায় মোনায়েম খানের বাসায় ঢুকে গেটের পাশের কলা গাছের ঝোপে বসে ছিলাম। একটু পরে শাজাহান এসে জানায়, মোনায়েম খানের শরীর খারাপ। তিনি দোতলায় উঠে গেছেন। ওইদিন অপারেশন স্থগিত রেখে বনানীর খ্রিস্টান পাড়ায় ইটের স্তূপে অস্ত্রের ব্যাগটি লুকিয়ে রাখি। আরেকদিন সন্ধ্যায় অস্ত্রের ব্যাগ নিয়ে শাজাহানের সঙ্গে আবার মোনায়েম খানের বাসায় যাই। একটি উজ্জ্বল বৈদ্যুতিক বাল্বের আলোয় চারপাশের সব কিছু পরিষ্কার দেখাচ্ছিল। অপারেশনের সুবিধার্থে সেই বাতিটি ইট দিয়ে ভেঙে ফেলি। ভাঙা বাল্ব দেখে বাসার লোকজন চোর চোর বলে চিৎকার শুরু করে। বাসায় পাহারারত অবাঙালি পুলিশ সদস্যরা হুইসেল বাজিয়ে টর্চ দিয়ে চোর খুঁজতে থাকে। আমি বিপদ দেখে সরে যাই।’ ’৭১ সালের ১৩ অক্টোবর আবার অভিযান শুরু করি। এবার সহযোগী হিসেবে সঙ্গে নেই আমার চাচাতো ভাই আনোয়ারকে। সন্ধ্যার পর মোনায়েম খানের বাসার ভেতরে কলা গাছের ঝোপে দুজন বসে থাকি। একটু পরে শাজাহান এসে জানায়, ‘আজ অপারেশন সম্ভব। মোনায়েম খান, তার মেয়ের জামাই (জাহাঙ্গীর মো. আদিল) আর শিক্ষামন্ত্রী (আমজাদ হোসেন) বাসার নিচ তলার ড্রইংরুমে বসা। একটি সোফায় তিনজন বসা। মাঝে মোনায়েম খান। আমি গোয়ালা জব্বার চাচা আর রাখাল শাজাহান ভাইকে জামা-কাপড় নিয়ে বাসা থেকে পালিয়ে যেতে বলি। অস্ত্র তাক করে আমরা দুজন ড্রইংরুমের দিকে এগিয়ে যাই। আমার প্ল্যান ছিল স্টেনগানের একটি ম্যাগাজিন পুরো খরচ করব মোনায়েম খানের ওপর। বাকি দুজনকে আরেকটি ম্যাগাজিন দিয়ে ব্রাশফায়ার করব। ব্যাকআপ আর্মস হিসেবে হ্যান্ড গ্রেনেড আর ফসফরাস বোমা তো আছেই।

ড্রইংরুমের দরজাটি খোলা ছিল। দরজার দিকে মুখ করে তিনজন একটি সোফায় বসা। আমি স্টেনগান দিয়ে ব্রাশফায়ার করি। কিন্তু সিঙ্গেল ফায়ার হয়, গুলিটি মোনায়েম খানের পেটে লাগে। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। বাকি দুজন ভয়ে বাঁচাও, বাঁচাও’ চিৎকার শুরু করেন। আমার স্টেনগান জ্যাম হয়ে যায়। আর ফায়ার হয় না। আমি ম্যাগাজিন বদলে ফায়ার করার চেষ্টা করি, তাতেও কাজ হয় না। আনোয়ার ভাই সেফটি পিন খুলে গ্রেনেড ছুড়ে মারেন। এবারও ভাগ্য খারাপ। গ্রেনেডটি বিস্ফোরিত না হয়ে বরং সেটি দেয়ালে লেগে আমাদের কাছেই ফিরে আসে। এরই মধ্যে বাড়িতে থাকা অবাঙালি পুলিশ সদস্যরা মাথা নিচু করে ওপরের দিকে ক্রমাগত ব্ল্যাংক ফায়ার করতে থাকে। আমরা দেয়াল টপকে সেখান থেকে পালাই।

দৌড়ে গুলশান লেকের কাছে পৌঁছে দেখি জব্বার চাচা আর শাজাহান ভাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। তারা তিনজন সাঁতরে লেক পাড়ি দেন। কিন্তু আমার পক্ষে স্টেনগান নিয়ে সাঁতরে লেক পার হওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। একটি কোষা নৌকায় আস্তে আস্তে গুলশান ২ নম্বর ব্রিজের কাছাকাছি পৌঁছি। এদিকে গোলাগুলির শব্দে ক্যান্টনমেন্টের দিক থেকে একের পর এক পাক আর্মির গাড়ি মোনায়েম খানের বাসার দিকে যেতে থাকে। গুলশান ২ নম্বর ব্রিজটির ওপর আর্মির চেক পোস্ট ছিল। আমি ধরা পড়ার ঝুঁকি নিয়েই ব্রিজের নিচ দিয়ে একটু একটু করে ক্রলিং করে ভাটারায় পৌঁছি।

ভাটারা বাজারে একটি চায়ের দোকানে আনোয়ার, জব্বার ও শাজাহান আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। পথে ইস্রাফিল খন্দকারের সঙ্গে দেখা। তাকেই প্রথম মোনায়েম খান গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর দেই। স্টেনগান কাঁধে করে ওই দিনই প্রথম গ্রামের মানুষ আমাকে দেখেন। আমি শীতে কাঁপতে থাকি। আনোয়ার ভাইকে স্টেনগান দিয়ে বলি, আমার খুব শরীর খারাপ লাগছে! এরপর আমি জ্ঞান হারাই। জ্ঞান ফিরে রাতে। দেখি, বাড়ির লোকজন আমাকে ঘিরে আছেন। বাড়িতে থাকা নিরাপদ নয় ভেবে আনোয়ার ভাইসহ অন্যরা রূপগঞ্জে চলে গেলেন। আমি বাড়ির বাংলোঘরে (কাচারি) ঘুমাই।

আমার এক চাচা মালেক মাস্টার রেডিও পাকিস্তানে সকাল ৭টার খবর শুনছেন। খবরে প্রচার হয় ‘রাতে আততায়ীর গুলিতে আহত হয়ে মোনায়েম খান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছেন।’ সকালে আমি বাড়ির কাচারি ঘরে ঘুমিয়ে আছি। মালেক চাচা এসে খুব জোরে বারবার দরজা ধাক্কাচ্ছিলেন। আমি ঘুম চোখে দরজা খুলতে জানতে চাই কি হইছে? তিনি বললেন, ‘কি অইছে জান না, রাইতে আকাম কইরা শুইয়া আছ! মোনায়েম খান মইরা গেছে। মিলিটারি বাড়িত আইল, তাড়াতাড়ি বাড়ি থেকে বাইরহ।’ তখন আমি নিশ্চিত হলাম যে, আমার গুলিতে মারা গেছেন পাক গভর্নর মোনায়েম খান।

ভাটারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন মোজাম্মেল হক। এই ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের শেষ মাথায় ফাজিলারটেক শাওড়াতলায় সাড়ে ৫৯ ফুট উঁচু একটি ভাস্কর্য ‘বীরের প্রত্যাবর্তন’ তারই প্রচেষ্টায় তৈরি করা।


 

 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র